• ?????: ধর্ম ও জীবন্‌

    নামাজে মনোযোগী হবার পদ্ধতি

    আমরা যখন নামাজে দাড়াই তখন শয়তান আমাদের অন্তরে নানারকম প্ররোচনা দিয়ে নামাজে অমনোযোগী করে তুলা চেষ্টা করে, এতে অনেকের বেলায় শয়তান সফল হয় আবার অনেকের বেলায় শয়তান সফল হতে পারেনা।

    এর থেকে বাঁচতে হলে ও নামাজ শুদ্ধভাবে পড়তে হলে আমরা যদি নামাযে যাহা পড়ি মেশিনের মতো না পড়ে বুঝে পড়ার চেষ্টা করতাম তাহলে ইন শা আল্লাহ্ শয়তান আমাদের নামাজকে নষ্ট করতে সফল হতে পারবে না *****

    আজ আপনাদেরকে কিভাবে সুরা ফাতিহাতে মনোযোগ রাখবেন সেই সম্পর্কে আলোচনা করব ।
    আপনাদের নিকট আমার অনুরোধ, যদি লেখাটি আপনার উপকারে আসে তাহলে অন্তত আপনার বন্ধু কিংবা আপনজনদের শেয়ার করবেন।
    আল্লাহ এর জন্য আপনাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন।
    নামাযে সূরা ফতিহা পড়ার সময় এ হাদীসটির কথা খেয়ালে রাখলে এক একটি আয়াত পড়ার পর আল্লাহর প্রেমময় জওয়াবটা মনের কানে শুনবার জন্য বান্দাহকে থামতেই হবে। আল্লাহর জওয়াবে যে তৃপ্তি ও শান্তি তা তারাই বোধ করতে পারে, যারা আয়াতগুলো ধীরে ধীরে মজা নিয়ে পড়ে।
    এ হাদীসে মহব্বতের এমন অগ্নিকণা রয়েছে যে,
    বান্দার দিলে ঈমানের বার“দ থাকলে এবং নামাযে সূরা ফাতিহা পড়ার সময় আল্লাহর আবেগময় কথার দিকে খেয়াল করলে আল্লাহর প্রতি ভালবাসার এমন আগুন জ্বলে উঠবে যে, জযবায় বান্দাহ নিজেকে মনিবের অতি কাছে বলে অনুভব করবে।
    আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ *****
    পড়ে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে হবে।
    হাদীসে আছে যে সূরা ফাতিহার এক এক অংশ তিলাওয়াত করার সাথে সাথে আল্লাহ এর জওয়াব দেন। এ হাদীসের কথাগুলো এমন আবেগময় ভাষায় বলা হয়েছে যা বান্দাহর মনে গভীর দোলা দেয়। হাদীসটি নিম্নরূপ :
    হাদিসটির অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত।
    তিনি বলেলন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি :
    আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি নামাযকে আমার ও আমার বান্দাহর মধ্যে দুভাগে ভাগ করেছি।
    আর আমার বান্দাহ আমার নিকট যা চায় তাই পাবে।
    বান্দাহ যখন বলে, ‘‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।”
    অর্থ :যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি সকল
    সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।
    তখন আল্লাহ বলেন , “ আমার বান্দাহ আমার প্রশংসা করল।”
    যখন বান্দাহ বলে “আর রাহমানির রাহীম”।
    অর্থ :যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু।
    তখন আল্লাহ বলেন আমার বান্দাহ আমার গুণ গাইল”
    যখন বান্দাহ বলে “মালিকি ইয়াওমিদ্দীন ”
    অর্থ :যিনি বিচার দিনের মালিক।
    তখন আল্লাহ বলেন “আমার বান্দাহ আমার গৌরব বর্ণনা করল”
    যখন বান্দাহ বলে, “ইয়্যাকা না বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন
    অর্থ :আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
    তখন আল্লাহ বলেন “এ বিষয়টা আমার ও আমার বান্দাহর মাঝেই রইল । আর আমার বান্দাহর জন্য তাই যা সে চাইল (অর্থাৎ আমার ও আমার
    বান্দাহর মধ্যে এ চুক্তি হলো যে সে আমার কাছে চাইবে, আর আমি তাকে দেব)।
    যখন বান্দাহ বলে “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দোয়াললীন”
    অর্থ :আমাদেরকে সরল পথ দেখাও,
    সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।”
    তখন আল্লাহ বলেন এটা আমার বান্দাহর জন্যই রইল আর আমার বান্দাহর জন্য তা ই যা সে চাইল।”

    ২৯ জুন দেখা যেতে পারে রমজানের চাঁদ

    আগামী ২৯ জুন পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা যেতে পারে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩০ জুন থেকে শুরু হতে পারে রমজানের রোজা পালন। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ড. এ আর খান গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এমনটিই দাবি করেছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, আগামী ২৭ জুন (শুক্রবার) দুপুর ২টা ৮ মিনিটে বর্তমান চাঁদের অমাবস্যা কলা পূর্ণ করে নতুন চাঁদের জন্ম হবে। নতুন চাঁদ ওই দিনই সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তরেখা থেকে ২ ডিগ্রি নিচে অবস্থান করবে। ফলে সে দিন বাংলাদেশ থেকে চাঁদ দেখা যাবে না। এটি পরদিন ২৮ জুন সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তরেখা থেকে ৭ ডিগ্রি ওপরে অবস্থান করবে এবং প্রায় ৩৮ মিনিট দেশের আকাশে অবস্থান শেষে সন্ধ্যা ৭টা ২৮ মিনিটে অস্ত যাবে। তবে সে দিনও বাংলাদেশের আকাশে চাঁদটি দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি পরদিন ২৯ জুন (রোববার) সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তরেখা থেকে ১৭ ডিগ্রি ওপরে অবস্থান করবে এবং প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট দেশের আকাশে অবস্থান করে রাত ৮টা ৯ মিনিটে অস্ত যাবে। ওইদিন চাঁদের প্রায় পাঁচ শতাংশ আলোকিত থাকবে এবং বাংলাদেশের আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে নতুন চাঁদটিকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। অতএব ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী আগামী ২৯ জুন সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখার সাপেক্ষে ৩০ জুন সোমবার থেকে আরবি ১৪৩৫ হিজরির ‘রমজান’ মাসের গণনা শুরু হবে।

    ১৩ জুন পবিত্র শবে বরাত

    বাংলাদেশের আকাশে আজ কোথাও ১৪৩৫ হিজরি সনের পবিত্র শাবান মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়নি। ফলে আগামীকাল ৩০ মে রজব মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে এবং আগামী ৩১ মে থেকে পবিত্র শাবান মাস গণনা শুরু হবে। ১৩ জুন শুক্রবার দিবাগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে বরাত উদযাপিত হবে।
    আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মুকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
    সভায় সভাপতিত্ব করেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সহ-সভাপতি চৌধুরী মোঃ বাবুল হাসান।
    ১৪৩৫ হিজরি সনের পবিত্র শাবান মাসের চাঁদ দেখা সম্পর্কে সভায় সকল জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়সমূহ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা করে কমিটি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
    জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় প্রধান তথ্য কর্মকর্তা তছির আহামদ, যুগ্মসচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) মোঃ মাকসুদুর রহমান পাটওয়ারী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক গোলাম শফিউদ্দিন, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দিন আহমাদ, বিটিভির পরিচালক গোলাম শফিউদ্দিন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপ-পারচালক সামসুদ্দিন আহমেদ, স্পারসোর পিএসও মো: শাহ আলম, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মুহিব্বুল¬াহিল বাকী নদভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

    কিছুক্ষণের জন্য ছায়াশূন্য থাকবে কাবা শরিফ

    মহাকাশ বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ২৮ মে দুপুর নাগাদ মক্কার পবিত্র কাবা শরিফের সঙ্গে সরাসরি একই লাইনে অবস্থান করবে সূর্য। সূর্যের কেন্দ্রবিন্দুটি এই কাবার ঠিক ওপরে উঠে আসবে।

    জেদ্দা অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল সোসাইটি এক বিবৃতিতে এই কথা জানিয়েছে।

    তারা জানিয়েছেন, মক্কা নগরীতে বুধবার ভোর ৫টা ৩৮ মিনিটে সূর্যোদয় হবে। উত্তরপূর্ব দিকটি থেকে সূর্য ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করবে এবং দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে তা ঠিক কাবা শরিফের মাথার ওপর উঠে আসবে। আর সে কারণে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও পবিত্র এই মসজিদ ঘরের কোনো দিকে কোনো ছায়া থাকবে না।

