• মহাবিপদে গার্মেন্ট খাত

    1395078073.চতুর্মুখী চাপে কঠিন বিপদে পড়েছে দেশের অর্থনীতির ত্রাতা তৈরি পোশাক খাত। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের শত্রুর আক্রমণের শিকার বেকারত্ব মোচনকারী খাতটি। সরকারের দায়ভার ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের উদাসীনতা আজ ভয়ানক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে এই খাতকে। সরকার ও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের আন্তরিক ও যৌথ উদ্যোগই পারে খাদের কিনার থেকে খাতটিকে টেনে আনতে। নইলে হুমকিতে পড়বে ৪০ লাখ পরিবারের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা। বর্তমানে এ খাতে বিদেশি ষড়যন্ত্রের নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে ‘কমপ্লায়েন্স’ ইস্যু। শুরুতে ষড়যন্ত্রের রূপটা দেশিয় এজেন্টদের মাধ্যমে কারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টি ও অগ্নিকান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয় তাজরিন ও রানা প্লাজা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নেতিবাচক প্রচারণা। এখন ওই একই ভিত্তিতে শুরু হয়েছে ‘কমপ্লায়েন্স ষড়যন্ত্র’। ইনকিলাবের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, এই ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রতিযোগী দেশগুলোর নাগরিকরা যারা বাংলাদেশে বায়িং হাউস ও ক্রেতাদের দেশীয় কার্যালয়ে শীর্ষ পর্যায়ে কর্মরত আছেন। তারা কমপ্লায়েন্স ও নিরাপত্তার নামে কারণে অকারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোকে বিপদে ফেলছেন। কিন্তু পাশের দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা বা চীনে মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য কেউ নেই।
    নতুন এই ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রীসহ গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নেতারা। সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতি রুখতে রফতানি খাত নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। তবে বাংলাদেশের গতিপথ কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না। এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র দ্বিতীয় সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেন, কমপ্লায়েন্সের নামে দেশের পোশাক শিল্প নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। এ বিষয়ে সরকার এখনই ব্যবস্থা না নিলে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।
    বর্তমানে দুই ধরনের কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এগুলো হলো ভবন ভাগাভাগি বা শেয়ারড বিল্ডিংয়ে গড়ে ওঠা ১৫ শতাংশ কারখানা। আর বিজিএমইএ-বিকেএমইএ’র সদস্য পদহীন ৭০০-৮০০ ‘সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানা’। বাকি কারখানাগুলোকে নিরাপত্তার জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে সে অর্থের সংস্থান করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম। এজন্য তিনি সময় ও ক্রেতাদের অর্থ সহায়তা চেয়েছেন। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে চালু প্রায় চার হাজার পোশাক কারখানার মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। বাকি কারখানার ৬০ শতাংশ বাণিজ্যিক ভবনে এবং ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে। আবার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কারখানা গড়ে উঠেছে ভাগাভাগির ভবনে। কোনো কারখানা ভবনে অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় বা দোকান আছে। আবার একটি ভবনে একাধিক কারখানাও আছে। এসব ভাগাভাগির কারখানায় ক্রেতারা অর্ডার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলছেন।
    এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম ইনকিলাবকে বলেন, আমরা বায়ারদের বলেছি, শেয়ারড বিল্ডিংয়ে গড়ে ওঠা কারখানা আমরা সরিয়ে নেব। কিন্তু সে জন্য দুই বছর সময় দিতে হবে। এর আগে কোনো কারখানা থেকে কাজ সরিয়ে নেওয়া যাবে না।
    দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিষয়ে শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, দেশি বিদেশি উভয় ষড়যন্ত্রের কবলে আছি আমরা। বিদেশিরা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে অর্ধনগ্ন ছবি ছেপেছে। এটাকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করছি আমরা। বিদেশিদের অর্থপুষ্ট দেশের এনজিওগুলো পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। স্ট্যান্ডার্ডের মতো আদর্শ গার্মেন্ট কারখানা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েই ধ্বংস হয়েছে। সরকারের উচিত, কোন কোন এনজিও দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে তা চিহ্নিত করে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে সেরকম কোন পদক্ষেপ দেখছেন না বলে জানান তিনি।
    সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী ইনকিলাবকে বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা করি। আর এখানে প্রতিযোগী থাকবেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগীরা আমাদের পেছনে ফেলতে চাইবে। টিকে থাকতে হলে আমাদের সরকার-মালিক-শ্রমিক ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
    গার্মেন্ট খাতের বর্তমান সংকটের দায়ভার সরকারকেও বহন করতে হবে- এই মত গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, সরকার এই খাতের উন্নয়নে অনেক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে ক্ষমতাসীন দলের কিছু বিতর্কিত রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে সংকট আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে তারা ইঙ্গিত করেছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র স্থগিত হওয়া জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিচ্ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের জিএসপি (পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) বাতিলের জোর শঙ্কা জেগেছে। ইইউ’র আবাসিক প্রতিনিধি উইলিয়াম হানা সম্প্রতি তাদের অসন্তোষের কথা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন। “সন্তুষ্ট হওয়ার কোন কারণ নেই।”
    জিএসপি ইস্যুর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই গার্মেন্ট খাতে স্পষ্ট হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি পোশাক শিল্পের দুই প্রধান উপখাত নিটওয়্যার ও ওভেন। এ নিয়ে উদ্যোক্তা-রফতানিকারকদের শঙ্কা, বর্তমান কার্যাদেশের পরিমাণ আগামী দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
    রফতানি পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এখন পর্যন্ত রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও এর হার ক্রমেই কমে এসেছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিট ও ওভেন খাতে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত যা ছিল যথাক্রমে ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ও ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি, যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও ২০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। নভেম্বরে এ দুই খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ ও ২১ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, শিগগিরই নেতিবাচক ধারায় পৌঁছবে প্রবৃদ্ধির সূচক।
    বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, রানা প্লাজা ধসের মধ্য দিয়ে জিএসপি স্থগিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর অশনি সঙ্কেত নেমে এসেছে। দেশে-বিদেশে নেতিবাচক প্রচারণা এবং বিভিন্ন পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে রফতানিতে যে কালো ছায়া দেখা দিয়েছে তাতে আগামীতে আমাদের আরো ভয়াবহতা মোকাবেলায় প্রস্তুত হতে হবে।
    আবদুস সালাম মুর্শেদী এ প্রসঙ্গে বলেন, জুন মাসে আমেরিকায় জিএসপি স্থগিত হলেও এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লেগেছে। কারণ, জুনের পর যেসব রফতানি আদেশ এসেছে সেগুলো রফতানি হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। গত কয়েক মাসে রফতানি আদেশ আরো কমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভয়াবহতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যাবে গত কয়েক মাসে যেসব রফতানি আদেশ এসেছে সেগুলো রফতানি হওয়ার পর।
    বর্তমান নেতৃবৃন্দের নেতৃত্ব ঘাটতিও বর্তমান অবস্থার জন্য সমান দায়ী- এমন মত সাবেক বিজিএমইএ নেতা ও গার্মেন্ট মালিকদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিএমইএ’র একজন সাবেক সভাপতি ইনকিলাবকে বলেছেন, বর্তমান নেতৃবৃন্দ সময়োপযোগী নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিধায় সংকট বেড়েছে। দৃঢ় নেতৃত্ব থাকলে এতদিনে জটিলতা কেটে যেত।
