• ৫ জানুয়ারি : গণতন্ত্রের রক্ষক না ভক্ষক?

    তৈমূর আলম খন্দকার : ৫ জানুয়ারি ২০১৪ বাংলাদেশের একটি দিবস যা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে ‘গণতন্ত্রের’ মাসী মা হিসেবে, কারো মতে এটা রাক্ষুসিনী যার কাজ ছলে বলে কৌশলে মায়াময়ী মা সেজে নিজ সন্তানকে ভক্ষণ করা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ ২০ দলীয় জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে না এ প্রত্যয় নিয়েই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। সে আন্দোলন সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করতে না পাড়লেও একটি শক্ত নাড়া দিয়েছিল এ মর্মে কোনো সন্দেহ ছিল না। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩ ‘রোড ফর ডেমোক্র্যাসি’ আন্দোলনটি পুলিশ ও র‌্যাবের নির্মম ও অগণতান্ত্রিক নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সে দিন ৯টি বালুর ট্রাক দিয়ে খালেদা জিয়াকে আটকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তিনি ঘর থেকে বেরুতে না পারেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বালু ট্রাকের মাধ্যমে পথ রোধ করে সরকার যে আচরণ প্রদর্শন করেছে তা-ও নাকি ‘গণতন্ত্রের’ জন্য। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র’ নামক অসার বস্তুটিকে বুটের নিচে রেখে একটি ফরমায়েসি গণতন্ত্রের সূচনা হলো। ভোট ও প্রার্থীবিহীন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন প্রার্থী এমপি এবং বাকিগুলোও তথাকথিত বিতর্কিত নির্বাচিত হতে জনগণের ভোট লাগেনি। অতঃপর সংরক্ষিত আসনে আরো ৪৫ জন নারীকে নির্বাচিত করে শুরু হয় অনির্বাচিত জাতীয় সংসদের পথচলা। সব কিছু জেনে বিশ্ববাসীও এ নির্বাচনকে বিতর্কিত নির্বাচন বললেও এর ধারা অব্যাহত রয়েছে।
    ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি লোক দেখানো নির্বাচনের পর বিরোধী দল আন্দোলন করেছে, মামলা-মোকদ্দমায় আসামি হয়েছে, গুম হয়েছে, ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে, সর্বোপরি বিরোধী দল আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, প্রহসনের নির্বাচন তারা মেনে নেয়নি। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সময় গড়িয়ে চলে এলো ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে সরকার গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করতে চাইলেও বিএনপি এটাকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করার উদ্যোগ নেয়। সে দিনও খালেদা জিয়াকে গুলশান অফিস থেকে বের হতে দেয়া হয়নি পুরনো কায়দায় সেই বালুর ট্রাক। বালুর ট্রাক সম্পর্কে সরকারি মুখপাত্র (মন্ত্রী) বলেছেন যে, ‘খালেদা জিয়া বাড়ি মেরামতের কাজের জন্য বালুর ট্রাক এনেছে।’ অন্য দিকে ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপাররা বলেছেন, ‘পুলিশ আমাদের কেন ধরে এনেছে তা আমরা জানি না।’ জনসভায় যোগ দেয়ার জন্য অফিস থেকে বের হতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন যা ৯৩ দিন অবদি চলে। অনেক ঘটনা অঘটনের মাধ্যমে ২০১৬ অতিক্রম করলেও ‘গণতন্ত্র’ আর আলোর মুখ দেখতে পায়নি। কারণ ২০১৫-১৬ দুটো বছরই ছিল স্থানীয় সরকার অর্থাৎ ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন। সে নির্বাচনও ছিল লোক দেখানো ও মানুষ হত্যার নির্বাচন। ১৪৫ জন নাগরিক ইউপি নির্বাচনে হত্যা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন যে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।’
    মূল কথায় আসা যাক। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার অবস্থান আগেও ছিল না, এখনো নেই, তবে কথা বলার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে বার বার, মানুষ সফল হয়েছে, কিন্তু সেই আগ্রাসন বার বারই গণমানুষের কণ্ঠকে রোধ করে দিয়েছে। ঘটনাচক্রে ‘হীরক রাজার’ দেশের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাজা যা বলবে সেটাই প্রজার জন্য আইন, এর ব্যতিক্রম আগেও ছিল না। বর্তমানেও নেই, তবে শব্দ চারণ ও কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশরা ‘খান বাহাদুর’ বা ‘রায় বাহাদুর’ টাইটেল দিয়ে যারা কথা বলতে পারত তাদের করায়ত্ত করত। পাকিস্তান আমলে করা হয়েছিল তগমায়ে কায়েদে আযম বা মিল্লাতে পাকিস্তান বা এ জাতীয় কোনো উপাধি দিয়ে। যারা অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করত তাদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য চালানো হতো স্টিমরোলার। সে অবস্থায় এখনো পরিবর্তন হয়নি।
    রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী? না তারা কি জনস্বার্থকে বিবেচনা করে কাজ করেন? দেশের চলমান প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড কি প্রমাণ করে?
    সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে :
    (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
    (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়।
