• বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা রোধে সরকারের সামগ্রিক ব্যার্থতা

    বলার অপেক্ষা রাখে না, মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে সৃষ্ট পানিজটের বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ঝড়বৃষ্টি ও বন্যার এই দেশে মাত্র দু’তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পুরো রাজধানী তলিয়ে যাবে, অচল হয়ে পড়বে এবং মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির শেষ থাকবে না- এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। গত মঙ্গলবার বৃষ্টি ও বৃষ্টির পানি রাজধানীকে স্থবির শুধু নয়, অচলও করে ফেলেছিল। তাই বলে অতি বর্ষণ কিন্তু হয়নি। সকাল থেকে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে থেমে থেমে, বেলা ১১টার পর ঘণ্টা দেড়েক হয়েছিল অঝোর ধারায়। মাত্র এটুকুতেই রাজধানী ঢাকা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর, তেজগাঁও, বিজয় সরণী, পান্থপথ, হাতিরপুল, শাহবাগ, মতিঝিল, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, গ্রীন রোড, মালিবাগ, রামপুরা, মগবাজার, বনানী, মহাখালী, শান্তিনগর, বেইলি রোডসহ এমন কোনো এলাকার কথা বলা যাবে না, যেখানে দুই থেকে তিন-চার ফুট পর্যন্ত পানি না জমেছিল। পানিতে ডুবে গিয়েছিল অলিগলিও। অনেক এলাকায় বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি জমেছিল। কোনো এলাকার রাজপথেই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। মোটর সাইকেল থেকে শুরু করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার তো বটেই, যাত্রীবাহী বাসও অচল হয়ে পড়েছে যেখানে সেখানে। মানুষের পক্ষে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। কারণ পানি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নোংরা ও বিষাক্ত। ফলে স্কুলগামী শিশু-কিশোর হোক কিংবা হোক অফিসগামী কেউ, যারা যে কাজেই বাইরে বেরিয়েছিলেন তাদের প্রত্যেককে বিপদে পড়তে হয়েছিল। কোথাও কোথাও মানুষকে একই জায়গায় দুই তিন ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়েছে। আধ ঘণ্টার পথ অনেকে পাড়ি দিয়েছেন এমনকি চার পাঁচ ঘণ্টায়। গুরুতর অসুস্থদেরও হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। চলাচল করতে পারেনি অ্যাম্বুলেস। অর্থাৎ সব মিলিয়েই সেদিন রাজধানীর অবস্থা হয়েছিল অত্যন্ত শোচনীয়।

    অন্যদিকে ভয়াবহ এই পানিজটের কারণ নিয়ে যথারীতি গবেষণা ও মতামত প্রকাশ করার পালা শুরু হয়ে গেছে। সাধারণভাবে দুই সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অন্য কিছু কারণও প্রাধান্যে এসেছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বলা হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়নের কথা। শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করে বহুতল ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ, ভবনের আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা না রাখা, পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়া এবং রাজধানীর চারপাশের প্রতিটি নদনদীতে পানি বেড়ে যাওয়ার মতো অনেক কারণ নিয়েই জোর অলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা তাদের অভিমত জানাচ্ছেন, করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন।

    একই কারণে পানিজটের বিভিন্ন কারণ সম্পর্কে জানানো এবং সমাধানের পথ খোঁজা দরকার। খাল ও পুকুর দখলের পাশাপাশি ভরাট করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণকে দায়ী করে দেয়া বিভিন্ন মহলের বক্তব্যকে আমরাও প্রধান একটি কারণ বলে মনে করি। খাল ও পুকুর দখলের এই অভিযানকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। এ ব্যাপারে শুধু ব্যক্তি বা বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দায়ী করে লাভ নেই। কারণ, সরকারের পক্ষ থেকেও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ কম নেয়া হয়নি। একটি উদাহরণ হিসেবে পুরনো ঢাকার ধোলাই খালের কথা উল্লেখ করা যায়। শত বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিশে থাকা এ খালটিকে বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে প্রকৃতপক্ষে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও করা হয়েছে অমার্জনীয় অপরাধ। পানি প্রবাহিত হওয়ার জন্য কালভার্টের ভেতরে যেখানে অন্তত ১৫ থেকে ২০ ফুট জায়গা ফাঁকা থাকার কথা সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমতে জমতে তিন চার ফুট জায়গাও এখন ফাঁকা নেই। ফলে পানিও যেতে পারে না। অথচ আগে এই ধোলাই খাল দিয়েই বৃষ্টির বেশিরভাগ পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়তো। রাজধানীর সুয়ারেজ বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকেও লক্ষ্য করা দরকার। পলিথিনসহ নানা আবর্জনায় ড্রেনগুলো আটকে যাওয়ার কথা সরকারের অবশ্যই জানা রয়েছে। কিন্তু আবর্জনা সরিয়ে ফেলার জন্য ওয়াসা বা দুই সিটি করপোরেশনের কারো পক্ষ থেকেই ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। হাতির ঝিল প্রকল্প নিয়ে ঢাকঢোল যথেষ্টই পেটানো হয়েছিল। কিন্তু এবার জানা গেলো, হাতির ঝিল থেকে পানি যে পথে বেরিয়ে যাওয়ার কথা সে পথের মুখে রামপুরায় রয়েছে একটি স্লুইস গেট। মঙ্গলবার সেটা নাকি বন্ধ ছিল, যার জন্য পানি সরে যেতে পারেনি। যেতে পারলেও অবশ্য লাভ হতো না। কারণ, বুড়িগঙ্গার মতো বালু নদীর পানিও স্বাভাবিকের চাইতে বেশি উচ্চতা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুতরাং হাতির ঝিলের পানি গিয়ে উল্টো নতুন কিছু এলাকার মানুষের বিপদ বাড়িয়ে তুলতো।

    এরকম আরো কিছু কারণও রয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, সেগুলোর উল্লেখের পরিবর্তে পানিজটের বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে দেখা দরকার। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে আর কোনো খাল বা পুকুর দখল ও ভরাট করা না হয়। বাধাহীন পানি প্রবাহের জন্য ধোলাই খালের বক্স কালভার্টের পাশাপাশি রাজধানীর কোনো ড্রেনেই আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না। এগুলোকে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ওয়াসা, তিতাস এবং দুই সিটি করপোরেশনসহ রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির দায়িত্বে নিয়োজিত সকল সংস্থার কাজে সমন্বয় করাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, আর কখনো যাতে গত মঙ্গলবারের পুনরাবৃত্তি না ঘটতে পারে।

    Comments

    comments

    No Comments

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    5 × 2 =