• ?????: মিডিয়া

    ওয়েলকাম খালেদা: ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর

    শফিক রেহমান:

    ‘গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে খালেদা জিয়া দেশে আসছেন না।”

    সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন (দৈনিক যুগান্তর, ১৭ নভেম্বর ২০১৫)।

    জেনারেল এরশাদের এই উক্তি প্রকাশিত হবার মাত্র চার দিন বা ৯৬ ঘণ্টা পরেই ২১ নভেম্বর ২৯১৫-তে বিএনপি চেয়ারপারসন ম্যাডাম খালেদা জিয়া এমিরেটস এয়ারলাইনের ফ্লাইট জিরো জিরো সিক্সে স্বদেশে ফিরে এসেছেন।

    এই ভবিষ্যদ্বাণীর দুই দিন আগেও এরশাদ বলেছিলেন, ‘‘এখন সংলাপের প্রস্তাব দেয়ার মতো অবস্থায় নেই বিএনপি। তিনি (খালেদা জিয়া) দেশে ফিরতে পারবেন কি না তারও ঠিক নেই (যুগান্তর ১৫ নভেম্বর ২০১৫)।’’

    এরশাদের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়ায় তিনি নিজে হয়তো আশ্চর্য হননি। কারণ, এরশাদ ভাগ্যবাদী এবং প্রায় নয় বছর ক্ষমতায় থাকা কালে নিজের ভাগ্য গণনার জন্য বহুবার বঙ্গভবন থেকে ছুটে গিয়েছিলেন আটরশির পীরের কাছে। আটরশির পীর তার জন্য একেছিলেন আরো দীর্ঘকাল ক্ষমতায় বহাল থাকার ছবি। এরশাদ বিনিময়ে তাকে ও তার শিষ্যদের দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য।

    কিন্তু আটরশির পীরের ভবিষ্যদ্বাণীও মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছিল।
    হার্ড লাক।

    শুধু এরশাদই নন। বস্তুত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫-তে খালেদা জিয়া লন্ডনে যাবার পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এবং তাদের সমর্থক মিডিয়া থেকে একটানা প্রচার চলেছিল তিনি আর দেশে ফিরবেন না। এরশাদের তুলনায় আরও নশ্বর পলিটিশিয়ানরা যেমন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করে চলেছিলেন।
    আর তাই বাংলাদেশের সর্বত্র পান-চিনি-হলুদ-বিয়ে-বৌভাতের এই সিজনে অভ্যাগতদের মুখ্য প্রশ্নটি ছিলÑ খালেদা জিয়া আর স্বদেশে ফিরে আসবেন কি না?

    তিনি তো অসুস্থ। তার লম্বা চিকিৎসা দরকার।
    তার তো বয়স হয়েছে। তার বিশ্রাম দরকার।
    তিনি ছেলের পরিবারের সঙ্গে বাদবাকি জীবন লন্ডনেই কাটিয়ে দিতে চান। তার পারিবারিক যত্ন দরকার।
    ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

    খালেদা জিয়া দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হবে অথবা সাজানো মামলার রায়ে তাকে নিজ গৃহে অন্তরীণ করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে গত দুই মাসে এমন হুমকিও এসেছে। এসব হুমকির প্রেক্ষিতে আহারের সমাপ্তি টানতে টানতে অভ্যাগতরা তাদের সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন, এই মুহূর্তে খালেদার দেশে ফেরা উচিত হবে না। সুতরাং তিনি লন্ডনেই থেকে যাবেন।

    এসব পূর্ণ এবং অর্ধ ভবিষ্যদ্বাণী যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছিল, প্রায় ৫,০০০ বছর আগে অ্যাসিরিয়ানদের শাসন আমলেও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের খুব কদর ছিল। তাদের উপদেশ মোতাবেক শাসকরা চলতেন। কিন্তু সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দিতে ‘‘যুক্তির যুগ” (Age of Reasons) শুরু হবার পর ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের ওপর শ্রদ্ধা ও ভক্তি মানুষ হারিয়ে ফেলে।

    কিন্তু তারপরও বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দিতে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের কদর অনেকের কাছে ছিল এবং আছে। ক্লিভল্যান্ড, ওহাই’র মনস্তাত্ত্বিক উপদেষ্টা মিজ রোজানা রজার্স বলেন, “ভবিষ্যৎ জানতে কতো জাদরেল সব মানুষ যে কতো আগ্রহী সেটা প্রকাশ করলে সাধারণ সব মানুষ তাজ্জব হয়ে যাবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ফিলাডেলফিয়ার বহু ব্যাংকার, হলিউডের বহু আইনজীবী এবং দেশের শীর্ষ ৫০০টি কম্পানির সিইও’রা গণকদের কাছে নিয়মিত যান। খুব ধনী ও খুব শক্তিশালী ব্যক্তিরা কোনো বড় ডিসিশন নেয়ার আগে গণকদের মতামত নেন। এ রকম প্রায় ৪,০০০ ব্যক্তি আমার ক্লায়েন্ট।’’

    রোজানা রজার্স অবশ্য নিজেকে গণক বলেন না। তিনি আপগ্রেডেড করেছেন নিজেকে। তিনি নিজেকে বলেন সাইকিক কাউন্সেলর (Psychic Counsellor)।

    পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান, মোনায়েম খান প্রমুখ নিয়মিত কনসাল্ট করতেন ময়মনসিংহ শহরের মি অজিত নিয়োগীর সঙ্গে, যিনি ছিলেন ম্যাথমেটিক্সের প্রফেসর।

    আমি নিজেও ১৯৫৬-তে তার কাছে গিয়েছিলাম আমার ভবিষ্যৎ জানতে। তখন ইকনমিক্সে সদ্য এমএ পরীক্ষা দিয়েছি এবং প্রেমে পড়েছি। আমার দুটি প্রশ্ন ছিল তার কাছে- আমি বিলেত যেতে পারব কি না এবং প্রেমে সফল হব কি না?

    অজিত নিয়োগী একটি শাদা কাগজে অনেক হিসাব নিকাশ করে বলেছিলেন, পরের বছরে ১৯৫৭তেই আমার বিলেত যাওয়া হবে এবং প্রেমেও সাফল্য আসবে।

    তাই হয়েছিল।

    কিন্তু তার পরেও আমি ভবিষ্যদ্বাণী এবং ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের ওপর আস্থা রাখিনি। তবে আমি আগ্রহ নিয়ে দেখেছি কিভাবে গণকরা অন্যান্যদের আস্থা অর্জন করেন এবং যথেষ্ট উপার্জনও করেন। আমার প্রয়াত বন্ধু, সাহিত্যিক, মুভি মেকার জহির রায়হানও ছিলেন একজন গণক এবং সমকালীন ছাত্রীদের খুব প্রিয়।
    যেসব মাধ্যমে দেশে বিদেশে ভবিষ্যৎ গণনা করা হয় তার একটা লিস্ট নিচে দেয়া হলো। বাংলাদেশের বেকার যুবকরা ভবিষ্যৎ দর্শনকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করলে ভাল আয় করতে পারবেন হয়তো! কারণ আওয়ামী সরকারের নিরন্তর প্রচারণা বিশ্বাস করলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গিয়েছে এবং অনেক মানুষ ধনবান ও ক্ষমতাবান হয়েছেন।

    উৎসাহী বেকাররা বেছে নিতে পারেন নিচের লিস্ট থেকে ভবিষ্যৎ গণনার এক বা একাধিক পদ্ধতি :

    কিরোম্যানসি (Chiromancy) ও পামিস্টৃ (Palmistry)। হাত দেখা। এটাই জহির রায়হান করতেন এবং বাংলাদেশে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

    অ্যালেকট্রোম্যানসি (Alectromancy)। শস্য ছিটিয়ে দিলে মুরগি কোনটা বেছে বেছে খায় সেটা দেখা।
    আকাশের তারা দেখা বা এস্ট্রোনমি।
    জ্যোতিষবিদ্যা। আকাশের গ্রহ ও অন্যান্য বস্তু দেখা।
    অগারি (Augury) বা পাখিদের উড়ে চলার পথ দেখা।
    কুষ্ঠি ও জন্মতারিখ দেখা। এটা মি অজিত নিয়োগীর বৈশিষ্ট্য ছিল।
    কার্টোম্যানসি (Cartomancy)। তাস দেখা।
    সিরোম্যানসি (Ceromancy)। মোমবাতি কিভাবে গলে পড়ে সেটা দেখা।
    ক্রোনোম্যানসি (Chronomancy)। দিন দেখা। কুলক্ষণ ও সুলক্ষণের দিন চিহ্নিত করা।
    কৃস্টালোম্যানসি (Chrystalomancy) কৃস্টাল বল দেখা।
    ফেইস রিডিং (Face reading)। মুখের গড়ন ও দাগ দেখা।
    জিওম্যানসি (Geomancy)। মাটি ও বালির গড়ন দেখা।
    হাইড্রোম্যানসি (Hydromancy)। পানি দেখা।
    কাউ চিম (Kau cim)। স্তূপীকৃত বাশের কাঠি দেখা।
    লিথোম্যানসি (Lithomacny)। মণিমানিক্য দেখা।
    নেকট্রোম্যানসি (Nectromancy)। মৃত ব্যক্তির আত্মাকে ডেকে আনা।
    নিউমেরোলজি (Numerology)। সংখ্যা বিন্যাস দেখা।
    ওনেরোম্যানসি (Oneiromancy)। স্বপ্ন বিশ্লেষণ করা।
    প্যারট এস্ট্রোলজি (Parrot Astrology)। তোতা পাখি কোন তাস তুলে নেয় সেটা দেখা।
    পাইরোম্যানসি (Pyromancy)। আগুনের শেইপ দেখা।
    স্পিরিট বোর্ড (Spirit board)। প্লানচেট করা বা হার্ট শেইপের কাঠের বোর্ডের মাধ্যমে কারো আত্মাকে ডেকে আনা।
    টাসিওম্যানসি (Tasseomancy)। চায়ের পাতা পেয়ালায় কি শেইপ নিচ্ছে সেটা দেখা।

    কিছুটা কম ধনী কিন্তু কিছুটা বেশি সচেতন এক ব্যক্তির সঙ্গে গত সপ্তাহে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে এক টেবিলে আমি ছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে জোরালো যুক্তি দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, ‘‘খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরবেন না। আমি বাজি রাখতে রাজি আছি।’’

    আমি তার চ্যালেঞ্জ নেইনি। বাজিও ধরিনি। তবে আমি তাকে বলেছিলাম, ‘‘দেশে না ফেরার যেসব যুক্তি আপনি দিলেন, সে সবই অকাট্য। তবে খালেদার ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য। হাসিনা নন খালেদা। এসব যুক্তি হাসিনার বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের পর তিনি দুইবার দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন বিদেশে আমেরিকায় তার পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে থাকতে। বাংলাদেশে তার নিরাপত্তা এবং ক্ষমতাসীন হবার বিষয় দুটি হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত করে হাসিনা দেশে ফিরে আসেন নভেম্বর ২০০৮-এ। সেই সময়ে খালেদার ওপর প্রচণ্ড চাপ আনা সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বাংলাদেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।’’

    সেই দুঃসময়েও খালেদা বিদেশে যাননি। স্বদেশে একাকী জেলবন্দীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এই সত্যটা কখনই ভুললে চলবে না।
    সুতরাং আমার দৃঢ় বিশ্বাস খালেদা লন্ডনে কিংস্টন -আপন-টেমসে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবনের বদলে স্বদেশে মামলা, বন্দিত্ব এবং অন্যান্য ঝুকিপূর্ণ জীবনেই আবার ফিরে আসবেন।

    ‘‘কবে?” ওই ব্যক্তিটি প্রশ্ন করেছিলেন।

    ‘‘সেটা আমি জানি না। তবে ফিরে যে আসবেন সেটা আমি জানি, যদি তাকে আমি ঠিকমতো বুঝে থাকি।” আমি উত্তর দিয়েছিলাম।
    ওই ব্যক্তির মুখে ফুটে উঠেছিল বিজয়ীর হাসি।

    আমি তাকে বলতে পারতাম, খালেদা ফিরে আসবেন আগামী এক মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে যে কোনো সময়ে। আমার উত্তরটা ঠিক হতো।

    বছর দুয়েক আগে আমি লন্ডনে গিয়েছিলাম আমার দুই চোখের ক্যাটারাক্ট বা ছানি অপারেশনের জন্য। এপয়েন্টমেন্ট করেছিলাম হার্লি স্টৃটে প্র্যাকটিসিং এক আই সার্জনের সঙ্গে যিনি বিশ্বখ্যাত দি মুরফিল্ডস আই হসপিটালে ক্যাটারাক্ট অপারেশন করেন। এই হসপিটালে শুধু চোখেরই চিকিৎসা হয়।

    ফার্স্ট কনসালটেশনে ডাক্তার বুঝিয়ে বললেন, “দুটো চোখের অপারেশন এক সঙ্গে কখনোই করা হবে না। একটি চোখ অপারেশনের পরে অন্তত দুই মাস গ্যাপ দিয়ে অন্য চোখটি অপারেশন করা হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে প্রথম চোখ অপারেশনের এক সপ্তাহ শেষে তা পরীক্ষার পরে। যদি পেশেন্টের ডায়াবেটিস বা গ্লুকোমা থাকে তাহলে দুই মাস নয় – দেড় বা দুই বছর পরে দ্বিতীয় চোখ অপারেশন করা হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে ডায়াবেটিস কনট্রোলে আনা এবং গ্লুকোমার সর্বশেষ পরিস্থিতি বিবেচনার পর।

    এ জন্যই আমি গণনা করেছিলাম খালেদার দেশে ফেরার সবচেয়ে কাছের সময় হতে পারে নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বরের প্রথমে। কারণ, পহেলা অক্টোবরে তার এক চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন হয়েছিল সেই মুরফিল্ডস হসপিটালে। কিন্তু যেহেতু খালেদার চোখে অন্যান্য সমস্যা আগেই ছিল এবং সেটা বেড়ে গিয়েছিল এ বছরের শুরুতে গুলশানে অবরুদ্ধ থাকার সময়ে তার ওপর সরকারি পুলিশ বাহিনীর পেপার স্প্রে (Pepper Spray, উচ্চারণটি পিপার নয়- পেপার) হামলায় সেহেতু তার দ্বিতীয় চোখের অপারেশন বিলম্বিত হতে পারে। অর্থাৎ, তার দেশে ফেরার সবচেয়ে দূরের সময়টা হতে পারে দেড় থেকে দুই বছর।