    সূর্যের এই অবস্থানকে ‘ছায়াশূন্য (জিরো শ্যাডো)’ অবস্থা বলেই চিহ্নিত করেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। আর বছরে অন্তত দুইবার পবিত্র মক্কা নগরীর ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি ঘটে।

    গবেষকরা জানান, পবিত্র কাবা ঘরটি বিষুব রেখা ও কর্কটক্রান্তির মাঝখানে অবস্থিত হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটে। ২৮ মে ছাড়াও প্রতিবছর ১৬ জুলাই তারিখেও একই ঘটনা ঘটে বলে জানান তারা।

    পৃথিবীর অক্ষরেখায় সূর্য ২৩.৫ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থান নিয়ে বিষুব রেখার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ঘুরতে থাকে। এভাবে একবার উত্তর গোলার্ধে একবার দক্ষিণ গোলার্ধে যায়। আর এই আসা যাওয়ার পথে বছরে দুইবার সরাসরি উপরে অবস্থান নিয়ে পবিত্র কাবা শরীফকে ছায়াশূন্য করে দেয়।

    জ্যোতির্বিদরা ওইদিন ঠিক মধ্যআকাশে থাকা অবস্থায় সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকাতে নিষেধ করেছেন।

    পবিত্র শবে মেরাজ পালিত

    গতকাল (সোমবার) দিবাগত রাত (২৬ রজব) ছিল পবিত্র মেরাজের রজনি। এ উপলক্ষে গত রাতে মহাখালীস্থ গাউছুল আজম জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন মসজিদ, খানকা, দরবার এবং মাজারে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র শবে মেরাজ উদযাপিত হয়েছে। এ মহান রাতের কর্মসূচিসমূহের মধ্যে ছিল রাতভর ওয়াজ, তেলাওয়াত-জিকির-আজকার নফল এবাদত বন্দেগী, মিলাদ এবং দোয়া মোনাজাত।
    এ মহান রাতে আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছায় রাসূল (সা.) স্বশরীরে পবিত্র কাবা শরীফ থেকে পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস, সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে রুহানি জগতের আরশে মো’য়াল্লায় মহান আল্লাহ তা’য়ালার সাথে সাক্ষাৎ করে আবার রাতেই জমিনে তাশরীফ আনেন। বিশিষ্ট ৪৫ জন ছাহাবায়ে কেরাম (রা.) মেরাজের বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মেরাজের ঘটনার কথা উল্লেখ রয়েছে। মেরাজের মাধ্যমে রাসূল (সা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং আল্লাহ তা’য়ালার সাথে তার নিগূঢ় সম্পর্কের রহস্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়। তাই মেরাজকে বিশ্বাস করা এবং উপলব্ধি করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। ২৬ রজব দিবাগত রাত হুজুরপুর নুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া ছাল্লাম স্বশরীরে মেরাজ অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালার সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন। এ মহান রাতে আল্লাহ তা’য়ালা রাসূল (সা.)কে দীদারদানে ধন্য করেন। যার কারণে আজ এই শেষ জামানায় উম্মতি মোহাম্মদির কাছে মেরাজুন্নবী (সা.) রজনী অতিশয় সম্মানিত ও মূল্যবান। কারণ দয়ালু নবীজীর মেরাজুন্নবী (সা.) এর বদৌলতে উম্মতে মোহাম্মদি মরতবা অন্যান্য নবীগণের সম্মান অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি লাভ করেছে। হাদীস শরীফে আছে আস্সালাতু মেরা’জুল মো’মেনিন অর্থাৎ নামাজ হলো নর-নারীর মেরাজ স্বরূপ। নবীপ্রেমিক নর-নারীকে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও একমাস রোজা আল্লাহর ও তার হাবীব (সা.) এর সন্তুষ্টি রাখার মাধ্যমে অর্জন করা প্রত্যেকটি মুসলমান নর-নারীর ঈমানী দায়িত্ব।
    নবী করিম (সা.)-এর সৃষ্টি মহান আল্লাহ পাকের নূর হতে। মেরাজ রজনীতে নূরের সাথে নুর মিলিত হয়েছিল। যার মধ্যে কোন পর্দা বা প্রভেদ ছিল না। উক্ত মেরাজ রজনীতে স্বয়ং আল্লাহ পাক আমাদের প্রিয় নবীজীকে সালাম দিয়েছিলেন, যা আমরা দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নবীজীকে সালাম দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, মুসলমান নর-নারীকে এই পবিত্র মেরাজুন্নবী (সা.) রজনীতে এই আকিদা পোষণ করতে হবে যে, নবীজীর মেরাজ হয়েছিল স্ব-শরীরে মোবারকে স্বপ্নে নয়, যা পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে।

    অহংকারীদের জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে

    ইসলামে অহংবোধকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অহমিকা ও আত্মগর্বীদের শুধু দুনিয়াতেই নয়, আখেরাতেও যে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, সে বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। অহংকারীদের পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর নবী হজরত মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে ক্ষমতার দর্প দেখাতে গিয়ে সে নিজের ধ্বংস অনিবার্য করে তুলেছিল। তার সেনাবাহিনীও সলিল সমাধির পরিণতি ভোগ করেছিল।

    রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অহংকারী না হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার কণা পরিমাণ অহংকারও আছে তাকেই জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসটি পর্যালোচনা করলে অনুভব করা যাবে, কোনো মুমিনের পক্ষে বিন্দুমাত্র অহংকার করার অবকাশ নেই। অহংবোধ মানুষের সুমতি ও সুগুণকে গিলে খায়। তাই মুমিনদের আচার-আচরণে, কথাবার্তায় কোনো ক্ষেত্রে অহং প্রকাশের অবকাশ নেই। অহংবোধ মানুষের সুকীর্তিকে কীভাবে বিলীন করে দেয় তার সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো শয়তান। হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ সব ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন তারা যেন আদম (আ.)-কে সেজদা করে। শয়তান এ হুকুম তামিল করতে অস্বীকার করে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অহংকারে ভুগে সে মাটির তৈরি মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে। আল্লাহ এ অপরাধের জন্য তাকে কঠিন শাস্তি দেন। অভিশপ্ত হিসেবে শয়তান চিরকাল নিন্দিত হবে।

    অহংবোধ-আত্মগরিমা ইমানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। নিজের ভুলত্রুটিকে গোপন রাখার অশুভ প্রয়াস মাথাচাড়া দেয়। অহংবোধকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পেরেছিলেন বলে জীবদ্দশায় জান্নাতি হিসেবে আল্লাহর কাছ থেকে ঘোষণা আসা সত্ত্বেও হজরত ওমর (রা.) প্রার্থনা করতেন- ‘আল্লাহ সে ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে আমার ভুল ধরিয়ে দেয়।’ আল্লাহ আমাদের অহংবোধ থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করুন।

    লেখক : ইসলামী গবেষক।

    ২৬ মে পবিত্র শবে মেরাজ

    আগামী ২৬ মে সোমবার রাতে পবিত্র শবে মেরাজ পালিত হবে। বুধবার সন্ধ্যায় রজব মাসের চাঁদ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। বৃহস্পতিবার থেকে আরবি ১৪৩৫ হিজরির রজব মাস গণনা শুরু হচ্ছে।

    মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী, ২৬ রজব দিবাগত রাতে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ করে মহানবী হয়রত মোহাম্মদ (স.) আল্লাহ তা’য়ালার সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। ইংরেজি তারিখ অনুযায়ী ২৬ রজব হবে আগামী ২৬ মে। বুধবার সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মুকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় ২৬ মে শবে মেরাজ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

    সভায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হাসান জাহাঙ্গীর আলম, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা তছির আহামদ, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দিন আহমাদ, বিটিভির পরিচালক গোলাম শফিউদ্দিন, আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মো. শাহ আলম, স্পারসো, ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

    ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, ৬২০ খ্রিস্টাব্দের রজব মাসের ২৬ তারিখের দিবাগত পবিত্র এই রাতে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর খাস রহমতে প্রথমে কাবা শরীফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন।

    সেখানে নবীদের জামায়াতে ইমামতি করে তিনি ‘বোরাক’ নামের বাহনে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন এবং সিদরাতুল মুনতাহায় উপস্থিত হন। ওই পর্যন্ত তার সফরসঙ্গী ছিলেন আল্লাহর ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.)।

    তারপর সেখান থেকে তিনি ৭০ হাজার নূরের পর্দা পেরিয়ে আরশে আজিমে আল্লাহর দিদার (সাক্ষৎ) লাভ করেন। সেখান থেকে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। মেরাজকালে মহানবী (সা.) সৃষ্টিজগতের সবকিছুর রহস্য স্বচক্ষে দেখেন।