    বিশ্লেষকরা বলছেন, জিএসপি’র জন্য যুক্তরাষ্ট্র এমন সব শর্ত জুড়ে দিয়েছে যা পূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়। এটা বুঝেই সরকারকে চাপে ফেলতে এসব শর্ত দিয়েছে। দেশের সম্ভাবনাময় গার্মেন্ট শিল্পকে ধ্বংস করতেই এসব শর্ত দেয়া হয়েছে- এমন মত গার্মেন্ট মালিকদের।
    যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৬ শর্তের মধ্যে অন্যতম সকল কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন বাস্তবায়ন করা। তবে ৫ হাজার কারখানার মধ্যে মাত্র ২১৫টি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন আছে। এর মধ্যে গত বছর দেয়া হয়েছে ৭৯টি কারখানায়। ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। পাট শিল্প ধ্বংস হয়েছে এই ট্রেড ইউনিয়নের কারণেই। তাই আমরা চাইনা গার্মেন্ট খাত ধ্বংস হোক। তবে ক্রমান্বয়ে সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ৭৯টি কারখানায় নতুন ট্রেড ইউনিয়ন হয়েছে।
    গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই খাতকে এধরনের বিধ্বংসী শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হবে। আর এজন্য মূল ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বাংলাদেশে শ্রমিক ইউনিয়নের বাস্তবতা বুঝাতে হবে।
    এদিকে গার্মেন্ট খাতকে নতুন করে বিতর্কের মুখে ফেলে দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামের বক্তব্য। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে জঙ্গী অর্থায়ন রয়েছে। বিজিএমই নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, মনিরুলের এ ঢালাও মন্তব্য বহির্বিশ্বে দেশের গার্মেন্ট খাতকে নতুন সংকটে ফেলে দেবে- এমনটিই মনে করছেন বিজিএমইএ নেতারা।
    বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি’র (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে জঙ্গি অর্থায়নের কোনো রেকর্ড নেই। সংবাদ সম্মেলনে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার আগে আমাদের জানালে ভালো হতো। এ ধরনের বক্তব্য বহির্বিশ্বে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প সম্পর্কে ভুল বার্তা যাবে।
    কয়েকটি কেস স্টাডি
    ঢাকার তেজগাঁওয়ের স্টিচওয়েল ডিজাইন লিমিটেড প্যাট্রিয়ট গ্রুপের একটি গার্মেন্ট কারখানা। গত বছর ৫ জুন এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন একটি ই-মেইল পান। ওই মেইলে আটটি ব্র্যান্ডের মালিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ইনডিটেক্স জানায়, স্টিচওয়েল ডিজাইন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা। তাই তারা তাদের সব অর্ডার ও পণ্য সেখান থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। মালিককে জানানোর পাশাপাশি ইনডিটেক্স এ বার্তা অন্যান্য ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানকেও জানিয়ে দেয়। ফলে অন্য ক্রেতারাও ওই কারখানা থেকে সরে যায়। পরে ইনডিটেক্স তৃতীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে দেখতে পায়, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে তত দিনে যে ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।
    গত বছর জুনে সাভারের লিবার্টি ফ্যাশন নামের একটি কারখানা থেকে অর্ডার প্রত্যাহার করে টেসকো। এর আগে তারা ব্রিটিশ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এমসিএসের মাধ্যমে একটি নিরীক্ষা করায়। কারখানার মালিকপক্ষের অভিযোগ, শুধু চোখে দেখে তাদের কারখানাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউজক) দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ভবনটি মোটেও ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কিন্তু টেসকো আর ওই কারখানায় ফিরে আসেনি। অন্য ক্রেতারাও সেখানে কাজের অর্ডার দিচ্ছে না।
    সম্প্রতি ঢাকার তিনটি কারখানা পরিদর্শনের পর সেগুলোকে কাজ করার অযোগ্য ঘোষণা করেন ক্রেতা প্রতিনিধিরা। তবে রিভিউ প্যানেল পরীক্ষা করে মালামাল সরিয়ে ভবনটি কিছুটা ভারমুক্ত করার পর চালু করার সুযোগ দেয়। পুরোপুরি পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে কারখানা চালুর পর নতুন করে কাজ পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।
