• ?????: মিডিয়া

    মৃত্যুর পরেও বিচারের রায় উল্টে যায় মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে (৫) শফিক রেহমান

    পঞ্চাশের দশকের শুরুতে খুব জাঁকজমক করে ঢাকায় ওয়াইজঘাটে মায়া সিনেমা হলের উদ্বোধন হয়েছিল। তখন সেটাই হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধুনিক এয়ার কন্ডিশন্ড হলো। এখন বাংলাদেশে হলটি মুন নামে পরিচিত।
    উদ্বোধনের পরে প্রথম দিকটায় মায়া-তে ভালো এবং লেটেস্ট হলিউড মুভি দেখান হতো। তাই হলিউডের এপিক মুভি এবং আটটি অস্কার প্রাইজের জন্য মনোনীত কুও ভাডিস (ছঁড় ঠধফরং) যখন ১৯৫২-তে মুক্তি পেল তখন দেরি না করে সেটি দেখতে গিয়েছিলাম।
    শুনেছিলাম এই মুভিতেই দেখান হয়েছে, রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন যে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই দৃশ্যটি। নিরোর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন পিটার ইউসটিনভ।
    আসলে নিরো তখন বাশি নয়—বহু তারবিশিষ্ট লায়ার (খুত্ব) বাদ্যযন্ত্রটি বাজিয়েছিলেন এবং সেটাই দেখান হয়েছিল কুও ভাডিস-এ। আমি কৌতূহলী হয়েছিলাম জানতে, একটি ইংরেজি ভাষার মুভির ল্যাটিন নাম কুও ভাডিস-এর মানে কি?
    আমি জেনেছিলাম।
    ‘কুও ভাডিস’ ল্যাটিন বাক্যটির মানে হচ্ছে, ‘পথিক, তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
    এই বাক্যটির উত্পত্তি বাইবেল থেকে।
    কৃশ্চিয়ান ধর্ম অনুসারী হওয়ার অপরাধে সেইন্ট পিটারকে ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন তদানীন্তন রোমান সম্রাট। প্রাণ বাচানোর জন্য সেইন্ট পিটার রোম থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। রোমের বাইরে পথে, সেইন্ট পিটার দেখেন পুনর্জীবিত যিশুকে। সেইন্ট পিটার তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কুও ভাডিস? তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
    যিশু উত্তর দেন, ‘রোমান ভাডো আইটেরাম কুশিফিগি। আমি আবার কুশবিদ্ধ হতে রোমে ফিরে যাচ্ছি।’
    এই উত্তরে সেইন্ট পিটার তার সাহস ফিরে পান এবং আবার কৃশ্চিয়ান ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তিনি রোমে ফিরে যান এবং ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার দুই পা ওপরে এবং মাথা ও দুই হাত নিচে ঝুলিয়ে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।
    পোল্যান্ডের নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক হেনরিক সিয়েনকিউইজ (ঐবহত্ুশ ঝরবহশরবরিপু)-এর ১৮৯৫-এ লেখা বিখ্যাত উপন্যাস কুও ভাডিস-এর মুভি রূপান্তর দেখে জেনেছিলাম রোমান শাসন আমলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো রোমে কলোসিয়াম (ঈড়ষড়ংংবঁস) বা ঈড়ষরংবঁস)-এ। কংকৃট, পাথর ও ইট দিয়ে ৭০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৮০ খৃষ্টাব্দ জুড়ে নির্মিত এই অ্যামফিথিয়েটারে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার দর্শকের স্থান ছিল। রোমের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কলোসিয়ামে তারা এসে দেখত গস্ন্যাডিয়েটরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কৃত্রিম যুদ্ধ, যুদ্ধের মহড়া, নাটক এবং মৃত্যুদ- কার্যকরের ঘটনা।
    এখানে খোলা আকাশের নিচে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কৃশ্চিয়ান ধর্ম প্রচারকদের এনে রাখা হতো।
    তারপর খাচা থেকে ছেড়ে দেয়া হতো ক্ষুধার্ত সিংহকে। উল্লসিত রোমানরা দেখত কৃশ্চিয়ানদের বাচার নিষ্ফল প্রচেষ্টা এবং তারপর তারা দেখত কিভাবে কৃশ্চিয়ানদের ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে ফেলছে সিংহরা।
    মায়া সিনেমা হলে মানুষের মায়া মমতার দৃশ্য নয়—কুও ভাডিস মুভিতে মানুষের নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার দৃশ্য আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল আমার প্রাক যৌবনে। পরবর্তীকালে আমি রোমে কলোসিয়াম দেখতে গিয়েছিলাম। ভূমিকম্প এবং পাথর চুরির ফলে ভাঙাচোরা এবং পরিত্যক্ত কলোসিয়ামকে এখন ইটালিয়ান সরকার সযত্নে সংরক্ষণ করছে। এটি এখন রোমের বড় টুরিস্ট এট্রাকশন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
    নিয়তির কি বিধান!
    যে রোমে এভাবে কৃশ্চিয়ানদের মৃত্যু হয়েছিল পরবর্তী সময়ে সেই রোমেই ভাটিকান সিটি হয় রোমান ক্যাথলিক কৃশ্চিয়ানদের ধর্মীয় কেন্দ্রস্থল। ভাটিকান সিটিতে থাকেন পোপ। প্রতি বছর গুড ফ্রাইডে-তে পোপ একটি আলোর মিছিল শুরু করেন কলোসিয়াম সংলগ্ন এলাকা থেকে।
    জোন অফ আর্কের নেতৃত্ব
    ধর্মীয় ভিন্নমত দমনের লক্ষ্যে প্রাচীনকাল থেকে প্রায় সব দেশে মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন ছিল। কিন্তু এতে লাভ হয়নি। সারা ইওরোপে কৃশ্চিয়ান ধর্ম প্রসারিত হয়। কিন্তু তারপরেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইওরোপিয়ান কৃশ্চিয়ানরা ধর্মীয় অজুহাতে কৃশ্চিয়ানদেরই বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে থাকে। ফ্রান্সের জোন অফ আর্ক (ঔড়ধহ ড়ভ অত্প, উচ্চারণটি জোয়ান নয়)-এর মৃত্যুবরণ এই ধরনের মৃত্যুদণ্ডের একটি বিখ্যাত দৃষ্টান্ত।
    ঘটনাটি ঘটেছিল ফ্রান্স বনাম ইংল্যান্ডের হানড্রেড ইয়ার্স ওয়ার বা শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের (১৩৩৭-১৪৫৩) সময়ে। ইংল্যান্ডের রাজা ফ্রান্সের সিংহাসন দাবি করায় এই সুদীর্ঘ যুদ্ধ চলেছিল। এক পর্যায়ে ফ্রান্সের বিরাট অংশ ইংল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। এই সময়ে উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের এক চাষির পরিবারে জন্ম হয় জোন-এর। কৈশোর পেরিয়ে বড় হবার সময়ে জোন দাবি করেন তিনি স্বর্গীয় দূত সেইন্ট মার্গারেট ও সেইন্ট ক্যাথরিনের নির্দেশ পেয়েছেন ফ্রান্সের রাজার পড়্গে অস্ত্র ধরতে এবং ইংল্যান্ডের দখল করা ফ্রেঞ্চ ভূখণ্ড উদ্ধার করতে। ফ্রান্সের সপ্তম চার্লস তখনো সিংহাসনে অভিষিক্ত হতে পারেননি। তিনি তার সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন জোনকে সাহায্য করতে। পুরুষের লোহার বর্ম পরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জোন বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে থাকেন।
    জোনের বৃলিয়ান্ট যুদ্ধ কৌশলে ইংরেজরা বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাজিত হতে থাকে। মোড় ঘুরিয়ে দেয় অর্লিয়ন্স শহরকে অবরোধকারী ইংরেজ সেনাদের পরাজয়। জোন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এখানে ইংরেজ সেনারা নাস্তানাবুদ হবে। তিনি এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধের নয় দিনের মাথায় অবরোধকারী ইংরেজ সৈন্যরা পালিয়ে যায়। এর কিছু দিন পরে সপ্তম চার্লসের অভিষেক হয়। জোন তার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন গোটা ফ্রান্সকে মুক্ত করার লড়্গ্যে।
    সাজানো বিচারে মৃত্যুদণ্ড
    তার দুর্ভাগ্য, ২৩ মে ১৪৩০-এর যুদ্ধের সময়ে ট্রেঞ্চে ঘাড়ে ও গলায় তিনি তীরবিদ্ধ হন। ইংল্যান্ডকে সমর্থনকারী এক দল ফ্রেঞ্চ সৈন্যের হাতে জোন বন্দি হন। তারা আহত জোনকে তুলে দেয় ইংরেজ সৈন্যদের হাতে। ইংল্যান্ড স্থির করে তারুণ্য, বিজয় ও বীরত্বের প্রতীক জোনের চরিত্র হনন করতে হবে যেন তিনি আর ফ্রেঞ্চদের প্রেরণাদাত্রী না হতে পারেন। এই লক্ষ্যে ইংরেজরা বানোয়াট ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে তার বিচারের আয়োজন করে। তাই তারা ইংল্যান্ডপন্থী ফ্রেঞ্চ নাগরিক পিয়ের কশো-কে বিচারের দায়িত্ব দেয়। পিয়ের কশো ছিলেন উচ্চপদস্থ বিশপ অফ বোভে, ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতা।
    এই বিচারে জোনকে তার পক্ষে কোনো উকিল নিয়োগের অধিকার দেওয়া হয় না। বরং জোন তার প্রতি অনুগত গার্ডদের মাধ্যমে জানতে পারেন, জেলখানায় তাকে ধর্ষণের চেষ্টা হতে পারে যেন তার মনোবল ভেঙে যায়। ধর্ষণকারীদের ঠেকানোর জন্য জোন জেলখানাতে পুরম্নষের সামরিক পোশাক পরে থাকেন। আদালতে জোন অভিযোগ করেন, তা সত্ত্বেও এক উচ্চ বংশীয় ইংরেজ তার সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করেছিল।
    কিন্তু জোনকে অভিযোগকারী উকিল বলেন, জোন যে সমাজ ও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলেন না, তার এই পোশাক আরেকটি প্রমাণ। যুদ্ধ করতে সুবিধার জন্য জোন তার চুল কেটে ছোট রাখতেন। জোনের এই ছোট চুলও তার অসামাজিক চালচলনের প্রমাণ রূপে গণ্য হয়েছিল।
    ট্রায়ালে জোনের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। নিজের পক্ষে উকিল না থাকায় জোনকেই আত্মপক্ষে বলতে হচ্ছিল। একপর্যায়ে অভিযোগকারী উকিল তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি জানেন আপনি ঈশ্বরের অনুগ্রহভাজন কিনা?’
    এই প্রশ্নটি একটি চাতুর্যপূর্ণ ফাদ ছিল। কৃশ্চিয়ান ধর্মে বলা হয়, কেউই নিশ্চিত হতে পারেন না, তিনি ঈশ্বরের অনুগ্রহভাজন কিনা। সুতরাং জোন যদি বলতেন, হ্যা, তাহলে তাকে ধর্মবিরোধী বলা যেত। অন্যদিকে, জোন যদি বলতেন, না, তাহলে সেটা হতো নিজেকে অপরাধীরূপে স্বীকার করে নেয়া।
    আদালতে জোন উত্তর দেন, ‘যদি আমি ঈশ্বরের অনুগ্রহভাজন না হই, তাহলে ঈশ্বর যেন আমাকে তার অনুগ্রহভাজন করেন। আর, যদি আমি তার অনুগ্রহভাজন হয়ে থাকি, তাহলে, ঈশ্বর যেন আমাকে সেই অবস্থানেই রেখে দেন।’
    ঐতিহাসিকরা লেখেন, জোনের এই তাত্ক্ষণিক উত্তরে, আদালত সত্মম্ভিত হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস বিরোধী হবার অভিযোগে জোনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। জোন চেয়েছিলেন পোপের কাছে আপিল করতে। কিন্তু কোনো আপিলের সুযোগ জোনকে দেয়া হয়নি।
    রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
    রাজধানী প্যারিসের শ’ দেড়েক মাইল উত্তর-পূর্বে ৩০ মে ১৪৩১-এ রুয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি লম্বা থামের সঙ্গে বেধে জোনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার দণ্ড কার্যকর করা হয়। জোন রাজি হয়েছিলেন মৃত্যুর সময়ে মেয়েদের পোশাক পরতে। তার পায়ের নিচে স্তূপীকৃত কয়লা ও লাকড়িতে আগুন ধরানোর সময়ে জোনের অনুরোধে কৃশ্চিয়ান যাজক একটি ক্রস তার সামনে ধরে রেখেছিলেন। তখন জোনের বয়স ছিল মাত্র উনিশ।
    তার মৃত্যুর পরে ইংরেজরা কয়লা ও লাকড়ি নাড়িয়ে জোনের আগুনে পোড়া মরদেহ উপস্থিত দর্শকদের দেখায়। ইংরেজরা চিন্তিত ছিল যে, ফ্রেঞ্চরা বিশ্বাস করতে পারে ঐশ্বরিক শক্তিতে বলিয়ান জোনের মৃত্যু হয়নি এবং তিনি পালিয়ে যেতে পেরেছেন। তাই জোনের মরদেহ আরো দুইবার পুড়িয়ে সেটা ছাইয়ে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর জোনের দেহভস্ম সিন নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
    এভাবেই মিথ্যা ধর্মীয় অভিযোগ এনে ও বিচারব্যবস্থাকে সাজিয়ে, পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিল ইংরেজরা।
    জোনকে পুড়িয়ে মারার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি জেফৃ থেরাজ পরে বলেছিলেন, আমার স্থান হবে নরকে।
    রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার এই ধরনের বানোয়াট অভিযোগ এবং আজ্ঞাবহ বিচারব্যবস্থার দৃষ্টান্ত সামপ্রতিককালে বাংলাদেশেও দেখা গেছে।
    জোনের মৃত্যু ফ্রেঞ্চদের অসীম প্রেরণা দেয়। গোলাবারুদ ব্যবহারে এবং সম্মুখ সমরে জোনের রণকৌশল ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জোনের মৃত্যুর পরে আরো বাইশ বছর যাবত্ শতবর্ষের যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধের শেষে ফ্রান্স শত্রুমুক্ত হয় এবং সপ্তম চার্লস বৈধভাবে রাজত্ব করতে পারেন।
    পুনর্বিচারে নিরপরাধী প্রমাণিত
    যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস পুনর্বিচারের আদেশ দেন। এই পুনর্বিচারের লক্ষ্য ছিল, জোনের বিচার ন্যায়ভাবে করা হয়েছিল কিনা এবং আইন মেনে চলা হয়েছিল কিনা সেটা তদন্ত করতে। ৭ জুলাই ১৪৫৬-তে আপিল আদালত রায় দেয় জোন নির্দোষ ছিলেন। মৃত্যুর ২৫ বছর পরে জোন নিরপরাধী প্রমাণিত হন।
    জীবিত থাকতেই জোন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। একটা অজপাড়াগার গরিব চাষি পরিবার থেকে আসা এক নিরক্ষর টিনএজার মেয়ে কিভাবে এতো রণকৌশল জানলেন, কিভাবে সাংগঠনিক শক্তি আয়ত্ত করলেন এবং কিভাবে গোটা দেশকে সুসংঘবদ্ধ করে বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারলেন, সে বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। জোনের জীবনী নির্ভর বহু মুভি, টিভি সিরিজ ও ভিডিও গেমস হয়েছে। তাকে নিয়ে নাটক ও উপন্যাস রচিত হয়েছে। জোনকে শ্রদ্ধা করা হয় একজন সাহসী দেশপ্রেমিক ও সক্রিয় নারীরূপে। ১৬ মে ১৯২০-এ, অর্থাত্, জোনের মৃত্যুর ৪৮৯ বছর পরে তাকে সেইন্ট-এর মর্যাদা দেয়া হয়। রোমান ক্যাথলিক চার্চের খুব জনপ্রিয় সেইন্টদের অন্যতম সেইন্ট জোন অফ আর্ক।
    অমর প্রেরণা দাত্রী
    ইংরেজ শাসন আমলে স্কুলে জোন অফ আর্কের জীবনী পড়েছিলাম। সুলতানা রাজিয়া এবং ঝাসির রানীর সঙ্গে তার তুলনা করতাম। জোনের প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলাম পুরুষের লোহার বর্ম পরিহিত ছবিতে। ইংরেজদের মাহাত্ম্য এখানে যে, জোনের কাছে তারা পরাজিত হলেও এবং জোনকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরবর্তীকালে তাদের উপনিবেশেও অর্থাত্ ইনডিয়াতেও পাঠ্যবইয়ে জোনের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আগুনে পুড়ে জোনের মৃত্যুর কাহিনী আমাকে কাতর করেছিল। তাই ইওরোপে প্রথম মোটর টুরে আমি গিয়েছিলাম রুয়ে-তে।
    জোনের মৃত্যু যেখানে হয়েছিল এখন রুয়েতে সেখানে আছে স্বাধীন ফ্রেঞ্চদের কোলাহল মুখরিত ফলমূল ও সবজির কাচাবাজার।
    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে দখলদার জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী ফ্রেঞ্চ বাহিনী জোনের প্রতীক ব্যবহার করেছিল। জোন মুক্তিকামী নারী পুরুষের প্রেরণা— কিন্তু জোন অন্যায় বিচার ব্যবস্থারও প্রতীক বটে।
    বাংলাদেশে যারা মৃত্যুদণ্ড প্রচার করেন এবং যারা অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেন তাদের মনে রাখতে হবে প্রায় ছয় শ’ বছর আগেও জোন অফ আর্ককে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সত্যকে চেপে রাখা যায়নি, ন্যায়কে কবর দেয়া যায়নি এবং প্রেরণাকে পুড়িয়ে মারা যায়নি।
    সুতরাং যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, তাদের মোকাবেলা সরকারের করা উচিত যুক্তি, তর্ক ও বুদ্ধি দিয়ে—শক্তি, ষড়যন্ত্র ও কুবুদ্ধি দিয়ে নয়।

    মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে (৩) জুডিশিয়াল মার্ডার ভিকটিম রোজেনবার্গ দম্পতি

    শফিক রেহমান
    ইথেল গৃনগ্লাসের জন্ম হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৫-তে নিউ ইয়র্ক সিটির একটি ইহুদি পরিবারে। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারের মতো তার পরিবারেও গান-বাজনা ও সাহিত্যের চর্চা ছিল। ছোটবেলায় তার আগ্রহ ছিল অভিনেত্রী ও গায়িকা হতে। কিন্তু যৌবনে পা দেয়ার পর তাকে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হলো। একটি শিপিং কম্পানিতে সেক্রেটারির কাজে তিনি যোগ দিলেন। চাকরি করতে গিয়ে শ্রমিক-মালিকের স্বার্থের সংঘাত বিষয়ে ইথেল সচেতন হন। এই সময়ে শ্রমিকের পক্ষে কমিউনিস্টদের আদর্শে তিনি দীক্ষিত হন। ইথেল যোগ দেন ইয়াং কমিউনিস্ট লিগে। আর এখানে ১৯৩৬-এ তার পরিচয় হয় জুলিয়াস রোজেনবার্গ-এর সাথে। জুলিয়াসও ছিলেন ইহুদি। ইথেলের বয়স তখন একুশ। জুলিয়াসের বয়স আঠারো।

    জুলিয়াসের জন্ম হয়েছিল ১২ মে ১৯১৮-তে। তিনি লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন। হাই স্কুলে পড়া শেষ করে তিনি নিউ ইয়র্কের সিটি কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময়ে তিনিও ইয়াং কমিউনিস্ট লিগে যোগ দেন।

    ইথেল ও জুলিয়াসের প্রেম গভীর থেকে গভীরতর হয়। কিন্তু ছাত্রাবস্থায় জুলিয়াস বিয়ে করতে রাজি হন না। ১৯৩৯-এ তিনি সিটি কলেজ থেকে ইলেকটৃকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। সেই বছরেই জুলিয়াস আর ইথেলের বিয়ে হয়।

    এর কিছুদিন পর ১৯৪০-এ জুলিয়াস রোজেনবার্গ ইঞ্জিনিয়ার-ইন্সপেকটর রূপে আমেরিকান আর্মিতে যোগ দেন। তার পোস্টিং হয় নিউ ইয়র্ক সিটির কাছে নিউ জার্সিতে ফোর্ট মনমাউথে অবস্থিত আর্মি সিগনাল কোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরিতে।

    ইতিমধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-এ ইওরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ক্রমেই এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে আফৃকা ও এশিয়াতে।

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয় দুই পর্যায়ে। সভিয়েট সৈন্যরা জার্মানিতে ঢুকে পড়লে এপৃল ১৯৪৫-এ জার্মানির চান্সেলর এডলফ হিটলার বার্লিনে আত্মহত্যা করেন। তারপর ৮ মে ১৯৪৫-এ জার্মানি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে।

    ইওরোপ ও আফৃকাতে যুদ্ধ থেমে গেলেও এশিয়াতে যুদ্ধ চালিয়ে যায় জাপান। ৬ আগস্ট ১৯৪৫-এ আমেরিকান বোমারু প্লেন থেকে জাপানের হিরোশিমা পোর্টে একটি এটম বোমা ফেলা হয়। বোমাটির নাম ছিল লিটল বয় (ছোট ছেলে)। এর ফলে অন্ততপক্ষে ৭৫,০০০ হিরোশিমা অধিবাসীর মৃত্যু হয়। এটাই ছিল যুদ্ধে এটম বোমার প্রথম প্রয়োগ। এর তিন দিন পরে ৯ আগস্ট ১৯৪৫-এ নাগাসাকি পোর্টে আমেরিকান বোমারু প্লেন থেকে দ্বিতীয় এটম বোমা ফেলা হয়। এই বোমাটির নাম ছিল ফ্যাট বয় (মোটা ছেলে)। এর ফলে প্রায় ৩৫,০০০ নাগাসাকি অধিবাসীর মৃত্যু হয়। এই দুই এটম বোমা বিস্ফোরণের পর ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫-এ জাপান আত্মসমর্পণ করে।

    সব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

    সেটাই মনে হয়েছিল তখন।

    কিন্তু, না।

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই শুরু হয়ে যায় কোল্ড ওয়ার (Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ)। এই যুদ্ধের একদিকে ছিল আমেরিকা ও বৃটেনসহ পশ্চিম ইওরোপের অধিকাংশ অকমিউনিস্ট গণতান্ত্রিক দেশগুলো। অন্যদিকে ছিল সভিয়েট ইউনিয়ন এবং তার প্রভাবাধীন পূর্ব ইওরোপের কমিউনিস্ট একনায়কতান্ত্রিক দেশগুলো।

    স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শিক প্রশ্ন ছিল পশ্চিম ইওরোপ এবং আমেরিকায় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা। আমেরিকান সাফল্যে মণ্ডিত পশ্চিমের ক্যাপিটালিজম জনগণের জন্য ভালো? নাকি, সভিয়েট ইউনিয়নের আদর্শের মোড়কে কমিউনিজমই জনগণের জন্য ভালো? গণতন্ত্র ভালো? নাকি একনায়কতন্ত্র ভালো?