    শবে মেরাজ মুসলমানদের কাছে তাই বিশেষ মর্যাদার। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল ইবাদত বন্দেগির মধ্যে দিয়ে এই মূল্যবান রাত অতিবাহিত করেন। অনেকে নফল রোজাও রাখেন এ দিন। তবে কোন কোন ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মহানবীর (স.) মেরাজ দৈহিক নয়, বরং ছিল আত্মিক আরোহণ।

    কল্যাণের একমাত্র পথ : নবুওয়াতের নমুনায় খিলাফত

    ডা. গাজী মোঃ নজরুল ইসলাম
    ॥ এক ॥
    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি রাব্বুল আলামীন। দুরুদ ও সালাম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গ (রা), সাহাবায়ে কিরাম (রা) ও সালেহীন (র)-গণের প্রতি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আমরা আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।
    পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য : আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতিকে দুনিয়ায় তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানব জাতি সৃষ্টির সূচনা লগ্নে ফিরিশতাদের সংগে আলোচনাকালে তিনি ঘোষণা করেন : (স্মরণ করুন!) যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে খলিফা সৃষ্টি করছি…। (সুরা বাকারাহ : ৩০)
    খিলাফত : পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফত হল পার্থিব বিষয়ে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব এবং দুনিয়ার সমগ্র মাখলুকের উপর মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব। আল্লাহর খলিফা হিসাবে মানব জাতির দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধান মোতাবেক সব কিছু পরিচালনা করা, নিজের মতে নয়, যা মূলত ইবাদতেরই অংশ। আদম (আ)-কে সৃষ্টির পর আল্লাহর হুকুমে ফিরিশতাদের সাথে সমগ্র মাখলুক হযরত আদম (আ)-কে সিজদা (বশ্যতা স্বীকার) করে মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব (খিলাফত)- এর স্বীকৃতি প্রদান করে। আল্লাহ বলেন : (স্মরণ করুন!) যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, এরপর ইবলিস ছাড়া তারা সকলেই সিজদা করল। ইবলিস অবাধ্য হল, অহঙ্কার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।- (বাকারাহ : ৩৪)
    ইবাদাত : পৃথিবীতে মানব জাতির একমাত্র কাজ হল- সকল প্রকার তাগুতকে অমান্য করে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং তার সাথে কোন কিছু শরীক না করা। আল্লাহ তা’য়ালার সন্তোষ অর্জনের লক্ষ্যে মানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর বিধান ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছুন্নাহ মোতাবেক অতিবাহিত করাকে ইবাদাত বলা হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন :
    – আমি জ্বীন ও মানব জাতিকে কেবলমাত্র আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি (সূরা যারিয়াত : ৫৬)। গোলামের নিজের কোন মত বা পছন্দ থাকে না, বরং তার প্রভুর মত ও পছন্দই গোলামের কাজ- এটাই ইবাদাতের মূল শিক্ষা। সুতরাং দুনিয়ার বুকে মানব জাতির একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য হল- খিলাফাতের মর্যাদায় মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত।
    খিলাফত ও ইবাদতের সূচনা : খিলাফত ও ইবাদতের মহান পরিকল্পনায় আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস্সাল্লাম এবং তার সঙ্গী হিসাবে হযরত হাওয়া আলাইহাস্সাল্লামকে সৃষ্টি করেন। উভয়কেই জান্নাতে বসবাসের নির্দেশ দেন। অতঃপর একদা হযরত আদম (আ)- এর সাথে তার বংশধর সমগ্র মানব জাতির রূহকে একত্রিত করে তাদের নিকট আল্লাহ তা›য়ালা তার প্রভুত্বের স্বীকৃতি আদায় করেন। আল্লাহ তা›য়ালা বলেন : স্মরণ করুন! যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিকট থেকে তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন এবং বললেন : আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলল : হ্যাঁ, (অবশ্যই আপনি আমাদের প্রতিপালক) এবং আমরা সাক্ষী রইলাম। এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য এ কারণে যে, কিয়ামতের দিন যেন তোমরা বলতে না পার- ‘আমরা তো এ ব্যাপারে কিছু জানতাম না।’ (সূরা আ’রাফ : ১৭২)
    দুনিয়ায় প্রেরণের পূর্বে আল্লাহ তা›য়ালা হযরত আদম (আ)-কে সব কিছু শিক্ষা দেন। শয়তান তাদের বংশধরদেরকে কীভাবে বিপথগামী করতে পারে জান্নাতের মাঝে উভয়কে তার বাস্তব প্রশিক্ষণ দেন। আল্লাহ তা›য়ালা বলেন : (১২০) এরপর শয়তান তাকে মন্দ পরামর্শ দিল। সে বলল : হে আদম! আমি কি আপনাকে চিরস্থায়ী জীবনদাতা গাছের এবং অনন্ত রাজ্যের সন্ধান দেব? (১২১) এরপর আদম ও হাওয়া সেই গাছের ফল খেয়ে ফেলল। তখন তাদের গোপন অঙ্গ তাদের পরস্পরের নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তারা জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে ঢেকে ফেলতে লাগল। আদম তার পভুর হুকুম ভুলে গেল, ফলে সে ভুলের মধ্যে পড়ে গেল। -(সূরা ত্ব-হা : ১২০-১২১)
    অতঃপর হযরত আদম (আ)-কে নবুওয়াত ও হিদায়াত প্রদান করে দুনিয়ায় তাঁর খলিফা হিসাবে তাঁরই গোলামী করার জন্য পাঠালেন। তিনি বলেন : (১২২) এরপর তার প্রভু তাকে (আদম) নবী হিসেবে মনোনীত করলেন এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করলেন। (১২৩) তিনি বললেন : তোমরা (মানব এবং শয়তান) উভয়ে একসাথে পরস্পরের শত্রু হিসাবে জান্নাত থেকে নেমে যাও পরে আমার নিকট থেকে তোমাদের কাছে সঠিক পথের কোন নির্দেশনা আসলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না এবং কোন দুঃখ-কষ্টও পাবে না। (১২৪) আর যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, তার জীবন-জীবিকা সংকুচিত করা হবে আর হাশরের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাবো। (১২৫) সে বলবে: হে আমার প্রভু! আমাকে কেন অন্ধ করে উঠালেন? আমি তো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলাম! (১২৬) তিনি বলবেন : ‘আমার আয়াতসমূহ তোমার কাছে এসেছিল, যেভাবে তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে সেভাবেই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হয়েছে। (১২৭) যে বাড়াবাড়ি করে ও তার প্রভুর আয়াতসমূহে ঈমান আনে না, আমি এভাবেই তার প্রতিফল দেই। আর আখিরাতের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন এবং চিরস্থায়ী। -(সূরা ত্ব-হা : ১২২-১২৬)
    মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থতার পরিণাম : দুনিয়ার বুকে মানুষের মধ্যে যারা তাদের সৃষ্টি ও দুনিয়ায় প্রেরণের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে তারা মনুষত্ব্যহীন। তাদের নিকৃষ্ট পাশবিকতার কারণে আল্লাহ তাদেরকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলে ঘোষণা করেছেন, তাদের পরিণতি হল জাহান্নাম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা›য়ালা বলেন : আর আমি বহু জ্বীন এবং মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তারা তা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখার চেষ্টা করে না, তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনার চেষ্টা করে না। তারা পশুর মত অথবা পশুর চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট। বস্তুত তারাই উদাসীন। – (সূরা আরাফ : ১৭৯)
    নবুওয়াতী মিশনের সূচনা ও বিরোধিতার পরিণাম :
    নবুওয়াতী মিশনের সূচনা : হযরত আদম আলাইহিস্সাল্লাম দুনিয়ার বুকে আল্লাহ তা’য়ালার সর্বোত্তম সৃষ্টি, আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর খলিফা এবং মানব জাতির আদি পিতা। আল্লাহ তা’য়ালা হযরত আদম (আ) এর বংশধর ভবিষ্যৎ মানবম-লীর জন্য তাকে সর্বপ্রথম নবী হিসাবে মনোনীত করেন। তিনি বলেন : এরপর তার প্রভু তাকে (আদম) নবী হিসেবে মনোনীত করলেন এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করলেন। (সূরা ত্ব-হা : ১২২)
    নবুওয়াতী মিশনের কেন্দ্র হল মাসজিদ : দুনিয়ায় এসে হযরত আদম (আ) নবুওয়াতী মিশন পরিচালনা ও আল্লাহ তা›য়ালার ইবাদতের জন্য সর্বপ্রথম একখানা ঘরের প্রয়োজন বোধ করলেন। আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরের আকুতি পূরণের জন্য বায়তুল মামুর বরাবর দুনিয়ার বুকে একখানা ইবাদাত-গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিলেন। এ ঘরই হচ্ছে বর্তমান কা’বাগৃহ যা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ায় মানব জাতির জন্য প্রথম ঘর, বায়তুল্লাহ বা মাস্জিদ। খিলাফত সভ্যতার কেন্দ্র হল মাসজিদ : ধীরে ধীরে হযরত আদম (আ)-এর বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। এ ঘরকে কেন্দ্র করে মানব সমাজ গঠিত হয়। এভাবে আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে মানব জাতি তার ভবিষ্যৎ অভিযাত্রা শুরু করে। আর আল্লাহর সর্বপ্রথম নবী ও খলিফা হিসাবে হযরত আদম আলাইহিস্সাল্লাম এ মাস্জিদকে কেন্দ্র করে দুনিয়ার বুকে এক হাজার বছর আল্লাহ তা›য়ালার হুকুমে নবুওয়াত ও কল্যাণময় খিলাফত প্রসাশন পরিচালনা করেন। অতঃপর তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে আল্লাহর মনোনীত নবী (আ)-গণ দুনিয়ার বুকে মানব সভ্যতায় আরও প্রায় এক হাজার বছর এ মহান দায়িত্ব পালন করেন।
    নবুওয়তী মিশনের আহ্বান ও বিরোধিতার পরিণাম :
    আল্লাহর মনোনীত সমস্ত নবী-রাসূল (আ)-গণ দুনিয়ার বুকে সকল তাগুতসমূহ পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদাতের দিকে মানব জাতিকে আহ্বান করেছেন। যারা তাদের ডাকে সাড়া দেয়নি তারা দুনিয়ার থেকে নির্মূল হয়ে যায়। পবিত্র কুরআন থেকে এর কতিপয় উপমা তুলে ধরা হল। হযরত নূহ আলাইহিস্সাল্লামের বিবরণ : হযরত আদম আলাইহিস্সাল্লামের ইন্তিকালের প্রায় এক হাজার বছর পর তাঁর বংশধরদের মাঝে যখন শিরক দেখা দেয় তখন আল্লাহ তা›য়ালা হযরত নূহ আলাইহিস্সাল্লাম-কে তাদের মাঝে রিসালাত ও হিদায়াতসহ প্রেরণ করেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন : আমি নূহকে তার জাতির নিকট প্রেরণ করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন : হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য ভয়ঙ্কর দিনের শাস্তির ভয় করছি। (আরাফ : ৫৯)

