• প্রসঙ্গত শিক্ষক যখন রাজনৈতিক লাঞ্ছনার শিকার

    একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞানে-গুণে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করেন শিক্ষকরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে জ্ঞানার্জনের কারখানা। আর উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকেরা যথাসাধ্য জ্ঞান দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সুনাগরিক ও মানবসম্পদ রূপে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সে জন্যে তাঁদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর বলা হয়। যার কারণে শিক্ষকসমাজ সবসময় সব মানুষের কাছে সম্মানীয় হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু ইদানিং ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি শিক্ষকদের এই সম্মান ও মর্যাদাকে আঘাত করছে। বাংলাদেশে বহুবারই সাধারণ শিক্ষকরা নানা কারণে রাজনৈতিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। কিন্তু তদন্তসাপেক্ষে কোনো ঘটনারই দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। অপরাধীদের শণাক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। ফলে অবিচারের সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। আর এ সুযোগে স্বার্থান্বেষীরা দলীয় ছাত্রদের ব্যবহার করে ফায়দা লুঠছে ও অন্যায়ের প্রতিবাদকারী সাধারণ শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছে।

    তবে সর্ব কালের সব হিসাব যেন বিগত সমসাময়িক কিছু ঘটনার কাছে লজ্জা পেয়েছে। এ ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) আন্দোলনরত শিক্ষকরা। আর উপাচার্যের অনৈতিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর হামলাটি চালিয়েছে ছাত্রলীগের কয়েকজন সদস্য। বলাই বাহুল্য ছাত্রলীগের এই বেপরোয়া দৌরাত্ম্যের উৎস ক্ষমতার দাপট। তারা কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। পুলিশ প্রশাসন পালন করে নীরব ভূমিকা। বরং দোষীদের নয়, তারা নির্দোষদের ওপর চড়াও হয়। বিভিন্ন সময়ে এমন চিত্র দেশবাসী দেখে আসছে গণমাধ্যমের বদৌলতে। ফলে সন্ত্রাসীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে অন্যের শান্তি-নিরাপত্তা ও অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। শাবিপ্রতে যা হয়েছে তা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি। যদি সরকার ও প্রশাসন এদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতো, যদি অপরাধীদের অপরাধী হিসেবেই বিচারাধীন করা হতো এবং উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হতো, তাহলে এমন বেপরোয়া তারা হতো না। শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস তারা দেখাতো না। এ ধরনের চিত্র সরকারের জন্যেও শুভফল বয়ে আনবে না। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরা দরকার। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের অনলাইন ভিডিওচিত্রে জনপ্রিয় শিক্ষক ও লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের মর্মযাতনা ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কথা দেশবাসী জেনেছে।

    প্রকৃতপক্ষে এ কষ্ট কেবল তার একার নয়; শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের। আমরা চরম ধিক্কার জানাই ছাত্র নামধারী এসব সন্ত্রাসীকে। আমরা মনে করি, ছাত্রলীগ যা করছে তার দায়ভার মূল দল হিসেবে আওয়ামী লীগও অস্বীকার করতে পারে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী সুন্দর রাজনীতি চর্চার জন্যে ছাত্রলীগকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছেন ও উগ্রদের প্রতি কঠোর হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। সোমবার বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ফের দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, ‘ছাত্রলীগে আগাছা জন্ম নিলে তা উপড়ে ফেলতে হবে।’ আমরা আশা করতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তার মর্মার্থ ছাত্রলীগ উপলব্ধি করবে এবং সংগঠনের দুর্নাম হয় এমন কর্ম থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকেও নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ছাত্রলীগকর্মী বলে সন্ত্রাস করে পার পেয়ে যাবে, এমনটি যাতে না হয়। আমরা আশা করতে চাই, শিক্ষকদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

    Comments

    comments

    No Comments

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    17 − eleven =