    উভয় পক্ষই চাইছিল দক্ষিণ আমেরিকা, আফৃকা ও এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের পক্ষে টানতে। সেই প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার জন্য উভয় পক্ষেরই প্রয়োজন ছিল তাদের শক্তি প্রমাণ করার ও দেখানোর।

    তখন প্রশ্ন ওঠে, জাপানে তো দুটো এটম বোমা ফেলে ইউএসএ (USA) বা আমেরিকা দেখিয়ে দিয়েছে তাদের কাছে এটম বোমা আছে। কিন্তু ইউএসএসআর (USSR) বা সভিয়েট ইউনিয়নের কাছে কি এটম বোমা আছে?

    উত্তরটা ছিল, গোপনে তখন দুই দেশই আণবিক থেকে আরো শক্তিশালী পারমাণবিক (নিউক্লিয়ার) বোমা বানানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুই দেশই চাচ্ছিল অপর পক্ষ যেন জানতে না পারে সপক্ষের অগ্রগতির কথা।

    ম্যাকার্থিজম জ্বরে আক্রান্ত আমেরিকা
    ইতিমধ্যে ১৯৫০ থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ম্যাকার্থিজম (Mecarthyism)-এর জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। ম্যাকার্থিজমের জনক ছিলেন রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থি (Joseph Mecarthy)। আমেরিকায় কমিউনিজমকে রুখে দাড়ানোর জন্য এবং বিদেশে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সভিয়েট ইউনিয়নকে মোকাবিলার জন্য সিনেটর ম্যাকার্থি সোচ্চার হয়েছিলেন।

    ১৯৫০-এ কোরিয়ান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। চায়না ছিল উত্তর কোরিয়ার পক্ষে। আমেরিকা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে। সভিয়েট ইউনিয়ন এবং চায়নার কমিউনিস্ট আগ্রাসনে ইওরোপ এবং এশিয়া যদি পরাজিত হয়, তাহলে এক সময়ে আমেরিকাও কমিউনিস্ট হয়ে যাবে এমন ভীতি ম্যাকার্থি তার দেশে ছড়িয়ে দিতে সফল হন। তার এই তথাকথিত দেশপ্রেমের ক্যামপেইনে (যা আসলে ছিল কমিউনিস্ট বিরোধী ক্যামপেইন) সহায়ক হন এফবিআই, অর্থাৎ ফেডারাল বুরো অফ ইনভেসটিগেশনের ডিরেকটর জে. এডগার হুভার। এদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল আমেরিকান কংগ্রেসে হাউস কমিটি অন আন-আমেরিকান অ্যাকটিভিটিস (House Committee on Un-American Activities)।

    এই কমিটি এবং ম্যাকার্থি ও হুভার, সম্মিলিতভাবে সারা আমেরিকায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টি করেন। ফলে কমিউনিস্ট সন্দেহভাজন হলেই ওই ব্যক্তিকে হয়রানি, চাকরিচ্যুতি, রিমান্ডে নির্যাতন, করা হতো। জেলদণ্ড- এমনকি মৃত্যুদণ্ডও তখন দেয়া হয়েছিল। এসব হয়েছিল দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে অথবা কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই। আমেরিকায় অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের একটি ব্ল্যাক লিস্ট তৈরি হয়েছিল।

    ম্যাকার্থিজমের শিকার হয়ে অভিনেতা ও মুভি ডিরেকটর চার্লস চ্যাপলিনকে স্বদেশ ছাড়তে হয়েছিল।

    কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্টদের প্রতি সহানুভূতি পরায়ণ ব্যক্তি রূপে চিহ্নিত হওয়ায় বহু গুণীজন তখন অপদস্থ, অপমানিত, পদচ্যুত এবং অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ম্যাকার্থিজমের অনুসারীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিলেন সমাজের বহু টপ নারী-পুরুষ। এসব নির্যাতিতদের মধ্যে ছিলেন নোবেল বিজয়ী সায়েন্টিস্ট এলবার্ট আইনস্টাইন ও লাইনাস পলিং, নোবেল বিজয়ী লেখক টমাস মান, ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট, নাট্যকার আর্থার মিলার ও বার্টল্ট ব্রেখট, অভিনেতা ড্যানি কে, অরসন ওয়েলস, গায়ক পল রবসন, পিট সিগার, কবি এলান গিন্সবার্গ, অভিনেত্রী জিন সিবার্গ, লেখক আরউইন শ প্রমুখ। মুভি ইনডাস্টৃতে ৩০০-র বেশি অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক ভুক্তভোগী হয়েছিলেন।

    কে যে কখন ম্যাকার্থিজমের শিকার হয়ে হাউস কমিটি অথবা এফবিআই অথবা আদালতের কাছে জবানবন্দি দিতে আদিষ্ট হবেন সেই ভয়ে আমেরিকার গুণী ও জ্ঞানী সমাজ তখন কাপছিলেন।

    সেই সময়ে ম্যাকার্থিজমের শিকার হন জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গ দম্পতি এবং তারা হন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। উভয়েই তাদের অপরাধ অস্বীকার করেছিলেন। তারা বলেন, তারা কমিউনিস্ট বিরোধী রাজনীতির শিকার হয়েছেন।

    উল্লেখ করা যেতে পারে, যেসব মামলায় ম্যাকার্থিজমের শিকার যারা হয়েছিলেন, সেসব মামলার রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরে উল্টে যায় এবং বলা হয় যেসব আইন দেখিয়ে শাস্তি দেয়া হয়েছিল সেসব ছিল অসাংবিধানিক। ফলে দণ্ডিত ব্যক্তিরা মুক্তি পান।

    কিন্তু সেই সুযোগ রোজেনবার্গ দম্পতির ছিল না। কারণ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গিয়েছিল।

    রোজেনবার্গ দম্পতির বিরুদ্ধে কি অভিযোগ ছিল?

    নিউ জার্সিতে আর্মি সিগনাল কোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরিতে ১৯৪৫ পর্যন্ত জুলিয়াস রোজেনবার্গ ইঞ্জিনিয়ার-ইন্সপেকটর পদে কাজ করেন। এই ল্যাবরেটরিতে ইলেকট্রনিক্স, কমিউনিকেশন্স, রেডার এবং গাইডেড মিসাইল বিষয়ে রিসার্চ হতো। আমেরিকান আর্মি যখন জানতে পারে জুলিয়াস ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য তখনই তারা তাকে ডিসমিস করে।

    জুলিয়াস সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যে আর্মি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে আসেন যে সভিয়েট ইউনিয়নের পক্ষে স্পাইরূপে কাজ করার জন্য রোজেনবার্গকে রিক্রুট করা হয়েছিল ১৯৪২-এ। তখন থেকে তিনি বহু টপ সিক্রেট তথ্য পাচার করতে থাকেন সভিয়েট ইউনিয়নের কাছে। রোজেনবার্গ যে স্পাইং করছেন সে বিষয়ে কিছু তথ্য দেন তারই শ্যালক ডেভিড গৃনগ্লাস।

    ডেভিড গৃনগ্লাস জানান, তার বোন ইথেল জানতেন তার স্বামী জুলিয়াস স্পাইং করছেন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সভিয়েটদের কাছে নিয়মিতভাবে পৌছে দিচ্ছেন। ডেভিড গৃনগ্লাস আরো জানান, তাকে এবং তার স্ত্রী রুথকেও স্পাইংয়ে রিক্রুট করতে চেয়েছিলেন জুলিয়াস। ডেভিড রাজি হননি। ম্যাকার্থিজমের যুগে, ডেভিড তার নিজের ও স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং আমেরিকার প্রতি নিজের আনুগত্য প্রমাণের জন্য নিজের বোন ইথেল ও দুলাভাই জুলিয়াসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

    জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গকে ট্রায়ালে দেওয়া হবে কিনা সেটা বিবেচনা করতে আগস্ট ১৯৫০-এ ফেডারাল গ্র্যান্ড জুরি ডাকা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রধান দুই সাক্ষী ছিলেন ডেভিড ও তার স্ত্রী রুথ গৃনগ্লাস। তারা দৃঢ়ভাবে বলেন, এটম বোমা বানানো সম্পর্কিত তথ্য পাচার করেছিলেন জুলিয়াস।

    ১৭ আগস্ট ১৯৫০ ফেডারাল গ্র্যান্ড জুরি রায় দেন জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গের বিচার হতে হবে। সেই সঙ্গে ডেভিড ও রুথেরও বিচার হতে হবে।

    ৬ মার্চ ১৯৫১-তে রোজেনবার্গদের ট্রায়াল শুরু হয়। ডেভিড বলেন রোজেনবার্গদের ফ্ল্যাটে তার বোনকে একদিন দেখেছিলেন তিনি পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত নোট টাইপ করছেন। ডেভিড আরো বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের একটা ডিজাইন একে জুলিয়াস তাকে দেখিয়েছিলেন। আদালতে ডেভিড তার স্মরণশক্তি থেকে ওই রকম একটা ডিজাইন একে বিচারককে দেখান।

    কিন্তু ডেভিড যেসব তথ্য তার বোন সম্পর্কে দিয়েছিলেন সেসব ছিল ওজনবিহীন। তবু সরকার পক্ষ ইথেলের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যায় কারণ তারা ভেবেছিল এর ফলে জুলিয়াস তার স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য স্বীকারোক্তি করবেন। আর তার ফলে এই স্পাইংয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যদের নাম জানা যাবে। কিন্তু দুজনই যে নিরপরাধ ছিলেন সেই দাবিতে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইথেল ও জুলিয়াস অটল থাকেন।

    রাজনৈতিক কারসাজি
    ট্রায়ালে ২৯ মার্চ ১৯৫১-তে তারা দোষী সাব্যস্ত হন। গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে ৫ এপৃল ১৯৫১-তে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

    আদালতে জুলিয়াস রোজেনবার্গ দাবি করেন এই দ- একটি পলিটিকাল ফ্রেমআপ বা রাজনৈতিক কারসাজি। তিনি বলেন, ‘এই মৃত্যুদণ্ডে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এটাই হওয়ার কথা ছিল। রোজেনবার্গ কেইসকে একটা দৃষ্টান্তরূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন সরকারের ছিল। কারণ কোরিয়ান যুদ্ধ আমেরিকান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আমেরিকায় একটা উন্মত্ততা চরমে ওঠানোর দরকার ছিল। যুদ্ধের বাজেট বাড়ানোর জন্য আমেরিকানদের মধ্যে ভীতি এবং উন্মত্ততা বজায় রাখতেই হবে। বামপন্থীদের মনে এমন একটা ছুরি বসাতে হবে যেন তারা ভয় করে, তাদের মতবাদের জন্য স্মিথ আইনে পাচ বছর জেল অথবা আদালত অবমাননার জন্য এক বছর জেল নয়, মতবাদের জন্য তাদের মরতে হবে।’

    (This death sentence is not surprising. It had to be. There had to be a Rosenberg case, because there had to be an intensification of the hysteria in America to make the Korean War acceptable to the American people. There had to be hysteria and a fear sent through America in order to get increased war budgets. And there had to be a dagger thrust in the heart of the left to tell them that you are no longer gonna get five years for a Smith Act prosecution or one year for contempt of court, but we’re gonna kill ya)!

    নিউ ইয়র্ক রাজ্যে সিং সিং জেলখানায় ১৯ জুন ১৯৫৩-তে ইলেকটৃক চেয়ারে জুলিয়াস ও ইথেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

    দি এটমিক কাফে (১৯৮২) নামে একটি ডকুমুভিতে প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা দেন কিভাবে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তারা বলেন, প্রথম ইলেকটৃক শকে জুলিয়াস রোজেনবার্গের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী মোট তিনটি শক ইথেল রোজেনবার্গকে দেয়া হলেও তার মৃত্যু হয় না। তখন তার হাত-পায়ের বাধনগুলো খোলা হয়। উপস্থিত ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন ইথেলের হার্ট বিট চলছে। এরপর ইথেলের হাত-পা আবার বেধে তাকে আরো দুটো ইলেকটৃক শক দেয়া হয়। তার মাথা থেকে ধোয়া বের হতে থাকে। এবার ইথেলের মৃত্যু হয়।

    তারাই ছিলেন প্রথম আমেরিকান সিভিলিয়ান, যারা স্পাইংয়ের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।

    বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদ
    রোজেনবার্গ দম্পতি গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠতে থাকে। কমিউনিস্ট দেশগুলো থেকে বলা হয়, যেহেতু জুলিয়াস ছিলেন আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সেহেতু তাকে ধরা হয়েছে – গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগটা অজুহাত মাত্র। ইহুদিরা বলেন, রোজেনবার্গ দম্পতিকে গ্রেফতার করাটা আমেরিকান সরকারের ইহুদি বিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাচানোর জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ পর্যন্ত বহু সংগঠন গড়ে ওঠে। এসব সংগঠনের মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত ছিল ন্যাশনাল কমিটি টু সিকিওর জাস্টিস ইন রোজেনবার্গ কেইস (National Committee to Secure Justice in Rosenberg case) অর্থাৎ রোজেনবার্গ মামলায় সুবিচার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় কমিটি।

    তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পর মার্কসবাদী নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ফ্রেঞ্চ দার্শনিক-লেখক জা পল সার্ত্র বলেন, ‘এটা হয়েছে বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড। গোটা আমেরিকান জাতির গায়ে রক্তের দাগ লেগেছে। রোজেনবার্গ দম্পতিকে খুন করে, তোমরা, আমেরিকানরা চেয়েছ বিজ্ঞানের অগ্রগতি রোধ করতে। মানুষকে তাড়িয়ে বেড়িয়ে, জেলজুলুম করে, বলি দিয়ে তোমাদের দেশকে তোমরা এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছ যে, তোমরা নিজেরাই ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছ … নিজেদের এটম বোমার কালো ছায়াতে তোমরাই ভয় পাচ্ছ।’

    জা পল সার্ত্র ছিলেন কমিউনিস্ট। রোজেনবার্গ দম্পতিও কমিউনিস্ট হওয়ায় তার আবেগটা ছিল বেশি। কিন্তু যারা কমিউনিস্ট ছিলেন না, তাদেরও অনেকে প্রতিবাদ জানান। যেমন আমেরিকান সায়েন্টিস্ট এলবার্ট আইনস্টাইন, আর্টিস্ট পাবলো পিকাসো, ফ্রেঞ্চ চিন্তাবিদ জা ককতু, নাট্যকার বারটল্ট ব্রেখট, আর্টিস্ট ফৃডা কাহলো, মুভি ডিরেকটর ফৃটজ ল্যাং প্রমুখ।

    মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পোপ দ্বাদশ পায়াস ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার-কে আবেদন করেছিলেন যেন রোজেনবার্গ দম্পতিকে বাচিয়ে রাখা হয়।

    কিন্তু বিশ্ব জুড়ে কোনো প্রতিবাদ-আবেদনে লাভ হয়নি।

    আমেরিকান সরকার পরিচালিত মাস হিস্টেরিয়া (Mass hysteria) আমেরিকান জাতির উন্মত্ততাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলেছিল। ম্যাকার্থিজমের তা-বে বহু নিরপরাধ আমেরিকান নিঃস্ব হচ্ছিলেন। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর জন্যও ম্যাকার্থিজম প্রয়োগ করা হচ্ছিল। যখন উচু পর্যায়ের আমেরিকান বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, মুভিস্টার, নাট্যকার, লেখক, টিভিস্টার ও পলিটিশিয়ানরা নিজেরাও ম্যাকার্থিজমের কবলে পড়তে থাকেন তখন তারা এই অভিশাপকে বিদায় দিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হন। ম্যাকার্থিজমের জনক রিপাবলিকান সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির জীবন ও অতীত কর্মকা- বিষয়ে ইনভেসটিগেটিভ জার্নালিজম শুরু হয়। কে এই ম্যাকার্থি? তার অতীত কি ছিল? বর্তমানে লোকচোখের আড়ালে তিনি কি করেন? তিনি নিজে কতোটা সৎ?