    সিরাতে রাসুল (সা.) অধ্যয়ন পদ্ধতি

    siratমুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত পয়গাম নিয়ে এ দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আর ২৩ বছরের নবুওয়াতি জিন্দেগির মধ্যেই তিনি মানব জাতি, মানব সভ্যতা এবং মানুষের অগ্রগতির কাফেলা যাতে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে চলতে পারে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে গিয়ে সাফল্যের সঙ্গে তাঁর রেজামন্দি ও মাগফেরাত পাওয়ার অধিকারী হয়, তারই একটা পরিপূর্ণ রূপরেখা রেখে গিয়েছেন।
    হুজুর আকরামের (সা.) অনুপম সে সিরাতে পাকের বিভিন্ন দিক নিয়ে যদি আলোচনার সূত্রপাত করতে হয়, তবে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে হুজুর (সা.) কোন সময়, ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপটে এবং মানব সভ্যতার কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর দ্বারা মানুষের এ সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে কতটুকু কাজ হয়েছিল এবং মানুষ কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছিল। অন্যদিকে সর্বপ্রথম তাঁকে যারা গ্রহণ করেছিলেন, যারা তাঁর শিক্ষা ও আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করে পরবর্তী মানব সমাজের জন্য একটা উজ্জ্বল উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছেন, তাদের সে কার্যকলাপ এবং সেই সাহাবায়ে-কেরামের আদর্শ চরিত্র কী রকম ছিল। কী রকম ছিল যারা সাহাবায়ে কেরামকে সঠিকভাবে অনুসরণ করেছেন এবং সে অনুসরণের রাজপথ ধরে আজ পর্যন্ত আল্লাহর দীন, আল্লাহর কিতাব এবং রাসুলের (সা.) আদর্শকে মানুষের সামনে জীবন্ত নমুনা হিসেবে অমস্নান করে রেখেছেন। আমরা যদি সিরাতে পাককে যথাযথ মূল্যায়ন করতে চাই, তবে যেমন আমাদের দেখতে হবে যে, মাত্র দশ বছর সময়কালের মধ্যে, দশ বছর কেন? মাত্র সাড়ে সাত থেকে আট বছর সময়কালের মধ্যে হুজুর আকরাম (সা.) এমন একটি বিশাল রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, যার আয়তন ছিল আমাদের বাংলাদেশের মতো অন্তত ১৬টি দেশের সমান। তাঁর ইন্তেকালের সময় মুসলমানদের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া রাষ্ট্রটির আয়তন ছিল পৌনে আট লাখ বর্গমাইল। অথচ বাংলাদেশের আয়তন মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল। প্রায় ১৬টি বাংলাদেশের সমান একটি বিশাল রাষ্ট্র হুজুর আকরাম (সা.) সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে রেখে গিয়েছিলেন। মাত্র কুড়ি বছর সময়ের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এই রাষ্ট্রের আয়তন ২৬ লাখ বর্গমাইলে সমপ্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হজরত ওসমানের (রা.) খেলাফতকালে দাঁড়িয়েছিল ইসলামী খেলাফতের আয়তন ২৬ লাখ বর্গমাইলে। এটা কোনো গল্প কাহিনী নয়। ইতিহাস আছে, ভূগোল আছে এবং প্রমাণ মানচিত্র রয়েছে। প্রতিটি মানচিত্রে এই রেকর্ড লিপিবদ্ধ রয়েছে। গবেষণা করলে দেখা যাবে, যেসব এলাকা হজরত ওসমান (রা.) শাসন করতেন, সেসব এলাকার আয়তন কত ছিল, কী রকম ছিল তার শাসন ব্যবস্থা। এটাকে আমি সিরাতে পাকের অংশ হিসেবেই আখ্যায়িত করতে চাই।
    মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা মক্কা মোয়াজ্জমায় ঘোষণা করেছিলেন, দেখ আজকের যুগে তোমরা এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছ যে, একজন মানুষ তার বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যথেষ্ট সংখ্যক লোকলস্কর সঙ্গে নিয়েও এক শহর থেকে অন্য শহরে নিরাপদে পৌঁছতে পারে না। পথে ওঁত্ পেতে বসে রয়েছে লুটেরা এবং তস্করের দল। অথচ শুধু কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ প্রতিষ্ঠা করলে দেখবে, এমন এক সময় আসবে সুদূর ইয়ামান থেকে কোনো যুবতী নিঃসঙ্গ অবস্থায় মাথার উপর সোনা-চাঁদির বোঝা নিয়ে মক্কা মোয়াজ্জমা পর্যন্ত সফর করবে, তার দিকে চোখ তুলে দেখার মতো কোনো দুষ্কৃতকারীর অস্তিত্ব আর থাকবে না। সাহাবায়ে কেরামের সময়কার শাসন ব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাই, হজরত ওমর (রা.) তার খেলাফতকালের তৃতীয় বর্ষে মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামী খেলাফতের বিভিন্ন এলাকার প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এক মহাসম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। সে মহাসম্মেলনে তিনি ভাষণ দিতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মনে রেখ, এখান থেকে সাড়ে সাতশ’ মাইল দূরের ফোরাত নদীর তীরেও যদি একটি কুকুর না খেয়ে মারা যায়, তার জন্য কিয়ামতের ময়দানে ওমরকেই জবাবদিহি করতে হবে।
    এটা বর্তমান যুগের কথা নয়, আজ থেকে চৌদ্দশ’ বছর আগের একটি ঘোষণা। একরম একটি ঘোষণার কথা যদি আজকের যুগের কোনো বিরাট রাষ্ট্রশক্তির প্রধানের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়, তবে এমন সব মানুষও হাসবে, যারা বিশ্বকে সর্বহারার স্বর্গে পরিণত করতে চায়। আজকের আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান, ব্রিটেনের সরকারপ্রধান কিংবা দুনিয়াতে এমন কোনো রাষ্ট্র আছে কি যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান একথা ঘোষণা করতে পারে যে, আমার দেশে আমার শাসিত এলাকার মধ্যে কোনো মানুষ যদি না খেয়ে মরে, কোনো মানুষ যদি কষ্ট পায়— আখেরাতের বিশ্বাসে না হলেও অন্তত দুনিয়ার বুকে আমি তার জন্য দায়ী এবং তার সব দায়-দায়িত্ব বহন করব। আছে কি এরকম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যার মুখ দিয়ে এরকম দুঃসাহসী ঘোষণা উচ্চারিত হতে পারে? কারণ তারা এ পর্যন্ত শুধু মানুষের ভাগ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মানসে একের পর এক বাদ ও মতবাদ দুনিয়ার বুকে নিয়ে এসেছে। যেমনিভাবে জীবন্ত ব্যাঙ ধরে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। তারাও অগণিত অসহায় মানুষের ভাগ্য নিয়ে পরীক্ষা নামের ছিনিমিনি খেলছে। কিন্তু কোনো পরীক্ষিত জীবন ব্যবস্থা এই দুনিয়ার মানুষের সামনে পেশ করা আজো কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি, যা সম্ভবপর হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামের শাসনামলে। আমাদের অনেকে জিজ্ঞাসা করে থাকেন— সেই ইসলাম, খোলাফায়ে রাশেদিনর, সেই সোনালি যুগের দিনগুলো মাত্র ত্রিশ বছর পরে কেন ভেঙে গেল? এর পরে কেন ইসলাম টিকে থাকল না? আমি বলতে চাই, এর চেয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন আর কিছু হতে পারে না। কারণ খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ থেকে শুরু করে আপনারা লক্ষ্য করবেন, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন হুজুর আকরামের (সা.) প্রথম খলিফা। তিনি ‘খেলাফত আলা মিনহাজিন্নবুওয়াত’ অর্থাত্ নবুওয়তের আদলে খেলাফত কীভাবে পরিচালনা করতে হয় তার সূচনা করেছিলেন। তার সূচিত এই খেলাফতের ধারাবাহিকতা বর্তমান শতাব্দীর বিগত ১৯২৪ সালের তুরস্কের সর্বশেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত চলে এসেছে। বস্তুত হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ছিল একশ’ ছয়জন। আমি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এই একশ’ ছয়জন খলিফার মধ্যে মাত্র বিশ-বাইশজন শাসক একটু অসংযমী ছিলেন। মানে হুজুর আকরাম (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের পুরোপুরি অনুসরণ ও অনুকরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। কিন্তু এদের মধ্যে অন্তত চল্লিশজন এমন শাসকের সন্ধান পাওয়া যায় যাদের শাসন ব্যবস্থা হজরত ওমর (রা.) কিংবা হজরত ওমর বিন আবদুল আজীজের (রা.) শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তারা অন্তত আল্লাহকে মানা, রাসুলের (সা.) দেয়া বিধানকে দুনিয়ার বুকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে যে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন, তাদের চরিত্র যেরকম নির্মল ছিল, তাদের শাসন যেরকম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, সেসব বিষয় যদি আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থাপন করতে পারি, তবে একে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস কারো হবে বলে মনে করি না।
    স্যার অ্যাডমন্ড বার্ক নামক জনৈক বিখ্যাত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ান তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছিলেন, মুহাম্মদের (সা.) অনুসারীরা যে শাসন ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, অন্তত পূর্ববর্তী এক হাজার বছরের মধ্যে এমন কোনো দুঃসংবাদ আমরা পাই না যে, তাদের দ্বারা শাসিত এলাকার মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে, মানুষ না খেয়ে মরেছে। এটা আমার কথা নয়, কোনো মুসলমানের কথা নয়, বরং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক ব্রিটিশ নাগরিকের কথা। তিনি একজন সাধারণ লোক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি আরো বলেছেন, মুহাম্মদের (সা.) উম্মতরা যেখানে যেখানে শাসন পরিচালনা করেছেন, সেখানে অন্তত খাওয়া-পরার একটা নিশ্চয়তা বিদ্যমান ছিল।
    ব্রিটিশের ভারতবর্ষ জয় করা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর দুর্ঘটনা ঘটে। অতঃপর সাতদিন পর্যন্ত বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ তারা লুণ্ঠন করে। মুর্শিদাবাদ থেকে লুণ্ঠিত সোনা-চাঁদি, গয়না-পত্র এবং টাকা-পয়সা ইত্যাদিসহ ৬০টি নৌকা বোঝাই মালামাল কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেসব মূল্যবান সম্পদ কলকাতায় পৌঁছার পর সেখান থেকে স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ চুরি করে ছয় লাখ পাউন্ড মূল্যমানের সম্পদ এবং তার চেলাচামুণ্ডারা চুরি করে আরো চার লাখ পাউন্ড। সর্বমোট ১০ লাখ পাউন্ড চুরি হওয়ার পরও যে টাকাগুলো ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল, তা দিয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই সর্বপ্রথম ইউরোপের বুকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের জন্ম হয়। আর সেই ব্যাংকের অর্থ সাহায্যেই তত্কালীন ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তা আমরা যখন কলেজের বই-পুস্তক পরীক্ষা পাসের লক্ষ্যে পড়ি এবং পাঠ মুখস্থ করি, তখন অন্য সব পাঠের মতো পড়তে থাকি— ১৭৬০ সালে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। পরীক্ষায় পাস করার জন্য ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের সন-তারিখ পরীক্ষার খাতায় লিখতে হয়। কিন্তু একটিবারও আমরা চিন্তা করে দেখি না, এর আগে কী ঘটনা ঘটেছিল? ইউরোপে এই বিরাট বিপ্লবের সূচনার আগে খোদ লন্ডনের বুকে প্রতি আট বছরের মধ্যে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। সে দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ গাছের ছাল-পাতা-চামড়া পর্যন্ত খেয়ে ফেলত। আর ধ্বংস হয়ে যেত নারীদের সম্মান এবং ধসে যেত তাদের সতীত্ব। যে দেশের অবস্থা এরকম ছিল, সে দেশের লোকেরা কীভাবে এত বিরাট শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে এত সম্পদের মালিক হয়ে গেল? যে অর্থের বলে তারা পৃথিবীতে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে বসল? কথিত আছে, সে সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। শুধু কি তাই! ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ান অ্যাডমন্ড বার্ক রচিত বই-পুস্তক পাঠ করুন। তার মতে, উম্মতে মোহাম্মদিয়ার অযোগ্য লোকদের টাকা-পয়সা লুণ্ঠন করে ইংল্যান্ডবাসী বড়লোক হয়েছে। অথচ এ দেশের মানুষ সে যুগে দুর্ভিক্ষ কাকে বলে জানত না। কিন্তু অন্তত তের বছর নিরলসভাবে এদেশ লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে ১৪৭০ সালের মন্বন্তরে অন্তত এদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ খেতে না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল। পথে-ঘাটে যত্রতত্র মানুষের লাশ পড়ে থাকত। সে মহামন্বন্তর হয়েছিল ইংরেজরা এদেশ দখল করার পর।
    অনেকে বলে থাকে, ইসলামের জন্ম হয়েছে মক্কায়, ইসলাম লালিত-পালিত হয়েছে মদিনায়, ধ্বংস হয়েছে বাগদাদে এবং ইসলামের কবর রচিত হয়েছে ইস্তাম্বুলে। এটা খ্রিস্টানদেরই বানানো কল্পকথা।
    আমরা যদি একথা বিশ্বাস করি, তবে আয়িম্মায়ে মোজতাহেদিন, প্রখ্যাত মোফাচ্ছেরিন এবং মোহাদ্দেসিনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের দ্বারা আমাদের যেভাবে সমৃদ্ধিশালী করেছেন, ইসলামী ইতিহাস এবং ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনকে যেভাবে সংরক্ষণ করেছেন, সেসবের নিরিখে এসব কল্পকথাও মিথ্যাই প্রমাণিত হয়ে যায়।