    তাই হয়েছে। বিএনপি থেকে প্রচারিত বিবৃতিতে জানা গেছে খালেদা জিয়া তার চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই স্বদেশে ফিরছেন।

    ২০ নভেম্বর ২০১৫ শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন খালেদা জিয়াকে নিয়ে হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে এমিরেটসের এয়ারবাস এ-থৃএইট টেক অফ করে, সেই ক্ষণ থেকে খালেদার বিজয় সূচিত হয়েছে। কারণ, খালেদা আবারও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন এক. তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো পলাতক জীবনমুখী নন এবং দুই. তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো ভেজাল দেশপ্রেমিক নন যিনি সর্বদাই দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও যার বোন, পুত্র-কন্যা, পুত্রবধূ-জামাই, নাতি-নাতনিরা সবাই বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকেন এবং যিনি নিজে সর্বদাই বিদেশ যেতে উন্মুখ থাকেন। এই মাসেই নেদারল্যান্ডস সফরের পর মাল্টা ও ফ্রান্সে হাসিনার সফরসূচি ছিল।

    সুপারস্টার ফুটবলার কৃশ্চিয়ানো রোনালডো আগামী সিজনে তার বর্তমান ক্লাব রিয়াল মাদৃদ ছেড়ে অন্য ক্লাবে যোগ দেবেন কি না সে বিষয়ে তাকে সম্প্রতি প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। আপনার ভবিষ্যতও আপনি জানেন না। আমি ভবিষ্যতে কোথাও যাবো কি না, তাও জানি না।’’

    ইংরেজিতে একটা বচন আছে ‘‘হোয়ার এঞ্জেলস ডোন্ট ডেয়ার টু ট্রেড ইন”- ফুলস ওয়াক ইন (Where angels don’t dare to tread in – fools walk in)। অর্থাৎ, যেখানে দেবদূতরা পা মাড়াতে ভয় পান, সেখানে মূর্খরা স্বেচ্ছায় হেটে যান।

    ভবিষ্যদ্বাণী কোনো বিজ্ঞ বা বুদ্ধিমান ব্যক্তি করেন না, অজ্ঞ ও মূর্খ ব্যক্তিরাই করেন- এই বচনটি আবারও প্রমাণিত হলো খালেদার স্বদেশ ফেরার মধ্যে দিয়ে। বাংলাদেশের আওয়ামী পলিটিশিয়ান ও আওয়ামী ঘরানার মিডিয়া, রোনালডোর কথা এবং উপরোক্ত বচনটি মনে রাখতে পারেন। কারণ খালেদা তাদের মূর্খ ও অজ্ঞ প্রমাণ করেছেন।

    এখন বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, খালেদা জিয়া ফিরে এসেছেন ভবিষ্যতে- ব্যাক টু দি ফিউচার (Back to the future)-এ।

    হলিউড ডিরেক্টর রবার্ট জেমেকিস ব্যাক টু দি ফিউচার নামের সিরিজে পার্ট ওয়ান, টু ও থৃ, তিনটি মুভি করেছেন। তিনি ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর মুভিটি করেননি।

    খালেদা জিয়ার এই প্রত্যাবর্তন ব্যাক টু দি ফিউচার পার্ট ফোর কোনো মুভির কাল্পনিক মধুর কাহিনী নয়। এটা হচ্ছে রূঢ়, কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাহিনী। তিনি তার একমাত্র পুত্র এবং লন্ডনে সম্প্রতি সমবেত সব নিকট আত্মীয়দের ছেড়ে স্বদেশে ফিরেছেন, বাংলাদেশের নতুন ভবিষ্যত গড়ার প্রত্যয়ে। সেই প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করতে হলে বিএনপিকে দ্রুত দিকনির্দেশনা দিতে হবে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পার্টির সব স্তরে গণতন্ত্রায়ন করে এবং কাউন্সিল অধিবেশন ডেকে। ভবিষ্যদ্বাণী নয়- খালেদা জিয়াকে নতুন ভবিষ্যত গড়তে হবে।

    ইতিমধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এবং পার্টির বাইরে অন্যরা যারা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একমাত্র নেতা খালেদা জিয়াই তারা সবাই এক বাক্যে বলবেনÑ ওয়েলকাম ব্যাক লেট আস অল গো ব্যাক টু দি ফিউচার।

    ২১ নভেম্বর ২০১৫।

    (বানান রীতি লেখকের নিজস্ব )

    শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক, টিভি অ্যাঙকর, বিবিসির সাবেক কর্মী (১৯৫৭-১৯৯১), লন্ডনে বহুভাষাভিত্তিক স্পেকট্রাম রেডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১৯৮৭-১৯৯২)। fb.com/ShafikRehmanPresents

    স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা: মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী – ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

    ১৭ ই নভেম্বর মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এ দিনে গোটা জাতিকে শোক সাগরে ভাসিয়ে উপমহাদেশের এ রাজনৈতিক সূর্য অস্ত গিয়েছিল। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। মজলুম মানুষের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়।

    মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বাংলার মজলুম জননেতা। তিনি তাঁর সারাটা জীবন কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য ব্যয় করেছেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের জীবনে কখনো কোথাও মাথানত করেননি। আপোষহীন থেকেছেন নিজের আদর্শের প্রতি। জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করে মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে ছিলেন অবিচল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগরিত করেন। জমিদারদের নির্যাতন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক-মেহনতিকে ঐক্যবদ্ধ করে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। শুধু ব্রিটিশ নয়, পাকিস্তান স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তিনি জীবনপণ লড়াই চালিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বস্তুতঃ তিনি জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ-চেতনার সংমিশ্রণে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন (ন্যাপ)। তাঁর বিচিত্র এই রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে- একটা কথা স্পস্ট বুঝা যায় যে, তিনি আজীবন মেহনতি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রামে কখনো পিছু হটেননি। বরং এই সকল লড়াই-সংগ্রামের জন্য জেল, জুলুম, হুলিয়াসহ নানা নির্যাতনের শিকার হন।
    তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘ওয়ালাকুমুসসালাম’ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি । শেখ মুজিবুর রহমান এর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু ছিলেন মাওলানা ভাসানী। শোষিত-বঞ্চিত ও নিপীড়িত অধিকারহারা মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী মহাপুরুষ ছিলেন মাওলানা ভাসানী। ভাসানী এমন একজন নেতা ছিলেন যাকে নিয়ে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনে গবেষণা চলছে।

    মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (জন্ম : ডিসেম্বর ১২, ১৮৮০-মৃত্যু : নভেম্বর ১৭, ১৯৭৬) বাংলাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে অন্যতম। যে কারণে যুক্ত ফ্রন্টের নামকরণ করা হয়েছিল ‘হক-ভাসানী’ যুক্ত ফ্রন্ট। এই হক ছিলেন, শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। দেশের মানুষের কাছে ‘মাওলানা ভাসানী’ ও ‘মজলুম জননেতা’ নামে অধিক পরিচিত। অসংখ্য ধর্মীয় ভক্ত বা মুরদি তাকেঁ শুধু ‘হুজুর’ বলেও সম্বোধন করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের বেশীরভাগ সময় বামপন্থী রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যদিও তিনি একান্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত , মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারী। বায়ান্নর আন্দোলনের ভাষা তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ এর সভাপতি ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি কারাবরণ পর্যন্ত করেছিলেন। ৬৯ এর আন্দোলনেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা একেবারে ফেলে দেবার মত নয়।কৃষক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি সবসময় রাজনীতি করেছেন অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানে তিনি উড়িয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পতাকা।
    দরিদ্র মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। নিতান্ত কিশোর বয়স থেকে তিনি নিয়েছিলেন সংগ্রামের দীক্ষা। তার ছোটবেলার একটি ঘটনা। কিশোর চেগা মিয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক বাড়িতে জেয়াফত খেতে গিয়েছেন। দরিদ্র মানুষসহ সবার জন্য সেখানে একই রকমভাবে বসে খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে, খাঁ বাড়ির লোকজনের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়নি বলে সবাই চলে এলেও চেগা মিয়া বেঁকে বসেন। তিনি অন্য সবার সঙ্গে মাটিতে বসে জেয়াফত খান।এমনিভাবে মেহনতী মানুষের পক্ষে অবস্থান করে তিনি মজলুম জননেতায় উপনীত হতে পেরেছিলেন। ছোট বয়স থেকে তিনি শ্রমজীবীর কষ্ট উপলব্ধির জন্য সাধনা করেছেন। কৃষকের সঙ্গে চাষ করে, জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরে আয়-রোজগার করেছেন। কাজ করার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন কৃষক, জেলে, কামার ও কুমারের বন্ধু। সারা জীবন ওই বোধই তাকে মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠায় অটল রেখেছে। দেওবন্দ মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি সংগ্রামী ও দেশপ্রেমিক একদল আলেমের সংস্পর্শে আসেন। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। এক সময় আসাম চলে গিয়ে কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার বিপ্লবীদের সঙ্গে দেওবন্দের মাওলানাদের চেতনার মিল দেখে তিনি এ রকম রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হন। বিপ্লবী রাজনীতি শুধু ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়, তাদের সৃষ্ট জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মপন্থা এটি তাকে বিপ্লবীদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। পূর্ব বাংলায় তিনি কৃষকদের নিয়ে ইংরেজ শাসনের তাঁবেদার শোষকদের গোলা জ্বালিযে দেয়ার মতো অনেক ঘটনার জন্ম দেন। তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী মওলানা নামে। মওলানা ভাসানীর বয়স যখন ৩০ বছর, ওই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন পূর্ববঙ্গ সফর করেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন তার সার্বক্ষণিক সফরসঙ্গী। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করেছেন। তখন তিনি পরতেন পায়জামা ও পাঞ্জাবি। একদিন তার ধর্মীয় গুরু মাওলানা আজাদ সোবহানী বললেন, কৃষক শ্রমিক যা পরে তা না পরে তুমি কীভাবে তাদের বন্ধু হবে। সেই যে মওলানা ভাসানী লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরা শুরু করেছিলেন আজীবন তা বহাল রেখেছেন। এ পোশাক পরেই তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করেছেন, চীনে সরকারি সফরে গিয়েছেন। কংগ্রেস দিয়ে মওলানা ভাসানীর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির শুরু। কংগ্রেস কর্মী হিসেবে তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল কৃষক-শ্রমিকের চিরশত্রু জমিদার, জোতদার আর সুদখোর মহাজন। এদের বিরুদ্ধে তিনি জনমত তৈরি করেছিলেন। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদার, জোতদাররা একাট্টা হয়ে তাকে খতম করে দিতে চেয়েছিল। তাই তিনি চলে যান আসামে। আসামে তার রাজনীতি দুর্বার গতি পায়।

    মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া পল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা হাজী শারাফত আলী। হাজী শারাফত আলী ও বেগম শারাফত আলীর পরিবারে ৪ টি সন্তানের জন্ম হয়। একটি মেয়ে ও তিনটি ছেলে। মোঃ আব্দুল হামিদ খান সবার ছোট। তাঁর ডাক নাম ছিল চেগা মিয়া। ছেলে-মেয়ে বেশ ছোট থাকা অবস্থায় হাজী শারাফত আলী মারা যান। কিছুদিন পর এক মহামারীতে বেগম শারাফত ও দুই ছেলে মারা যায়। বেঁচে থাকলো ছোট শিশু আব্দুল হামিদ খান।

    পিতৃহীন হামিদ প্রথমে কিছুদিন চাচা ইব্রাহিমের আশ্রয়ে থাকেন। ওই সময় ইরাকের এক আলেম ও ধর্ম প্রচারক নাসির উদ্দীন বোগদাদী সিরাজগঞ্জে আসেন। হামিদ তাঁর আশ্রয়ে কিছুদিন কাটান। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে ১৮৯৩ সালে তিনি জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে তিনি মাদ্রাসার মোদাররেসের কাজ করেন এবং জমিদারের ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে পীর সৈয়দ নাসীরুদ্দীনের সাথে আসাম গমন করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ইসালামিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৭-এ দেওবন্দ যান। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে আসেন। ১৯১৭খ্রিস্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তাঁর ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই ইদল সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৫সালে তিনি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন হম্মদ চৌধুরীর মেয়ে আলেমা খাতুনকে বিবাহ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি তার সহধর্মিণী আলেমা খাতুনকে নিয়ে আসাম গমন করেন এবং আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটান। ১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এখান থেকে তার নাম রাখা হয় “ভাসানীর মাওলানা”। এরপর থেকে তার নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়।

    সাম্যবাদের আদর্শকে যিনি মনেপ্রাণে গ্রহণ করে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, দেশের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের জন্য যিনি নিজের জীবনকে করেছিলেন উৎসর্গ তিনি হলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। মওলানা ভাসানীর জন্ম হয়েছিল এক সাধারণ পরিবারে ১৮৮০ সালে ১২ ফেব্র“য়ারি। বৃহত্তর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানের জেলা) ধানগড়া গ্রামে।

    জন্মের পর বাবা হাজী শরাফত আলী খান আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন ‘চেগা মিয়া’। কিন্তু বাবা-মায়ের স্নেহ বেশিদিন পাননি মওলানা ভাসানী। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৬ বছর তখনই পিতার মৃত্যু হয়। তারপর এগারো বছর বয়সে মায়েরও মৃত্যু হয়।