    অভিযোগ কোনো প্রমাণ নয়
    সেই সময়ে আমেরিকার জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক-সাংবাদিক এডওয়ার্ড মারো কয়েকটি প্রোগ্রামে দেখিয়ে দেন ম্যাকার্থিজম আমেরিকার কি মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ রিপোর্ট অন সিনেটর জোসেফ আর ম্যাকার্থি নামে একটি প্রোগ্রামে তিনি দেখিয়ে দেন, ম্যাকার্থি নিজেই ছিলেন অসৎ ও কা-জ্ঞানহীন এবং পরশ্রীকাতর। বিশেষত খ্যাতনামা আমেরিকানদের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ। এই টিভি প্রোগ্রামের শেষাংশে এড মারো-র উক্তি ছিল :

    ‘আমাদের কখনোই উচিত হবে না, প্রতিবাদকে আনুগত্যহীনতা মনে করে গুলিয়ে ফেলা। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে অভিযোগ কোনো প্রমাণ নয় এবং কারো দণ্ড নির্ভর করে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনগত পদ্ধতির ওপর। পরস্পরের প্রতি ভীত হয়ে সমাজে চলাফেরা আমরা করব না। যুক্তিহীনতার যুগে উদ্বেগ আমাদের কাবু করতে পারবে না। আমরা যদি আমাদের ইতিহাস ও আদর্শ গভীরভাবে বিবেচনা করি তাহলে জানব আমরা কোনো ভীতুর বংশধর নই।’

    (We must not confuse dissent with disloyalty. We must remember always that accusation is not proof and that conviction depends upon evidence and due process of law. We will not walk in fear, one of another. We will not be driven by fear into an age of unreason, if we dig deep in our history and our doctrine, and remember that we are not descended from fearful men.)
    .
    ম্যাকার্থিজম যুগ শেষ করার পেছনে এই প্রোগ্রাম ও এই উক্তির বিশেষ অবদান ছিল।

    জুডিশিয়াল মার্ডার
    পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমেরিকানরা বুঝতে পারে দলমত নির্বিশেষ তারা সবাই বিপন্ন। জনমত ঘুরে যেতে থাকে জোসেফ ম্যাকার্থির বিরুদ্ধে।

    ম্যাকার্থি ছিলেন অতি উচ্চাশাপূর্ণ। সিনেটর থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইচ্ছা তার ছিল। তিনি ভেবেছিলেন কমিউনিজমের জুজু ভয় দেখিয়ে আমেরিকানদের তিনি তার পেছনে দাড় করাতে পারবেন। সেটা না হওয়ায় হতাশ ম্যাকার্থি ক্রমেই মদ খেতে আসক্ত হয়ে পড়েন। তার লিভার নষ্ট হয়ে যায়। ২ মে ১৯৫৭-তে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাকার্থির মৃত্যু হয়।

    আর তার পরপরই আমেরিকা থেকে চিরবিদায় নেয় ম্যাকার্থিজম।

    কিন্তু ম্যাকার্থিজম পেছনে রেখে গেছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং জুডিশিয়াল মার্ডারের ভয়াবহ ও কুৎসিত দৃষ্টান্ত – ইলেকটৃক চেয়ারে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যু।

    রোজেনবার্গ দম্পতির বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়ায় ডেভিড গৃনগ্লাস ও তার স্ত্রী রুথ মুক্তি পেয়েছিলেন। ২০০১-এ একটি ইন্টারভিউতে ডেভিড গৃনগ্লাস বলেন, ‘ওই সময়ে কে যে এটমিক বোমার বিষয়ে নোট টাইপ করেছিলেন সেটা এখন আর আমার মনে পড়ে না। কিছুই মনে পড়ে না। … আমি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে সরকার পক্ষ আমাকে উৎসাহিত করেছিল। আমি সেটা করেছিলাম আমার নিজের প্রাণ এবং আমার স্ত্রীর প্রাণ বাচানোর জন্য। আমার বউ আর ছেলেমেয়েকে বোনের জন্য বলি দিতে চাইনি। এ বিষয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’

    ডেভিড গৃনগ্লাস অনুতপ্ত না হলেও গ্লানি থেকে আমেরিকার বিচার বিভাগ মুক্ত হয়নি। সেখানে এখনো তর্ক চলছে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার (১৯৫৩-১৯৬১)-এর রিপাবলিকান সরকার কেন এবং কিভাবে মদ্যপানে আসক্ত, ঘোর এলকোহলিক রিপাবলিকান সিনেটর ম্যাকার্থি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল? কেন আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ এফবিআই ও বিচার বিভাগ পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছিল? কেন খুবই লঘু পাপে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল?

    এটা ঠিক যে সেই সময়ে সভিয়েট ইউনিয়নের এটমিক শক্তি সঞ্চয়, চায়নার উত্থান এবং কোরিয়ান যুদ্ধ, সঙ্গত কারণে আমেরিকানদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু সেটাকে পুজি করে রাজনৈতিক লাভ আদায়ের চেষ্টা করা রিপাবলিকান সরকার ও রিপাবলিকান দলের উচিত হয়নি। তাদের উচিত হয়নি অতি দুর্বল অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা সাজিয়ে মানুষকে বিপদের মুখে, এমনকি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। সেই সময়ে এই রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং হীন কৌশল সাধারণ আমেরিকানরা বুঝতে পারেনি।

    ভাষা আন্দোলন করায় মৃত্যুদণ্ড?
    ১৯৫২-৫৩তে রোজেনবার্গ দম্পতিকে বাচানোর জন্য বিশ্ব জুড়ে আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত উভয়েরই ইলেকট্রক চেয়ারে মৃত্যুবরণ আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল কয়েকটি কারণে।

    ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র রূপে আইএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার পিতা সাইদুর রহমান ছিলেন ঢাকা কলেজেরই প্রফেসর এবং ঢাকা কলেজের তিনটি হস্টেলের (হাসিন বাগ, নূরপুর ভিলা ও মোস্তফা হাউজ) সুপারিনডেন্ট। ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন ছাত্রদের পক্ষে। এই অভিযোগে তাকে রাতারাতি ট্রান্সফার করা হয় সিলেটের মুরারিচাদ কলেজে। এর ফলে আমার মা রওশন আরা রহমান, বাংলাবাজার গার্লস স্কুলের টিচার, তার চার সন্তানকে নিয়ে মহাবিপদে পড়েন।

    ৩৭ নাম্বার বেচারাম দেউড়িতে সুপারিনটেনডেন্টের কোয়ার্টার্স ছেড়ে হঠাৎ ঢাকায় বাড়ি পাওয়া তখন দুঃসাধ্য ছিল। এই অকূল পাথার থেকে মা-কে উদ্ধার করেন তার এক আত্মীয় সৈয়দ মোহাম্মদ আলী (যিনি মুসলিম লিগের এমপি এবং অভিনেতা সৈয়দ আহসান আলী সিডনির পিতা ছিলেন) তার সহায়তায় বাদামতলিতে একটি বাড়িতে আমাদের স্থান হয়।

    তবে এই বাড়িটি ছিল বাদামতলি পতিতালয়ের পাশে।

    সেই প্রথম বারবনিতাদের চাক্ষুষ দেখলাম এবং বুঝলাম সরকারি রোষের শিকার হলে মানুষ ও পরিবারকে কতো প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হতে পারে।

    জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গ দম্পতির অভিজ্ঞতা ছিল মর্মান্তিক। আমার পিতামাতার দুর্দশা তাদের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম সরকারি প্রশাসন যন্ত্র কাউকে শান্তি দিতে বদ্ধপরিকর হলে সেটা তারা করতে পারে।

    আগস্ট ১৯৪৭-এ পাকিস্তান জন্মের মাত্র সাড়ে চার বছর পরে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন মুসলিম লিগ সরকারের কাছে বিষের মতো মনে হয়েছিল। ঠিক আমেরিকায় রিপাবলিকান সরকারের কাছে যেমন কমিউনিজমকে ক্ষতিকর মনে হয়েছিল। কমিউনিজমের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য সাজানো বিচারে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। আমার মনে প্রশ্ন এসেছিল তাহলে কি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকার অপরাধে আমার পিতার মৃত্যুদণ্ড হবে? আমার পিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্যি ছিল। কিন্তু সেটা কি মৃত্যুদণ্ড ডেকে আমার মতো গুরুতর অপরাধ ছিল?

    ছিল না।

    কিন্তু তখন যদি মুসলিম লিগ সরকার তাই মনে করত তাহলে কি হতো? যদিও ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে তখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল না, তবুও যদি পাকিস্তান সরকার আইন বদলে, নতুন আইনে ভাষা আন্দোলনকারীদের মৃত্যুদণ্ড দিত তাহলে আমরা কি করতে পারতাম?

    উন্মত্ত শাহবাগী
    এই প্রশ্নটি আমার আবার মনে এসেছিল ৬১ বছর পরে আরেক ফেব্রুয়ারিতে। ২০১৩ তে শাহবাগে তথাকথিত গণজাগরণের সময়ে।

    জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে ফাসি দেওয়ার লক্ষ্যে আইন বদলে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার জন্য শাহবাগীদের আন্দোলনে দুই মাস দেশের দুটি প্রধান হসপিটাল, পিজি ও বারডেমে, রোগিদের সেবাÑশুশ্রুষা ব্যাহত হয়েছিল। তাতে হয়তো কিছু পেশেন্টের তরান্বিত মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এই আন্দোলন। তাদেরও (শাহবাগীদের) কি তাহলে পরবর্তী সরকারের সময়ে আইন বদলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা উচিত হবে?

    কোনো আইনের রেট্রোসপেকটিভ এফেক্ট (Retrospetive Effect) দিয়ে ন্যায়ের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বিষয়ে তথাকথিত সুশীল সমাজ তখন নীরব ছিল।

    শাহবাগীদের আন্দোলনের সময়ে আমার বারবার মনে পড়ছিল প্রায় একই ধরনের সরকার পৃষ্ঠপোষিত এবং সাজানো পাবলিক উন্মত্ততা বা মাস হিস্টেরিয়ার পরিণতিতে ছয় দশক আগে হতভাগ্য রোজেনবার্গ দম্পতির ইলেকটৃক চেয়ারে জুডিশিয়াল মার্ডারের কথা। বাংলাদেশে মাস হিস্টেরিয়ার সময়ে সুশীলদের বিবেক হারিয়ে গিয়েছিল বুড়িগংগায়, লজ্জা ডুবে গিয়েছিল শীতলক্ষ্যায়, মানবতাবোধ বিলীন হয়ে গিয়েছিল মেঘনায়।

    অন্যায় ও পাপ
    ছয় দশক আগে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পরে আমি বুঝতে পারি মৃত্যুর ফাইনালিটির বিষয়টি। ব্যক্তির মৃত্যু একটি ফাইনাল ফাইনাল ঘটনা। মৃত্যুর পরে ব্যক্তিকে জীবিত করা যায় না। রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুর পরে আমেরিকায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেচে গেলেও রোজেনবার্গ দম্পতি পুর্নজীবিত হতে পারেন নি। এই চরম দুঃখজনক রূঢ় বাস্তবতা বুঝে আমেরিকায় তখন থেকে মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় এবং সেই আন্দোলন এখনো চলছে। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ১৫টি-তে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়েছে।

    মৃত্যুদণ্ড: দেশে বিদেশে যুগে যুগে শীর্ষক লেখাগুলোর প্রথম পর্বে (টেন রিলিংটন প্লেস) আমি দেখিয়েছি নিরপরাধ টিমথি এভান্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর বৃটেনে মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলনের সুত্রপাতের বিষয়টি। দ্বিতীয় পর্বে (এ সিক্স মার্ডার মিসটেকেন আইডেনটিটি) আমি দেখিয়েছি ভুল পরিচয়ে জেমস হ্যানরাটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর বৃটেনে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ ও বিচার বিভাগের ব্যর্থতা বৃটেনের মানুষকে সচেতন করে তোলে। আজ তৃতীয় পর্বে (জুডিশিয়াল মার্ডার ভিকটিম রোজেনবার্গ দম্পতি) আমি দেখিয়েছি আমেরিকাতে কা-জ্ঞানহীন পলিটিশিয়ান ও তাদের সহযোগী রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগ এবং পক্ষপাতদুষ্ট বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনমত গঠিত হবার বিষয়টি।

    আইনের হাত মুচড়িয়ে, আইনকে বদলিয়ে এবং বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রিত করে রেট্রোসপেকটিভ এফেক্টে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় সেটা যে কতো বড় অন্যায় ও পাপ সেটা আশা করি বাংলাদেশের মানুষ বুঝবে।

    ২১ মে ২০১৪

    (বানান রীতি লেখকের নিজস্ব )

    শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক, টিভি অ্যাঙকর, বিবিসির সাবেক কর্মী (১৯৫৭-১৯৯১), লন্ডনে বহুভাষাভিত্তিক স্পেকট্রাম রেডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১৯৮৭-১৯৯২)। fb.com/ShafikRehmanPresents

    টেন রিলিংটন প্লেস মৃত্যুদণ্ড দেশে বিদেশে যুগে যুগে

    মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত টিমথি এভান্সের ফাসির আদেশ কার্যকর হয় ৯ মার্চ ১৯৫০-এ লন্ডনে পেনটনভিল জেলখানায়। তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন তার স্ত্রী বেরিল ও ১৩ মাসের শিশুকন্যা জেরালডিনকে খুন করার অপরাধে। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল পচিশ।
    এভান্স এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। পরবর্তীকালে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে তিনি ছিলেন নিরপরাধ।
    একজন নিরপরাধ মানুষকে ভুল বিচারের পরিণতিতে ফাসিতে প্রাণ দেওয়ার জের টেনে বৃটেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রথা বন্ধ করার আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সাংবাদিক, লেখক ও টিভি উপস্থাপক লুডোভিক কেনেডি। ১৯৬৫-তে এই আন্দোলন সফল হয়। বৃটেনে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৬-তে একটি তদন্ত কমিটির রায়ে টিমথি এভান্স নিরপরাধ ঘোষিত হন এবং তাকে মরণোত্তর ক্ষমা করা হয়।
    এসব কারণে টিমথি এভান্সের বিচার ও ফাসির বিষয়টি তার মৃত্যুর পরে দেড় যুগ ধরে বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশিত হতে থাকে।
    ১৯৫৭-তে লন্ডনে যাবার আগে ছাত্র অবস্থায় টাইম ম্যাগাজিনের কল্যাণে ঢাকাতেই আমি টিমথি এভান্সের ট্রায়াল, একজিকিউশন এবং মিসক্যারেজ অফ জাস্টিস বিষয়ে জানতাম। কিন্তু আমি জানতাম না ১৯৫৮-তে লন্ডনে ১৮৮ ল্যাংকাস্টার রোডে যে বাড়িতে আমি থাকব তার থেকে মাত্র কয়েক শ’ গজ দূরেই ১০ রিলিংটন প্লেসে থাকতেন টিমথি এভান্স এবং সেই বাড়ির মালিক জন কৃস্টি, যিনি ছিলেন আসল খুনি!
    সেন্ট্রাল লন্ডনে হাইড পার্কের পশ্চিম দিকে বেইজওয়াটার এবং তার পশ্চিমে ল্যাডব্রোক গ্রোভ পাড়ায় অবস্থিত ১৮৮ ল্যাংকাস্টার রোডের তেতলা বাড়িটিতে পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন খ্যাতনামা ছাত্রছাত্রী থাকতেন। তারা সবাই ডক্টরেট অথবা পোস্ট ডক্টরেট পড়াশোনার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন। এই বাড়ির অন্যতম অধিবাসী ছিলেন সস্ত্রীক ড. মতিন চৌধুরী (পরবর্তীকালে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভাইস চান্সেলর), সস্ত্রীক ড. ইন্নাস আলী (ফিজিক্স), সস্ত্রীক মোশাররফ হোসেন (ইতিহাস), জামিনউদ্দিন আকন্দ (কেমিস্টৃ), লতিফা আকন্দ (ইতিহাস) প্রমুখ।

    আর এই বাড়ির কয়েক শ গজ দূরে ১০ রিলিংটন প্লেসের তেতলা বাড়িতে ছিলেন সস্ত্রীক টিমথি এভান্স, যিনি ছিলেন বাড়ি রং করা ও ছোটখাট মেরামত কাজের কর্মী এবং সস্ত্রীক বাড়ির মালিক জন কৃস্টি, যিনি ছিলেন পোস্ট অফিস কার্ক ও সাবেক পুলিশ কনস্টেবল।

    কিন্তু এত কাছে থাকলেও টেন রিলিংটন প্লেস খুজে পাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ ওই ঠিকানাটি বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত হয়ে যাবার পর সেখানে বৃটেন এবং বিভিন্ন দেশের টুরিস্টরা এসে ভিড় জমাতো। ছবি তুলতো।
    টুরিস্টদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় অধিবাসীরা এর বিহিত করার জন্য সিটি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে রিলিংটন প্লেসের নাম বদলে দেওয়া হয়। বিষয়টি আমি জানতে পারি টিভি উপস্থাপক লুডোভিক কেনেডির একটি প্রোগ্রামে। তিনি তখন টিমথি এভান্সের নির্দোষ প্রমাণ করতে বৃটিশ পুলিশ ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছিলেন। বলা বাহুল্য, বৃটেনে এ জন্য তাকে পুলিশ বিভাগের হয়রানি অথবা বিচার বিভাগের রোষের শিকার (যেমন, আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত) হতে হয়নি।

    আমাদের বাড়ির এত কাছেই টেন রিলিংটন প্লেস জানার পরদিনই আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বলা যায়, সেটা ছিল ছোট একটা কানাগলি। রাস্তার দুই পাশে ছিল খানত্রিশেক তেতলা বাড়ি। প্রতিটি দেখতে একই রকম। প্রতিটি বাড়িতে ঢোকার একটিই দরজা। প্রতিটি বাড়ির ছাদে সারি সারি মাটির চিমনি। কয়লার আগুন জ্বালিয়ে বাড়ি গরম রাখার খেসারতে দেড় শ বছরে বাড়িগুলোর রং হয়ে গিয়েছিল কালো। বাড়িগুলোর বয়স হয়তো দেড় শ বছর ছিল। নি¤œবিত্ত মানুষরা সেখানে থাকতো। এখন অবশ্য সেসব বাড়ি আর চেনা যাবে না। রাস্তার নাম পাল্টে যাবার সাথে সাথে বাড়িগুলো আধুনিক করা হয়েছে।
    এর পর থেকে খুব আগ্রহের সাথে আমি টিভিতে লুডোভিক কেনেডির প্রোগ্রামগুলো দেখতাম। পত্রিকায় তার কলামগুলো পড়তাম। ক্রমেই বুঝতে থাকলাম কেন কেনেডি মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলন করছিলেন।
    টিমথি এভান্স কে ছিলেন
    টিমথি এভান্সের জন্ম হয়েছিল ২০ নভেম্বর ১৯২৪-এ দক্ষিণ ওয়েলসে মার্থার টিডফিলে। টিমথির দুর্ভাগ্যের সূচনা হয় তার জন্মের আগেই। টিমথি ভূমিষ্ঠ হবার আগে ১৯২৪-এ তার জন্মদাতা পিতা পরিবার ছেড়ে চলে যান। টিমথির একটা বড় বোন ছিল। নাম আইলিন। টিমথির মা ১৯২৮-এ আবার বিয়ে করেন এবং তখন টিমথির সৎ বোন মরিনের জন্ম হয়। জন্ম থেকেই টিমথির কথা বলতে অসুবিধা হতো এবং এ জন্য স্কুলে তাকে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। আট বছর বয়সে একটা দুর্ঘটনায় টিমথির ডান পা জখম হয়। সেখানে টিউবারকুলার ভেরুচা হয়, যার ফলে তার ডান পা কখনোই সারেনি। চিকিৎসার জন্য টিমথিকে প্রায়ই হসপিটালে যেতে হতো। ফলে তার পড়াশোনা আরো ব্যাহত হয়।
    টিমথি প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরে এসবের পরিণতিতে তিনি নিজের নাম পড়া ও লেখা ছাড়া আর কিছু পড়তে-লিখতে পারতেন না। এটা তাকে হীনম্মন্যতায় ফেলে দিয়েছিল। তিনি যে হাবাগোবা নন, সেটা প্রমাণের জন্য টিমথি প্রায়ই নিজের সম্পর্কে লম্বা লম্বা কথা বানিয়ে বলতেন। অর্থাৎ তিনি চাপা মারতেন। তার এই অভ্যাসটি পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাছে জবাবদিহিতার সময়ে বিপদ হয়ে দাড়ায়।
    ১৯৩৫-এ তার মা দ্বিতীয় স্বামীকে নিয়ে লন্ডনে আসেন। এখানে স্কুলে পড়ার সময়ে টিমথি বাড়িঘর রং করা এবং ছোটখাট মেরামত করার কাজ শেখেন। ১৯৩৭-এ টিমথি মার্থার টিডফিলে ফিরে যান এবং কয়লাখনি শ্রমিক রূপে কাজ শুরু করেন। কিন্তু পায়ের অসুখের জন্য এই কাজ ছেড়ে দিয়ে ১৯৩৯-এ আবার লন্ডনে ফিরে আসেন মায়ের সাথে থাকতে। ১৯৪৬-এ তারা সেইন্ট মার্কস রোডে একটি ফ্যাটে থাকা শুরু করেন। এখান থেকে দুই মিনিটের হাটাপথে ছিল টেন রিলিংটন প্লেস।