    এর আগে রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর ওয়ালমার্ট তাদের ওয়েবসাইটে তিনশ কারখানার তালিকা প্রকাশ করে ঘোষণা করে, ওই সব কারখানায় তাদের পোশাক তৈরি হবে না। ওই তালিকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান অনেক বছর আগে থেকেই ওয়ালমার্টের কাজ করছিল না। বরং তারা আরো ভালো ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাজ করছিল। কিন্তু ওয়ালমার্ট তাদের না জানিয়ে কালো তালিকাভুক্ত করে। ফলে বিপাকে পড়ে ওই তিনশ’ কারখানা।
    পোশাক খাতে এখন তিন জোটের পরিদর্শন কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি’ প্রায় ছয় শ’ কারখানা পরিদর্শন করবে। ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট ‘বাংলাদেশ অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি’ প্রায় ১৬শ’ কারখানা পরিদর্শন করবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সহায়তায় সরকার ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় বুয়েটকে দিয়ে বাকি কারখানাগুলো পরিদর্শন করাচ্ছে। এর মধ্যে অ্যাকর্ড যেসব প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিদর্শন করাচ্ছে, তারা নিয়ে আসছে বিদেশি প্রকৌশলী। এরই মধ্যে ওই সব বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য আইনজীবীদের মত নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে।
    লিবার্টি ফ্যাশনকে পরীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া ‘এমসিএস’ নামক প্রতিষ্ঠানটি যে প্রকৌশলীকে পাঠিয়েছিল তিনি ছিলেন পাকিস্তানি। তাঁর ‘ভুয়া’ প্রতিবেদনের কারণে লিবার্টি ফ্যাশন বিপদে পড়েছে। তিনি কী কারণে ‘চোখের দেখায়’ ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন তার রহস্য ভেদ হয়নি। প্রসঙ্গত, ভারতের পর বাংলাদেশের নতুন প্রতিযোগী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে হাজির হয়েছে পাকিস্তান।
    সম্প্রতি বিজিএমইএ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিশিষ্ট প্রকৌশলী অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বিদেশি প্রকৌশলীদের এ দেশে নিবন্ধন নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। জবাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছিলেন, এটি নিশ্চিত করা হবে।
    এই খাতকে রক্ষা করতে আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি তুলেছেন বিজিএমইএ সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম। তিনি ইনকিলাবকে বলেছেন, দেশের গার্মেন্ট সেক্টরের জন্য সরকারের সাপোর্ট মোটেই যথেষ্ট নয়। তবে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী খুব আন্তরিক। কোন দাবি নিয়ে তার কাছে গেলে তিনি আন্তরিকভাবে দেখার চেষ্টা করেন। আগের আমলে আমরা কোন কাজই করতে পারিনি। পাটের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় থাকলেও ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় নেই। এটা খুবই জরুরী। আলাদা মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা দেখছি না।
    তিনি বলেন, হঠাৎ করে শ্রমিকদের বেতন বেড়ে যাওয়ায় সরকারের কাছে আমাদের দাবি ছিল, উৎসে কর শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ করা। অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টি পাস করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির দ্রুত অনুমোদন দিক।
    আবদুস সালাম মুর্শেদী ইনকিলাবকে বলেন, এই মুহূর্তে যে সাপোর্ট বেশি দরকার সেটা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা। কারণ, আমাদের শ্রমিকদের বেতন বেড়েছে। আমরা একটি অস্থিতিশীল বছর পার করেছি। আমাদের সব ধরনের সুবিধাসহ অবকাঠামো দরকার যেখানে আমাদের কারখানাগুলো স্থানান্তর করতে পারি। সরকার আমাদের যথেষ্ট সাপোর্ট দিচ্ছে। বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী আমাদের সহযোগিতা করছেন। তবে এই খাত আরও বেশি দাবি করে। আমরা আন্তর্জাতিক ব্যবসা করি। আর এখানে প্রতিযোগী থাকবেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগীরা আমাদের পেছনে ফেলতে চাইবে। টিকে থাকতে হলে আমাদের সরকার-মালিক-শ্রমিক ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

    Comments

    comments

    No Comments

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    five × one =