    ভাসানীর আরও দুজন বড় ভাই ছিলেন আমীর আলী খান ও ইসমাইল খান। তাঁদেরও অকালমৃত্যু হয় একে একে। বেঁচে রইলেন বোন এবং ছোট ভাই আবদুল হামিদ খান ওরফে চেগা মিয়া। শৈশবেই সকলকে হারিয়ে আব্দুল হামিদ এসে আশ্রয় নিলেন চাচা ইব্রাহিম খানের বাড়িতে। চাচা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিলেন সিরাজগঞ্জ শহরের এক মাদ্রাসায়। কিন্তু পড়াশোনায় মন বসল না আব্দুল হামিদের। ক্লাসের বাধ্যবাধকতা তাঁর ভাল লাগত না। একদিন চাচার সাথে অভিমান করে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেলেন শাহজাদপুরে এক দূঃসম্পর্কের ভগ্নিপতির বাড়িতে। সেখানে গিয়ে পড়াশুনা ছেড়ে শুরু করলেন ক্ষেতমজুরের কাজ। ভাসানী যখন শাহজাদপুরে ক্ষেতমজুরের কাজ করেছিলেন তখন সেখানে এসে হাজির হলেন এক পীরসাহেব। তিনি এসেছেন সুদূর ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে। নাম তাঁর নাসিরউদ্দিন শাহ বোগদাদী। ভাসানী একদিন দেখা করলেন পীর সাহেবের সাথে। পীর সাহেবের এই অনাথ বালকটিকে পিতৃস্নেহে কাছে টেনে নিলেন। পরে পীরসাহেবের সাথেই তিনি চলে গেলেন ময়মনসিংহ জেলার বল্লাগ্রামে। সেখানে গিয়ে পীর সাহেবে ভাসানীকে আবার মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন।

    মক্তবের পড়া শেষ করে শুরু করলেন শিক্ষকতা। মাদ্রাসার শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে এলেন টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। এখানে বছরখানেক থাকার পর তিনি পীরসাহেবের সাথেই চলে গেলেন আসামে। পীরসাহেবের আস্তানায়। তখন সারা ভারতে চলছিল ব্রিটিশবিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। ভাসানীও জড়িত হলেন দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে। তখন ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ভাসানী পীর সাহেবের অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন দেওবন্দে। ভর্তি হলেন দেওবন্দ ইসলামিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি চলল তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড। বলতে গেলে দেওবন্দ থেকেই ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের শরু। দেওবন্দের শিক্ষা শেষ করে ভাসানী আবার ফিরে এলেন আসামে।

    মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য পীরসাহেব তখন আসামের জঙ্গলে স্থাপন করেন ইসলাম প্রচার মিশন। ভাসানীও তখন মিশনের কাজে আত্মনিয়োগ দেন। মিশনের কাজ নিয়ে তিনি চলে এলেন বগুড়া পাঁচবিবিতে। এখানে পরিচয় হল জমিদার শামসুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীর সাথে। ভাসানী জমিদার সাহেবের ছেলে মেয়েদের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হলেন। পরে শুধু গৃহশিক্ষকতা নয়, জমিদারী দেখাশোনা করারও দায়িত্ব পেলেন ভাসানী। জমিদারি সংক্রান্ত ব্যাপারে ভাসানীকে প্রায়ই কলকাতায় যাতায়াত করতে হত। কলকাতা তখন ছিল বিপ্লবী দলের কিছু কর্মী সাথে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন উপলক্ষেই ভাসানী দেশবন্দু চিত্তরঞ্জন দাসের সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পান। ভাসানী তখন থেকেই দেশবন্ধুর অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ১৯১৯ সালেই ভাসানী অনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং অসহযোগী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনে নেমে গ্রেফতার হন। তাঁর নয় মাসের জেল হয়। এটাই ভাসানীর প্রথম কারাবরণ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯২১ সালে তিনি আলিভ্রাতৃদ্বয় অর্থাৎ মওলানা মোহাম্মদ আলি এবং শওকত আলির ডাকে খেলাফত আন্দোলন এবং একই সাথে দেশবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করলেন। আবারও গ্রেফতার হলেন তিনি। এবার হল সাতদিনের জেল। ১৯২২ সালে উত্তর বঙ্গ ও আসামে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বিপন্ন মানুষের সেবায় এগিয়ে আসেন ভাসানী। কলকাতা থেকে এলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ বসুসহ আরও অনেকে। ভাসানী এইসব জাতীয় নেতার সাথে দুঃস্থ মানুষের সেবায় দিনরাত কাজ করতে লাগলেন।

    ১৯২৫ সালে তিনি বগুড়ার জমিদার শামসুদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরীর কন্যা আলেমা খাতুনকে বিয়ে করেন। বিয়ের একবছর পর তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে যান আসামের ভাসানচরে। ১৯২৬ সালে তিনি আসামে শুরু করেন ‘কৃষক আন্দোলন’।

    জমিদাররা প্রমাদ শুনলেন। তখন সব জমিদার মিলে ইংরেজ গভর্নরকে দিয়ে মওলানা ভাসানীকে অবাঞ্চিত ব্যক্তি ঘোষণা করলেন। ভাসানীকে বাংলা থেকে বহিষ্কার আদেশ জারি করা হল। অবশেষে ভাসানী স্ব-পরিবারে গিয়ে ঠাঁই নিলেন আসামের গহীন জঙ্গলে-ঘাগমাড়া নামে এক জায়গায়। সাংগঠনিক কাজের জন্য মাঝে মাঝে কলকাতা বা অন্যান্য জায়গায় যেতে হলেও ভাসানী ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত লাগাতারভাবে আসামেই ছিলেন।

    তিনি ১৯২৯ সালে সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলা ময়দানে ‘বঙ্গ আসাম প্রজা সম্মেলন’ আহ্বান করেন। এই সম্মেলনে প্রায় তিন লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল। সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

    মওলানা ভাসানী লাইনপ্রথা ও বাঙাল খেদা আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন ১৯২৫ সালে। ১৯৩৭ সালে ভাসানী আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে আসামের বারোটি জেলায় মুসলিম লীগের সংগঠন আরও জোরদার হয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনেই আসামের ৩৪ আসনের মধ্যে ৩১ টি আসন লাভ করে। ভাসানী নিজেও আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগের মন্ত্রীপরিষদ গঠিত হওয়ার পরও ভাসানী তাঁর লাইনপ্রথা ও বাঙাল খেদা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন। ফলে সরকারের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কেন্দ্রীয় লীগ নেতৃবৃন্দ তাঁকে নিজদলীয় সরকারের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু ভাসানী তার আর্দশের প্রতি অটল রইলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি রংপুরে গাইবান্দায় কৃষক প্রজা সম্মেলনের আয়োজন করলেন।

    ১৯৪০ সালে তিনি জননেতা এ কে ফজলুল হকের সাথে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন।

    আসামের লাইন প্রথাবিরোধী আন্দোলন থেকে সরে থাকার জন্য স্বয়ং মুহম্মদ আলি জিন্নাহ পর্যন্ত তাঁকে অনুরোধ করেন। কিন্তু জিন্নাহর প্রস্তাবও ভাসানী প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ভাসানীর আন্দোলনের মুখে ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আসামের মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে। তবে পুলিশ বাঙালীদের ওপর গুলি চালায় এবং একজন নিহত হয়। ভাসানী গ্রেফতার হন।

    ১৯৪৭ সালের ২৯ জুন ভাসানী গৌহাটি কারাগার থেকে ছাড়া পেলেন। ছাড়া পেয়েই তিনি ছুটে এলেন সিলেটে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব মুহুর্তে সিলেট পাকিস্তানের অংশ হবে কি না এই নিয়ে গণভোট হয়। ভাসানী সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্তকরণের পক্ষে সমর্থন করেন। এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগষ্ট ভারত বর্ষ দ্বিখন্ডিতহয়ে জন্ম নিল দু’টি পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আসাম সরকার মওলানা ভাসানীকে অবিলম্বে আসাম ত্যাগের নির্দেশ দেয়। তিনি ফিরে এলেন টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। ১৯৪৮ সালে প্রথম পূর্ববঙ্গ পরিষদের টাঙ্গাইল আসন শূন্য হলে ভাসানী উপনির্বাচনে অংশে নেন এবং খাজা নাজিম উদ্দিন মনোনিত প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু খাজা নাজিম উদ্দিন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই উপনির্বাচন বাতিল ঘোষণা করেন। শুধু তাই নয় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত যাতে ভাসানী কোন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে এই মর্মেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১৯৪৯ সালে সোহ্রাওয়াদী ঢাকায় ফিরে এলে মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভাসানী একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৫৪সালে বার্লিনে শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য ভাসানী লন্ডন সফরে গেলেন। কিন্তু তিনি পাকিস্তান সরকারের চক্রান্তের ফলে জার্মানি যাবার ভিসা পেলেন না। তিনি বিদেশে থাকা অবস্থায় শুনতে পারলেন পূর্ববঙ্গের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল করা হয়েছে এবং যুক্তফ্রন্ট নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তাই সেই মুহূর্তে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। পরে ১৯৫৫ সালে সোহরাওয়ার্দি ভাসানীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন। ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল কাগমারি সম্মেলন। ভাসানীর উগ্যোগে এই কাগমারি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। ভাসানীর সেই কাগমারি সম্মেলনের ফল বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন শেখ মজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্ব একটি রাজক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে কাগমারি সম্মেলনের ১৪ বছর পরে পাকিস্তান সরকার ভেঙে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ জন্মলাভের মাধ্যমে। সেই বছরই ১৯৫৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাথে সর্ম্পক ছিন্ন করে নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আ্ওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ভাসানী হলেন চিনপন্থি ন্যাপের সভাপতি অপর দিকে মস্কোপন্থি ন্যাপের সভাপতি হলেন অধ্যাপক মুজাফর আহমদ। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হলে সারা দেশে গড়ে ওঠে আন্দোলন। ভাসানীও এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরীক হন। আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্র“য়ারি সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধু বের হয়ে আসার পর আইয়ুবিরোধী তথা পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন আরও জোর দার হয়। এই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন মওলানা ভাসানী।

    ১৯৩১-এ সন্তোষের কাগমারীতে, ১৯৩২-এ সিরাজগঞ্জের কাওরাখোলায় ও ১৯৩৩-এ গাইবান্ধায় বিশাল কৃষক সম্মেলন করেন। ১৯৩৭-এ মাওলানা ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলীম লীগে যোগদান করেন। সেই সময়ে আসামে ‘লাইন প্রথা’ চালু হলে এই নিপীড়নমূলক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন। এসময় তিনি ” আসাম চাষী মজুর সমিতি” গঠন করেন এবং ধুবরী, গোয়ালপাড়া সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে শের-এ-বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলীম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক মুসলীম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৫-৪৬ সালে আসাম জুড়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে “বাঙ্গাল খেদাও” আন্দোলন শুরু হলে ব্যাপক দাঙ্গা দেখা দেয়। এসময় বাঙালিদের রক্ষার জন্য ভাসানী বারপেটা, গৌহাটি সহ আসামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ান। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯৪৭ সালে আসামে গ্রেফতার হন। ১৯৪৮-এ মুক্তি পান। এরপর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার কার্যাবলি বাংলায় পরিচালনা করার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান এবং এই দাবি নিয়ে পীড়াপীড়ি করেন। ১৯ মার্চ বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বলেন, যেসব কর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ প্রদেশ থেকে সংগ্রহ করে তার শতকরা ৭৫% প্রদেশকে দিতে হবে। এখানে উলেস্নখ যে, ব্রিটিশ আমলে বঙ্গপ্রদেশ জুটেক্স ও সেলসট্যাক্স রাজস্ব হিসেবে আদায় করত এবং এই করের ভাগ কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হতো না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববঙ্গ সরকারের হাত থেকে এই কর ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরাই আদায় করতে থাকে যার ফলে পূর্ববঙ্গ সরকার আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। যাই হোক, মুসলিম লীগ দলের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় মুসলিম লীগের ৰমতাসীন সদস্যরা মওলানা ভাসানীর ওপর অখুশী হয় এবং তার নির্বাচনে ত্রুটি ছিল এই অজুহাত দেখিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করে এবং মওলানা ভাসানীকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। পরিশেষে মওলানা ভাসানী ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতদসত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর এক নির্বাহী আদেশ বলে মওলানা ভাসানীর নির্বাচন বাতিল করেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলিতে রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৩ জুন ওই কর্মিসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ কর্মিসম্মেলনে যোগদান করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান। মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রধান অতিথি। ২৩ জুন পূর্ববঙ্গের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সর্বসম্মতিক্রমে এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক। ২৪ জুন আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় খাদ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ভূখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ১৯৪৯-এর ১৪ অক্টোবর গ্রেফতার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ করেন। ১৯৫০ সালে সরকার কর্তৃক রাজশাহী কারাগারের খাপরা ওয়ার্ড এর বন্দীদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন এবং ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরী হলে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সহযোগিতার কারণে গ্রেফতার হয়ে ১৬ মাস কারানির্যাতনের শিকার হন। অবশ্য জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল মওলানা ভাসানীকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৫৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি শের-এ-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামক নির্বাচনী মোর্চা গঠন করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে ২৩৭ টির মধ্য ২২৮ টি আসন অর্জনের মাধ্যমে নিরঙকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর ২৫শে মে ১৯৫৪ মাওলানা ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোল্ম যান এবং সেখানে বক্তব্য প্রদান করেন। ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্ণরের শাসন জারি করে এবং মাওলানা ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। ১১ মাস লন্ডন, বার্লিন, দিল্লী ও কলকাতায় অবস্থান করার পর তার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে ১৯৫৫-র ২৫ এপ্রিল দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পূর্ব বাংলায় খাদ্যজনিত দুর্ভিক্ষ রোধের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ১৯৫৬-র ৭ মে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে ২৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন। একই বছর ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে মাওলানা ভাসানী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করে নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করার জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করেন। কাগমারী সম্মেলনে১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। এই সভায় মওলানা ভাসানীও বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি বলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামু ওআলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে।এছাড়া কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখান করলে ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ২৫ জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর পর থেকে সবসময় বাম ধারার রাজনীতিএর সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৫৭-র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১২ অক্টোবর মাওলানা ভাসানীকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকায় ৪ বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন।

    বন্দী অবস্থায় ১৯৬২-র ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বন্যাদুর্গতদের সাহায্য ও পাটের ন্যায্যমূল্যসহ বিভিন্ন দাবিতে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ৩ নভেম্বর মুক্তিলাভ করেন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট-এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হন। ১৯৬৩-র মার্চ মাসে আইয়ুব খানের সাথে সাক্ষাত করেন। একই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের বিপ্লব দিবস-এর উৎসবে যোগদানের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেন এবং চীনে সাত সপ্তাহ অবস্থান করেন। ১৯৬৪-র ২৯ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করে দলের সভাপতির দ্বায়িত্বভার গ্রহন করেন এবং একই বছর ২১ জুলাই ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ (কপ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৫-র ১৭ জুলাই আইয়ুব খানের পররাষ্ট্র নীতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯৬৬-তে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থাপিত ছয় দফা কর্মসূচীর বিরোধিতা করেন। ১৯৬৭-র ২২ জুন কেন্দ্রীয় সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ জারি করলে এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৭-র নভেম্বর-এ ন্যাপ দ্বি-খন্ডিত হলে চীনপন্থি ন্যাপের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে মাওলানা ভাসানী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের মুক্তি দাবি করেন। ৮ মার্চ (১৯৬৯) পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সেখানে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে সাক্ষাত করে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে একমত হন। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখান করে শ্রমজীবীদের ঘেরাও কর্মসূচী পালনে উৎসাহ প্রদান করেন। আইয়ুব খান সরকারের পতনের পর নির্বাচনের পূর্বে ভোটের আগে ভাত চাই, ইসলামিক সমাজতন্ত্র কায়েম ইত্যাদি দাবি উত্থাপন করেন।

    ১৯৭০ সালের ৬-৮ আগস্ট বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনশন পালন করেন।অতঃপর সাধারণ নির্বচনে অংশ গ্রহনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ১২ নভেম্বর (১৯৭০) পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রান ব্যবস্থায় অংশ নেয়ার জন্য ন্যাপ প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলন এর প্রতি সমর্থন প্রদান করেন এবং ১৮ জানুয়ারী ১৯৭১ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য তার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।২৫ মার্চ রাতে মওলানা ভাসানী সন্তোষে তার গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনি পাকিস্তান বাহিনীর দৃষ্টি এড়িযে টাঙ্গাইল ছেড়ে তার পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। পাকিস্তান বাহিনী তার সনত্দোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। মওলানা ভাসানী মোজাফ্ফর ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে ভারত সীমানা অভিমুখে রওনা হন। অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সাহায্যে মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম ১৫/১৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ অতিক্রম করে আসামের ফুলবাড়ী নামক স্থানে উপস্থিত হন। পরে তাদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়। এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে প্লেনে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের ৫তলার একটি ফ্ল্যাট তাদের অবস্থানের জন্য দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পৰে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া মওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যেন পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রৰার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই। ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।
    এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দু’বার কোহিনুর প্যালেসে এসে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং তার পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রার্থনা করেন।
    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বদলীয় চরিত্র দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে আট সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয় যার সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। ওই উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন_ ১) তাজউদ্দীন আহমদ, ২) মণি সিং, ৩) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, ৪) মনোঞ্জন ধর প্রমুখ। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ওই উপদেষ্টা কমিটির সভায় এই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বাধীনতা ব্যতিরেক অন্য কোন প্রকার রাজনৈতিক সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না।
    মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কলকাতা ছাড়াও দেরাদুন, দিল্লী ও অন্যান্য স্থানে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে অনেকে অভিযোগ করেন যে ভারতে থাকাকালীন তিনি নজরবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী দুইবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে দিল্লী অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি করা হয়েছিল। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ করেন। ১৯৭৩ সালে খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় ১৫-২২ মে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ১৯৭৪-এর ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতি গঠন করেন। একই বছর জুন মাসে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলে টাঙ্গাইলের সন্তোষে গৃহবন্দি হন। ১৯৭৬-এর ১৬ মে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লং মার্চে নেতৃত্ব দেন। একই বছর ২ অক্টোবর খোদাই খিদমতগার নামে নতুন আর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।

    মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধঃ

    মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশের কিংবদন্তীতুল্য প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং ষাটের দশকের শুরুতেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে আমরা থাকতে পারছি না। ১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাওলানা ভাসানী অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনের পর ইয়াহিয়া খান যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগের হাতে হস্তান্তরে গড়িমসি করতে লাগলেন তখন মাওলানা ভাসানী বজ্র কন্ঠে বললেন ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাই বলি অনেক হইয়াছে কিন্তু আর নয়’।
    ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন প্রদান করে এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা ঘোষণার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বাঙ্গালীদের ওপর আক্রমন করলে তিনি ভারতে চলে যান। যুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি এসময় বিশ্বনেতাদের কাছে চিঠি লিখেন। মওলানা ভাসানী চীনের নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং , প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান।

    ১৯৭১ সনের ২১ শে এপ্রিল মওলানা ভাসানী বহু কাকুতি মিনতি করে চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাইয়ের নিকট মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য পত্র লেখেন

    ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস
    ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের এ দিনে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মরণবাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে এ দিন দেশের সর্বস্তরের লাখো জনতা লংমার্চে অংশ নেন।
    ওই দিন রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢলনামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারতবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে গোটা এলাকা। বেলা ২টায় হাজার হাজার মানুষের স্রোত গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত যাপনের জন্য সে দিনের মতো শেষ হয়। মাঠেই রাত যাপন করার পর দিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে।
    ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এ লংমার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পান না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’ মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লংমার্চ সমাপ্ত হলেও সেদিন ভারত সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন এবং নিরাপত্তা জোরদার করে।
    মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা মার্চের প্রস্তুতির সময় বিশ্ব নেতাদের এ সম্পর্কে অবহিত করে বার্তা পাঠান। তিনি তদানীন্তন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড, চীনের নেতা মাও সেতুং, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন প্রমুখের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে ভারতের ওপর প্রভাব খাটিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির ব্যাপারে সহযোগিতা কামনা করেন।
    এ ছাড়া মওলানা ভাসানী জনসভা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশে এরই মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা সরেজমিন দেখতে আসার আহ্বান জানান।
    ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী সেদিন ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও এর বিভিন্ন তিকর দিক তুলে ধরে যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সেই উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস্য হয়ে আছে আজও। ভারতের এক তরফা ও আগ্রাসী মনোভাবে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চল ভয়াবহ হুমকির মুখে। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা আজ পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্ধশত নদী বিলুপ্তির পথে। অন্য দিকে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে স্থান ভেদে ২৫ ফুট থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
    যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হলেও কোনো সুফল আসেনি। দীর্ঘ দিন ধরে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না।
    সরেজমিন দেখা গেছে, পদ্মার বুকে বিশাল বালুচর পড়েছে। সেখানে ফুটবল খেলা হচ্ছে, গাড়ি চলছে। পদ্মার মূল নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেক দূরে (প্রায় পাঁচ কিলোমিটার) সরে গেছে। পদ্মার সেই যৌবন আর নেই।
    বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে দেশের বৃহৎ এ অঞ্চলটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, মরুকরণ দেখা দেবে।

    মৃত্যু

    জীবনের শেষ দিকে মওলানা ভাসানীকে ঘন ঘন হাসপাতালে যেতে হতো। হার্টের অসুখ, মূত্রাশয়ের অসুখ, ব্রঙ্কাইটিস তাকে কাবু করে ফেলেছিল। ১৯৭৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় এক মাস তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে ছিলেন। দেশে বেশ কিছুদিন সুস্থ ছিলেন। সন্তোষ থেকে ৪ নভেম্বর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানান । ১৯৭৬ খৃস্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশ বরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়। সারা দেশ থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে।

    সমাজ সংস্কার
    রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। আসামে ৩০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কারিগরী শিক্ষা কলেজ, শিশু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষে। এছড়াও তিনি কাগমারিতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ এবং পঞ্চবিবিতে নজরুল ইসলাম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

    প্রকাশিত গ্রন্থ
    দেশের সমস্যা ও সমাধান (১৯৬২)
    মাও সে তুং-এর দেশে (১৯৬৩)

    মাওলানা ভাসানী কর্ম-জীবনের শুরু থেকে সামাজিক জুুলুম, অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। আমরা তাকে কখন দেখতে পেয়েছি বাংলা-আসামের স্থানে স্থানে জমিদার, সুদখোর শোষক মহাজনদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে, কখনো বা উপনিবেশবাদী বৃটিশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতায়, খিলাফত আন্দোলনে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীদের স্বাধীনতা সংগ্রামে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে তিনি অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, মাতৃভাষার দাবী প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন আদায় এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের আপোষহীন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতকে অভিন্ন নদীর উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণ থেকে বিরত রাখতে এবং বিশ্ববাসীকে এ বিষয়ে সচেতন করে বাংলাদেশের দাবীর প্রতি সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে যে লং মার্চ‘র আয়োজন করেছিলেন তা ইতিহাসে আজ অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মাওলানা ভাসানী নেতৃত্বে ১৯৫২ সালে ৩০ জানুয়ারী ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরী হল রুমে বসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। সে কারণে তিনি ১৬ মাস কারা বরণের পর জনমতের কারণে তাকে সরকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরে তিনি ১৯৫৩ সালে ৩ ডিসেম্বর শেরে বাংলার একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়াদীকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন তার যোগ্য নেতৃত্বে পূর্ববাংলা পরিষদের নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধ, বাংলা ভাষা, ফারাক্কা সহ গণতান্ত্রিক দাবী আদায়ের লক্ষ্যে অসহযোগ আন্দোলন সংগ্রামের ডাক দিয়ে দাবী আদায়ের বিভিন্ন সরকারকে বাধ্য করেছিলেন। আজ দেশের এই ক্রান্তি কালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মত জননেতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

    লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম , জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, যুক্তরাজ্য ও ঝালকাঠি জেলা বিএনপির বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক, জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক সহ-সভাপতি,বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষনা পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র প্রতিষ্ঠিতা এবং চার্টাড ইনস্টিটিউট অব লিগ্যাল এক্সিকিউটিভের মেম্বার।

    ‘গোরস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’

    জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে নির্মমভাবে হত্যার পর এক আবেগময়ী স্ট্যাটাসে বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজ চিন্তক ফরহাদ মজহার লিখেছেন, আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পক্ষেই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকব। আমরা কাঁদতে ভুলে যাব। নিজ নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্থানের দিকে যাব, আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে। এভাবে গোরস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

    তার সেই স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো:

    দীপন আমাকে এক হিসাবে জোর করেই ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ বইটি তৈরি করিয়ে নিয়েছিল। বলেছিল, আপনার কিছু বই আমাকে দিতেই হবে। ও ছিল আহমদ ছফা ও আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন আবুল কাশেম ফজলুল হকের ছেলে।

    দীপনের চেহারা আমাদের মতো বাম রাজনীতি করে আসা পুরানা আর রুক্ষ বাবা-কাকাদের মতো ছিল না। স্নেহ জাগানিয়া মুখ, লজ্জিত ভাবে হাসত। দুই একবার যতোটুকু কথা বলেছি মনে হয় নি মগজ কোন খোপে বন্ধক দিয়ে দীপন মুক্তবুদ্ধিওয়ালা হয়ে গিয়েছে। চিন্তা করতে চাইত সব দিক থেকেই। ওকে প্রথম দিন থেকেই আমার ভাল লেগেছিল।

    বইটি ২০১১ সালের শেষের দিকে তৈরি করে দিয়েছিলাম। ও পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে বের করেছিল।

    জাক দেরিদার ওপর আমার লেখাগুলো জোগাড় করে বললো এটা গুছিয়ে দিন, আমি প্রচ্ছদ বানিয়ে প্রচার করে দিয়েছি। আমার মাথায় তখন ‘ভাবান্দোলন’ চেপে বসা। দেরিদার সঙ্গে হুসালের তর্ক পাশ্চাত্য চিন্তার জায়গা থেকে যতোটা বুদ্ধিদীপ্ত তার চেয়েও বাংলার ভাবচর্চার জায়গা থেকে আরও দুর্দান্ত। ভাবলাম, নতুন করে পুরাটা বাংলাভাষার ভাবচর্চার ক্ষেত্র থেকে লিখব। এমনভাবে লিখব যাতে ফকির লালন শাহের ভাষা ও শরীরের সম্পর্ক বিচার কিম্বা নদিয়ার সাধকদের ‘গুরু’ ধারণা ভাষার বহু অর্থ বোধকতাকে কিভাবে মোকাবিলা করে তা নিয়ে লিখি।

    এতে দেরিদা প্রাসঙ্গিক হবে। বিদেশি দার্শনিকদের নিয়ে আঁতেলি ভাল লাগে না। কিন্তু লেখা সহজে এগুলো না। কারণ যা লিখতে চাই তা সহজ বিষয় নয়। লিখছিলাম আস্তে আস্তে দীপনকে আর দেওয়া হোল না। ও বইয়ের জন্য তাড়া দিতে আবার যখন গত বছর এলো, আমি বুঝিয়ে বলায় খুব খুশি। এ বছর তাকে যেভাবেই হোক শেষ করব বলে কথা দিয়েছিলাম। গুছিয়ে এনেছি।

    কিন্তু ফয়সাল আরেফিন দীপন আর নাই।

    গতকাল সন্ধ্যায় জাগৃতি প্রকাশনার দীপন সহ শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল ও অন্য দুই লেখক সুদীপ কুমার বর্মন ও তারেক রহিমের খবর পেয়ে পাথর হয়ে আছি।

    দীপনের বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’

    অবিশ্বাস্য শোক মাথায় নিয়ে আবুল কাশেম ফজলুল হক এই কথাটা স্পষ্ট ভাবে বলতে পেরেছেন।

    আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পক্ষেই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকব। আমরা কাঁদতে ভুলে যাব। নিজ নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্থানের দিকে যাব, আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে।

    কে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সেকুলার মুক্তবুদ্ধিওয়ালা আর কে ধর্মান্ধ বা ইসলামি জঙ্গী গোরস্থান তার বিচার করে না। শুধু কবরের ওপর ঘাস গজায়, আর একদা ঐতিহাসিকরা গবেষণা করতে বসে কিভাবে একটি জাতি তাদের বেয়াকুবির জন্য ধ্বংস হয়ে গেলো।

    যেহেতু আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই, তাই জীবনের কোন মূল্য আমরা দিতে জানি না। আমি দেখছি, বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশে দুই দিক থেকে দুটো মিছিল গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। দীপন, আমি প্রাণপণ এই বিভক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। এই ভয়াবহ বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে আমি জানপরান সবাইকে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে যাব।। কিন্তু তাতে কি যারা চলে গিয়েছে ফিরে আসবে?