    টিমথি এভান্সের বিয়ে ও সন্তান
    ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭-এ বেরিল সুসানা থরলিকে বিয়ে করেন টিমথি এভান্স। তখন তার বয়স ছিল বাইশ। প্রথমে তারা মায়ের সাথে সেইন্ট মার্কস রোডে ছিলেন। ১৯৪৮-এর গোড়ার দিকে বেরিল বুঝতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানকে নিয়ে নিজস্ব ফ্যাটে থাকার জন্য বেরিল ও টিমথি ফ্যাট খুজতে থাকেন। টেন রিলিংটন প্লেসের তেতলায় একটি ফ্যাট তারা পান। এই বাড়ির মালিক ছিলেন পোস্ট অফিসের কার্ক জন কৃস্টি। এক সময়ে তিনি পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন। কৃস্টি আর তার স্ত্রী ইথেল থাকতেন একতলার ফ্যাটে।
    কৃস্টি যে একজন সিরিয়াল খুনি সেটা জানতেন না এভান্স। এভান্স আর বেরিল আসার আগে ওই বাড়িতেই কৃস্টি দুজন নারীকে খুন করেছিলেন। পরবর্তী সাত-আট বছরে কৃস্টি অন্ততপক্ষে আরো তিন নারীকে খুন করেছিলেন। ১০ অক্টোবর ১৯৪৮-এ টিমথি আর বেরিলের কন্যাসন্তান জেরালডিনের জন্ম হয়।
    তবে তার মানে এটা ছিল না যে টিমথি-বেরিলের দাম্পত্যজীবন সুখের ছিল। বেরিল গোছানো নারী ছিলেন না। ঘরসংসার এলোমেলো ছিল। যে টাকা তাকে টিমথি দিতেন সেটা দিয়ে তিনি সংসার ম্যানেজ করতে পারতেন না। আর টিমথি মদে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। বেতনের অনেক টাকাই মদে খরচ হতো। মাঝে মধ্যে তার রাগ চরমে উঠতো তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া এবং হাতাহাতি হতো। এসব জেনে গিয়েছিল প্রতিবেশীরা। ১৯৪৯-এর শেষের দিকে বেরিল আবার অন্তঃসত্ত্বা হন। অভাবের সংসারে বেরিল দ্বিতীয় সন্তান চাননি। তিনি গর্ভপাত করাতে চান। এতে প্রথমে টিমথি রাজি না হলেও পরে রাজি হন।

    এভান্সের প্রথম স্বীকারোক্তি
    কয়েক সপ্তাহ পরে ৩০ নভেম্বর ১৯৪৯-এ টিমথি এভান্স মার্থার টিডফিলে পুলিশের কাছে গিয়ে বলেন, তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। তার প্রথম স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেন, গর্ভপাত ঘটানোর জন্য একটা বোতলে তিনি যে হাতুড়ে ওষুধ এনে দিয়েছিলেন সেটা খাবার পরে বেরিল মারা যান। তারপর তিনি বেরিলের লাশ টেন রিলিংটন প্লেসের বাইরে একটি সুয়ারেজ লাইনে ফেলে দিয়েছেন। শিশুকন্যা জেরালডিনকে অন্যখানে রেখে তিনি মার্থার টিডফিলে স্বীকারোক্তি দিতে এসেছেন।
    পুলিশ সাথে সাথে রিলিংটন প্লেসে গিয়ে বাড়ির সামনের নর্দমা ও সুয়ারেজ লাইন পরীক্ষা করে দেখে। কিন্তু বেরিলের লাশ তারা পায় না। তারা এটাও বোঝে সুয়ারেজের ম্যানহোল ঢাকনা খুলতে তিনজন অফিসারের সম্মিলিত শক্তি লাগে। তাহলে এভান্স কিভাবে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলেছিলেন?

    এভান্সের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তি
    সুতরাং পুলিশ আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তখন এভান্স তার বক্তব্য বদলে ফেলেন। এভান্স বলেন, তার বাড়িওয়ালা কৃস্টি রাজি হয়েছিলেন বেরিলের গর্ভপাত ঘটাতে। এভান্স আর বেরিল উভয়েই কৃস্টির প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন। ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় এভান্স তার কাজ থেকে ফিরে এলে কৃস্টি তাকে জানান গর্ভপাত প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং বেরিল মারা গেছেন। সেই সময়ে বৃটেনে গর্ভপাত বা এবরশন নিষিদ্ধ ছিল। তাই কৃস্টি প্রস্তাব দেন তিনি লাশ সামাল দেওয়ার সব ব্যবস্থা করবেন। তদুপরি তার পরিচিত এক দম্পতি জেরালডিনের দেখাশোনা করবে। কৃস্টি বলেন, এভান্সের উচিত হবে লন্ডন থেকে চলে যাওয়া।
    এভান্স সেটাই করেছিলেন। তিনি মার্থার টিডফিলে গিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে থাকছিলেন। তারপর তিনি লন্ডনে ফিরে আসেন জেরালডিনের খোজ নিতে। কিন্তু তখন কৃস্টি রাজি হন না জেরালডিনকে দেখাতে।

    মা ও মেয়ের লাশ
    টিমথি এভান্সের এই দ্বিতীয় স্বীকারোক্তির পর পুলিশ টেন রিলিংটন প্লেসে গিয়ে প্রাথমিক তল্লাশি চালায়। তারা সন্দেহজনক কিছু খুজে পায় না। যদিও তখন বাড়ির পেছনের ছোট উঠানের বা ব্যাক গার্ডেনের (১৬ ফিট লম্বা ী ১৪ ফিট চওড়া) কাঠের দেয়ালের একটি খুটি ছিল মানুষের উরুর হাড়! এটা পুলিশের নজর এড়িয়ে যায়।
    ২ ডিসেম্বর ১৯৪৯-এ পুলিশ দ্বিতীয় তল্লাশি চালায়। এবার ব্যাক গার্ডেনের ওয়াশহাউসে (কাপড় ধোওয়ার রুম) টেবিল কথে জড়ানো বেরিলের লাশ পায়। ওই ওয়াশহাউসে ঢোকার চাবি থাকতো মিসেস কৃস্টির কাছে। আরো ভয়ঙ্কর আবিষ্কার ছিল বেরিলের লাশের পাশেই ছিল শিশু জেরালডিনের লাশ। টিমথি এভান্স এই আবিষ্কারের আগে দেয়া দুই জবানবন্দির কোনোটিতেই বলেননি তিনি তার মেয়েকে খুন করেছিলেন।
    বেরিল ও জেরালডিন, উভয়কে শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছিল।

    পুলিশের অসম্পূর্ণ তল্লাশি
    আশ্চর্যের বিষয় এই যে এবারও ব্যাক গার্ডেনে মানুষের হাড়ের খুটি পুলিশের নজর এড়িয়ে যায়। এমনকি কৃস্টি এর আগে যে আরো দুই নারীকে হত্যা করেছিলেন তাদেরও কোনো আলামত পুলিশ পায়নি। অথচ ওই ব্যাক গার্ডেনেই স্বল্পগভীর কবরে তাদের লাশ ছিল। ওই ওয়াশহাউস থেকে মাত্র কয়েক ফিট দূরে।
    কৃস্টি একটি কুকুর পালতেন। পুলিশ চলে যাবার পরপরই ওই কুকুরটি কবর খুড়ে একটি লাশ তুলে আনে। তখন কৃস্টি নিহত মিস ইডির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কাছেই যুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফেলে আসেন। অনেকেই ধারণা কুকুরটি বুঝতে পেরেছিল তার মনিব বিপদে পড়বে। তাই আগে কখনো কবর না খুড়লেও সেদিন কুকুরটি মনিবকে সতর্ক করার জন্য কাজটি করেছিল।
    একদিন পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খেলার সময়ে মিস ইডির খুলি পেয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। তারা পুলিশে খবর দেয়।

    এভান্সের তৃতীয় স্বীকারোক্তি
    ইতিমধ্যে পুলিশ বেরিল ও জেরালডিনের লাশে যে কাপড় ছিল তার অংশবিশেষ এভান্সকে দেখিয়ে জানায় যে জেরালডিনও খুন হয়েছে। এই প্রথম এভান্স জানতে পারেন জেরালডিন বেচে নেই।
    পুলিশ পরবর্তীকালে বলে, এই সময়ে তারা এভান্সকে প্রশ্ন করেছিল জেরালডিনের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি জানতেন কিনা। পুলিশের মতে, এভান্স বলেছিলেন, হ্যা। হ্যা।
    তারপর এভান্স নাকি তৃতীয় স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন টাকা পয়সার টানাটানি নিয়ে ঝগড়ার এক পর্যায়ে তিনি বেরিলকে গলা টিপে খুন করেন। এর দুই দিন পরে জেরালডিনকেও তিনি শ্বাস রোধ করে খুন করেন।
    টিমথি এভান্সের দোষ প্রমাণের জন্য পুলিশ এই তথাকথিত স্বীকারোক্তি এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে এভান্সের পরস্পরবিরোধী বিবৃতিগুলো আদালতে পেশ করে।
    কিন্তু লুডোভিক কেনেডি প্রমাণ করে দেন যে, এমন স্বীকারোক্তি ও বিবৃতি ছিল অতিরঞ্জিত এবং তদন্তকারী অফিসাররাই এসব লিখে দিয়েছিলেন। লুডোভিক কেনেডি আরো প্রমাণ করে দেন যে এভান্সের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা খুবই দুর্বল থাকা সত্ত্বেও এসব ‘স্বীকারোক্তি’ আদায়ের জন্য খুব ভোরে অথবা গভীর রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। পরে আদালতে এভান্স জানান তাকে নির্যাতনের হুমকি দিয়েছিল পুলিশ। লুডোভিক কেনেডি বলেন, মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পুলিশ এটা করেছিল। তাছাড়া পুলিশের তল্লাশি কাজে অনেক গাফিলতি ও শিথিলতা ছিল। আর সেজন্যই টেন রিলিংটন প্লেসে তারা প্রথমে মানুষের হাড় এবং লাশগুলো খুজে পায়নি।

    বাংলাদেশে সতর্কতার প্রয়োজন
    প্রায় ৬৪ বছর আগে এসব ঘটেছিল ইংল্যান্ডে। এখন ৬৪ বছর পরে বাংলাদেশে থানা, ডিবি অফিস, র‌্যাবের হাজতে বা হেফাজতে নির্যাতনের বিবরণ শোনা যায় ভিকটিমদের কাছে। এ রকম অবস্থায় ভিকটিমদের দেওয়া স্বীকারোক্তি যে গ্রহণযোগ্য নয় সেটা লুডোভিক কেনেডি প্রমাণ করে গিয়েছেন। আশা করা যায় বাংলাদেশের বর্তমান বিচার বিভাগ ন্যূনতম ন্যায়বিচারের স্বার্থে তথাকথিত আসামিদের স্বীকারোক্তিগুলো অতি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
    এভান্সের ট্রায়াল
    ১১ জানুয়ারি ১৯৫০-এ কন্যাকে খুনের দায়ে এভান্সের বিচার শুরু হয়। সেই সময়ে প্রচলিত আইন ব্যবস্থায়, প্রসিকিউশন শুধু একটি খুনের দায়ে বিচারের ব্যবস্থা করে। স্ত্রী বেরিলকে হত্যার দায়ে এভান্সকে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ করা হয় Ñ কিন্তু এই অভিযোগ ফাইলে রাখা হয়। তবে বেরিলকে খুনের আলামতগুলো জেরালডিনকে খুনের বিচারে হাজির করা হয়।
    ট্রায়ালে এভান্সের উকিল ছিলেন ম্যালকম মরিস। তিনি জানান, এভান্স তার সঙ্গে আলোচনায় জোড়া খুনের জন্য কৃস্টিকেই সবসময়ে দায়ী করেছেন। ট্রায়ালে এভান্সের এটাই ছিল ডিফেন্স এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিজেকে নির্দোষ দাবি করে যান।
    পরবর্তী ঘটনাগুলো প্রমাণ করে টিমথি এভান্স সত্যিই নির্দোষ ছিলেন।
    এই ট্রায়ালে কৃস্টি ও তার স্ত্রী ইথেল প্রসিকিউশনের পক্ষে দুজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। কৃস্টি বলেন, তিনি কখনোই বেরিলের গর্ভপাত করানো প্রস্তাব দেননি। বরং বেরিল-এভান্সের দৈনন্দিন ঝগড়ার বিস্তারিত বিবরণ দেন কৃস্টি।
    এভান্সের ডিফেন্সে ম্যালকম মরিস বলেন, কৃস্টিই খুনি। অতীতে তার কৃমিনাল রেকর্ড ছিল। বহুবার চুরির দায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন এবং একবার এক দেহপসারিনীকে কৃকেট ব্যাট দিয়ে গুরুতর আহত করেছিলেন।
    কিন্তু জুরি মনে করেন কৃস্টি সংশোধিত অর্থাৎ ভালো মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া দুই নারীকে খুন করার কোনো মোটিভ কৃস্টির ছিল না। তার সম্ভাব্য মোটিভ প্রমাণ করতে ডিফেন্স ব্যর্থ হয়। অন্য দিকে যদিও এভান্সের কোনো কৃমিনাল রেকর্ড ছিল না তবুও এভান্সের ‘স্বীকারোক্তি’ থেকে বেরিলকে হত্যার জন্য এভান্সের মোটিভ প্রতিষ্ঠা করতে প্রসিকিউশন সমর্থ হয়।
    যদি কৃস্টির ব্যাক গার্ডেনে পুলিশ উপযুক্ত তল্লাশি চালিয়ে অপর দুই নিহত নারীর দেহাবশেষ পেত তাহলে এই ট্রায়ালের দরকার হতো না এবং তাহলে আরো নারী পরবর্তীতে খুন হতো না। পুলিশের ব্যর্থতা, তদন্তকাজে অযোগ্যতা ও অবহেলা, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় এবং ভ্রান্তপথে বিচার ব্যবস্থা চালিত হবার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত ছিল টিমথি এভান্স ট্রায়াল।
    এখন বাংলাদেশেও এমনটি হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।

    জেরা-পাল্টা জেরার পরে চূড়ান্তপর্যায়ে যে প্রশ্নটি বিবেচিত হয়, সেটা হলো, কে সত্যি বলছেন? এভান্স নাকি কৃস্টি? এই ট্রায়াল মাত্র তিন দিন স্থায়ী হয় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ এড়িয়ে যাওয়া হয়। সেসব জুরিকে দেখানো হয়নি। বিচারক প্রথম থেকেই এভান্সের বিরুদ্ধে মত পোষণ করেছিলেন। তার রায়েও সেটা প্রমাণিত হয়। দুই দিন পরে এভান্স দোষী সাব্যস্ত হন। মাত্র ৪০ মিনিটে জুরি তাদের সিদ্ধান্তে আসেন।
    এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০-এ লর্ড চিফ জাস্টিস লর্ড গডার্ড, মি. জাস্টিস সেলার্স এবং মি. জাস্টিস হামফ্রেস নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
    ৯ মার্চ ১৯৫০-এ টিমথি এভান্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন জল্লাদ এলবার্ট পিয়েরপয়েন্ট।
    চরম ভুল
    ওই সময়ে বৃটেনবাসী স্বস্তি পেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, যাক, একটা পাষণ্ড খুনির ফাসি হয়েছে।
    আসলে এভান্সের প্রথম স্বীকারোক্তির পর থেকে দেশবাসীর একাংশ ঝুকে পড়েছিল এভান্সের ফাসি হওয়ার দিকে। এদের এই মনোভাব সৃষ্টির সহায়ক হয়েছিল চাঞ্চল্যকর খবরপিপাসু মিডিয়া। এসবের ফলে ট্রায়ালের আগেই এভান্সের ফাসির পক্ষে জুরি, বিচারক এবং উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা সবাই মানসিকভাবে রেডি হয়ে গিয়েছিলেন এভান্সকে ফাসি দিতে।
    কিন্তু তারা চরম ভুল করেছিলেন।
    মাত্র তিন বছর পরেই সেটা জানা যায়।
    অন্য খুনের অপরোধে কৃস্টি ধরা পড়েন তিন বছর পরে।
    কৃস্টির তার ফাসির আগে পুলিশ এবং সাইকিয়াটৃস্টদের কাছে বার বার বলেন, তিনিই ছিলেন বেরিলের হত্যাকারী। যদি কৃস্টির এই স্বীকারোক্তি সত্যি হয় তাহলে এভান্সের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিটাই ছিল সত্যি যখন তিনি বলেছিলেন, বেরিলের গর্ভপাতের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কৃস্টি এবং তারই হাতে ৮ নভেম্বর ১৯৪৯-এ বেরিল মারা গিয়েছিলেন।
    লুডোভিক কেনেডি ওই হত্যাকাণ্ডের একটা রিকন্সট্রাকশনে বলেন, বেরিল তার ফ্যাটে বাড়িওয়ালা কৃস্টিকে ঢুকতে দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন কৃস্টি গর্ভপাত ঘটাবেন। কিন্তু কৃস্টি চেয়েছিলেন যৌনসঙ্গম করতে। এতে বাধা পেয়ে কৃস্টি উন্মত্ত হয়ে বেরিলকে আক্রমণ করেন এবং একপর্যায়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করেন। কৃস্টি তার জবানবন্দিতে বলেন, সম্ভবত খুনের পর তিনি যৌনসঙ্গম করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু মনে করতে পারেননি। কৃস্টি এটাও বলেন যে জীবিত অবস্থায় সঙ্গমকালেই তিনি খুন করেছিলেন বেরিলকে। কিন্তু বেরিলের অটোপসিতে ওই ধরনের কোনো যৌন সঙ্গম প্রমাণিত হয়নি।
    সেই সময়ে দোতলার ফ্যাটটি খালি ছিল। তেতলায় বেরিলকে এবং তারপরে জেরালডিনকে খুনের পরে কৃস্টি তাদের লাশ এনে দোতলার ফ্যাটে রাখেন। চার দিন পরে তাদের লাশ তিনি ওয়াশহাউসে এনে রাখেন।

    নতুন লাশ আবিষ্কার
    টিমথি এভান্সের ফাসি হয়ে যাবার তিন বছর পরে টেন রিলিংটন প্লেসে আগত নতুন ভাড়াটে তার কিচেন প্যান্টৃ-র (যেখানে রান্নার হাড়ি পাতিল বাসন ইত্যাদি রাখা হয়) দেয়ালে তিন নারীর লাশ পান। এরা ছিলেন ক্যাথলিন ম্যালোমি, রিটা নেলসন এবং হেকটোরিনা ম্যাকলেনান। এদের খুন করে কিচেন প্যান্টৃর দেয়ালের মধ্যে কৃস্টি লাশ গেথে ফেলেছিলেন। তারপর ওই দেয়াল নতুন ওয়ালপেপার দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন।
    এদের লাশ আবিষ্কার হবার পর এবার পুলিশ টেন রিলিংটন প্লেসের প্রতিটি অংশ তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করে। একজন অস্টৃয়ান নার্স, রুশ ফুরস্ট এবং একজন শ্রমিক, মুরিয়েল এডি-র লাশ পাওয়া যায় ব্যাক গার্ডেন বিল্ডিংয়ে। সেখানে তাদের কবর দেয়া হয়েছিল। এই দুই নারীর একজনের উরুর হাড় কৃস্টি ব্যবহার করেছিলেন তার বাড়ির দেয়ালের খুঁটি রূপে যেটা এর আগে সবসময় পুলিশের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় নারী ছিলেন কৃস্টিরই স্ত্রী ইথেল। তার লাশ পাওয়া যায় তাদেরই ফ্যাটে কাঠের মেঝের নিচে।
    কৃস্টি পালিয়ে যান।

    কৃস্টির স্বীকারোক্তি
    ৩১ মার্চ ১৯৫৩-তে কৃস্টি ধরা পড়েন দক্ষিণ লন্ডনে পাটনি বৃজের কাচে টেমস নদীর তীরে। বেরিলকে খুন করার বিষয়টি স্বীকার করলেও তিনি কখনোই শিশু জেরালডিনকে খুন করার বিষয়টি স্বীকার করেননি।
    সিরিয়াল খুনি কৃস্টির বিচার হয় তার স্ত্রী ইথেলকে হত্যার অভিযোগে।
    তিনি দোষী প্রমাণিত হন।
    তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৫ জুলাই ১৯৫৩। জল্লাদ ছিলেন সেই একই ব্যক্তি এলবার্ট পিয়েরপয়েন্ট যিনি তিন বছর আগে এভান্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন।
    কৃস্টি তার মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেননি।
    ফাসির রশি গলায় পরানোর পর কৃস্টি তার জল্লাদকে বলেছিলেন, তার নাক চুলকাচ্ছে।
    পিয়েরপন্ট উত্তর দিয়েছিলেন, এই অস্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না।