    সুতরাং সিরাতকে খণ্ডিতভাবে চর্চা করা এবং পাঠ করার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের গোটা উম্মতে মুহাম্মদিকে একটিমাত্র ইউনিট হিসেবে কল্পনা করে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের ওপর দিয়ে যতগুলো যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে তার প্রত্যেকটি যুগে এই উম্মত বিশ্বমানুষের জন্য কতটুকু করেছে, মুসলমানদের কতটুকু অবদান ছিল এবং মুসলমানরা তাদের ঈমান-আকিদার ওপর ভিত্তি করে কতদূর অগ্রসর হয়েছে, যদি এর ওপর একটা সার্বিক পর্যালোচনা না হয়, তবে সিরাতে পাকের আলোচনাই হলো না। সিরাতে পাকের আলোচনা যদি করতে হয়, তবে হুজুর আকরামের (সা.) আদর্শকে, তাঁর সুন্নাহকে এবং তাঁর জীবনকে এ যুগ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই। এটা আনতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে, এটাকে আনতে হবে এমন জীবন্তভাবে যেন প্রতি যুগে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতিনিধিরা, তাঁর গোলামেরা, তাঁর অনুসারীরা এবং অন্তত তাঁর নাম নিয়েও যারা দুনিয়াতে ছিলেন, তারা কীভাবে জীবন যাপন করেছেন। দুনিয়ার মানুষের জন্য তারা কতটুকু কী করেছেন, এর একটা সার্বিক পরিক্রমা আমাদের চোখের সামনে থাকতে হবে। হুজুরকে (সা.) যদি জানতে হয়, তবে তাঁর সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে জানতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের যুগ প্রায় একশ’ বছরের। এই একশ’ বছরের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম কী করেছেন, তারা কতদূর অগ্রসর হয়েছেন, তারা কোথায় কোথায় চলে গিয়েছেন, সারা ভূখণ্ডের মধ্যে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) দাওয়াত কীভাবে পৌঁছে দিয়েছেন, কীভাবে ইউরোপ পাড়ি দিয়েছেন এবং কীভাবে সুদূর চীন পর্যন্ত পৌঁছেছেন। আমি তো দাবি করে বলতে চাই, আমাদের এ দেশের চট্টগ্রামের উপকূলে রাসুলের (সা.) সাহাবাদের একটি জামায়াত এসেছিলেন। এই উপকূলের মানুষেরা এখান থেকে গিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত নিজেদের তৈরি জাহাজের সাহায্যে পৌঁছেছেন এবং সেখানে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। যে দেশে সাহাবায়ে কেরামের পায়ের ধূলি রয়েছে, সে দেশে কি ইসলাম বিপন্ন হতে পারে? সাহাবায়ে কেরামের দেশ, তাবেয়িনের দেশ, মোহাদ্দেসিনের দেশ; এ দেশে কোনোদিন ইসলাম বিপন্ন হবে না। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) সিরাত কোনোদিন বিলীন হবে না। হুজুর আকরাম (সা.) আমাদের মধ্যে জীবিত থাকবেন না? নিশ্চয়ই থাকবেন। তাঁর সুন্নতকে, তাঁর একেকটি আদর্শকে আজ পালন করার মতো মানুষ কি এদেশে বেঁচে থাকবে না? নিশ্চয়ই থাকবে। তিরস্কারকারীর তিরস্কার যদি উপেক্ষা করা না যায়, তবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর উম্মত হিসেবে এ দুনিয়ার বুকে আমরা বেঁচে থাকতে পারব না। আমাদের গালি দেয়া হয়, নতুন নতুন শব্দ আবিষ্কার করে গালি দেয়া হয়, কী চমত্কার শব্দ ‘মৌলবাদী’! কী করব? উপায় নেই। কারণ আমাদের বলা হয়েছে হুজুর আকরাম (সা.) যে ভাবে, যে ভাষায়, যে উচ্চারণে আল্লাহর কোরআন আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন— সে ভাবেই, সে ভাষাতেই এবং সে উচ্চারণেই আমাদের পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। কোরআনের একটা নোকতা বাদ দিয়ে পড়লে কি তা জায়েজ হবে? একটা জের, একটা জবর এবং একটা পেশ বাদ দিয়ে পড়লে? সুতরাং আমরা ঘোর মৌলবাদী।
    বস্তুত সিরাতে পাককে যদি আমাদের আলোচনা করতে হয়, বুঝতে হয় এবং অনুধাবন করতে হয়; তবে শুধু তাঁকে প্রথম কিংবা অন্য কোনো শতাব্দীর হিজরির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। সিরাতে পাক তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা সিরাতের মধ্যে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শের শ্রেষ্ঠত্বকে নিজের কর্মে, নিজের সাধনায়, নিজের মুখে এবং নিজের কার্য-পদ্ধতির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে প্রতিপন্ন করে তার জয়গান যদি সারা দুনিয়ার মানুষের মুখে তুলে ধরতে পারি, তবে তা হবে সিরাতকে আলোচনা করা এবং চর্চা করার সার্থকতা।
    কিন্তু হুজুর আকরামের (সা.) সিরাতকে এ পর্যন্ত আমরা যথাযথভাবে ধরে রাখতে পারিনি। আওয়ামের পর্যায়ে, জনসাধারণের পর্যায়ে আমরা বহু বেদআতের মধ্যে ডুবে গেছি। আমরা কবর পূজায় লিপ্ত হয়েছি। আমরা বিদেশি ইজম ও মতবাদ ইত্যাদির অনুসারী হয়ে পড়েছি। আমাদের দোষের কোনো শেষ নেই। এত সবের মধ্যেও আল্লাহপাক দুনিয়ার মধ্যে এমন একটি জনগোষ্ঠী কিয়ামত পর্যন্ত রাখবেন, যারা আল্লাহর রাসুলের জীবন্ত নমুনা। হুজুর পাকের (সা.) অনুসারী হিসেবে একেকটা নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধিরূপে তারা দুনিয়ার মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই জামায়াতই হলেন ওলামায়ে হাক্কানির জামায়াত। এই জামায়াত সাহাবায়ে কেরামের যুগের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে শুধু সংগ্রাম করেছেন তা নয়, বরং বুকের তাজা রক্তও অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) জেলখানায় মারা গেছেন। আপস করেননি। হজরত হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে শহীদ হয়েছেন, কিন্তু আপসের হাত বাড়িয়ে দেননি। বালাকোটের বধ্যভূমিতে শহীদ হয়েছেন হজরত সৈয়দ আহমদ (রহ.) এবং মাওলানা ইসমাঈল (রহ.)। সুতরাং কারবালা থেকে শুরু করে বালাকোট পর্যন্ত পৃথিবীর দিকে দিকে আপনি যেখানেই দৃষ্টিপাত করুন না কেন সেখানেই দেখবেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) সিরাতের প্রতিনিধিরা আছেন সেই ওলামায়ে হাক্কানির দলে। তাদের কেউ কোথাও বসে রাসুলের (সা.) হাদিসের দরস দিচ্ছেন, কেউ কোথাও বসে মানুষকে আল্লাহর হুকুম-আহকামের প্রতি, রাসুলের (সা.) তরিকার প্রতি এবং সাহাবায়ে কেরামের জিন্দেগির প্রতি অঙুলি নির্দেশ করে দাওয়াত দিচ্ছেন এবং নিজেদের জীবনে তা বাস্তবায়িত করে অন্য মানুষকে আকৃষ্ট করে চলেছেন। আবার কেউবা কোথাও খানকার মধ্যে বসে মানুষকে আধ্যাত্মিক তরবিয়্যত দিয়ে যাচ্ছেন এবং রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কেমন ছিলেন তার বাস্তব নমুনা পেশ করছেন। এই ওলামায়ে হাক্কানির জামায়াত কিয়ামত পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ অব্যাহত গতিতে চলবে। এই চলার কোনো শেষ হবে না। যত বড় দুশমনই দুশমনি করুক না কেন, বাল্যকালে গল্প শুনেছিলাম যে এক দৈত্য ছিল। তাকে মারতে চাইলে, তার শরীরে আঘাত করলে যত ফোঁটা রক্ত বের হতো, তার শরীরের প্রত্যেক ফোঁটা রক্ত থেকে দশটি দৈত্য জন্ম নিত। ঠিক তেমনি, ওলামায়ে হাক্কানির জামায়াত এমন একটি জামায়াত, রাসুলের (সা.) প্রতিনিধির জামায়াত, তাঁরই গোলামের জামায়াত। এই জামায়াতের লোকেরা শুধু এ যুগে নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত হুজুরের (সা.) আদর্শকে সমুন্নত রাখবে আর তার বাস্তব