    কেউই প্রত্যাবর্তন করে না।

    এই লাশের ভার অনেক ভারি, বাংলাদেশ বহন করতে পারবে কি? সেই দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার চর্চা আমরা করি না যা আমাদের গোরস্থানের দিকে নয়, সপ্রতিভ জীবনের দিকে নিয়ে যায়।

    মিনা ট্রাজেডি : প্রশ্নবিদ্ধ হজ ব্যবস্থাপনা

    সৌদি আরবের মিনায় পবিত্র হজ পালনকালে গত বৃহস্পতিবার পদদলিত হয়ে কমপক্ষে ৭৬৯ জন হাজির মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকে। সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্সের পরিচালকের দপ্তর এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সৌদি আরবের মিনায় পদদলিত হয়ে মারা যাওয়া ৭৬৯ হাজির মধ্যে ৬৫০ জনের ছবি প্রকাশ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
    পরিচালকের দপ্তর জানিয়েছে, হজের শেষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতা মিনার বড় জামারাকে (বড় শয়তান) লক্ষ্য করে কঙ্কর মারতে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। পদদলিত হয়ে ৭১৯ জন হাজি আহত হয়েছেন।
    তাপমাত্রা উঠেছিল ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। গনগনে আঁচ শরীরে জ্বালা ধরায়। তেতে ওঠা সেই সূর্য মাথায় নিয়েই হজের শেষ পর্যায়ে চূড়ান্ত রীতি পালন করতে সকাল সকাল তাঁবু ছাড়েন লাখো হাজি। উদ্দেশ্য ছিল, মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়বেন তাঁরা। শয়তানের স্তম্ভে যাওয়ার জন্য সেতুর মতো একাধিক পথ আছে। এক পথে গিয়ে পাথর ছুড়ে আরেক পথে ফিরে আসেন হাজিরা। গত বৃহস্পতিবার সকালে হাজিরা সার বেঁধে এক পথে গিয়ে পাথর ছুড়ে যখন আরেক পথ ধরে ফিরছিলেন তখনই গোল বাধে। হঠাৎ সে পথের মুখে গিয়ে তাঁরা দেখেন আরেক দল হাজি সেই পথেই পাথর ছোড়ার জন্য রওনা হয়েছেন। উভয় পক্ষ যখন মখোমুখি হয় তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় হড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি। প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন সবাই। ভিড়ের চাপে স্বামীর হাত থেকে স্ত্রী, মায়ের হাত থেকে সন্তান, সন্তানের হাত থেকে ছিটকে যান বৃদ্ধ মা-বাবা। চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নার রোল ওঠে। সবাই শুধু আল্লাহকে ডাকছিলেন। এভাবে চলে বেশ খানিকক্ষণ। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে দেখা যায়, সাদা ইহরামে জড়ানো শত শত মানুষ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। পদপিষ্ট হয়েছে তারা। তীব্র গরম আর ভিড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে শ্বাসকষ্টে মারা গেছে শত শত মানুষ। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহত হয়েছে ৭৬৯ জন। আহতের সংখ্যা ৯৩৪।
    সিভিল ডিফেন্সের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আহতদের উদ্ধার করে মিনা অঞ্চলের চারটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখনো উদ্ধার কাজ চলছে। উদ্ধারকাজে চার হাজারের মতো কর্মী অংশ নিচ্ছেন। ঘটনাস্থলে ২২০টি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছে। শয়তানকে পাথর মারতে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।২০৪ নম্বর সড়কের কাছে জামারাত সেতুর প্রবেশমুখ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপের স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটেনি।
    ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও দৃশ্যে ঘটনাস্থলে শত শত হাজির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বেশ কিছু ভাঙা হুইলচেয়ার ও পানির বোতল। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে হতাহত ব্যক্তিদের দ্রুত সরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেন কমলা ও হলুদ রঙের পোশাক পরিহিত উদ্ধারকর্মীরা।
    সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র বলেন, হতাহত হাজিদের উদ্ধারকাজে অংশ নেন প্রায় ৪ হাজার কর্মী। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে যায় দুই শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স। হতাহত হাজিদের চারটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
    ঘটনাস্থল থেকে আল-জাজিরার আরেক সংবাদদাতা ওমর আল-সালেহ বলেন, ‘আমি এমন কিছু দৃশ্য দেখেছি, যা সত্যিই হৃদয়বিদারক। একজনের ওপর আরেকজন এভাবে স্তূপাকারে মৃতাবস্থায় পড়ে ছিলেন হাজিরা।’
    আল দিয়ার নামে একটি আরব দৈনিকে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল-সউদ বৃহস্পতিবার মিনায় বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সউদের সঙ্গে বৈঠক করতে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৩৫০ সদস্যের নিরাপত্তা বাহিনী। যুবরাজের নিরাপত্তার কারণে চলাচল একমুখী করা হয়েছিল এবং এত বড় ঘটনার জন্য এর দায় আছে। যদিও সৌদি আরব এ খবর ঠিক নয় বলে জানিয়েছে।
    দুর্ঘটনার দিন সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল মানসুর আল তুর্কি বলেছিলেন, যে সড়কটিতে ওই পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে, সেখানে আগে কখনো এত হাজির একত্রে সমাগম ঘটেনি। গত শনিবার সৌদি গেজেট-এর খবরে বলা হয়, অন্তত ৩০০ ইরানি হাজি নির্দেশনা ভাঙার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
    মিনায় হাজিদের অবস্থানের জায়গা সম্প্রসারণ কেন করা হচ্ছে না, এ প্রশ্নের জবাবে মানসুর বলেন, হজ পালন-সম্পর্কিত ইসলামি নীতিমালায় এ সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
    হতাহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাগরিক ইরানের, ১৩৬ জন। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, ক্যামেরুন, নাইজার, নাইজেরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, মিসর, চাদ, সোমালিয়া, কেনিয়া, আলজেরিয়া, তানজানিয়াসহ আরো অনেক দেশের নাগরিক রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ আছে ৯২ জন। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
    এবার ক্রেন দুর্ঘটনার পরই হাজিদের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরবের অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল।  বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মুসলমানের কাছে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে বিবেচিত স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণে সৌদি আরবের একচেটিয়া অধিকার নিয়েও কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হলো। বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও সংশ্লিষ্টদের তোপের মুখে পড়েছে সৌদি সরকার। তারা বলছে, আরো বেশি হাজি টানতে অবকাঠামো নির্মাণে সৌদি সরকার শত শত কোটি ডলার খরচ করছে। অথচ হাজিদের নিরাপত্তার দিকটি বরাবরই তারা অবহেলা করছে। হাজিদের মধ্যেও তারা বৈষম্য করেছে। ধনী দেশের হাজিদের জন্য যত সুবিধা রয়েছে, গরিব দেশের হাজিদের জন্য তা নেই। ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতির কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।
    অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আগেই উঠেছিল সৌদিদের বিরুদ্ধে। নব্বই দশকে ইরান প্রথমে সৌদির দিকে এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তাদের দাবি ছিল হজ যেহেতু মুসলিম উম্মার বিষয় তাই এর কর্তৃত্ব এককভাবে কোন দেশ বা সরকারের হাতে থাকা উচিৎ নয়। এই দায়িত্ব সব মুসলিম দেশের নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া দরকার। তাদের দাবিকে সেদিন অস্ত্রের মূখে সৌদি কর্তৃপক্ষ স্তদ্ধ করে দেয। সেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হয়। এরপর আরো দিন গড়িয়েছে। হজ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে চাপা ক্ষোভ থাকলেও তা প্রকশ্যে আসেনি। কিন্তু এবারের ঘটনা সবকিছু বদলে দেবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হজের সময় সৌদি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ক্ষোভের অণলে পেট্রোল ঢেলেছে। ক্রেণ ছিড়ে শতাধিক হাজী নিহত এই ঘা না শুকাতেই আবার পদপিষ্ট হয়ে ৭৬৯ হাজী নিহত হন। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বমুসলিম সম্প্রদায় এখন অনেকটা সরব হয়েছে । ফলে বলা যেতে পারে বড় চাপের মুখে পড়েছে সৌদি সরকার তথা রাজ পরিবার।
    একটা প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে, হজের ব্যবস্থাপনা সৌদি আরবের হাতে থাকা উচিত না মুসলমান দেশগুলো যৌথভাবে এ দায়িত্ব পালন করবে?
    ঘটনার পরপরই বিশেষ করে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের গাড়িবহর মিনায় এসেছিল। যুবরাজের সঙ্গে ছিল প্রায় সাড়ে ৩০০ নিরাপত্তারক্ষী। যুবরাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শয়তানের স্তম্ভে যাওয়ার অন্তত দুটি পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাই অন্য পথগুলোতে প্রচণ্ড ভিড়ের সৃষ্টি হয়। এ থেকেই পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। লেবাননের পত্রিকা আল দিয়ার বরাত দিয়ে রেডিও তেহরান বলছে, যুবরাজের কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে মিনায় সালমানের সফর বা উপস্থিতি-সংক্রান্ত খবর প্রচার নিষিদ্ধ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
    আবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রিটিশ ডাক্তার বলেন, ‘মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার পথে নির্ধারিত ট্রেনটি অনেক দেরি করে। স্টেশন ছাড়ার পরও সেটি পথে আরো দেরি করে। পরে আমরা জানতে পারি, বাদশাহ হজ পালন করছেন। তাই ট্রেন দেরি হয়েছে। কয়েকটি রাস্তাও বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরে যখন বাদশাহ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তখন একসঙ্গে অনেক মানুষ পাথর ছোড়ার জন্য বের হয়। ফলে তীব্র ভিড়ের সৃষ্টি হয়।’
    একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও দাবি করেছে, হঠাৎ শয়তানের স্তম্ভে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইসহাক সালেহ নামের এক কেনীয় হাজি বলেন, ‘আমি ঘটনার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করব।’
    দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যবসায়ী জায়িদ বায়াত বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ থাকায় সংকীর্ণ পথে তীব্র ভিড়ের সৃষ্টি হয়। পায়ের চাপায় পড়ে গরমে আর শ্বাসকষ্টে লোকজন মারা যায়। চোখের সামনেই অনেককে মরতে দেখেছি।’
    আরেকজন বলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত সৌদি পুলিশ হঠাৎ একটি পথ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পাশের একটি পথ দিয়ে পাথর ছুড়তে যাচ্ছিল লোকজন। এ সময় পাথর ছুড়ে ফিরছিল আরেক দল। দুই দল হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে যায়। তীব্র ভিড়ের কারণে তখন আর সামনে বা পেছনে যুাওয়ার উপায় ছিল না। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। যারা মাঝখানে পড়েছিল তারাই সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। পদদলনের ঘটনার আশপাশে অনেকগুলো তাঁবু ছিল। কিন্তু তাঁবুর লোকজন অন্য হাজিদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি।
    এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, হাজিদের লাইন ঠিক রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি গাড়ি সড়কে রাখা ছিল। হঠাৎ সেটি সরিয়ে নেওয়ায় লাইন ভেঙে যায় এবং হুড়োহুড়ি সৃষ্টি হয়।
    ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি পত্রিকা দাবি করেছে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চলাচলের জন্য সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। তবে সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ট্যুর অপারেটরদের জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ ছিল, পাথর ছুড়তে গিয়ে এর চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছেন তাঁরা। এ কারণে ভিড়ের সৃষ্টি হয়।
    আর মক্কাভিত্তিক ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইরফান আল-আলাউয়ির ভাষ্য মতে, সৌদি পুলিশও ভাষার বিষয়ে যথেষ্ট প্রশিক্ষিত নয়, তাই তারা বিদেশি হাজিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে না। ভিড় নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ দক্ষ নয়।
    তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, যুবরাজের গাড়িবহরের জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে, এ খবর সঠিক নয়। এ ছাড়া যুবরাজ সেদিন মিনায় গিয়েছিলেন অন্য পথে। তাঁর জন্য পথ বন্ধ করা হয়নি।
    সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বলেছেন, হজের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনার যথাযথ তদন্ত হবে, কারো দোষ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সমালোচনাকারীরা বলছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ কখনোই দুর্ঘটনার দায় নিতে চায় না। এবারও তারা দায় নেয়নি। উল্টো তারা বলছে, হাজিরা যথাযথ নিয়ম না মানায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আফ্রিকান হাজিদের একটি দল এ ঘটনার জন্য দায়ী। এমনকি দুর্ঘটনার জন্য তারা বিদেশি হাজিদের মূর্খতাকে দায়ী করে বলেছেন, বিদেশি হাজিরা আরবি কিংবা ইংরেজি বোঝে না। তাই তারা যথাযথ নির্দেশনাও বুঝতে পারে না। এ জন্য দুর্ঘটনা ঘটে।
    এবার ২০ লাখের মতো মুসলমান হজ পালন করছেন। এর আগেও হজ পালন করতে গিয়ে নানা সময়ে পদদলিত হয়ে হাজিরা মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯০ সালে মক্কায় পদদলিত হয়ে ১ হাজার ৪২৬ জন হাজির মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে মিনায় (বড় শয়তান) লক্ষ্য করে কঙ্কর ছুড়ে মারার সময় পদদলিত হয়ে ১৮০ জন হাজির মৃত্যু হয়। ২০০১ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে মারা যান ৩৫ জন। ২০০৬ সালে মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় দুর্ঘটনায় ৩৬০ জনের বেশি হাজির মৃত্যু হয়।
    এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর হজ চলাকালে মক্কায় মসজিদুল হারামে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেন ভেঙে পড়ে ১১১ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ৪০০ জন।সৌদির সিভিল ডিফেন্সের টুইটারে প্রথম এই দুর্ঘটনার খবর জানায়।
    সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ বিন-আবদুল্লাহ আল-শেখ হজের সময় পদদলিত হয়ে সাত শ’র বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ বলে বর্ণনা করেছেন। সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে তিনি বলেন, এদের ভাগ্য এবং নিয়তিতে যা লেখা ছিল, তা ছিল অবশ্যম্ভাবী। তিনি আরও বলেছেন, এ জন্যে সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষী হতে পারে না।
    ইরান এবং আরও কয়েকটি দেশ এই ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে এনে সৌদি কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে।মিনায় পদপিষ্ট হয়ে ৭৬৯ জন হাজির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। ইরানসহ কয়েকটি দেশের অভিযোগ, সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারেনি। এই কাজে তাদের গাফিলতি ছিল। তবে এটি উড়িয়ে দিয়ে দুর্ঘটনার জন্য ইরানের হাজিরা দায়ী বলে মন্তব্য করেছে সৌদি আরব।
    ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিপুলসংখ্যক হাজির হতাহতের ঘটনার জন্য সৌদি আরবের প্রতি ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘দুঃখজনক এ ঘটনার দায়িত্ব সৌদি সরকারের নেওয়া উচিত। আমাদের উচিত হবে না যে অব্যবস্থাপনা ও ভুলের কারণে এ বিপর্যয়, সেটি এড়িয়ে যাওয়া।’
    আয়াতুল্লাহ খামেনির এই বক্তব্যের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি গত শনিবার জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণে এ ঘটনার তদন্ত দাবি করেন। পদদলিত হয়ে এত হাজির হতাহত হওয়ার ঘটনাকে তিনি ‘হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেন। ভাষণে তিনি যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান তাতে এ ইঙ্গিত মেলে, ইরান তার আঞ্চলিক এ প্রতিদ্বন্দ্বীর সমালোচনায় এতটুকু ছাড় দিতে নারাজ।
    আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, এ ইস্যু ভোলার মতো নয়। দুর্ঘটনার শিকার হাজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এটি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। তিনি বলেন, এ ঘটনার জন্য একে-ওকে দায়ী না করে সৌদি আরবের উচিত, এর দায়দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং মুসলিম সম্প্রদায় ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চাওয়া।খামেনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বে অনেক প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। এক হাজারের বেশি (ইরানের দাবি অনুযায়ী) হাজির মৃত্যুর ঘটনা কোনো ছোটখাটো ইস্যু নয়।
    ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল সৈয়দ ইব্রাহিম রাইসি শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, সৌদি রাজপরিবারের ‘অপরাধের’ জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিচার চাইবে ইরান। এদিনই ইরান সে দেশে নিযুক্ত সৌদি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে দুর্ঘটনার পর থেকে তৃতীয়বারের মতো তলব করে। এ সময় হতাহত ও নিখোঁজ হাজিদের উদ্ধার এবং তাঁদের পরিবারগুলোকে তথ্য দিতে আরও সহযোগিতা করতে সৌদি আরবকে চাপ দেওয়া হয়।
    ঘটনার প্রতিবাদে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ মানুষ। তাঁরা সৌদি আরবের রাজপরিবারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং তাঁদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দুর্ঘটনায় নিহত ৭৬৯ জন হাজির মধ্যে ১৪০ জনের বেশি ইরানের নাগরিক।
    বিশ্বের সবচেয় বেশি মুসলমান অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেছেন, হজ ব্যবস্থাপনার অবশ্যই উন্নতি হওয়া উচিত, যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
    সিরিয়া কর্তৃপক্ষও দুর্ঘটনার জন্য সৌদি আরবের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছে। নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারি হজ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি খুঁজে বের করতে সৌদি বাদশাহর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
    নাইজেরিয়ার হজ প্রতিনিধিদলের প্রধানের মতে, মিনার ঘটনার জন্য হাজিদের দায়ী করে সৌদি সরকার ‘ভুল’ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন জানাব, (হজযাত্রীরা) নির্দেশ মানেননি, এই ভুল অভিযোগ যেন তারা না করে।’
    যুক্তরাজ্যের হজ ও ট্রাভেলের পরামর্শক মোহাম্মদ জাফরি বলেছেন, ‘যেকোনো ঘটনার পর বলা হয়, এটা ওপরওয়ালার ইচ্ছা। কিন্তু এটা ওপরওয়ালার ইচ্ছা নয়। এটা মানুষের অদক্ষতা।’ সৌদি আরব যাতে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি উন্নত করে, সে জন্য ব্রিটিশ সরকারকে প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানান তিনি।
    মিনা দুর্ঘটনার পর হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরানের সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছে সৌদি আরব। তা ছাড়া, ঘটনার জন্য ইরানি হাজিরাই দায়ী বলেও অভিযোগ করে দেশটি। ঘটনাটির তদন্ত ও এ ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানানোর পর সৌদি আরব তার এ অবস্থানের কথা ব্যক্ত করল।
    সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের দৃঢ়ভাবে সব অভিযোগ-সমালোচনা নাকচ করে বলেন, ইরান এ মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে রাজনীতি করছে। কিন্তু রাজনীতি করার মতো পরিস্থিতি এখন না। শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে এক বৈঠকের আগে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ইরানি নেতারা আরও দায়িত্বশীল ও চিন্তাশীল হবেন।
    ইরানি হাজিদের দেখভালে নিয়োজিত তাওয়াফা এস্টাবলিশমেন্টের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সৌদি গেজেট-এর খবরে বলা হয়েছে, প্রায় ৩০০ ইরানি হাজির ‘হজ নির্দেশনা’ ভাঙার কারণেই ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে।
    গত বৃহস্পতিবার সকালে এ দুর্ঘটনার পরপরই একজন সৌদি যুবরাজ এর জন্য আফ্রিকার হাজিদের দায়ী করে বিবৃতি দিয়েছিলেন বলেও গণমাধ্যমে খবর বের হয়। তবে এই বিবৃতির কথা অস্বীকার করেছে সৌদি আরব।
    এদিকে একজন সৌদি যুবরাজের গাড়িবহরের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখার কারণেই সেদিন ভিড়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং পদদলনের ঘটনা ঘটে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তাকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। লন্ডনে সৌদী রাষ্ট্রদূত প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নওয়াফ আল সউদ এক বিবৃতিতে এ রকম গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল মানসুর আল-তুর্কি এর আগে সুনির্দিষ্টভাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ সৌদি আরবের উর্ধ্বতন ব্যক্তিরা কখনোই ওই এলাকায় গাড়ি নিয়ে যান না। ইরানপন্থী টেলিভিশন চ্যানেল ‘প্রেস টিভি’ এবং লেবাননের ‘আদিয়ার’ টিভি এই গুজব ছড়াচ্ছে বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়। উল্লেখ্য সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান ইতিমধ্যে এই ঘটনার দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
    মিনার বিয়োগান্ত অধ্যায় নিয়ে সৌদি আরব ও ইরান দৃশ্যত সরাসরি বিরোধে জড়িয়েছে। তবে মনে হচ্ছে, দ্রুত গ্রহণযোগ্য তদন্ত ফল প্রকাশ না করা সম্ভব হলে উভয় দেশের পক্ষে অন্যান্য দেশও তর্কে জড়াতে পারে। এমনকি অবশিষ্ট বিশ্ব দেখবে, মুসলমানরা একে অন্যের বিরুদ্ধে কতটা অসদয় ও অবিনয়ী হতে পারে। ইতিমধ্যে তার সব লক্ষণ স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। এই দোষারোপ তীব্রতা পেলে মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থহানির সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য অনেকে বলবেন, এতে আর নতুনত্ব কী। মুসলিম দেশগুলোর ভ্রাতৃঘাতী কাণ্ডকারখানা তো নতুন কিছু নয়। তবে একটি নতুন মাত্রা আছে। আর সেটা হলো, হাজিদের পদদলিত হয়ে ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ‘রাজনীতি’ করাটা আরও খারাপ নজির স্থাপন করবে। ইতিমধ্যে সৌদি গণমাধ্যমে ‘লাশের রাজনীতি’ (পলিটিকস ওভার দ্য ডেডবডিজ) শব্দটি জায়গা করে নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব বর্তমানে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, আর তাতে পাকিস্তান নিরপেক্ষ থাকলেও বাংলাদেশ সৌদি আরবের পাশে রয়েছে। এ রকম একটি পটভূমিতে সৌদি-ইরান চাপান-উতোর নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে।
    মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের মহাসচিব আবদুল্লাহ আল তারকি বলেছেন, কতিপয় দায়িত্বহীন ইরানি কর্মকর্তার উক্তির লক্ষ্য হলো সৌদি আরব ও তার নেতাদের ক্ষতিসাধন করা। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ‘সৌদি আরবের বিপক্ষে যাঁরা বিবৃতি দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সহানুভূতি নেই।’ তিনি অর্ধেক গ্লাস পূর্ণ দেখতে বলেছেন। তবে একজন তুর্কি কর্মকর্তা বলেছেন, তাঁরা হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেলে আরও ভালো করতে পারতেন। মুসলিম দেশগুলোতে হজযাত্রীদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে আর অগ্রাহ্য করা যাবে না।
    সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষ করে ইরান দ্রুত সৌদি আরবকে এই দুর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করেছে। লক্ষণীয়, উভয় দেশের গণমাধ্যমও নিজ নিজ সরকারের ভাষ্য বড় আকারে তুলে ধরা অব্যাহত রেখেছে। সৌদি গেজেট ও আরব নিউজ জোর দিয়ে লিখেছে যে, ৩০০ ইরানি হাজি নিয়ম ভেঙে চলাচল করতে গিয়েই এই দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছেন।
    গত রোববার আরব নিউজ-এ রশিদ আবু-আলসাম ‘লাশের রাজনীতি’ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর যুক্তি: ‘একটি একমুখী রাস্তায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় দুই বিপরীত দিক থেকে আসা হাজিরা, যাঁদের অনেকেরই কাঁধে ভারী ব্যাগ এবং অনেকেই দ্রুত শয়তানের দিকে পাথর ছুড়তে জামারাত এলাকায় যেতে অত্যুৎসাহী, তাঁরা মুখোমুখি হওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে শত্রুরা বলছেন, হজ ব্যবস্থাপনা আর সৌদি আরবের হাতে নিরাপদ নয়। এই দাবি হাস্যকর, কারণ সৌদি আরব এই খাতে “বিলিয়নস অব রিয়ালস” খরচ করছে।’ ১৯৭৫ থেকে হজ গবেষণাকেন্দ্র সক্রিয় আছে। হজ নিরাপদ করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানও আহরণ করা হয়েছে। স্থানস্বল্পতা বিবেচনায় নিয়েই ২০১২ সালে দেওয়া ৩০ লাখের হজ ভিসা ১০ লাখ কমিয়ে এবার প্রায় ২০ লাখ করা হয়। অবশ্য ১৯৫০ সালে হজ ভিসা ছিল এক লাখেরও কম। অবকাঠামো বেড়েছে, কিন্তু তা কি ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি?
    তবে সৌদি মিডিয়ার অভিযোগ সত্য ধরে নিলেও অনেকের মতে তা যথাযথ নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেই সামনে আনতে পারে। কারণ, কথিত ইরানি ৩০০ হাজির মতো অন্য অনেক দেশের হাজিদের দল এভাবে ‘ভুলক্রমে’ নিয়ম ভঙ্গ করতে পারে। আর তা যদি এত বড় মানব বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা প্রকারান্তরে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
    গত রোববার আরব নিউজ-এর একটি শিরোনাম ছিল ‘সৌদিবিরোধী প্রচারণায় নেমেছে ইরানপন্থী মিডিয়া’। কিন্তু প্রতিবেদনটির লেখক সিরাজ ওহাব শুরু করেছেন এভাবে: মিনায় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ইংল্যান্ডের কতিপয় সংবাদপত্র ভুল কাহিনির ভিত্তিতে কঠোর সমালোচনা করছে। দ্য টেলিগ্রাফ-এর চিফ ফরেন করেসপনডেন্ট কলিন ফ্রিম্যান অভিযোগ করেছেন যে, বাদশাহ সালমানের প্রাসাদের নিকটবর্তী এলাকায় দুটি রাস্তার প্রবেশমুখ ভিআইপি আগমনের কারণে পুলিশ আটকে দিয়েছিল, আর সেটাই এই ভয়ংকর দুর্ঘটনার কারণ। সিরাজ ওহাব এই তথ্য খণ্ডন করে লিখেছেন, ‘আসলে দুর্ঘটনা ঘটেছে যে রাস্তায় সেখান থেকে প্রাসাদ বহু দূরে। যেসব সাংবাদিক ওই এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা ওই সাংবাদিকের অজ্ঞতা আঁচ করে হেসেই খুন। মিসরীয় সাংবাদিক জামিল রাদওয়ান লিখেছেন, দুর্ঘটনাকবলিত ২০৪ নম্বর রাস্তা ও প্রাসাদ দুই মেরুতে। আর কোনো ভিআইপি সফরও ঘটেনি।’ তবে এক বন্ধু মিসরীয় সাংবাদিক গতকাল উইচ্যাটে জানালেন, তাঁর সংবাদপত্র কোনো অবস্থান নেয়নি। দুর্ঘটনার কারণ তারা তদন্ত করে দেখছে। টেলিগ্রাফ-এর ওই খবর প্রসঙ্গে এক সৌদি নাগরিক টুইটারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, শেফিল্ড স্টেডিয়ামে ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে লিভারপুল বনাম নটিংহাম ম্যাচে ১০০ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছিল।
    সৌদি বাদশাহ দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু এখনো তার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। চলতি হজ মৌসুমে এটা দ্বিতীয় দুর্ঘটনা। মিনার দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭৬৯ জন নিহত ও ৯৩৪ জন আহত হওয়ার খবর এসেছে। ৯৮ বাংলাদেশি হাজি নিখোঁজ। গত ১১ সেপ্টেম্বর একটি নির্মাণ–ক্রেন মসজিদের ওপর আছড়ে পড়লে ১১১ জন নিহত ও ৩৯০ জন আহত হন। কর্তৃপক্ষ বলেছে, শক্তিশালী ঝড় থেকে ধেয়ে আসা তীব্র বাতাসের ছোবলে ক্রেনটি বিধ্বস্ত হয়। যদিও তদন্তে একটি কোম্পানিকে এ জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে সে জন্য কারও শাস্তি হয়নি। পদদলিত হয়ে ২০০৪ সালে ২৪৪ জন নিহত হওয়ার পরে ২০০৬ সালেও প্রায় একই স্থানে ৩৬০ জনের বেশি হাজি পদদলিত হয়ে নিহত হন। ১৯৯০ সালের ট্র্যাজেডি ছিল সব থেকে ব্যাপক: পদদলিত হয়ে ১ হাজার ৪২৬ জন নিহত হন। নিকট অতীতেই চারটি ঘটনায় কেবল পদদলিত হয়ে ২ হাজার ৭৯৯ হজযাত্রী নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুর মিছিল আর বাড়তে দেওয়া চলে না।
    গতকাল রোববার বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১১টায় সৌদি গেজেট পত্রিকার ওয়েবসাইটে একেবারে বাঁ দিকে শীর্ষ শিরোনাম ছিল: ‘ইরানি হাজিদের বিধি লঙ্ঘনের কারণেই এই দুর্ঘটনা’। একই গুরুত্ব দিয়ে খবরটি প্রকাশ করেছে খালিজ টাইমস। গত শনিবার এই খবর ছেপেছে লন্ডন থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক আশারক আল-আওসাত। তারা বরাত দিয়েছে একটি ইরানি সূত্রের। ইরানি হাজিদের তাওফা এস্টাবলিশমেন্টের। ওই কর্মকর্তা তার নাম প্রকাশ করেননি।
    গতকাল তেহরান টাইমস-এর শীর্ষ শিরোনাম ছিল: শনিবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে অনুষ্ঠেয় ওআইসির জরুরি বৈঠকে হজ ব্যবস্থাপনা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে ইরান আলোচনায় আগ্রহী। তেহরান টাইমস-এর এই খবরের সূত্র হলো ‘স্টাফ অ্যান্ড এজেন্সিস’। কিন্তু কোনো এজেন্সির নাম নেই। এতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ১৩৬ ইরানিসহ দুই হাজার উল্লেখ করা হয়েছে। তেহরান টাইমস বলেছে, এটা রিপোর্ট করা হয়েছে যে সৌদি যুবরাজকে বহনকারী গাড়িবহর ওই স্থানে পৌঁছায়। সে কারণে হাজিরা তাঁদের গতিপথ বদলাতে বাধ্য হন। আর সেটাই দুর্ঘটনার কারণ। কিন্তু এই খবরের ভিত্তি কী, তা ওই প্রতিবেদনে নেই। এমনকি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তা বলেননি। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনির মন্তব্য কিছুটা সতর্ক। তিনি বলেন, ‘অব্যবস্থাপনা ও অযথাযথ পদক্ষেপের কারণে সংঘটিত এই দুর্ঘটনা উপেক্ষা করা যায় না। সৌদি আরবকে এর দায় স্বীকার করতে হবে।’ ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস এপির সংবাদ ছেপেছে। এতে বলা হয়েছে, দুটি বড় ধরনের মানুষের ঢল বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। ‘দুর্ভাগ্যবশত মুহূর্তের মধ্যে এটা ঘটে’, মন্তব্য করেছেন সৌদি মুখপাত্র জেনারেল তার্কি।
    টেলিগ্রাফ-এর সাংবাদিক কলিন ফ্রিম্যান সোমালিয়ায় অপহৃত হয়ে বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিলেন। তিনি ইরাক যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন। ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি আসলে নিজে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করেননি। তিনি সাদামাটা একটি রিপোর্ট করেছেন। ব্রিটেনভিত্তিক হজ উপদেষ্টা জাফরির বরাতে তিনি ওই রিপোর্ট করেছেন। গত শুক্রবার বিবিসি রেডিওতেও জাফরি ওই দাবি করেন। এমনকি সৌদি দূতাবাস যে রাগতভাবে তাঁর দাবি নাকচ করেছেন, তারও উল্লেখ আছে কলিনের রিপোর্টে। ব্রিটেনের একটি প্রতিষ্ঠান জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সৌদি আরবকে যে যন্ত্র দিয়েছিল, তারা বলেছে, সে যন্ত্র ওই এলাকা কভার করে না।
    ব্যবস্থাপনার দিকটি যে নাজুক, তাতে সন্দেহের অবকাশ কম। এপির একজন সাংবাদিক দুর্ঘটনার ১০ ঘণ্টার বেশি সময় পরেও মরদেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছেন। সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনার জন্য গৌরবান্বিত ছিল। সৌদি বাদশাহর একটি আনুষ্ঠানিক খেতাব হলো, ‘কাস্টডিয়ান অব দ্য টু হলি মস্কস’। কিন্তু এই গৌরব ম্লান হয়ে গেছে। মক্কা ও মদিনায় পাঁচ হাজার সিসিটিভিসহ এক লাখ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিলেন। সুতরাং, বর্তমান যুগে খোলা স্থানের তদন্ত ফল পাওয়া দুঃসাধ্য নয়। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি ও সিসিটিভির ফুটেজ পরিষ্কার করে দিতে পারে, সেখানে কী ঘটেছিল।
    কিন্তু খালিজ টাইমস মিনা ডেটলাইনে এএফপির বরাতে রোববার একটি খবর ছেপেছে, যা আমাদের বিস্মিত ও মর্মাহত করেছে। মসজিদুল হারামের শীর্ষ মুফতি শেখ আবদুল আজিজ আল শেখ তদন্তের আগেই শুক্রবার মিনায় অনুষ্ঠিত এক সভায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স নায়েফকে বলেছেন, দুর্ঘটনাটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তিনি এমনকি এ কথাও বলেন, ‘যা ঘটেছে সে জন্য আপনারা দায়ী নন।’ এরপর তাহলে কি সুষ্ঠু তদন্ত হবে?
    ইরানসহ সব দেশেরই উচিত হবে হজ ব্যবস্থাপনা কী করে উন্নত ও অধিকতর নিরাপদ হতে পারে সেই বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। সৌদি সরকারেরও উচিত হবে এই বিষয়ে বিনা দ্বিধায় পরামর্শ চাওয়া। তবে তাদের উচিত হবে যেকোনো কারণেই হোক পদ্ধতি যে ভেঙে পড়েছে, তা স্বীকার করা। দায়দায়িত্ব আপন কাঁধে তুলে নিলেই তা সত্যিকারের অভিভাবকসুলভ মনোভাবের পরিচয় দেওয়া হবে।
    হজ ও মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার দায়িত্ব সৌদি আরবের পালন করাটা খুব বেশিদিনের নয়। তাই এগুলোর ওপর অন্য দেশ বা জাতির অধিকার দাবি করাটা অকারণ বলা যাবে না। তবে এই দাবি এখনও যথেষ্ট সমর্থন পায়নি।
    মৃত্যুতে মানুষের হাত নেই, মৃত্যু মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে- মুসলমান মাত্রই এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু নিয়তির হাতে নিজেকে সমর্পণ করে বসে থাকতে হবে এ কথাও ধর্মে লেখা নেই। বরং ধর্মে সাবধানতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি সাবধানতা অবলম্বন করত তবে হয়তো এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।
    সৌদি আরবে পদদলিত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন মহান আল­াহ তাআলা যেন তাদের হজ কবুল করেন এবং তাদের জান্নাতে স্থান দেন। আমরা এ ধরনের মৃত্যু আর চাই না। আশা করি সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।
    লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