    বিচার বিভাগের ব্যর্থতা
    কৃস্টির অপরাধে বিচার বিভাগের টনক নড়ে। এভান্স কি সত্যিই তার স্ত্রী বেরিল ও শিশুকন্যা জেরালডিনকে খুন করেছিলেন?
    তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ম্যাক্সওয়েল-ফাইফ একটি তদন্ত কমিশনকে আদেশ দেন কোনো মিসক্যারেজ অফ জাস্টিস হয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে।
    হেল্ডারসন কমিশন নামে পরিচিত এই কমিশন এক সপ্তাহব্যাপী তদন্তের পর রায় দেন দুটি হত্যার জন্য টিমথি এভান্সই দায়ী ছিলেন। তারা আরো বলেন বেরিলকে যে কৃস্টি খুন করেছিলেন এই মর্মে কৃস্টির স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ কমিশন মনে করে, কৃস্টি তার ডিফেন্সে তার মস্তিষ্ক বিকৃত ঘটেছিল সেটা প্রমাণের লক্ষ্যে বেরিল হত্যার জন্য নিজেকে দায়ী করেন।
    কিন্তু হেন্ডারসন কমিশনের এই রায় মিডিয়া এবং পাবলিক, কেউই মেনে নিতে পারে না। তার প্রশ্ন ওঠায় যদি কৃস্টির স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য না হয় Ñ তাহলে এভান্সের স্বীকারোক্তিই বা কেন গ্রহণযোগ্য হবে? দেশ জুড়ে বিশেষত পার্লামেন্টে গভীর বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। মাইকেল ফুট, সিডনি সিলভারম্যান, রেজিনাল্ড প্যাজেট, জেফৃ বিং প্রমুখ এমপি বহু প্রশ্ন পার্লামেন্টে ওঠান। এর ফলে টিমথি এভান্স নিরাপরাধ ঘোষিত হন এবং এই ঘোষণায় বলা হয় বেরি এবং জেরালডিন, কারো মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী ছিলেন না।
    বস্তুত এভান্স এবং কৃস্টি, কারো ট্রায়ালেই বেরি হত্যা কখনোই প্রাইমারি চার্জ ছিল না। এভান্সকে চার্জ করা হয়েছিল তার কন্যা জেরালডিনকে খুনের দায়ে। আর কৃস্টিকে চার্জ করা হয়েছিল তার স্ত্রী ইথেলকে হত্যার দায়ে।

    বিবেকবানদের আন্দোলন
    টিমথি এভান্স যে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন সেটা এত পুলিশি এবং বিচার বিভাগীয় প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রমাণিত হলো কিভাবে?
    ১৯৫৫-তে ডেভিড এসটর (সম্পাদক, দি অবজার্ভার), ইয়েন গিলমুর (সম্পাদক, দি স্পেকটেটর), জন গৃগ (সম্পাদক, দি ন্যাশনাল অ্যান্ড ইংলিশ রিভিউ) এবং স্যার লিটন এন্ড্রুস (সম্পাদক, দি ইয়র্কশায়ার পোস্ট) সম্মিলিতভাবে একটি নতুন তদন্তের দাবি জানাতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। হেল্ডারসন কমিশনে রায় বিষয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই বছরে আইনজীবী মাইকেল ইডোস, এভান্স ও কৃস্টির দুটি ট্রায়াল গভীরভাবে বিবেচনার পর দি ম্যান অন ইয়োর কনশেন্স (The man on your conseience, আপনার বিবেকের ওপর দাড়ানো মানুষটি) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি যুক্তি দেন যে এভান্স খুনি ছিলেন না। এরপর টিভি সাংবাদিক লুডোভিক কেনেডি প্রকাশ করেন তার বই, টেন রিলিংটন প্লেস। এই বইয়ে তিনি পুলিশি তদন্ত প্রক্রিয়ার এবং ১৯৫০-এ এভান্সের বিচারে যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ পুলিশ হাজির করেছিল সেসবের তীব্র সমালোচনা করেন। লুডোভিক কেনেডি প্রমাণ করেন যে এসবই ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
    এর ফলে ১৯৬১-তে আরেকটি পার্লামেন্টারি বিতর্ক হয়। কিন্তু দ্বিতীয় তদন্ত কমিশন তখনো গঠিত হয় না। লুডোভিক কেনেডি তার আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন।
    ১৯৫৫-তে লিবারাল পার্টির পলিটিশিয়ান হার্বার্ট উলফ যোগাযোগ করেন দি নর্দান ইকো পত্রিকার সম্পাদক হ্যারল্ড এভান্সকে। নাম এভান্স হলেও তিনি টিমথি এভান্সের আত্মীয় ছিলেন না। এরা দুইজন এবং লুডোভিক কেনেডি মিলে ‘টিমথি এভান্স কমিটি’ গঠন করেন। এদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার ফ্র্যাংক সসকিস একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ দেন যার চেয়ারপারসন হন হাই কোর্ট বিচারপতি স্যার ড্যানিয়েল ব্রাবিন (১৯৬৫-৬৬)।
    ব্রাবিন রায় দেন, খুব সম্ভবত এভান্স তার স্ত্রীকে হত্যা করেছিলেন, কিন্তু কন্যাকে নয়। এটা ছিল প্রসিকিউশন যুক্তির উল্টো। প্রসিকিউশন বলেছিল, এভান্স একই সময়ে একই ঘটনায় ওই দুজনকে হত্যা করেছিলেন।

    পুলিশের সাজানো মামলা
    ব্রাবিনের এই রায় সত্ত্বেও তার তদন্তে পুলিশ বিভাগে দুর্নীতি ও অনৈতিকতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। পুলিশ কিভাবে মামলা সাজায় সেটা পাবলিক জানতে পারে। ব্রাবিন বলেন, পুলিশ ইম্পরটেন্ট আলামতগুলো নষ্ট করে ফেলেছিল। যে নেকটাই দিয়ে জেরালডিনের শ্বাস রোধ করা হয়েছিল সেটা পুলিশ নষ্ট করে ফেলেছিল। পুলিশের উচিত সব গুরুত্বপূর্ণ ট্রায়ালে সব সাক্ষ্যপ্রমাণ সযতেœ রক্ষা করা। এসব সমালোচনা সত্ত্বেও ব্রাবিন চেষ্টা করেন পুলিশের মান বাচাতে। তাই যতটা সম্ভব পুলিশের বিবৃতি তিনি আমলে নেন।
    এভান্স ও কৃস্টির ট্রায়ালে জনমনে যেসব প্রশ্ন উঠেছিল তার খুব কম উত্তর ব্রাবিন তদন্ত কমিটির রায়ে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ইসুগুলো ঝুলেই থাকে। তবে নিজের শিশুসন্তান হত্যার দায় থেকে এভান্স মুক্ত হওয়ার পরিণামটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
    এভান্সকে নির্দোষ ঘোষণা ও ক্ষমা
    এই রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রয় জেংকিন্স তৎপর হন। তিনি এভান্সের জন্য একটি রয়াল পারডন (রাজকীয় ক্ষমা) এর সুপারিশ করেন। এভান্স তার শিশুকন্যাকে খুন করেননি এমন মর্মে ব্রাবিন কমিটির রায়ের প্রেক্ষিতে এভান্সকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।
    পেনটনভিল জেলখানা প্রাঙ্গণ থেকে তার দেহাবশেষ তুলে পূর্ব লন্ডনে সেইন্ট প্যাটৃকস রোমান ক্যাথলিক কবরস্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়।

    ইতিমধ্যে বৃটেন জুড়ে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ব্রাবিন কমিটির রায়ের পর এই আন্দোলন আরো বেগবান হয় যার পরিণতিতে বৃটেনে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়ে যায়।
    জানুয়ারি ২০০৩-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টিমথি এভান্সের বিচারে ত্রুটি হয়েছিল তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ টাকা দেয় এভান্সের বোন এবং সৎবোনকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে কোনো হত্যাই এভান্স করেননি।
    এভান্সের সৎবোন মেরি ওয়েস্টলেক আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি বলেন, ব্রাবিন কমিটির রায়ে জেরালডিন হত্যার দায় মুক্ত হলেও বেরিল হত্যার দায়মুক্ত হননি এভান্স। এজন্য আরেকটি তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত।
    ১৯ নভেম্বর ২০০৪-এ মেরি ওয়েস্টলেকের এই আবেদনের শুনানিতে আদালত রায় দেন যে, আবার তদন্তে যে সময় ও টাকা খরচ হবে সেটা যৌক্তিক হবে না। তবে আদালত মেনে নেন যে এভান্স তার স্ত্রী ও কন্যাসন্তান কাউকেই হত্যা করেননি।
    প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য
    এভাবেই ফাসির ৫৪ বছর পরে টিমথি এভান্স দায়মুক্ত হন।
    সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে তিনি কোনো খুনই করেননি।
    সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে তার ফাসির জন্য দায়ী ছিল পুলিশ বিভাগের অক্ষমতা ও অবহেলা এবং সেটা ঢেকে রাখার জন্য তাদের অনৈতিক কূটকৌশল, অভিযুক্তদের প্রতি নির্যাতন, মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা।
    সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে পুলিশের এসব কুকর্মে সহযোগী হতে পারে বিচার বিভাগ এবং মন্ত্রীরা।

    আর তাই যে কোনো মৃত্যুদণ্ডের আগে সুগভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে পুলিশের অভিযোগ এবং আদায় করা স্বীকারোক্তিসমূহের বস্তুনিষ্ঠতা। আর যেহেতু পুলিশের কর্মকাণ্ডের ফলে মিসক্যারেজ অফ জাস্টিসের সম্ভাবনা থেকেই যায় সেহেতু মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত হওয়া উচিত।
    টিমথি এভান্সের ঘটনা সম্পর্কে বহু বই বেরিয়েছে।
    গান, নাটক এবং মুভিও হয়েছে।
    টিমথি এভান্সের মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
    তার বোনরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
    কিন্তু টিমথি এভান্স কি তার প্রাণ ফিরে পেয়েছেন?
    (চলবে)

    ১০ মে ২০১৪
    facebook.com/Shafik Rehman Presents

    ক্ষমতা হস্তান্তর যেভাবে সম্ভব : টনি বেনের বাণী

    শফিক রেহমান
    ৪ মে ২০১৪, রবিবার, ৫:০৬

    শেখ হাসিনা ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত কোনো ক্যু সফল হবে না। তাই ক্যু সফল করতে হলে শেখ হাসিনার কাছে পৌছাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন (গণভবন) যে গার্ডরা পাহারা দিচ্ছে তারা শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বস্ত। এই গার্ডরা ভেতরে কাউকেই কোনোভাবেই ঢুকতে দেবে না। তাছাড়া, আমি মনে করি, কোনো ক্যু-র প্রচেষ্টা এত রক্তক্ষয়ী হবে যে, সেই ঝুকি নেওয়ার মতো কোনো অফিসার নেই। আমি আপনাকে বলতে পারি যে, শেখ হাসিনা ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না। সেটা হতে পারে শুধুমাত্র আমাদের লাশের ওপর দিয়ে।
    -ঢাকায় ইনডিয়ান সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিতকে দেওয়া সজীব ওয়াজেদ জয়-এর ইন্টারভিউয়ের একাংশ যা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ২৪ নভেম্বর ২০১৩-তে।
    To have a successful coup, you will have to physically get Sheikh Hasina to hand over power. The guards guarding this house (Gano Bhaban, the official residence of the Prime Minister) are faithful to Sheikh Hasina. There is no way the guards will allow anybody to step in.
    Besides, any (coup) attempt will be so bloody that I dont think there is any group of officers inclined to take that risk. I can tell you that Sheikh Hasina will not hand over power. It can only happen over our dead bodies.
    -Sajib Wazed Joy, in an interview taken by Devadeep Purohit in Dhaka and published in the Telegraph, Calcutta, India on 24 November 2013..

    বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আব্বু (তাজউদ্দীন আহমদ) তার চূড়ান্ত মতামত মুজিব কাকুকে জানিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সচিব আবু সায়ীদ চৌধুরীকে সাক্ষী রেখে তিনি মুজিব কাকুকে ফোন করে বলেছিলেন, আপনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনাকে আমি অনেকবারই বলেছি আমার দ্বিমতের কথা। আর আজ আমার চূড়ান্ত মতামত দিচ্ছি। আমি আপনার এই একদলীয় শাসনের সাথে একমত নই… বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার হাতে এতই ক্ষমতা দেওয়া আছে যে সেই ক্ষমতাবলে দেশে একদলীয় ব্যবস্থা বা আর কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা বক্তৃতায় সব সময় বলেছি একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশের কথা, যার ভিত্তি হবে গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রের গুণগান করেছি আমরা সবসময়ে, আজকে আপনি একটি কলমের খোচায় সেই গণতন্ত্র শেষ করে দিয়ে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন।… বাই টেকিং দিস স্টেপ ইউ আর কোজিং অল দি ডোরস টু রিমুভ ইউ পিসফুলি ফ্রম ইওর পজিশন (…আপনার অবস্থান থেকে শান্তিপূর্ণভাবে আপনাকে সরিয়ে দেওয়ার সব দরজাই আপনি এই পদক্ষেপ নিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছেন)।
    -শারমিন আহমদ : তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা (পৃষ্ঠা ১৯১-১৯২)