    কিন্তু সত্যিই কি জনগণ রাষ্ট্রের বা ক্ষমতার মালিক? জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর কোনো প্রক্রিয়া (স্পেস) ক্ষমতাসীনরা কি খোলা রাখে? স্পেস রাখে না এ কারণে যে, জনগণের জন্য স্পেস রাখলেই তারা (ক্ষমতাসীনরা) নিজেরাই হাওয়া হয়ে যেতে পারে এ ভয়ে। দলীয় কারণের অভিযোগ আগেও ছিল, কিন্তু দলবাজি এত প্রকট আকার ধারণ করতে দেখা যায়নি। যোগ্যতা যাই থাকুক কোনো চাকরি, ব্যাংকিং সুবিধাসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে সাধারণ নাগরিকরা বঞ্চিত, যারা ক্ষমতাসীনদের সমর্থন করে না অথবা যাদের কোনো আত্মীয়স্বজন সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত।
    মোটা দাগে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা আভিধানিক অর্থে যাই হোক না কেন বাস্তবতার দৃশ্যপটে তা বদলে গেছে। ইংল্যান্ডে যত আদেশ-নিষেধ সরকারিভাবে যে ঘোষণাই আসুক না কেন তা হয় রানীর ব্যানারে। বাস্তবতা এই যে, আমাদের দেশেও গণতন্ত্রকে দুর্বল ও ধ্বংস বা বিতর্কিত করার জন্য যা করা হয় সবই গণতন্ত্রকে রক্ষার অজুহাতে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান শর্ত হলো জবাবদিহিতা। বর্তমান সরকার মনে করে, তারা জবাবদিহিতার অনেক ঊর্ধ্বে। কারণ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে।
    সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ক্যালেঙ্কারি ও অর্থ লোটপাট বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোষাগার থেকে ডিজিটাল চুরির মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে জবাবদিহিমূলক কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি বরং তথ্যবিভ্রাট সৃষ্টি করে সরকার জনমনে ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। সরকার ভারতের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করেছে যা সম্পর্কে জনগণ অবগত নয়; এমনকি বিনা ভোটে নির্বাচিত নিজের করায়ত্ত সংসদেও তা আলোচনা করা হয়নি। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সত্যই জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়ে থাকে তবে জনগণের সাথে এ বৈরিতা কেন? কেন জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলক ঘটাতে দেয়া হচ্ছে না? আইনের শাসন ও মানবতা পাশাপাশি নির্বিঘেœ চলতে না পারলে গণতন্ত্রের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে না। আইনের শাসনের পরিবর্তে দেশে যখন ব্যক্তির শাসন চলে তখন এ পরিবেশকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলা যায় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষমতাসীনদের মুখে মুখে থাকলে স্বাধীনমত প্রকাশের জন্য মিথ্যা মামলায় নিগৃত হয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আমার দেশ, টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত। একুশে টিভির মালিক পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। ‘লাইসেন্স আমি দিয়েছি এবং আমিই তা বন্ধ করতে পারি’ এ হুমকি দিয়েও মিডিয়ার প্রতি ভীতি সঞ্চার করা হয়েছে।
    সরকারি দল ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস এবং বিরোধী দল বিএনপি ও শরিক দল এ দিবসকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে উদযাপন করেছে। আগে থেকে সরকারি দলের মুখপাত্র ঘোষণা দিয়ে আসছে যে, বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না যা ইতঃপূর্বে সরকারি দল দিয়েছিল। বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে না দেয়া কি গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ? পুলিশ বা র‌্যাব দিয়ে মিথ্যা মামলায় নাজেহাল এবং হুমকি দিয়ে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করাই কি গণতন্ত্রের বিজয়? অনৈতিকভাবে নিজ স্বার্থ রক্ষাই যদি বিজয় হয় তবে এ বিজয় সম্পর্কে দেশবাসীর চেতনাবোধ কোনো কাজ করবে না, বরং বিবেক যদি সচেতন থাকে তবে অবশ্যই এ বিজয় জনগণের সমর্থন পেতে পারে না। বেনজির ভুট্টোর ভাষায় ‘বন্ধুক ও টিয়ারশেল দিয়ে মানুষকে দমন করা যায়, তাদের বরখাস্ত করা যায়, কিন্তু তাদের হৃদয়কে জয় করা যায় না। ধুসর মরুতে যেমন ফুলের গাছ জন্মায় না তেমনি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে এক নায়কতন্ত্র হওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলকে জনগণের মন জয় করেই টিকে থাকতে হয়। তারা শহীদের আত্মার প্রতি দায়বদ্ধ, যারা গণতন্ত্রের জন্য আত্মহুতি দিয়েছে’ (সূত্র ডটার অব টি ইস্ট পৃষ্ঠা-৩৫০)।
    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন-
    ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, আচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনাবিচারে বন্দী করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’ ওই বইটির প্রকাশক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি কি তার পিতার এ উপলব্ধি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হননি? নাকি ক্ষমতার লোভ বা স্বার্থের জন্য মানুষ যেভাবে পথ হারিয়ে ফেলে তিনি অনুরূপ হয়েছেন? গণতন্ত্র কি তার বোঝার ক্ষমতা তিনি রাখেন, তারপরও তিনি যদি বুঝেশুনে না বুঝে থাকেন তবে তার দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের বিজয় নামক পোশাক পরে উল্লাস করা ক্ষমতাসীনদের জন্য যথার্থ!

    Comments

    comments

    No Comments

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    5 + 5 =