    বিএনপি চেয়ারপারসন দেশে ফিরেই চমক দেখাতে পারেন

    লন্ডন সফররত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৮ বছর পর পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেছেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুর কারণে তাকে ছাড়াই লন্ডনে পরিবারের অন্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন তিনি। চিকিৎসার জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। তিনি লন্ডনের কিংসটনে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করছেন। সেখানে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এছাড়া সফরকালে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশ নেবেন তিনি। খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশে দ্রুত একটি নির্বাচন দরকার বলে বক্তব্যও দিয়েছেন। পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

    লন্ডন বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দল পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ আন্দােলনের রুপরেখা চূড়ান্ত করতে ইতোমধ্যেই দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন খালেদা জিয়া। অতীতের আন্দােলনের ভুল চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ আন্দোলনে কিভাবে সফলতার মুখ দেখা যায় সেই পরামর্শও নিচ্ছেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতাদের কাছ থেকে। জানা গেছে, দেশে ফিরেই বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেবেন খালেদা জিয়া। এক্ষেত্রে দলের পুনর্গঠনের বিষয়টি আন্দােলনের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসবে। পাশাপাশি তরুণ কয়েকজন নেতাকে শীর্ষপদ দেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, যুগ্ম-মহাসচিবসহ নির্বাহী কমিটির প্রতিটি পর্যায় থেকে নিষ্ক্রিয়দের বাদ দেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন খালেদা জিয়া। এদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে অপক্ষোকৃত রাজপথে পরীক্ষিত তরুণ, যোগ্য ও মেধাবীদের সামনে নিয়ে আসবেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লন্ডন বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, কঠিন সময় অতিক্রম করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি।

    রাজাপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচন সম্পন্ন

    রাজাপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে উপ নির্বাচন শন্তিপূর্ণভাবে
    সম্পন্ন আলহাজ্ব মোঃ আনোয়ার হোসেন মজিবর মৃধা(ফ্রিজ)প্রতীক নিয়ে বিজয়ী
    মিজানপনা, রাজাপুর(ঝালকাঠী)থেকেঃ ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর উপজেলার ৩ নম্বর
    সদর রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের উপ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ্ব
    মোঃ আনোয়ার হোসেন মজিবর মৃধা(ফ্রিজ)প্রতীক নিয়ে ৪,১৫১ চার হাজার একশত
    একান্ন ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোঃ তাজুল
    ইসলাম কাজল শরীফ(টেবিল ফ্যান)প্রতীক নিয়ে ৩,২১৫ তিন হাজার দুইশত পনের ভোট
    পেয়েছেন।সোমবার (২১শে সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত
    বিরতিহীন ভাবে চলে ভোট গ্রহণ।ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় পাঁচ প্রার্থির
    মধ্যে এ উপ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদ প্রার্থী হয়ে ভোটের যুদ্ধে লড়াই করেন
    ৫জন প্রার্থী। প্রার্থীরা হলেন, মোঃ তাজুল ইসলাম কাজল শরীফ(টেবিল ফ্যান),
    মোঃ সিরাজুল ইসলাম দুলাল(অটোরিক্সা),আলহাজ্ব মোঃ আনোয়ার হোসেন মজিবর
    মৃধা(ফ্রিজ),মোঃ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ সুমন(তাল গাছ) ও মোঃ মাসুদ করিম
    খান মিঠু(ঢোল)প্রতীক।এবং মোঃ সিরাজুল ইসলাম দুলাল(অটোরিক্সা)প্রতীক নিয়ে
    পেয়েছেন ২,৩২৭ দুই হাজার তিন শত সাতাইশ । রাজাপুর ইউনিয়নে মোট ভোটার
    সংখ্যা ২০ হাজার ১৪জন । এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ হাজার ৯০৭ জন ও মহিলা
    ভোটার ১০ হাজার ১০৭ জন প্রায়।মোট ভোট কেন্দ্র ৯টি এবং কক্ষ সংখ্যা ৩৬টি।
    গত ৩১ জুলাই রাজাপুর উপজেলা বিএনপি সভাপতি আঃ ওয়াহেদ মৃধার মৃত্যুতে
    ইউনিয়নটির চেয়ারম্যান পদ শূন্য হয়ে পড়ার কারণে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদ
    শূন্য হয়ে যায়। আর এ শূন্য পদেই ২১ শে সেপ্টেম্বর/১৫ইং অনুষ্ঠিত হয় এ উপ
    নির্বাচন। নির্বাচন শান্তিপূর্নভাবে সম্পন্ন করার লক্ষে র্যা ব, বর্ডার
    গার্ড ও পুলিশী পাহারা কড়া নিরাপত্তা ছিল ।

    বার্তা প্রেরকঃ মিজানুর রহমান

    শিশু আয়লান ও বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীগণ

    শিশু আয়লানের মৃত্যু বিশ্ব মানবিকতাকে অনেক বড় প্রশ্নতে বিদ্ধ করেছে। কাগজ, টেলিভিশন এবং সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভার্চ্যুয়াল জগত। ঘুম ভেঙেছে বৃটেনসহ অনেক রাষ্ট্রেরই। আমরাও আয়লানকে নিয়ে আমাদের আবেগ, অভিবাসী প্রশ্নে উৎকন্ঠার চরম প্রকাশ করেছি। আমাদের আবেগ উৎকন্ঠার কথা ছাপা হয়েছে কাগজে, কথা হয়েছে টক শোতে, ঝড় তুলেছি ভার্চ্যুয়াল স্পেসে।

    কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের এই উৎকন্ঠা এবং আবেগ দেখে বিদেশিদের যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ‘যে দেশে মায়ের গর্ভে থাকা সন্তান গুলিবিদ্ধ হয় এবং তার প্রতিক্রিয়া হয় অনেক সীমিত। কাগজে কেউ লিখেন না সে কথা, টকশোতে ভুলে যাওয়া হয় এমন বিষয়, ভার্চ্যুয়াল জগতে যারা বিরোধী মতের তারাই শুধু মিনমিন করে আওয়াজ দেন- এমন একটি দেশের মানুষ পরদেশের একটি বাচ্চার প্রতি এত উচ্চকণ্ঠ। এত আবেগী একটি জাতির এ কেমন বৈপরিত্য!’ কী জবাব দিবে এ জাতিটি?

    অনেকে বলবেন আয়লানের বিষয়টি আলাদা, আয়লান এখন সারা বিশ্বের প্রতিমূর্তি। অস্বীকার করছি না। অভিবাসী প্রশ্নে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে আমাদের অনেক বাংলাদেশি আজ গণকবরে। এক মা খুঁজে ফিরছেন তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেটিকে। আটক হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের ছবি দেখে বলে যাচ্ছেন, ‘ওই তো আমার বাছা।’ তারা কি আমাদের কাছে বিশ্বের প্রতিমূর্তি নয়!

    বাংলায় একটা কৌতুক বেশ প্রচলিত, ‘শাশুড়ি তার মেয়েকে বরের হাতে তুলে দিতে গিয়ে বললেন, আমার মেয়েটিকে সবসময় পাশের বাড়ির বৌয়ের মতো দেখো।’ আমাদের সবসময় পাশের বাড়ির দিকে নজর বেশি থাকে। যাই হোক শিবের গীত বাদ। অভিবাসন তথা বিদেশে নিজের ভাগ্য ফেরানোর উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের অনেকে সাগর পাড়ি দিয়েছেন, অনেকে মারা পড়েছেন, অনেকে ধরা পড়েছেন। আমরা যথারীতি এসব নিয়ে কথা বলেছি, তারপর এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের উদ্যম ফুরিয়েছে- যার যা আছে তা নিয়ে আবার ঘরে ফিরে এসেছি।

    আমাদের এ ভূখণ্ডের মানুষদের অনেক আগে থেকেই বলা হতো, ‘হুজুগে বাঙ্গাল’। হুজুগ পেলে আর কথা নেই- ঝাঁপিয়ে পড়েছি। অনেকে রাগ করবেন জানি। হয় তো বলবেন, ‘তোমার বাবা খেয়েদেয়ে কাজ নেই, নিজের লেজ নিয়ে টানাটানি করছ।’ উত্তরে বলব- লেজটা ছেঁটে দেয়ার সময় এসেছে। লেজুরবৃত্তি করতে করতে আমরা মনুষ্য প্রজাতি থেকে ক্রমেই কিৎসকিন্ধায় বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠছি।

    ফুটনোট: ‘জার্মান বাংলাদেশি অভিবাসীদের জায়গা দেবে না’ এমন কথা জানিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সরকারকে অনুরোধ করেছে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া, মালোশিয়া, ইতালিসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের কী হবে? আর যে বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের ঠাঁই হয়েছে ব্যাংকক, ইন্দোনেশিয়া, মালোশিয়ার গণকবরে তাদের ফিরিয়ে দেবে কে? তাদের ফিরিয়ে আনবে কে?