    ক্ষমতাসীনকে প্রশ্ন করুন, কিভাবে আপনি ক্ষমতায় এসেছেন এবং কিভাবে আমরা আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারি? রাজনীতিতে এই দুটি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
    – টনি বেন
    টনি বেন কে ছিলেন এই প্রশ্নটির উত্তর হয়তো বাংলাদেশের অনেকেরই জানা নেই।
    বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে বৃটেনের বামপন্থী রাজনীতিতে টনি বেন ছিলেন একজন প্রধান নেতা যার ওপর অনেক সময়ে নির্ভর করতো লেবার পার্টির সাফল্য এবং ব্যর্থতা। প্রতিপক্ষ টোরি বা কনজারভেটিভ পার্টি দ্বারা তিনি যেমন সমালোচিত হতেন, ঠিক তেমনি তার নিজের লেবার পার্টির মধ্যেও তিনি বিতর্কিত হতেন। কিন্তু দুটি দলই স্বীকার করতে বাধ্য হতো টনি বেনের ভূমিকা অনেক সময়ে ছিল দলের ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থে। তাই টনি বেন ছিলেন নিজেই একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
    টনি বেনের এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার অসাধারণ কণ্ঠস্বর, গভীর আত্মবিশ্বাস এবং ধূমায়িত পাইপ হাতে মগে চা খাওয়া।
    ১৪ মার্চ ২০১৪-তে টনি বেন ৮৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী টোরি পার্টির নেত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মতো তিনি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। নিজের পার্টি, লেবার পার্টির পক্ষ থেকে তিনি কখনো পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতাও হতে পারেন নি। তবে তিনি একবার লেবার পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু টনি বেন ১৯৫০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ১৬ বার পার্লামেন্টের সদস্য বা এমপি নির্বাচিত হন। লেবার পার্টির মধ্যে সর্বাধিকবার নির্বাচিত হবার রেকর্ড তারই।
    রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত
    তার মৃত্যুর পর দলমত নির্বিশেষে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ সম্মান জানানোর প্রস্তাব ওঠে। এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কারণ মার্গারেট থ্যাচার নিজের মৃত্যুর আগে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়। তার সেই অনুরোধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু টনি বেন, যিনি শাদাসিধে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন, তিনি নিজের মৃত্যুর আগে এই ধরনের জাকজমক ভরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোনো অনুরোধ করে যান নি। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে করার জন্য অনুমতি নিতে হয় বৃটিশ রানীর। কিন্তু বেন ছিলেন বৃটেনে রাজতন্ত্র অবসানের পক্ষপাতী।
    এই প্রেক্ষিতে বৃটিশ জনগণ আশ্চর্য হয়ে যায় যখন জানা গেল বর্তমানে ক্ষমতাসীন টোরি পার্টির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে টনি বেনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য এবং রানী এলিজাবেথও তার অনুমতি দিয়েছেন। কিছু কট্টর ডানপন্থী টোরি এবং কিছু কট্টর বামপন্থী লেবার নেতাকর্মীরা মৃদু সমালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত টনি বেনের মরদেহ এনে রাখা হয় বৃটিশ পার্লামেন্টের নিজস্ব গির্জা সেইন্ট মেরি আন্ডারক্রফটে। একটি উচু টেবিলে তার কফিন ঢাকা হয় বৃটিশ পতাকা দিয়ে এবং তার ওপর রাখা হয় ফুলের তোড়া। এর আগে একমাত্র মার্গারেট থ্যাচারই এমন সম্মান পেয়েছিলেন।
    ইতিমধ্যে ইন্টারনেট জুড়ে চলতে যাকে সকল দলের টপ নেতা, সাহিত্যিক, অভিনেতা, পপস্টার এবং বৃটিশ সুধী সমাজ ও সংস্কৃতিসেবীদের শ্রদ্ধাসূচক স্মৃতিচারণ। টনি বেনের সুদীর্ঘ জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচিত হতে থাকে রেডিও-টিভিতে। টনি বেনের স্মরণীয় বহু উদ্ধৃতি প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন ব্লগে।
    বাংলাদেশিদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে
    এই ব্যাপক ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্যে বাদ পড়ে যায় টনি বেনের জীবনের একটি দিক এবং সেটি হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বৃটেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন আন্দোলনকে তার সমর্থন দান।
    টনি বেনকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬০-এর ফেব্রুয়ারিতে শীতের এক বিকেলে সেন্ট্রাল লন্ডনে রেড লায়ন স্কোয়ারে অবস্থিত কনওয়ে হলে একটি মিটিংয়ে। সেই সময়ে প্রবাসী পূর্ব পাকিস্তানি ছাত্রছাত্রীদের কার্যক্রম হোবর্নের এই অঞ্চল জুড়ে হতো। এখানেই অবস্থিত ব্যারিস্টার হতে আগ্রহীদের পীঠস্থান লিংকন্স ইন, ইকনমিস্ট হতে আগ্রহীদের লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স, অন্যান্য সব বিষয়ে পড়াশোনার জন্য লন্ডন ইউনিভার্সিটি, স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ (সংক্ষেপে সোয়াস) এবং ছাত্রদের থাকার বিভিন্ন হল। এদের কাছেই ছিল বুশ হাউসে বিবিসি বাংলা বিভাগের দফতর যেটি এখন সরে গিয়েছে অন্যখানে। তাই ছাত্রছাত্রীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমাবেশ এখানে ঘটতো। কনওয়ে হলটি খুবই শাদামাটা বলে ভাড়া ছিল কম।
    ১৯৫৮-তে পাকিস্তানে জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর থেকে তার সেনাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। এই ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল পাকিস্তান স্টুডেন্টস ফেডারেশন বা সংক্ষেপে পিএসএফ। রাজনীতি সচেতন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্ররা এই সংগঠনের সদস্য ছিল। তবে এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের একটা নিজস্ব ধারাও প্রবাহিত ছিল।
    লর্ড উপাধি ছেড়ে দেওয়ার একক আন্দোলন
    পিএসএফের আমন্ত্রণে সেই শীতের বিকেলে টনি বেন কনওয়ে হলে এসেছিলেন গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলার জন্য প্রধান অতিথি হয়ে। সেই সময়ে তার সম্পর্কে দুটি কথা জানতাম। এক. তিনি বৃস্টল সাউথ-ইস্ট আসন থেকে নির্বাচিত লেবার এমপি এবং দুই. বংশগত কারণে বৃটিশ আইন অনুযায়ী তিনি আর এমপি থাকতে পারবেন না তার পিতা ভাইকাউন্ট স্ট্যানসগেইটের মৃত্যুর পরে।
    শেষের তথ্যটি আমাকে কৌতূহলী করেছিল।
    বৃটেনের পার্লামেন্টে দুটি হাউস বা কক্ষ আছে। আপার হাউস বা উচ্চকক্ষ যাকে বলা হয় হাউস অফ লর্ডস বা লর্ডস সভা এবং লোয়ার হাউস বা নিম্নকক্ষ যাকে বলা হয় হাউস অফ কমন্স বা কমন্স সভা। বৃটেনে নির্বাচনে যারা বিজয়ী হন, তারা হন কমন্স সভার সদস্য বা এমপি এবং এদের সদস্য পদের মেয়াদ থাকে পাচ বছর। পার্লামেন্টে নিম্নকক্ষে এরাই হন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী। এমপিদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা। অন্যদিকে উচ্চকক্ষে লর্ডরা সদস্য হন তাদের বংশগত যোগ্যতায় অথবা সরকারের মনোনয়নে। এদের সদস্য পদের মেয়াদ থাকে আজীবন অথবা স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া পর্যন্ত। নিম্নকক্ষ কর্তৃক পাস হওয়া কোনো বিল পর্যালোচনা করা এবং সেটা পুনর্বিবেচনার জন্য আবার নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠানো ছাড়া আর বিশেষ কোনো ক্ষমতা উচ্চকক্ষ সদস্যদের বা লর্ডদের নেই। তাই যারা রাজনীতি করতে চান এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দেশ পরিচালনা করতে চান তারা হাউস অফ কমন্স বা নিকক্ষের সদস্য হতে চান। অর্থাৎ, তারা হতে চান এমপি। অন্যভাবে বলা চলে, তারা লর্ড হতে চান না যদিও লর্ড শব্দটির সঙ্গে মর্যাদা, সম্ভ্রম এবং আভিজাত্য জড়িয়ে আছে।
    ১৯৬০-এ প্রচলিত বৃটিশ আইন অনুযায়ী লর্ডস সভার সদস্য ভাইকাউন্ট স্ট্যানসগেইট, যার পূর্ণ নাম ছিল উইলিয়াম ওয়েজউড বেন, তার মৃত্যুর পর তার প্রথম পুত্র মাইকেলের হবার কথা ছিল ভাইকাউন্ট স্ট্যানসগেইট এবং সেই সুবাদে লর্ডস সভার সদস্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ওই পুত্রের মৃত্যু হওয়ায়, তার দ্বিতীয় পুত্র এনটনি নিল ওয়েজউড বেন, যিনি সংক্ষিপ্ত টনি বেন নামে পরিচিত হয়েছিলেন, তাকেই উত্তরাধিকার সূত্রে লর্ডস সভার সদস্য হতে হতো। টনি বেন ইতিমধ্যে মাত্র পচিশ বছর বয়সে ১৯৫০-এ বিপুল ভোটে বৃস্টল সাউথ-ইস্ট থেকে লেবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে তিনি হয়েছিলেন পার্লামেন্টে সর্বকনিষ্ঠ এমপি বা বেবি অফ দি হাউস। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে পিতার মৃত্যুর পরে কিছুতেই তিনি নিম্নকক্ষ ছেড়ে উচ্চকক্ষে লর্ড হয়ে যাবেন না। তাই তিনি এককভাবে একটি আন্দোলন চালাচ্ছিলেন যেন বৃটিশ নাগরিকদের অধিকার থাকে লর্ডস সভার সদস্য পদ ছেড়ে দেওয়ার।
    নভেম্বর ১৯৬০-এ ভাইকাউন্ট স্ট্যানসগেইটের মৃত্যুর পর টনি বেন অটোম্যাটিকালি হয়ে যান লর্ড এবং হাউস অফ কমন্সের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এপৃল ১৯৬১-তে টনি বেনের আসনে উপনির্বাচন ধার্য হয়। টনি বেন এর বিরুদ্ধে কমন্সে একটি ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্পিকার তাকে ভাষণ দেওয়ার অনুমতি দেননি।
    টনি বেন তার একক আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি জানতেন ভোটাররা তাকে চায় এবং তিনি এটাও জানতেন যে বৃটিশ আইনে একটা ফাক আছে। কমন্সে ঢুকতে না পারলেও কমন্সের নির্বাচনে দাড়ানোর বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং উপনির্বাচনে বিজয়ী হন। বিষয়টি তখন ইলেকশন কোর্টে গড়ায়। আদালত রায় দেন যে ভোটাররা সচেতন ছিলেন। সুতরাং টনি বেনের পক্ষে তাদের ভোট দেয়া অনুচিত হয়েছিল। কমন্সে বেন ঢুকতে পারবেন না এবং উপনির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী টোরি পার্টির প্রার্থী ম্যালকম সেইন্ট কেয়ারকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। মজার কথা এই যে ম্যালকম সেইন্ট কেয়ারের অবস্থাও টনি বেনের মতো ছিল। সেইন্ট কেয়ারের পিতাও ছিলেন লর্ড এবং তার মৃত্যুর পর সেইন্ট কেয়ারের কমন্স সভার সদস্য পদ খারিজ হয়ে যেত।
    আদালতের রায়ে গভীরভাবে হতাশ হলেও টনি বেন তার ক্যামপেইন চালিয়ে যেতে থাকেন।
    ঠিক এই সময়টায় টনি বেনকে আমরা কয়েকবারই পেয়েছিলাম আমাদের ছাত্রসমাবেশে। তিনি সেখানে শ্রেণী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বিষয়ে বলতে আসতেন। পরোক্ষভাবে এটা ছিল তার নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্যামপেইনের একটা অংশ।
    বিজয়ী বেন
    অবশেষে টোরি সরকার দি পিয়ারেজ অ্যাক্ট (The Peerage Act 1963) পাস করে, যার ফলে লর্ড পদবি ছেড়ে দেওয়া আইনসম্মত হয়।
    ৩১ জুলাই ১৯৬৩-তে সন্ধ্যা ছয়টার সময়ে এই আইনটি পাস হয়। বেন-ই ছিলেন প্রথম লর্ড যিনি তার পদবি ছেড়ে দেন। এটি তিনি করেন সেই দিনই সন্ধ্যা ৬-২২ মিনিটে!
    সেই সন্ধ্যায় আমরা, বেন গুণগ্রাহীরা, একটি পাবে (Pub-এ) কয়েক রাউন্ড বিয়ার কিনে তার এই ঐতিহাসিক সাফল্য সেলিব্রেট করেছিলাম। সেদিনের সান্ধ্য পত্রিকাগুলোতে ছিল শুধুই বেনের সাফল্যের সংবাদ।
    চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য বেনকে অপেক্ষা করতে হয় আরো বিশ দিন। সেইন্ট কেয়ার তার নির্বাচনের সময়ে বলেছিলেন, আইন বদলে গেলে তিনি এমপি পদ ছেড়ে দেবেন। সেইন্ট কেয়ার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। বৃটিশ সাউথ-ইস্টে আবার উপনির্বাচন হয় ২০ আগস্ট ১৯৬৩-তে। ওই উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টনি বেন পার্লামেন্টে ফিরে আসেন।
    ব্যক্তিগত ন্যায্য দাবি আদায় করার জন্য দেশের কয়েক শ বছরের পুরনো আইন বদলানোর লক্ষ্যে এককভাবে আন্দোলন করে সফল হওয়ার এই দৃষ্টান্ত আমাদের খুবই অনুপ্রাণিত করেছিল। সমষ্টিগতভাবে আন্দোলন করে বিজয়ী হবার বহু দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু এককভাবে আন্দোলন করে সফল হবার এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
    মায়ের প্রভাব
    টনি বেনের জন্ম হয়েছিল ৩ এপ্রিল ১৯২৫-তে লন্ডনে তার পিতা ভাইকাউন্ট হবার আগে ছিলেন লেবার পার্টির এমপি এবং দুইবার মন্ত্রী। টনির মা মার্গারেট ছিলেন নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী নেত্রী এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞানী। টনির ওপর তার মায়ের প্রভাব পড়েছিল বেশি। মা যখন তাকে বাইবেল পড়াতেন তখন বলতেন, বাইবেলের গল্পগুলোর ভিত্তি হচ্ছে পয়গম্বর এবং রাজাদের মধ্যে যুদ্ধ। রাজারা ছিল ক্ষমতাবান। কিন্তু পয়গম্বররা ছিলেন ন্যায় ও নীতিবান। সুতরাং টনির উচিত হবে তার নিজের জীবনে রাজাদের বিরুদ্ধে পয়গম্বরদের সাপোর্ট করা। সম্ভবত বৃটেনের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে টনি বেনের বিতৃষ্ণার সূচনা হয়েছিল তার মায়ের শিক্ষাতে।
    টনি বেনের দাদা এবং নানা উভয়েই ছিলেন লিবারাল পার্টির এমপি। অর্থাৎ তিন পুরুষ ধরে টনি বেনরা ছিলেন এমপি। তিন পুরুষেই তারা হয়েছিলেন মন্ত্রী। তার পিতা যখন লেবার সরকারের ইনডিয়া দফতরের মন্ত্রী ছিলেন তখন ১৯৩১-এ মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে টনি বেনের দেখা হয়েছিল।
    বেনের পৈত্রিক পরিবারের মূল আয় ছিল একটি প্রকাশনা ব্যবসা থেকে। তিনি পড়াশোনা করতে যান অক্সফোর্ডে। ১৯৩৯-এ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি এয়ার ফোর্সে পাইলট রূপে যোগ দেন। যন্ত্র এবং আধুনিকতার প্রতি টনি আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তীকালেও তার এই আগ্রহ অটুট ছিল। যুদ্ধ শেষের পর তিনি আবার অক্সফোর্ডে ফিরে যান এবং সেখানে ফিলসফি, পলিটিক্স ও ইকনমিক্স পড়েন। ১৯৪৭-এ তিনি অক্সফোর্ড ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হন। তখন ধনী এবং অভিজাত পরিবারের সন্তানরাই অক্সফোর্ড-কেমবৃজে পড়াশোনার সুযোগ পেত। সম্ভবত সেই কারণে সাধারণ মানুষের স্টেটাস পেতে উৎসাহী টনি বেন পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ডে তার লেখাপড়ার বিষয়টি অনুক্ত রাখতেন। ১৯৭৫-এ হু ইজ হু (Whos Who) জীবনীকোষে তিনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন, শিক্ষা এখনো চলছে (Education- still in progress).
    অসাধারন পরিবার সাধারন নাম
    ১৯৪৮-এ গ্র্যাজুয়েট হবার পর কিছু কাল আমেরিকায় কাটিয়ে বেন বিবিসি রেডিওতে প্রডিউসার পদে কাজ করেন (১৯৪৯-৫০)। এই সময় পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এনটনি ওয়েজউড বেন এবং ওয়েজি নামে বন্ধুবৃত্তে ও পরিবারে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৩-এ বিবিসির একটি প্রোগ্রামে তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে এনটনি ওয়েজউড বেনের পরিবর্তে তিনি শুধু টনি বেন নামে পরিচিত হতে চান। এখানেও তার সেই একই মনস্তত্ত্ব কাজ করেছিল। তিনি তার অভিজাত এবং দীর্ঘ নাম বদলে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত নাম রাখেন। এই ধারাতে পরবর্তীকালে আমেরিকার উইলিয়াম জেফারসন কিনটন হয়ে যান বিল কিনটন এবং বৃটেনে এনটনি চার্লস লিনটন ব্লেয়ার হয়ে যান টনি ব্লেয়ার। একই ধারায় বর্তমান বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড উইলিয়াম ডোনাল্ড ক্যামেরন হয়েছেন ডেভিড ক্যামেরন এবং বর্তমান বৃটিশ বিরোধীদলীয় নেতা এডওয়ার্ড স্যামুয়েল মিলিব্যান্ড হয়েছেন এড মিলিব্যান্ড!
    কিন্তু নাম বদলে ফেললেও তিনি যে উচ্চবংশীয় অভিজাত পরিবারের সন্তান সেটা গোপন করা অসম্ভব ছিল। তাই তিনি এক সময়ে বলেন, যে উচ্চ শ্রেণীর মানুষরা বৃটেন চালায় তাদের আপাদমস্তক আমি জানি। তারা কিসের তালে আছে সেটাও আমি জানি। আর এটাই হচ্ছে লেবার পার্টিতে আমার অবদান।
    ১৯৪৯-এ তিনি বিয়ে করেন আমেরিকান ধনী নারী ক্যারোলাইন মিডলটন ডিক্যাম্পকে। ক্যারোলাইন বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্রে এবং কাজ করতেন শিক্ষা ক্ষেত্রে। অক্সফোর্ডে পড়ার সময়ে টনি বেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। এর নয় দিন পরে অক্সফোর্ডে একটি পার্কের বেঞ্চে ক্যারোলাইনকে পাশে বসিয়ে টনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। টনি বেন বলেন, আমি খুব লাজুক ছিলাম। তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল এবং তারা এক কন্যা ও তিন পুত্রের জন্ম দেন। পুত্রদের মধ্যে মধ্যমজন হিলারি রাজনীতিতে এসেছেন এবং লেবার সরকারের আমলে মন্ত্রী হয়েছিলেন। অর্থাৎ, চতুর্থ পুরুষেও বেন পরিবার থেকে এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন। টনি বেন ও তার স্ত্রী বসবাস করতেন পশ্চিম লন্ডনে নটিং হিল এলাকায় একটি বড় বাড়িতে, যেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল লাইব্রেরি। ২০০০-এ ক্যারোলাইন মারা যান। যে বেঞ্চে বসে টনি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে সেই বেঞ্চটি তিনি অক্সফোর্ড থেকে কিনে লন্ডনে নিজের বাড়ির বাগানে স্থাপন করেন।
    যুদ্ধ বিরোধী বেন
    ১৯৪৯-এ বিয়ের পরপরই টনি বেন বৃস্টল সাউথ-ইস্টের এমপি হবার জন্য কাজে লেগে যান। ওই আসনে লেবার এমপি ছিলেন স্যার স্ট্যাফোর্ড কৃপস, যিনি রিটায়ার করেছিলেন। ২০০১-এ টনি বেন ৫১ বছর পার্লামেন্টে সদস্য থাকার পর রিটায়ার করেন। রিটায়ার করার সময়ে তিনি বলেন,আমি পলিটিক্সে আরো সময় দেওয়ার জন্য রিটায়ার করছি।
    কথাটা টনি বেন হালকাভাবে বলেননি। যখন মার্চ ২০০৩-এ ইরাকের বিরুদ্ধে বৃটেন যুদ্ধে যায় তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার। টনি বেন বলতেন, প্রতিটি যুদ্ধই হচ্ছে কূটনীতির ব্যর্থতার পরিচয় (All war represents a failure of diplomacy)। তাই ফেব্রুয়ারি ২০০৩-এ টনি বেন চলে যান বাগদাদে এবং সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আলোচনা করে আসন্ন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি সফল হন না। তিনি মনে করতেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার ও বজায় রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। আমেরিকার সহযোগী হবার জন্য তিনি ব্লেয়ারের সমালোচনা করেন।
    টনি বেনের যুদ্ধবিরোধী হবার কারণ ছিল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে এয়ার ফোর্স পাইলট রূপে তিনি যুদ্ধের নৃশংসতা ও ভয়াবহতা স্বচোখে দেখেছিলেন। এই যুদ্ধে একটি দুর্ঘটনায় তার বড় ভাই নিহত হয়েছিলেন। তাই ১৯৫৪ থেকে তিনি পারমাণবিক বোমাবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে ছিলেন। ২০০১-এ তিনি আফগানিস্তান যুদ্ধে বৃটেনের জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা করেন।
    বাগদাদ থেকে ফিরে এসে টনি বেন ফেব্রুয়ারি ২০০৩-এ স্টপ দি ওয়ার কোয়ালিশন (যুদ্ধ থামাও জোট) নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ওই মাসে বৃটেনে যুদ্ধবিরোধীদের একটি মহাসমাবেশে বহু মানুষ যোগ দেয়। এতে পুলিশের মতে ৭,৫০,০০০ প্রতিবাদকারী মানুষ উপস্থিত ছিল এবং সেই সময় পর্যন্ত সেটাই ছিল বৃটেনের সবচেয়ে বড় জনসমাবেশ। দি ওয়ার কোয়ালিশন দাবি করে সেখানে ১,০০০,০০০ প্রতিবাদকারী উপস্থিত ছিল। টনি বেনের আবেগি কিন্তু যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা এই সমাবেশের সাফল্যের প্রধান কারণ ছিল। পার্লামেন্ট থেকে বিদায় নিয়ে তিনি আমৃত্যু এই জোটের হয়ে যুদ্ধবিরোধী কাজ চালিয়ে যান।
    বিনয়ী বেন
    প্রায় ৫১ বছর পার্লামেন্টের সদস্য থাকলেও এবং তার দল লেবার পার্টি একাধিকবার ক্ষমতায় এলেও টনি বেন কখনোই প্রধানমন্ত্রী হননি এমনকি লেবার পার্টি বিরোধী অবস্থানে গেলেও তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারেননি। তাই টনি বেন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সব রাজনৈতিক জীবনই ব্যর্থতায় শেষ হয়। আমার রাজনৈতিক জীবন অধিকাংশের তুলনায় আগেই শেষ হয়েছে (All political careers end in failure. Mine ended earlier than most)।
    এই উক্তিটি ছিল তার বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধীদলীয় নেতা না হতে পারলেও তিনি লেবার সরকারের আমলে একাধিকবার মন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে অথবা মন্ত্রী পদে কাজ করেছিলেন। তিনি হয়েছিলেন পোস্টমাস্টার জেনারেল (১৯৬৪-১৯৬৬), টেকনলজি মন্ত্রী (১৯৬৬-১৯৭০), শিল্পমন্ত্রী (১৯৭৪-১৯৭৫) এবং এনার্জি মন্ত্রী (১৯৭৫-১৯৭৯)।
    টনি বেন সম্পর্কে বলা হয়, মন্ত্রী পদে থাকার পরে যে গুটিকয়েক পলিটিশিয়ান আরো বামপন্থী হয়ে গিয়েছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এতে তার সোশালিজম বা সমাজতন্ত্র মার্কসবাদের চাইতে বাইবেল দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছিল তার মায়ের কারণে। এক সময়ে বৃটেনে উগ্র বামপন্থীদের বলা হতো বেনপন্থী বা বেনাইট (Bennite)।
    চারটি শিক্ষা
    মন্ত্রিত্বের পরে কেন তিনি আরো বামপন্থী হয়ে যান সে বিষয়ে টনি বেন বলেন, আমি চারটি শিক্ষা পেয়েছিলাম। এক. জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের নীতি এবং সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে আমলারা বা সিভিল সার্ভিস পণ্ড করে দেয়। দুই. লেবার পার্টি যে ধারায় চলছে সেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তার ফলে পার্টির নেতা তার জমিদারির মতো পার্টিকে চালাতে পারেন। তিন. লেবার সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার্সদের এবং চার. মিডিয়ার যে ক্ষমতা আছে সেটা মধ্যযুগীয় চার্চের সঙ্গে তুলনীয়। সমাজে যারা অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করছে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকেই মিডিয়া প্রতিদিনের ঘটনাগুলো দর্শক, শ্রোতা ও পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করে।
    এই লেখাটি যারা পড়ছেন তারা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে টনি বেনের এই চারটি শিক্ষা বিবেচনা করতে পারেন।
    পার্টির মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার পক্ষে
    দেশের শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে আরো প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য বেন ছিলেন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার পক্ষে। দলের মধ্যে তিনি আরো গণতন্ত্র চর্চার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। বৃটেনে প্রতি বছর রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলন বা কনফারেন্স হয়। বেন চাইতেন ওই সম্মেলনে ভোটের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন। ইইউ বা ইওরোপিয়ান ইউনিয়নে বৃটেনের যোগদানের বিরোধী ছিলেন বেন। এই ইসুতে টনি বেন ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী বা ন্যাশনালিস্ট পলিটিশিয়ান এবং নিজের দল লেবার পার্টির চাইতে প্রতিপক্ষ দল টোরি পার্টির কাছাকাছি।
    টনি বেনের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার দলের মূলধারার সঙ্গে বহুবার তীব্র বিরোধিতা ঘটেছিল। যেমন, ইওরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগদান ইসুতে, কিন্তু তিনি কখনোই দল ছেড়ে যান নি। তিনি বলতেন,দলের মধ্যে থেকেই দলের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর চেষ্টা করে যেতে হবে। কোনো ব্যক্তির অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল টেকে না।
    বাংলাদেশে বিদ্রোহী অঙ্গ দল গঠনের প্রবণতা যাদের মধ্যে আছে তাদের উচিত হবে টনি বেনের পূর্ণ জীবনী পড়ে দেখা।
    পরিশ্রমী লেখক
    তাদের অসুবিধা হবে না। কারণ টনি বেন ছিলেন পরিশ্রমী ডায়রি লেখক। তার জীবন কেন্দ্রিক আটটি ডায়রি প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ ডায়রি প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। নাম : এ ব্লেইজ অফ অটাম সানশাইন (A Blaze of Autumn Sunshine বা হেমন্তের কড়া সুর্যালোক)। এই চূড়ান্ত ডায়রিতে তিনি ২০০৭-৯ সালগুলোর ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। জীবনের হেমন্তকালে বা পড়ন্ত বেলায় এই দুই বছরে তিনি দেশ জুড়ে প্রায় আশিটি শহরে ঘুরে বেড়ান, ভাষণ দেন, বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেন এবং ওয়ান-ম্যান শো বা একক শো উপস্থাপন করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন সুবক্তা এবং তার বক্তৃতায় ঘৃণার চাইতে বেশি ব্যঙ্গরস, ক্রোধের চাইতে বেশি যুক্তি এবং কল্পকথার চাইতে বেশি বাস্তব সমাধানের রূপরেখা থাকত, তাই তার ভাষণ শুনতে সর্বত্রই অনেক শ্রোতা টিকেট কিনে আসত। বিশেষত তরুণরা।
    একটি স্ট্রোকের পর তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। শেষ ডায়রিতে তিনি লেখেন, আমি আশা করি আবার আমি একাই চলাফেরা করতে পারব। আমি পরনির্ভর হয়ে থাকতে চাই না।… এই ডায়রিতে আমি লিখেছি কিভাবে মানুষ বুড়ো হয়ে যায়। এই রূঢ় বাস্তবতা আমাকে মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু এটা মেনে নেওয়া আমার জন্য খুব কষ্টকর হয়েছে।
    এই আট খণ্ডের ডায়রি ছাড়াও আরো দুটি বই লিখেছেন। রেডিও এবং টেলিভিশনে বহু শো দিয়েছেন। টনি বেন লেখালেখির জন্য বিশাল লাইব্রেরি করেছিলেন যেখানে বইয়ের সঙ্গে ছিল অজস্র নিউজ পেপার কিপিংস। এসব লেখা, শো, জনসভার ভাষণ এবং পার্লামেন্টে বিতর্কে বেন তার প্রতিপক্ষকে কখনোই অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেন নি। তিনি বলতেন, প্রতিপক্ষকে তিনি ঘৃণা করেন না প্রতিপক্ষের নীতিকে তিনি সমালোচনা করেন।
    বাংলাদেশে যারা বর্তমান ((অবৈ:) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার ভাষণ শুনেছেন (আপনি (খালেদা) পেয়ারের পাকিস্তানে চলে যান ১ মে ২০১৪, গাজীপুর) তারা টনি বেনের কয়েকটি ভাষন পড়লেই বুঝবেন বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ না হোক, মধ্যম সভ্যতার দেশে উন্নীত করতে হলে পলিটিশিয়ানদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত।
    টনি বেন কেন তার ভাষা ও ভাষণ সম্পর্কে এত সতর্ক থাকতেন? কারণ তিনি জানতেন প্রবীণ পলিটিশিয়ানদের দ্বারা নবীন পলিটিশিয়ানরা প্রভাবিত হয়। বেন সবসময়ই নবীনদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে তরুণদের কথা শুনতেন। এটা শুধু যে তিনি ইংরেজ তরুণদের বেলায়ই করতেন, তা নয়। ষাটের দশকে আইয়ুব খান বিরোধী যেসব ছাত্র সম্মেলনে তিনি আসতেন তখন আমাদের কথাও তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং ভালো সাজেশন দিতেন। তার বই পড়ে এবং ভাষণ শুনে ছাত্রজীবনে ডেভিড ক্যামেরন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন রাজনীতিতে যোগ দিতে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য ক্যামেরন টোরি পার্টিতে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ক্যামেরন শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন টনি বেনের সৎ এবং আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি।
    পপ ও পোশাক, চা ও পাইপ
    তরুণদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্র বজায় রাখতে টনি বেন খুব আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ছিলেন পপ মিউজিকে। তিনি জানতেন রাজনীতির চাইতে তরুণরা মিউজিকে বেশি আগ্রহী। এ কারণেই প্রতি বছর তিনি ইংল্যান্ডের গ্ল্যাস্টনবেরি ফেস্টিভালে যেতেন। প্রতি জুনের শেষে সমারসেট, গ্ল্যাস্টনবেরিতে এই আন্তর্জাতিক উৎসবে পপ, ব্লুজ, রক, রেগে, হিপহপ এবং লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠান চলে পাচ দিন ব্যাপী। পাশাপাশি চলে নাচ, নাটক, সার্কাস, ক্যাবারে মিউজিক এবং অন্যান্য ধরনের আর্টস প্রদর্শনী। বিশ্বের টপ পপ আর্টিস্টরা এই ফেস্টিভালে যোগ দেন এবং উপস্থিত দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা পৌনে দুই লক্ষের বেশি হয়। টনি বেন বলতেন, গ্ল্যাস্টনবেরি আমার জন্য একটা বার্ষিক তীর্ঘযাত্রা। এখানে এলে রাজনৈতিক তৃনমূলের সঙ্গে আমি পরিচিত হই। তরুণদের আইডিয়া জানি। নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে যাই।
    প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগের কজন সিনিয়র পলিটিশিয়ান বাংলাদেশের কোনো পপ মিউজিক ফেস্টিভালে নিয়মিত গিয়েছেন কি? তারা কি জানেন, আসিফ আকবর, আইয়ুব বাচ্চু, শাফিন আহমেদ প্রমুখ পপ শিল্পীরা এখন কি গাইছেন? তারা কি জানেন, আর্টসেল, শূন্য, অর্থহীন প্রভৃতি নতুন কোন পপ ব্যান্ড এখন তরুণদের মধ্যে প্রিয়?
    ষাটের দশক কনওয়ে হলে তিনি আসতেন ক্যাজুয়াল পোশাক পরে। সাধারণত কালো অথবা ব্রাউন টাউজার্স এবং ব্রাউন কর্ডরয়ের জ্যাকেট পরে। তরুণদের সংস্পর্শে থাকার ফলে পরবর্তী সময়ে তরুণদের প্রিয় মালটিপকেট জ্যাকেট পরে তিনি সভায় যেতেন। তিনি ভেজিটারিয়ান বা নিরামিষাসী ছিলেন। কোনো এলকোহলিক ডৃংকস খেতেন না। অনবরত চা খেতেন। তার হাতে থাকত ধূমায়িত পাইপ। ইন্টারনেটে পাইপ হাতে টনি বেনের অনেক ছবি আছে। তবে কেউ কেউ বলেন, সবসময় হাতে পাইপ থাকলেও টনি বেন সবসময় পাইপ স্মোক করতেন না। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টনি বেন বলেছিলেন,পাইপ স্মোকিং আমার নেশা নয় – ওটা পেশা… প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু তারপর সেই প্যাকেট বৈধভাবে কেনা যায়। বিষয়টা বেশ বিচিত্র।