প্রমাণও যুগে যুগে দেখা গেছে। আপনারা একটু স্মরণ করুন যে, সেই ষষ্ঠ শতাব্দীর হিজরির ঘটনা, তাতার বাহিনীর হামলার কারণে সমগ্র ইসলামী দুনিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। সে যুগের অনেক বড় বড় আলেম এমন একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, কিয়ামতের আগে ইয়াজুজ-মাজুজের যে দল আবির্ভূত হওয়ার কথা রয়েছে মনে হয় তাতার বাহিনীই সে ইয়াজুজ-মাজুজের দল। সুতরাং এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কোনো সার্থকতা নেই। কিন্তু সব নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল, জেগে উঠলেন এক আল্লাহর বান্দা। তিনি জঙ্গলে ঘোরাফেরা করে দিন কাটাচ্ছিলেন। এ অবস্থায়ই তিনি একটা আজান দিলেন, সে আজানের শব্দ গিয়ে পৌঁছল এক তাতারি শাহজাদার কানে। শাহজাদা দরবেশের আজানের শব্দ শুনে এমনিভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন, যার ফলে তাতারিদের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়েছে। আমি আর বলতে চাই না। তবে এতটুকু বলতে চাই, একজন মর্দে মোমেনের আজানের ফলে গোটা তাতার গোত্রই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। যার ইতিহাস স্মরণ করে আল্লামা ইকবাল বলেছেন, এই তাতার জাতি পরবর্তী যুগে হজরত সালাউদ্দীন আইয়ুবির (রহ.) নেতৃত্বে এবং আরো বহু বড় বড় জেনারেলের নেতৃত্বে ইসলামকে রক্ষা করার জন্য কাফেরদের মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, বোধ হয় ভূমধ্যসাগরে সে পরিমাণ পানিও নেই। আল্লামা ইকবাল আরো বলেছেন, যখন কাবার প্রহরী পাওয়া যাচ্ছিল না, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এমনই ইন্তেজাম করলেন, তাঁর এক মকবুল বান্দার আজানের বরকতে কাফেরদের দেবালয়ের ভিতর থেকে কাবার প্রহরী বের হয়ে আসল।
    ১৯২২ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তুরস্কে হাজার হাজার আলেমকে হত্যা করা হয়েছে। মা-বোনদের পর্দা করার অপরাধে বেইজ্জত করা হয়েছে। আরবি কোরআন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে আরবি আজান। এতসব জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও সে দেশের ওলামায়ে হাক্কানি নীরবে বসে থাকেননি। তাদের মধ্যে তুরস্কের এই যুগের মোজাদ্দেদ বদিউজ্জামান নুরসী (রহ.) দু’যুগেরও অধিক সময় জেলখানায় কাটিয়েছেন। তিনি যখন জেলখানায় যেতেন, তখন অন্যান্য কয়েদি তার দ্বারা প্রভাবান্বিত হতো। তারা যখন জেল থেকে বেরিয়ে আসত, তখন একেকজন মোবাল্লেগ হিসেবে বের হতো।
    আমি তুরস্ক সফর করে জানতে পেরেছি, আজ সে দুর্দিন কেটে গেছে। হজরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) মাজারের পাশে বসে আমি জনৈক তুর্কি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কীভাবে এ অত্যাচারের বিভীষিকার মধ্যেও ইসলামকে রক্ষা করে রাখছেন? উত্তরে ছেলেটি বলল, মিল-কারখানার শ্রমিকরা, ক্ষেতের কৃষকরা এবং ঘরের মা-বোনরা আল্লাহর কালামকে গোপনে মুখস্থ করেছে। পুরুষ হাফেজ ছিল না, কিন্তু হাজার হাজার মেয়ে হাফেজ হয়ে গিয়েছিল, আরবি কোরআনপাক তারা রক্ষা করেছে। গোপনে গোপনে ঘরের কোণে আমরা কোরআন শুনেছি, কোরআন পড়েছি। এভাবে তারা তাদের দেশে আল্লাহর কোরআনকে রক্ষা করেছে এবং ধীরে ধীরে আবার ইসলামী বিপ্লব শুরু হয়েছে।
    বর্তমানে সেদেশে আবার রোজা, নামাজ, আজান, কোরআন পড়া আরম্ভ হয়েছে; অধিকন্তু তারা আবার পূর্ব-ইউরোপের নয়টি দেশেও কাজ করছে। সেসব দেশে কম্যুনিস্টরা লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছে, হাজার হাজার মসজিদ ধসিয়ে দিয়েছে। বহু মসজিদ-মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে; কিন্তু তারপরও দেখা গেছে, এতসব করেও কিছু করা যায়নি। জেল হয়, জরিমানা হয় কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর পাগলরা, তাঁর অনুসারীরা কোনো কিছুই মানে না। ভেতরে ভেতরে যখন কাজ হয় তখন কাজের গতি বেড়ে যায়। আজ থেকে মাত্র ৭০/৮০ বছর আগে পূর্ব ইউরোপ মুসলমানদের অধীনে ছিল। বেলগ্রেড জামে মসজিদ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত আজান উচ্চারিত হতো। সমগ্র পূর্ব ইউরোপে হাজার হাজার মাদ্রাসা ছিল, মসজিদ ছিল, মাশায়েখ ছিলেন, মুফতি ছিলেন, ওলামা ছিলেন, হাফেজ ছিলেন। একথা কি আমরা বিশ্বাস করতে পারি? আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। কারণ আমাদের ওইদিকে দৃষ্টিপাত করতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি আমরা তো আমাদেরও দেখতে পারছি না। আমরা বুঝতে পারছি না যে, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) রুহানি তাছির কতটুকু। কীভাবে তিনি মদিনাতে শুয়ে শুয়ে সারা দুনিয়াকে উঠাচ্ছেন? কীভাবে তিনি স্বীয় প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন?
    আজকে সিরাতে পাককে আমাদের অনুধাবন করতে হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। যারা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহকে (সা.) অনুসরণ করেছেন তাদের পথ কোনটা? এ পর্যন্ত যাদের কাফেলা চলে এসেছে তাদের পথ কোনটা ছিল। সাহাবায়ে কেরাম আমাদের মধ্যে ইসলামের বাণী নিয়ে এসেছিলেন বৈকি। পক্ষান্তরে আমাদের দেখতে হবে এবং বুঝতে হবে বিপরীত একটি দিকও। ইসলামের প্রথম যুগ তৈখৈ শুরু করে আজ পর্যন্ত ইসলাম এবং মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শকে ছোট করে খাটো করে দেখানোর জন্য কোনো দুর্বৃত্তের জামায়াত কীভাবে কাজ করছে? যে আবদুল্লাহ ইবনে ছাবার যুগ থেকে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করার সূচনা হয়েছিল, তা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত থাকার আসল হাকিকতটা কী! এ যুগের মানুষ কীভাবে সিরাতে পাককে কলুষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে? কীভাবে সাহাবায়ে কেরামকে তাদের মকাম থেকে নিচে নামানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে? কীভাবে আমাদের সামনে ইসলামের গুরুত্ব খাটো করার ষড়যন্ত্র করে চলেছে? কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থাকে হাস্যস্পদ করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে? এসব দিক যদি আমরা বিবেচনা না করে শুধু আবেগে ভেসে যাই এবং রাতের পর রাত, দিনের পর দিন যদি আমরা আবেগে ডুবে থাকি, তবে মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহকে (সা.) এ যুগে বসে এ যুগের সমস্যার মোকাবিলায় সঠিকভাবে অনুধাবন করা এবং তাঁর সিরাতের যথাযথ মূল্যায়ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। (একটি বক্তৃতাংশ থেকে সংগৃহীত)

    আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তাহাজ্জুদ নামাজ

    1396885513.হাফেজ সাইফুল ইসলাম : তাহাজ্জুদ শব্দটি নিদ্রা যাওয়া ও জাগ্রত হওয়া পরস্পরবিরোধী দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে ‘রাত্রির কিছু অংশ কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন’ (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত-৭৯)। কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকার অর্থ নামাজ পড়া। এ কারণেই রাত্রিকালীন নামাজকেই তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়। তবে অধিকাংশ মুফাসিসরগণের মতে, শয্যা পরিত্যাগ করে যিকির ও দোয়ায় আত্মনিয়োগ করার অর্থ তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ, যা গভীর রাতে ঘুম থেকে ওঠার পর পড়া হয়।
    তাহাজ্জুদ নামাজ সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। ইসলামের সূচনার যুগে এটি মহানবী (স.) ও উম্মত সবার জন্য ফরজ ছিল।
    রাসূল (স.)-এর মে’রাজের পর তা নফল হয়ে যায়। যেমন সূরা মুজ্জাম্মিলের শুরুতে আল্লাহপাক আদেশ দিয়েছেন ‘হে বস্ত্রাবৃত, রাত্রিতে দ-ায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে অর্ধ রাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ১-৩)। এই আয়াতসমূহে তাহাজ্জুদের নামাজ কেবল ফরজ করা হয়নি বরং রাত্রির চতুর্থাংশ নামাজে মশগুল থাকার প্রতিও তাগিদ দেয়া হয়েছে।ইমাম বাগবী (রহ.) বলেন, এই আদেশ পালনার্থে রাসূল (স.) ও সাহাবায়ে কেরামগণ অধিকাংশ রাত্রি তাহাজ্জুদ নামাজে ব্যয় করতেন। ফলে তাদের পদদ্বয় ফুলে যায় এবং আদেশটি কষ্টসাধ্য প্রতীয়মান হয়। পূর্ণ এক বছর পর ওই সূরার শেষাংশের ‘কোরআনের যতটুকু তোমাদের সহজ মনে হয় ততটুকু আবৃত্তি কর’ আয়াতটি নাজিল হলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায় এবং বিষয়টি নিজের ইচ্ছর ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। যতক্ষন নামাজ পড়া সহজ মনে হয় ততক্ষণ নামাজ পড়া তাহাজ্জুদের জন্য যথেষ্ট। হজরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন, মে’রাজের রাত্রিতে পঞ্জেগানা নামাজ ফরজ হওয়ার আদেশ এলে তাহাজ্জুদের ফরজের আদেশটি রহিত হয়ে যায়।তবে এরপরও তাহাজ্জুদ সুন্নাত হিসেবে বহাল থেকে যায়। কারণ রাসূল (স.) ও সাহাবায়ে কেরামগণ নিয়মিতভাবে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। (তাফসিরে মা’আরিফুল কোরআন, ক্বিয়ামুল লাইল)।
    তাহাজ্জুদের মর্যাদা অপরিসীম। ফরজ নামাজের পরে উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। হাদিস শরীফে রাসূল (স.) এরশাদ করেছেন, ‘রমজানের পর উত্তম রোজা হলো মুহাররম মাসের রোজা এবং ফরজ নামাযের পর উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ’ (তাহাজ্জুদের নামাজ)। তাহাজ্জুদগুজার বান্দাহ্দের অগ্রগতির স্বীকৃতি আল্লাহপাক স্বয়ং নিজেই দিয়েছেন যথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালন কর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান? যে এরূপ করে না’ (সূরা জুমার, আয়াত নং-৯)। বেহেশতবাসী পরহেজগার মুমিন বান্দাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা রাত্রির শেষাংশে জাগ্রত থেকে নামাজ পড়ে ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ তা’আলা তাদের বর্ণনা দিয়েছেন যে, ‘তারা (খোদাভীরুরা) রাত্রির সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সূরা আজ-জারিয়াত, আয়াত-১৭-১৮)।
    মহান প্রভু পবিত্র কোরআনের সূরা ফুরকানে তাঁর প্রিয় বান্দাহ্দের ১৩টি বিশেষ গুণাবলী ও আলামত বর্ণনা করেছেন। সেই বিশেষ গুণসমূহের একটি হচ্ছে- তাহাজ্জুদ নামাজ। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘এবং যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দ-ায়মান হয়ে।’ (সূরা আল- ফুরকান, আয়াত-৬৪)।
    কেয়ামতের ভয়াবহ বিপর্যয় ও কঠিন হিসাব-নিকাশের দিবসে কোন ব্যক্তি যদি সহজ হিসাব কামনা করে, তবে তার উচিত হবে নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া। শ্রেষ্ঠতম মুফাসিসরে কোরআন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (র.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হাশরের ময়দানে সহজ হিসাব কামনা করে, তার উচিত হবে আল্লাহ যেন তাকে রাত্রির অন্ধকারে সেজদারত ও দাঁড়ানো অবস্থায় পান। তার মধ্যে পরকালের চিন্তা ও রহমতের প্রত্যাশাও থাকা দরকার। (তাফসিরে কুরতুবি, মা’আরেফুল কোরআন, ক্বিয়ামুল লাইল)।
    মহান আল্লাহ তা’আলা তাহাজ্জুদগুজার বান্দাহ্দের জন্য জান্নাতে অসাধারণ বালাখানা সজ্জিত করেছেন। হজরত আবু মালেক আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (স.) বলেন, ‘জান্নাতে এমন কক্ষ থাকবে যার ভিতরের অংশ বাহির থেকে এবং বাইরের অংশ ভিতর থেকে দৃষ্টিগোচর হবে।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স.) এসব কক্ষ কাদের জন্য? উত্তরে রাসূল (স.) বললেন, যে ব্যক্তি সালাম করে, ক্ষুধার্তকে আহার করায় এবং রাত্রে যখন সবাই নিদ্রিত থাকে, তখন সে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে। (মুসনাদে আহমদ, বায়হাকী তিরমিজি ) (তাফসিরে মাজহারি, মা’আরেফুল কোরআন)।
    আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত রোজ হাশরে সমগ্র সৃষ্টিকুলের উপস্থিতিতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারী প্রিয় বান্দাহদের মহান সম্মানে ভূষিত করবেন। হজরত আসমা বিনতে ইয়াজিদ হতে বর্ণিত আছে যে, ‘রাসূল (স.) এরশাদ করেছেন, কেয়ামতের দিন যখন আল্লাহ পাক পূর্ববর্তী মানবম-লীকে একত্রিত করবেন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আহ্বানকারী (যার আওয়াজ সমগ্র সৃষ্টিকুল শুনতে পাবে) দাঁড়িয়ে আহ্বান করবেন- হে হাশরের মাঠে সমবেত মানবম-লী, আজ তোমরা জানতে পারবে যে, আল্লাহপাকের নিকট সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী কে? অনন্তর সে ফেরেশতা ‘যাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে’ এরূপ গুণের অধিকারী লোকগণকে দাঁড়াতে আহ্বান জানাবেন। এই আওয়াজ শুনে এসব লোক (তাহাজ্জুদগুজার) দাঁড়িয়ে পড়বেন, যাদের সংখ্যা হবে খুবই নগণ্য। এদের হিসাব গ্রহণ ব্যতিতই বেহেশতে প্রেরণ করা হবে। অতঃপর অন্যান্য সমগ্র লোক দাঁড়াবে এবং তাদের হিসাব গ্রহণ করা হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, মাজহারি, মা’আরিফুল কোরআন)।
    তাহাজ্জুদ নামাজ; মন্দ কাজের কাফফারা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহান সুযোগ। তিরমিযি শরীফে হজরত আবু উমামা বর্ণিত এক হাদিসে রাসূল (স.) এরশাদ করেছেন, নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়। কেননা এটি তোমাদের পূর্ববর্তী সব নেক বান্দাহর অভ্যাস ছিল। এটা তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলার নৈকট্যদানকারী, মন্দ কাজের কাফফারা এবং গুনাহ থেকে নিবৃত্তকারী। (মাজহারি, মাআরেফুল কোরআন)।
    প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি কামনা করেন, আল্লাহ যেন তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন, তার এবাদত-বন্দেগি কবুল করেন এবং তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন। এসব চাওয়া-পাওয়ার প্রধান অবলম্বন হলো তাহাজ্জুদ নামাজ। সহিহ হাদিসের সবকটি কিতাবেই এই হাদিসটি বর্ণিত আছে যে, হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত রাসূল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা প্রতি রাতের শেষাংশে দুনিয়ার আকাশে বিরাজমান হন এবং ঘোষণা দেন যে, কোনো প্রার্থনাকারী আছ কি? যার প্রার্থনা আমি কবুল করব। প্রয়োজন প্রার্থনার কোনো লোক আছ কি? যার প্রয়োজন আমি পূর্ণ করে দেব। এবং কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? যাকে আমি ক্ষমা করে দেব।’
    তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে আরো অনেক সুস্পষ্ট আয়াতে কারিমা ও হাদিস শরীফ রয়েছে যা সীমিত পরিসরে আলোচনা করে শেষ করা যাবে না। উক্ত আয়াত ও হাদিস শরীফসমূহ থেকে এটি পরিষ্কার হয় যে, তাহাজ্জুদ নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথনের এক মহান অবলম্বন। ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে। তাহাজ্জুদের বদৌলতে মানুষ মহান মর্যাদার অধিকারী হয়। জনৈক বুজুর্গ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উন্নতি চায় সে যেন শেষ রাত্রিতে জাগ্রত থেকে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে।’ তাহাজ্জুদের ফলে মানুষের অন্তরাত্মা পশুত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে ঈমানি আলোয় উদ্ভাসিত হয়। ফলে হৃদয়ে প্রফুল্লতা আসে এবং এবাদতের স্বাদ অনুভূত হয়। সুতরাং তাহাজ্জুদ নামাজ প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইহকালীন উন্নতি ও পরকালীন মুক্তির এক মহান এবাদত।
    লেখক : প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, রামু লেখক ফোরাম –