• ভ্যাট বনাম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়

    শিক্ষা যে এদেশে একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, তার সবশেষ উদাহরণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আরোপ। চলতি বাজেটে বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পর থেকেই শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা এর সমালোচনা করে আসছিলেন। একই সঙ্গে এটি যে সব শেষে শিক্ষার্থীদের ওপরেই চাপানো হবে, সেই আশঙ্কাও ছিল এবং ফলেছেও তা। প্রস্তাবিত বাজেটের পর থেকে গত প্রায় চার মাস ধরে অনেক ধরনের সমালোচনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সাড়ে সাত শতাংশ হারে ভ্যাটের অর্থ আদায় করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কেউ কোনো কথা বলেনি। না শিক্ষামন্ত্রী, না অর্থমন্ত্রী, না রাজস্ব বোর্ড। শিক্ষা এখন স্রেফ একটি পণ্য, পবিত্র সংবিধানে ‘শিক্ষা মৌলিক অধিকার’ এ বিষয়ে যতই মুখরোচক কথা লিপিবদ্ধ থাক না কেন। অনেক আগে থেকেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো (দু-একটি ছাড়া) ভ্যাট দিয়ে আসছে। তবে কর্তৃপক্ষ নয়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই তা আদায় করা হয়।

    কর্তৃপক্ষকেই মূসক দিতে হবে, এমনটা উল্লেখ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত মূসক প্রত্যাহার করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রীর কথা শুনলে মনে হতে পারে দেশের অর্থমন্ত্রীর প্রধান কাজ হচ্ছে নির্বিচারে রাজস্ব আরোপ করে সরকারের টাকা বাড়ানো। আসলে কি তাই? সরকার নীলকর আদায়কারী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারের বরং অন্যতম কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের জনকল্যাণমুখী আর্থিক ব্যবস্থাপনা। সংবিধান অনুসারে এটি করার ক্ষেত্রেও সরকারকে ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, উন্নয়নের জন্য, দেশ চালানোর জন্য বা অন্য যেকোনো কারণে টাকার প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক লুট করে, বিদেশে পাচার করে বা নানাভাবে দুর্নীতি করে লোপাট করা লাখো–কোটি টাকা আদায়ের চেষ্টা করুন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শুধু নন, যেকোনো শিক্ষার্থীর ওপর ভ্যাট বা ট্যাক্স আরোপের আগে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে
    জানুন।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী আছেন, যাঁরা আমলা, বড় ব্যবসায়ী বা বড় আইনজীবীর সন্তান। ছাত্র আন্দোলনের ভয় আছে বলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক টাকা বেতন বাড়ানোর সাহস পায় না কোনো সরকার। অপর দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে
    সেই ভয় নেই মনে করে কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ টাকা বেতনের চেয়ে শত গুণ শুধু ভ্যাট আরোপ করা হোল। শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান, আমাদের ভবিষ্যৎ, ভ্যাট আদায়ের জন্য উচ্চশিক্ষাকে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ছাত্রদের স্বার্থহানি করা কোন অর্থে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে তা কোন ভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না।

    মাননীয় অর্থমন্ত্রী, আপনার কাছে অনুরোধ, জানার চেষ্টা করুন, বাস্তব অবস্থার খোঁজখবর নিন অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দুরবস্থার কথা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বড় অংশের ছাত্রছাত্রীদের পিতাদের মধ্যে অবস্থাপন্নরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, পুলিশের দারোগা বা মুদি দোকানদারও। কোনো কোনো শিক্ষার্থী আছেন, যাঁদের তিনটি চারটি টিউশনি করে বা আট ঘণ্টা চাকরি করে নিজের পড়ার খরচের একটি বড় অংশ জোগাড় করতে হয়। অন্ধকারে ডুবে না থেকে সোজা ভাবে ভাবুন দেশের উন্নয়ন হবে এমন কিছু করুন।

    Comments

    comments

    No Comments

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    ten + 12 =