    কাকন রেজা:সাংবাদিক

    ৯/১১, ১৪ বছরের অনন্ত সন্ত্রাসের মওকা

    টম এঞ্জেলহার্ট ঃ ১৪ বছর পার হয়ে গেল… আপনি কি এখনও বিশ্বাস করেন ৯/১১এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছিলো, তার সবটা ঠিক? আমরা কি এখনো সেই ২০০১ সালের ধারণা নিয়েই বাস করছি? ১৪ বছরের যুদ্ধ, আগ্রাসন, হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার পরিধি বৃদ্ধি, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি উগ্রবাদ… ১৪ বছরের মহাকাশ বিনিয়োগ, বোমা হামলা, সামরিক নীতি, হতাশা ও ধ্বংসযজ্ঞ… ১৪ বছরে মার্কিন সাম্রাজ্যে ভীতির সংস্কৃতি, সীমাহীন আতঙ্ক ও হুমকি, সন্ত্রাসী আক্রমণের আশঙ্কা… ১৪ বছরের মার্কিন গণতন্ত্র যখন ধনকুবেরদের খেলার মাঠ… ১৪ বছরের গোপনয়ীতা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন জনগণকে সবসময় অন্ধকারে রাখা… ১৪ বছরে নাগরিকদের অব্যাহতি, যুদ্ধ-বাণিজ্যের ক্রম-উত্থান, যুদ্ধে তথ্য প্রদানের মাধ্যমে লাভজনক অবস্থা তৈরি এবং পেন্টাগনে অসংখ্য বেসরকারি কন্ট্রাক্টর নিয়োগ… এনএসএ, সিআইএ এবং জাতীয় স্বার্থে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থায় পরিবর্তন… ১৪ বছরে পুলিশের সামরিকীকরণ এবং ড্রোন ও স্টিংরে এর মাধ্যমে ‍যুদ্ধপ্রযুক্তির প্রসার… ১৪ বছর ধরে ‘হোমল্যান্ড’ নামে ‘অমার্কিনী’ শব্দের প্রচলন… ১৪ বছরে বৈশ্বিক নজরদারির প্রসার যখন শিখরে… এই হলো টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে আজ পর্যন্ত পরবর্তী ১৪ বছর…
    মার্কিনী অবকাঠামোর ইতিহাসে এই ১৪ বছরে এক মাইল রেলওয়েও তৈরি হয়নি। তবে এই ১৪ বছরে আফগান যুদ্ধ হয়েছে, ইরাকযুদ্ধ হয়েছে, সিরিয়া যুদ্ধ হয়েছে। তাই ১৪ বছর পরে ধন্যবাদ জানাতে হয় ওসামা বিন লাদেনকে। মনস্তাত্তিকভাবে বলতে হয়, ৯-১১ এর হামলা আসলে এমন এক অবস্থা তৈরি করেছে যেটা মার্কিন নেতারা অনেকদিন ধরেই স্বপ্ন দেখে আসছিলো। ৯/১১ এর ঘটনা যেন আমাদেরকে যেকোনো কিছু করার লাইসেন্স দিয়ে দেয়। যেকোনো কাজে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য ৯/১১ যেন যথেষ্ট। আর এই ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে কাজও করেছে। আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যে ‘তারা (মুসলমানরা/সন্ত্রাসী-জঙ্গীরা) আমাদের স্বাধীনতা পছন্দ করে না।’ আপনারা (যুক্তরাষ্ট্র) আমাদের দেশকে ১৪ বছর ধরেই যেন বোকা বানিয়ে আইন, পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধ শুধু আপনার একাই করেন নি, আমাদেরকেও ব্যবহার করেছেন। আর মুসলিম বিশ্বে অশান্তি তৈরির জন্য ঠিক এটাই আপনাদের প্রয়োজন ছিলো।

    ১৪ বছরের পরে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে ৯/১১ এর ঘটনা কতটা অভাবনীয় ছিলো এবং আমরা এ বিষয় নিয়ে কতটা অন্ধকারে ছিলাম। ৬ আগস্ট ২০০১ সাল জর্জ ডব্লিউ বুশকে লাদেনের মার্কিন হামলার কথা গোয়েন্দা সূত্রে জানানো হলেও তিনি বিশ্বাস করেন নি। এনএসএ, সিআইএ, এফবিআই সবগুলো গোয়েন্দা সংস্থার কাছেই এই হামলার খবর ছিলো। তবুও তারা এটা ভাবতে পারেনি। এমনকী যখন ঘটনাটি ঘটছে তখনও আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমি তখন আমার বেডরুমে অনুশীলন করছিলাম। টিভি খুলে দেখি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত আনা হয়েছে এবং সেখান থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। এবং তখন আমার ১৯৪৫ সালে এম্পায়ার বিল্ডিং ধ্বংসের কথাই মনে হয়েছে।
    সন্ত্রাসীরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস করে ফেলছে? আল-কায়েদা? ব্যাপারটি তখনও বিশ্বাস হচ্ছিলো না। পরে যখন আরো দুটি বিমান নিউইয়র্কে হামলা হলো এবং একটি পেন্টাগনে আঘাত করলো তখন বুঝতে পারছিলাম এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। তখনই আমার মনে হয়েছিলো যে, মার্কিনীদের এই দুর্বলতার প্রতিঘাত হবে অন্যরকম,। এর ভুক্তোভোগী হবে অন্যরা। ১৪ বছর পরে এসে আপনার কি মনে হয় না যে সেই একটি হামলার অজুহাতে (৯/১১এর হামলা) জর্জ বুশ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে বিশ্বটা আসলে তাদের। বিশ্ব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে তাদের কোনো সময়ই লাগেনি। ৬০টি দেশে তারা তাদের এই অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। জেমস বন্ড ছবির মতো ‘খারাপ মানুষদের’ সঙ্গেই যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে মার্কিন সরকার। ৯/১১ এর ঘটনার দিকে ফিরে তাকালে কি একটুও অবাক লাগে না?

    আপনার কি মনে হয় না বুশ প্রশাসন সামরিক কতৃপক্ষের দ্বারা মোহাবিষ্ট ছিলো। বিশ্ব বদলানোর এবং শান্তির জন্য সামরিক বাহিনীর অসীম শক্তি কি একটুও অবাক করে আপনাকে? আপনার কি মনে হয় না, পেন্টাগন হামলার পর প্রতিরক্ষা সচিবের দেয়া নির্দেশে ইরাক আক্রমণের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত? কারণ তিনি তো জানতেনই যে হামলা আল-কায়েদা করেছে। তিনি স্বষ্ট করে বলেছিলেন, ‘জোর পদক্ষেপ নাও, সব ধুয়ে ফেলো সেটার সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক।’ আক্রমণের প্রতিশোধ যে শুধু ওসামা বিন লাদেনের উপর নয়, বরং আফগানিস্তান, ইরাক এবং সম্ভবত ইরানের উপরও পড়ছে এই ব্যাপারগুলো কি একটুও কৌতুহল জাগানিয়া নয়? ১৪ বছর পরে এটা কতটা কল্পনীয় যে তখন যেই দেশটিকে পরম পরাশক্তি মনে করা হতো, সেই দেশটিকে অল্প কিছু জিহাদীদের নিয়ে একটা সংগঠন এরকম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। যেখানে আল-কায়েদার চেয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ১০ থেকে ১৩ গুণের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। এবং বলা হতো তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কোনো যুদ্ধ জয় করতে সম্ভব নয়। কিন্তু এই বিষয়গুলো যদি ১২ সেপ্টেম্বর ২০০১ এ আপনি বলতেন তবে নিশ্চিতভাবে জনগণের মার খেতে হতো আপনাকে। ১৪ বছর পরে কি আপনার মনে হয় না যে মার্কিন সরকার এখনো তাদের ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে মুক্ত করতে পারেনি? যদিও ২০১১ সালে একটি দেশ ছেড়ে চলে আসে তারা এবং ২০১৪ সালে আবারো ফিরে যায়। বারবার এই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও পুনরায় যেন সেখানেই ফিরে যায় তারা।

    ১৪ বছর পরে কি আপনার মনে হয় না যে, ওয়াশিংটনের ৯/১১ এর পরবর্তী নীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেট এর ‘খিলাফত’ তৈরি করতে সাহায্য করেছে? ভঙ্গুর ইরাক ও সিরিয়ায় যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি এখন লিবিয়া, নাইজেরিয়া এবং আফগানিস্তানেও তাদের শাখা খুলেছে। কিন্তু যদি ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এই সম্ভাবনার কথা বলা হতো তবে নিশ্চিতভাবেই পাগল মনে করা হতো আপনাকে। ১৪ বছর পরে আপনার কি অদ্ভূত লাগে না যে যুক্তরাষ্ট্রই এখন হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। আপনার কি অবাক লাগে না যে এসব কিছুই সন্ত্রাস নির্মুলের নামে করা হচ্ছে? আমাদের ড্রোন যেখানেই আঘাত আনুক না কেন আমরা তো আসলে সন্ত্রাস নির্মুল করছি! ১৪ বছর পরে এটা ভাবতে অবাক লাগে না যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের এই যুদ্ধ সবসময় সন্ত্রাসের যুদ্ধই ( war of and for terror) হয়ে দাঁড়ায়? আমাদের পদ্ধতিই যেন ইসলামি উগ্রবাদী নেতাদের হত্যা করা। সেই ২০০১ এর হামলার পর যেটা আসলে আমাদের সামনে নিয়ে আসা হয়েছিলো। এসকল সংগঠনগুলো শক্তি সম্পর্কে কি ওয়াশিংটনের কোনো ধারণাই ছিলো না? ১৪ বছর পরে এটা চিন্তা করা কি সম্ভব নয় যে, ৯/১১ আসলে একটি গণকবর যেখানে মার্কিন জীবনকে আমরা যেরকম জানতাম, চিরকালের জন্য তা ঘুমিয়ে গেছে?

    শরণার্থীদের সেবায় ফিনিশ সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্ণর

    ফিনল্যান্ডের শরণার্থীদের সেবায় এগিয়ে আসলেন ফিনিশ সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্ণর মিঃ এরক্কি লিকানেনফিনল্যান্ডে আগত বিপর্যস্ত শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে নিজের একমাসের পুরো বেতন দশ হাজার ইউরো দান করবেন ফিনিশ রেডক্রসের ত্রাণ তহবিলে  রবিবার মিঃ এরক্কি লিকানেন ফেসবুকের স্টেটাসে এমনটিই ঘোষণা দিয়েছেন। এতে তিনি আরো উল্লেখ করেন, “ফিনল্যান্ডে আগত হাজার হাজার শরণার্থী ও অভিবাসীদের আবাসন সহ অন্যান্য সংকটের তীব্রতা ও তাদের ভোগান্তি আমাকে ব্যথিত করেছে। এটা আমাদের মানবিক দায়িত্ব”। তার এই সিদ্ধান্তে অন্যেরাও অনুপ্রাণিত হবে বলে তিনি আশা রাখেন। তিনি দেশের সকলকে শরণার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসার আহবান জানান।

    এরক্কি লিকানেন ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ফিনিশ রেডক্রসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

    প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক,লেবানন, জর্ডান, মিশর ও ইরাকে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গেছেন। তবে সংঘাতময় ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাজে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এখন ইউরোপের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন হাজার হাজার শরণার্থী।

    এরইমধ্যে গত বুধবার সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার সময় নৌকা ডুবে আয়লান নামে তিন বছরের এক সিরীয় শিশুর মৃতদেহ তুরস্কের ঊপকূলে ভেসে আসে। সৈকতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ওই শিশুর মৃতদেহের ছবি নিয়ে বিশ্বের প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়। এরপর শরণার্থীদের নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের অবস্থানের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংকট নিরসনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে দুই লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে বলেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন।
    জামান সরকার, ফিনল্যান্ড

    নিজের বাড়ির দরজাটি শরণার্থীদের জন্য খুলে দিলেন ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

    জামান সরকার, হেলসিংকি থেকেঃ ফিনিশ প্রধানমন্ত্রী ইউহা সিপিলা তার ব্যবহৃত ঘড়টি উদ্বাস্তুদের খুলে দেওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন। ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর নগর অউলুর নিকটে “কেমপেলে” তে প্রধানমন্ত্রীর এই বাড়িটি। তিনি অবকাশ যাপনকালে মাঝেমাঝে এ বাড়িটি ব্যবহার করে থাকেন। অউলু শহরে উদ্বাস্তুদের খোঁজখবর নিতে এসে স্থানীয় শরণার্থী অভ্যর্থনা কেন্দ্রের অভ্যর্থকদের নিকট শরণার্থীদেরব্যাবহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইউহা সিপিলা এ বাড়িটি হস্তান্তর করেন।

    স্ত্রী মিন্না মারিয়া সিপিলার অভিপ্রায়ে ও পরামর্শেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জানান প্রধানমন্ত্রী। ফিনল্যান্ডে আগত কয়েক হাজার শরণার্থী ও অভিবাসীদের আবাসন সংকটের তীব্রতা ও মানুষের ভোগান্তির সমাধানে তার এই সিদ্ধান্ত ফিনিশদের অনুপ্রাণিত করবে বলে প্রধানমন্ত্রী সিপিলা উল্লেখ করেন। অউলুর শরণার্থী অভ্যর্থনা কেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি দেশটির সকল গীর্জা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকে শরণার্থীদের ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসারও আহবান জানান।