    তরুণদের প্রতি
    নিজের জীবনে একক সংগ্রাম চালিয়ে সফল হবার প্রেক্ষিতে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী টনি বেন তরুণদের প্রতি একটি মূল্যবান উপদেশ এবং আশার বানী দিয়ে গিয়েছেন। সেটা হলো, ‘প্রথমে তোমাকে ওরা অবজ্ঞা করবে। তারপর ওরা বলবে তুমি একটা পাগল। তারপর বলবে তুমি বিপজ্জনক। তারপর চলবে একটা নীরবতা। আর তারপর তোমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী কাউকে তুমি দেখবে না।’
    তরুণদের যে কর্মসংস্থান দরকার সেটা টনি বেন বুঝতেন। তার যুদ্ধ বিরোধিতার এটাও একটা কারণ ছিল। তিনি বলেন, “যুদ্ধের জন্য যদি টাকা পাওয়া যায় তাহলে মানুষকে সাহায্য করার জন্যও টাকা পাওয়া সম্ভব… স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং সব কিনিক ও হসপিটালে আরো বেশি লোক নিয়োগ করলে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।”

    পাচটি প্রশ্ন করবে
    টনি বেন একজন চিন্তাবিদও ছিলেন। বিশেষত গণতন্ত্র বিষয়ে তিনি খুব সহজ ভাষায় তরুণদের প্রতি কিছু উপদেশ দেন। ২০০৫ সালে তিনি লেখেন :
    ক্ষমতাশালীদের পাচটি প্রশ্ন করবে :
    ১ আপনার কি ক্ষমতা আছে?
    ২ এই ক্ষমতা আপনি কোনখান থেকে পেয়েছেন?
    ৩ কার স্বার্থে এই ক্ষমতা আপনি কাজে লাগাচ্ছেন?
    ৪ কার কাছে আপনি জবাবদিহি করেন?
    ৫ আপনাকে আমরা কিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারি?
    মনে রেখ :
    ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার শুধু গণতন্ত্রই আমাদের দেয়।
    সে জন্যই কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি গণতন্ত্র পছন্দ করে না।
    আর সে জন্যই প্রতিটি প্রজন্মকে লড়ে যেতে হবে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করতে এবং সেটা বজায় রাখতে।
    এই প্রজন্মের মধ্যে তুমিও আছ, আমিও আছি – এখানে এবং এখনই।

    এই উপদেশের অরিজিনাল ইংরেজিটা নিচে প্রকাশিত হলো। টনি বেন নিজের হাতে কয়েকটি শব্দ ক্যাপিটাল লেটারে লিখে আন্ডারলাইন করে দেন। আশা করি তরুণ পাঠকরা সেটা লক্ষ্য করবেন।
    Ask the powerful five questions:
    1 What power have you got?
    2 Where did you get it from?
    3 In whose interest do you exercise it?
    4 To whom are you accountable?
    5 How can we get rid of you?
    – Tony Benn, 2005

    Only democracy gives us that right.
    That is why NO-ONE with power likes democracy.
    And that is why EVERY generation must struggle to win it and keep it.
    – Including you and me here and NOW.

    টনি বেন তার একটি ডায়রিতে আরো তিনটি মূল্যবান উপদেশ নিয়ে গেছেন :
    ১ জনগণকে বিশ্বাস করো।
    ২ তুমি যা বিশ্বাস করো তার প্রতি সৎ থেকো।
    ৩ নিজের পরিবারের সঙ্গে থেকো।

    বাংলাদেশে যখন রাজনীতি থেকে নীতি বিদায় নিয়েছে, সমাজ থেকে আদর্শ বিদায় নিয়েছে, শিক্ষায়তন থেকে মূল্যবোধ বিদায় নিয়েছে, তখন টনি বেনের এসব উপদেশ পলিটিশিয়ান, সমাজপতি ও শিক্ষাবিদরা প্রচারে উদ্যোগী হতে পারেন।

    একাই একশ হতে পারে
    ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচন বিহীন নির্বাচনে ইনডিয়া ব্র্যান্ড আওয়ামী লীগ “বিজয়ী” হবার পর এবং একজন (অবৈ:) প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা আকড়ে ধরে থাকার পর তরুণ-প্রবীণ কিছু রাজনৈতিক কর্মী-নেতা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা যদি টনি বেনের জীবন পর্যালোচনা করেন অথবা তার আত্মজীবনীমূলক ডায়রিগুলো পড়েন তাহলে তারা আবার আশাবাদী হবেন। পুনরুজ্জীবিত হবেন। তারা বুঝবেন মানুষ একাই একশ হতে পারে। একাই অনেক কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
    আর সেখানেই (অবৈ:) প্রধানমন্ত্রী ও তদীয় পুত্রের ভয়।
    ইনডিয়ান সহযোগিতায় প্রতিটি দলের উপর নজরদারি করা যায়। দলের কিছু নেতাকর্মীকে ফাসি দেওয়া যায়। গুম করা যায়।
    কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি ব্যক্তির ওপর নজরদারি করা অসম্ভব। প্রতিটি ব্যক্তিকে গুম-খুন করা অসম্ভব।
    ব্যক্তি যখন আদর্শে বলীয়ান এবং ক্ষোভে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তখন কোনো সরকারের পক্ষেই তাকে সামলানো সম্ভব নয়। এটাই সত্য।
    নারায়ণগঞ্জে সিরিয়াল অপহরণ, গুম ও খুন এবং তারপর শীতলক্ষ্যাতে সাতটি লাশ পাওয়ার পরে গত কয়েক দিনে সেই শহরে যে জনরোষ বিরাজ করছে সেসব এই সত্যটির প্রাথমিক প্রমাণ মাত্র।

    ফিরে যাই সেই প্রথম প্রশ্নে।
    টনি বেন কে ছিলেন?
    এই প্রশ্নের উত্তরটা পাওয়া যায় জানুয়ারি ২০০৭-এ বিবিসি-র দি ডেইলি পলিটিক্স প্রোগ্রাম কর্তৃক পরিচালিত একটি জনমত জরিপে। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৩৮% -এর মতে বৃটেনের এক নাম্বার পলিটিকাল হিরো টনি বেন। মার্গারেট থ্যাচার পেয়েছিলেন ৩৫% ভোট।

    এবার ফিরে যাবো ক্ষমতা হস্তান্তর প্রসঙ্গে। এই রচনার প্রথম তিনটি উদ্ধৃতিতে :

    ৩ টনি বেন আজীবন কর্মকাণ্ডে তার বাণী বাস্তবায়িত ও সফল করে গেছেন।
    ২ তাজউদ্দীন আহমদ যে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে, সেটাও বাস্তবে ঘটে গিয়েছে।
    ১ সজীব ওয়াজেদ জয় যে আত্মবিশ্বাসমূলক নির্ভয়বাণী দিয়েছেন সেটা কি বাস্তবে চলমান থাকবে? নাকি সেটা অবাস্তব ও ভুল প্রমাণিত হবে? ভবিষ্যতই সেটা বলে দেবে।

    ৩ এপৃল ২০১৪

    facebook.com/ShafikRehmanPresents

    ইতিহাসের দায়

    মুশফিকুল ফজল আনসারী:স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে অন্তত পক্ষে মত প্রকাশের সামান্যতম স্বাধীনতা ভোগ করাটাও এখন কষ্টসাধ্য। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এসকল শব্দ এখন অভিধানেই শোভা পাচ্ছে। অথচ এসবের জন্য কতই না সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ। দেশের মা, মাটি আর মানুষের সে স্বাধীনতা সংগ্রামের আছে গৌরবময় ইতিহাস। কিন্তু স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সময় পরও একটি পক্ষ চাইছে তরুণ প্রজন্মকে তাদের দাসত্বের সীমানা দেখিয়ে আটকে রাখতে। কিন্তু ইতিহাসের পরিণতি অপ্রিয় সত্যের মতো বারবার স্পষ্ট হয়ে থাকে। ইতিহাস কেউ দখলের দুঃসাহস করতে পারে, তবে তাতে তার ইচ্ছের জায়গাটা দখল করে নিতে পারে না।

    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুব বেশী দূরের নয়। তবে দুঃখজনক হলেও নিকট অতীতের এ ইতিহাস নিয়ে জাতির যতটুকু উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দেখা পাবার কথা ছিলো তা হয়নি। সবচাইতে পরিতাপের বিষয় যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর শ্রম-ঘামে দেশ স্বাধীন হলো, তাদের অবজ্ঞা আর অস্বীকারের এক হীন প্রতিযোগিতায় কোমর বেঁধে নেমেছে একটি পক্ষ। আর তার সাম্প্রতিক প্রমাণ বাংলাদেশের কোটি মানুষের প্রিয় নেতা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্প্রতি তথ্য, প্রমাণ, যুক্তি ও ইতিহাস নির্ভর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বিরুপ, অশোভন, অশ্রাব্য প্রতিক্রিয়া।

    দেশের রাজনীতিতে প্রবলভাবে উচ্চারিত একটি নাম তারেক রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো যিনি মিশে গেছেন দেশের তৃণমূলসহ প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। গত ২৫ মার্চ লন্ডনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের দেয়া বক্তব্য ছিলো ইতিহাসের প্রতিধ্বনি, পুনঃশব্দায়ন।

    তারেক রহমান বলেন, ‘শহীদ জিয়া ৭ কোটি মানুষের মনের কথা বুঝতে পেরে তখনকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ব্যর্থতার পর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি কারো পাঠানো নয়, বরং নিজের হাতে ড্রাফট করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’

    অনুষ্ঠানে তিনি তার বক্তব্যের স্বপক্ষে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের দেয়া বক্তব্য, তাদের প্রকাশিত বই ও সাক্ষাৎকার, দেশের বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য, পত্রিকার প্রতিবেদন, বিদেশী সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ, ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড, ভারত রক্ষক সাইটের রেকর্ড প্রদর্শন করেন।

    ইতিহাসের দায়কে গ্রাহ্য করে তারেক রহমান ইতিহাস নির্ভর তত্ত্ব-উপাত্ত্বের দ্বারস্ত হয়েছেন। আর এ দায় দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। সুচিন্তক তারেক রহমান তার সঠিক দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তার এ বক্তব্যে অনেকটা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠার মতো আক্রোশে ফেটে পড়েছে শাসক দল আওয়ামী লীগ।

    যুক্তির বিপক্ষে যেখানে যুক্তিই বাস্তবিক উদাহরণ। সেখানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মাঝারি নেতারা তারেক রহমানের বক্তব্যের বিরোধীতা করেছেন অত্যন্ত অযৌক্তিক, অসংযত ও অশোভন বক্তব্যের ভিতর দিয়ে। এ যেনো অনেকটা যুক্তিতে না পারিলে শক্তিতে দেখে নেবো, সে প্রবাদের বাস্তবায়ন।

    তারেক রহমানের বক্তব্যে তীর্যক সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যারা মিথ্যাচার করছে তারাই প্রথম রাষ্ট্রপতি নিয়ে নতুন ফর্মুলা দিচ্ছে। ঘোষক ফর্মুলা পাল্টে এখন রাষ্ট্রপতি বানিয়ে ফেলেছে। কিছু অর্বাচীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

    আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পর দলটির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমদ তার সমালোচনায় অবিচার করলেন তার নিজের রাজনৈতিক জীবনের উপর। অত্যন্ত অসংযত ভাষায় সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরে আহাম্মক, লেখাপড়া জানে না। … বেয়াদবির একটা সীমা আছে। স্যার স্যার করে মুখে লালা বের করে ফেলত। বঙ্গবন্ধু দেশে এসেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে।’

    দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘এসব অর্বাচীন ইতোমধ্যে ইতিহাস বিকৃতকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের কথা এবং কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই। রাজনীতির মাঠে পরাজিত হয়ে এখন তারা হতাশা থেকে এসব প্রলাপ করছে।’

    আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, এ ধরনের বক্তব্য ইগনোর (এড়ানো) করা ছাড়া কোন অভিব্যক্তি আমার নেই। এ ধরনের কথা যারা বলতে পারে তাদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করা উচিৎ।

    তারেক রহমানের বক্তব্যে সরকার দলীয়দের যুক্তি ও তথ্য প্রমাণছাড়া এ ধরনের গালাগাল নির্ভর সমালোচনা ভিন্ন মতের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অসংযতা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে। ইতিহাস নিয়ে তারেক রহমানের দাবি যদি অসত্যই হয়ে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের উচিত ছিলো তার বক্তব্যে উপস্থাপন করা প্রমাণ ও যুক্তিসমূহের জবাবে তাদের অবস্থানের প্রমাণ তোলে ধরা। তারেক রহমান তার বক্তব্যের স্বপক্ষে যাদের বক্তব্য উদৃত করেছেন তাদের কেউ কেউ এখনও শাসক দলের মন্ত্রী অথবা ঘনিষ্ট বলে পরিচিত। তাদের কাউকেই এ বিষয়ে মুখ খুলতে দেখা গেলনা। তা না করে অন্যরা যে ভাষায় কথা বলেছেন, সেটা তাদের আচরণের পুরনো ভাঙ্গা রেকর্ডের আওয়াজ ছাড়াতো আর কিছুই নয়।

    তারেক রহমান ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করে একটি গবেষণাধর্মী বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি পৃথিবীর এমন এক দেশে তার বক্তব্য দিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি মানুষের মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা বিরাজিত। গণতন্ত্রের তীর্থ বলে খ্যাত গ্রেট বৃটেনে। দেশের বাইরে থাকলেও তার অনূভবে, অস্তিত্বে আর দুচোখ জুড়ে কেবল বাংলাদেশ।

    যদি পরিবারের কথা বলা হয়, তবে বলতে হবে সাত কোটি বাংলাদেশিকে স্বাধীনতার ঘোষণায় উজ্জিবীত করে যিনি নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধের সম্মুখ সমরে, সেই স্বাধীনতার ঘোষকের গর্বিত উত্তরাধিকার তারেক রহমান। প্রতিবেশী দেশে প্রবাস যাপন না করে বুলেট আর মৃত্যুকে সঙ্গী করে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সেনাপতি জিয়াউর রহমানের যোগ্য পুত্র ইতিহাসের সত্যের প্রতিধ্বনি করেছেন। যে মাটি মানুষের রাষ্ট্রনায়ক কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য লড়েননি, লড়েছেন একটি সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশ গড়তে। জীবনের শেষ মুহূর্তে তার নিজের প্রিয় সম্পদ আপন প্রাণকেও দেশের জন্য বিলিয়ে গেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর দেশের মুক্তির জন্য। সে নামটিকেই ইতিহাস থেকে জোর করে মুছে দিতে চাচ্ছে একটি পক্ষ। জাতিকে সে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করতে আর ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতেই দেশের এক ক্রান্তিকালে সোচ্চার কন্ঠে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন তারেক রহমান। কেবল শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা নয় সন্তান হিসাবেও পিতার প্রতি কর্তব্য পালনে ও নির্জলা অসত্যের বিরুদ্ধে ইতিহাস নির্ভর জবাব দেয়াটা যোগ্য পুত্রের দায়িত্বও বটে।

    তারেক রহমান বলেছেন, ‘ইতিহাসের আলোকে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা হয়েছে জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীনতার ঘোষক।’

    তিনি বলেন, ‘৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা হলে ১৭ই এপ্রিল কেন মুজিবনগর সরকার গঠিত হলো, কেন ৮ই মার্চ বাংলাদেশে স্বাধীন সরকার গঠন হলো না, চট্টগ্রামে ২শ’ মাইল দুরে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠাতে পারলে কেন তার বাড়ি থেকে ৬/৭ মাইল দূরে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে খবর পাঠাতে পারলেন না। এসব কোন প্রশ্নের উত্তর শেখ হাসিনাসহ তার দলের নেতৃবৃন্দ না দিয়ে অগণতান্ত্রিক ভাষায় নানা কথা বলছেন। এটাই প্রমাণ করে আমরা যা বলেছি তা-ই ঠিক, জিয়াই বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক।’

    বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, “অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত তার লেখা ‘বাংলাদেশ : ইর্মাজেন্সী অব এ নেশন’ বইয়ের ১৪৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘মেজর জিয়াউর রহমান ওয়াজ দ্যা ফাস্ট এনাউন্স দ্যা ইন্ডিপেন্ডডেন্স অব বাংলাদেশ’ এবং একই বইয়ের ২২৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘দ্যা নেঙট ইভিনিং মেজর জিয়া এনাউন্স দ্যা ফরমিটিকা অব এ প্রবিনশিয়াল গর্ভমেন্ট…’। শেখ মুজিব সরকারের তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল শফি উল্লাহ (অব.) তার লেখা ‘বাংলাদেশ এট ওয়ার’ বইয়ের ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় জিয়াউর রহমানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার কথা’ স্বীকার করেছেন।”

    তারেক রহমান বলেন, গত ২৫ই মার্চ যুক্তরাজ্যে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় তিনি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ দিয়ে কিছু প্রশ্ন উপস্থাপন করেছিলেন তার উত্তরে আওয়ামী লীগ কিছুই বলতে পারেনি।

    গত ৯ এপ্রিল সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিরূপ সমালোচনার জবাবে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার হলের সমাবেশে ঘোষণাপত্রের একটি বক্তব্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “সেখানে লেখা রয়েছে, ‘এতদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি থাকিবেন’। কিন্তু ৭২ সালের ১০ জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে শেখ মুজিব ১২ জানুয়ারী কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন? তখনওতো সংবিধান প্রণীত হয়নি।”

    ইতিহাস নিয়ে কূটতর্ক ও বিতর্কের সূচনা আওয়ামী লীগের হাতেই হয়েছে। তারেক রহমান নিজের মনগড়া কোন বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। তিনি কেবল সেসময়কার কিছু কঠিন সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি শেখ হাসিনার বক্তব্যের ভাষ্যমতো নতুন কোন ফর্মূলাও দাঁড় করাননি আবার তোফায়েল আহমদের মতো, না জেনে বা সত্যকে এড়িয়ে নিজের বক্তব্য সবার সামনে তোলে ধরেননি। বাস্তব সত্য হচ্ছে আওয়ামী লীগে এখন যারা নাক সিটকিয়ে কথা বলছেন, সেই দলে তাদের অবস্থানই অস্পষ্ট। এইতো ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের সময় মন্ত্রীত্ব পাননি দলটির নেতা তোফায়েল আহমদ। তার স্ব-বিরোধী অবস্থানের কারণেই নিজ সভানেত্রীর কাছে স্থান পাননি। আর নিজের মন্ত্রীত্ব ও গুরুত্ব হারানোর বেদনা তখন কেঁদে কেঁদে মিডিয়াকে জানান দিয়েছেন তোফায়েল। এরকম আরো অনেকেইতো রয়েছেন, যাদের কথা বললে কলেবর আরো বড় হয়ে যাবে। তারা যুক্তি, প্রমাণে পরাস্ত হয়ে কেবলি গলাবাজি করে বেড়াচ্ছেন।

    ঘটে যাওয়া ঘটনাই নিজস্ব ক্ষমতাবলে জায়গা করে নেয় তার কাঙ্খিত স্থানে। আর তাই ইতিহাস। ইতিহাস চলে তার নিজস্ব নিয়মে। চাইলেই এর গতিপথ পরিবর্তন করা যায় না। যা ঘটেছে তাই বলতে হবে, আর অপ্রিয় হলেও তাই মেনে নিতে হবে এটা ইতিহাসের দাবি। তারেক রহমানের তার দায় থেকে ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাই জাতির কাছে তুলে ধরেছেন। কেউ মানুক আর না মানুক ইতিহাস সবসময় স্পষ্ট অক্ষরে তার নিজের কথা বলে যাবে।62327_Tareq-Rahaman-London-150x150

    লেখক: সাংবাদিক

    সৌজন্যে: দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২২ এপ্রিল ২০১৪

    গিনেস বুকে নাম ওঠাতে পরবর্তী আওয়ামী প্ল্যান:শফিক রেহমান

    image_76651_0আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে গিনেস ব্রুয়ারির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে কাজ করতেন স্যার হিউ বিভার। তিনি ছুটির দিনে তার বন্ধুদের নিয়ে পাখি শিকার করতে ভালোবাসতেন। তারা যেতেন বনে জঙ্গলে এবং পাহাড়ি এলাকায়। নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য খুজে বেড়াতেন নতুন জাতির পাখিকে।

    ১০ নভেম্বর ১৯৫১-তে এমনই এক শুটিং টৃপে আয়ারল্যান্ডের নর্থ স্লব নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলেন স্যার হিউ এবং তার বন্ধুরা। স্লেনি নদীর তীরে এই জায়গাটি গাছপালায় ভর্তি। এক সময়ে গাছের ডালে বসা একটি গোলডেন প্লোভার (Golden Plover)-এর দিকে বন্দুক তাক করলেন স্যার হিউ।

    কিন্তু তার লক্ষ্য ব্যর্থ হলো।

    তিনি বন্ধুদের বললেন, তার মিস করার কারণ হলো গোলডেন প্লোভার-ই ইওরোপের সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি। বন্ধুরা দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন, ইওরোপে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি হচ্ছে রেড গ্রাউস (Red Grouse)।

    শুটিং টৃপের শেষে তারা সবাই ফিরে গেলেন কাসলবৃজ হাউজে। কিন্তু তর্কের শেষ হচ্ছিল না।

    এক পর্যায়ে স্যার হিউ বুঝলেন, শুধু পাখি বিষয়েই নয়, অন্যান্য বহু বিষয়েও নিশ্চয়ই এ রকম অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর আয়ারল্যান্ড তথা ইওরোপে অমীমাংসিত আছে। চায়ের দোকানে, বিয়ার খাওয়ার পাব (Pub)-এ, অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে অথবা বাড়িতে ডিনার পার্টিতে এ রকম তর্ক নিশ্চয়ই প্রতিদিনই হয়। সুতরাং এমন একটা বই যদি হয় যেখানে বিভিন্ন রেকর্ডের সব লিস্ট থাকবে তাহলে সেটি নিশ্চয়ই জনপ্রিয় হবে।

    যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। পরদিন স্যার হিউ লন্ডনে অবস্থানরত তার দৌড়বিদ ইংরেজ বন্ধু কৃস্টফার চ্যাটাওয়ে-কে ফোন করলেন।

    তুমি তো মাটিতে মিডল আর লং ডিসটান্স রানিংয়ে অন্যতম দ্রুতগামী মানুষ হিসেবে বিশ্বজোড়া নাম করেছ। কিন্তু বলতে পারো আকাশে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি কোনটি? স্যার হিউ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন।
    চ্যাটাওয়ে তার অপারগতা প্রকাশ করলেন। কিন্তু তিনি বললেন, এ বিষয়ে দুই যমজ ভাই নরিস ও রস ম্যাকহুইর্টার, সাহায্য করতে পারবেন। আমার সঙ্গে তারা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। তখনই দেখেছি ওরা ফ্যাক্টস ও ফিগার্স নিয়ে অনেক রিসার্চ করে। এখন ওরা লন্ডনেই ফ্যাক্টস ও ফিগার্সের একটা এজেন্সি খুলেছে।

    স্যার হিউ যোগাযোগ করলেন নরিস ও রসের সঙ্গে। জানতে পারলেন তিনিই সঠিক ছিলেন। রেড গ্রাউসের চাইতে বেশি স্পিডে উড়তে পারে গোলডেন প্লোভার। তবে, লেভেল ফাইটে বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি হচ্ছে অ্যানাটিডে (Anatidae) নামে এক জাতির হাস। এরা ঘণ্টায় ৫৬-৬২ মাইল (৯০-১০০ কিলোমিটার) স্পিডে উড়তে পারে। আর শিকার ধরতে আকাশ থেকে নিচে সবচেয়ে বেশি স্পিডে ডাইভ দিতে পারে পেরেগন ফ্যালকন। ডাইভের সময় তার স্পিড হতে পাড়ে ঘন্টায় ১৮৬ মাইল (৩০০ কিলোমিটার)।

    এরপর স্যার হিউ বিভিন্ন রেকর্ড সংগ্রহ করে একটি বই প্রকাশের জন্য নরিস ও রসকে চুক্তিবদ্ধ করলেন। লন্ডনের ১০৭ ফিট স্টৃটে দুই ভাই একটি নতুন অফিস ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করলেন। পরিণতিতে আগস্ট ১৯৫৪-তে দি গিনেস বুক অফ রেকর্ডস নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের মাত্র ১,০০০ কপি ছাপা হয়েছিল এবং বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে ফৃ বিলি করেছিলেন স্যার হিউ।

    বইটি বিলি করার পর স্যার হিউ আরো কপির জন্য অসংখ্য অনুরোধ পেলেন। অপ্রত্যাশিত সাড়া পাওয়ার পর বইটি বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশের জন্য স্যার হিউ গিনেস সুপারলেটিভস লিমিটেড নামে একটি কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭ পৃষ্ঠার বাধানো দি গিনেস বুক অফ রেকর্ড ২৭ আগস্ট ১৯৫৫-তে বৃটেনে বাজারজাত হয় এবং এটি ডিসেম্বরে কৃসমাসের সময়ে বৃটিশ বেস্টসেলার লিস্টে টপে যায়।

    এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পরের বছরে বইটি আমেরিকা সংস্করণ প্রকাশ করেন স্যার হিউ। সেখানে প্রথম বছরেই বইয়ের ৭০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়।

    এরপর বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর বইটি প্রকাশিত হতে থাকে। প্রতি বছরই বইটির নতুন সংস্করণ বাজারে আসা শুরু করে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরে যেন ডিসেম্বরে কৃসমাস বাজারটা ধরা যায়। ঈদ বার্ষিকী অথবা পূজা বার্ষিকীর মতোই গিনেসের নতুন সংস্করণের জন্য কৃসমাসের সময়ে পাঠকরা আগ্রহে অপেক্ষা করে। বিশেষত কিশোর-কিশোরীরা। নতুন বইয়ে কিছু পুরনো রেকর্ড বাদ দিয়ে বিগত বছরের নতুন রেকর্ডগুলো সংযোজিত হয়। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে যারা রেকর্ড করেন, বা রেকর্ড প্রত্যাশী, যেমন, স্পোর্টসে (অলিম্পিক, ফুটবল, কৃকেট, সুইমিং, ট্র্যাক ইভেন্টস) মুভি, বিজনেস অথবা পলিটিক্সে, তারা এই বইয়ে নিজের নাম ওঠানোর চাইতে নিজস্ব ক্ষেত্রে স্পেশালাইজড রেকর্ড বুকে নাম ওঠাতে বেশি উৎসাহী। যেমন, ক্রিকেট প্লেয়াররা চান উইসডেন (Wisden) বুকে নিজের নাম ওঠাতে যেখানে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের নাম উঠেছে। উইসডেন প্রতি বছর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। অর্থাৎ যারা স্বভাবগতভাবে প্রতিযোগিতাপরায়ণ তারা গিনেস বুকের তোয়াক্কা করেন না।

    ম্যাকহুইর্টার ভাই দুজন বহু বছর বইটির তথ্য সংকলক ও সম্পাদক ছিলেন। এই বইয়ের সাফল্যের পিঠে চড়ে তারা রেকর্ড ব্রেকার্স নামে একটি টিভি সিরিজ উপস্থাপন করেন। এই অনুষ্ঠানে কিশোর কিশোরীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিচিত্র রেকর্ড বিষয়ে প্রশ্ন করত দুই ভাইকে। এই দুই যমজ ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ।

    ইতিমধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী গেরিলা দল আইআরএ (IRA) দুই ভাইকে চিহ্নিত করেছিল আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা বিরোধী রূপ। তাদের হাতে ১৯৭৫-এ নিহত হন রস ম্যাকহুইর্টার। এরপর এই টিভি অনুষ্ঠানটির নতুন নাম হয় নরিস অন দি স্পট।

    নিজস্ব গুন ও বৈচিত্র এবং পাশাপাশি এই টিভি অনুষ্ঠানের ফলে দি গিনেস বুক অফ রেকর্ডস হয় একটি সুপরিচিত নাম এবং সফল পণ্য, বিশেষত বিনোদনের জগতে বা এন্টারটেইনমেন্ট ওয়ার্ল্ডে।

    গিনেস ব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষ প্রথমে বইটি গিনেস সুপারলেটিভস লিমিটেডের নামে প্রকাশ করলেও দ্রুত এই কম্পানির নাম বদলে করেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লিমিটেড। আমেরিকায় তারা স্টার্লিং বুকসের নামে বইটি প্রকাশ করেন। এরপর বইটি প্রকাশিত হতে থাকে ডায়াজিও (Diageo)-র ব্যানারে ২০০১ পর্যন্ত। তারপর বইটির কপিরাইট কিনে নেয় জুলেইন এন্টারটেইনমেন্ট (Guillane Entertainment)। মাত্র এক বছর পরেই জুলেইন এন্টারটেইনমেন্টকে কিনে নেয় এইচআইটি এন্টারটেইনমেন্ট (HIT Entertainment)। ২০০৬-এ এপ্যাক্স পার্টনার্স কিনে নেয় এইচআইটি এন্টারটেইনমেন্টকে। এর দুই বছর পরে ২০০৮-এ দি জিম প্যাটিসন গ্রুপ কিনে নেয় এপ্যাক্স পার্টনার্সকে। এখন জিম প্যাটিসন গ্রুপই গিনেস বুকের প্রকাশক। কিন্তু জিম প্যাটিসন গ্রুপের মালিক কে?

    উত্তর : রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট (Ripley Entertainment) যাদের হেড কোয়ার্টার্স হচ্ছে আমেরিকায় ফোরিডার অরল্যান্ডো শহরে। তবে তারা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের হেড কোয়ার্টার্স রেখেছে লন্ডনে। এই কম্পানি যুগপৎ গিনেস ওয়ার্ল্ড রের্কস এট্রাকশন্স নামেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মিউজিয়াম বা যাদুঘর চালাচ্ছে। পাশাপাশি রিপলির বিলিভ ইট অর নট (বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন) যাদুঘরও চালাচ্ছে।

    বলা যায়, ১৯৫৪-তে সিরিয়াস তথ্য এবং রেকর্ড সংকলনের জন্য প্রতিষ্ঠিত কম্পানিটি এখন ৬০ বছর পরে নতুন মালিকানায় সিরিয়াস এবং ননসিরিয়াস, হালকা ফালতু ও আনন্দদায়ক তথ্য ও রেকর্ডের বইটির প্রকাশক হয়েছে। বর্তমান গিনেস বুকের এন্টাইটেইনিং চরিত্রের সঙ্গে মিল আছে রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট নামের। ইতিমধ্যে গিনেস বুকের নামও বদলে গেছে। এখন এটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নামে বের হয়- দি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নামে নয়।

    সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোতে গিনেস বেশি জোর দিয়েছে মানুষের প্রতিযোগিতা ও বিচিত্র কর্মকাণ্ডের ওপর। যেমন, কে সবচেয়ে বেশি ভার উত্তোলন করতে পারল অথবা কে সবচেয়ে বেশি হ্যামবার্গার দশ মিনিটে খেতে পারল। তবে খাওয়া এবং মদ্যপান বিষয়ে এখন গিনেস আর নতুন কোনো দাবি গ্রহণ করছে না মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে। এসব রেকর্ড ছাড়াও গিনেস প্রকাশ করেছে সবচেয়ে বড় টিউমার কার ছিল, সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ কোনটি, সবচেয়ে ছোট নদী কোনটি, সবচেয়ে বেশি সময় জুড়ে প্রচারিত টিভি সিরিয়াল কোনটি অথবা সবচেয়ে কম বয়স ব্যক্তি কে পৃথিবীর সব দেশে ঘুরে এসেছে। কে নাক দিয়ে সবচেয়ে বেশি নুডলস বের করতে পারে। কার চুল, নখ কতো লম্বা, ইত্যাদি।

    ১৯৯৫-এ নরিস ম্যাকহুইর্টার গিনেস প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে পদচ্যুত হন। তার বিদায়ের পর গিনেস বুক ক্রমেই বদলে যেতে থাকে। টেক্সটসহ তথ্যের বদলে ছবিসহ তথ্য গিনেসের পাতা দখল করে। এটাও একটা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ গিনেস বুকের মূল পাঠক কিশোর-কিশোরীরা লেখার চাইতে ছবি বেশি পছন্দ করে। এর একটি তাৎপর্য হচ্ছে এই যে অধিকাংশ বিশ্ব রেকর্ডই এখন আর বইতে (অথবা তাদের অনলাইন ওয়েবসাইটে) নেই। গিনেস বুকের বর্তমান প্রকাশক নিঃসঙ্কোচে তথ্য পরিবেশনের বদলে আনন্দ পরিবেশনে এগিয়ে গিয়েছেন। তবে কেউ যদি কোনো রেকর্ড প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে পারেন যদি লিখিতভাবে গিনেস বুক প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঠিকানা : www.guinnessworldrecords.com
    সাধারণত এসব চিঠির উত্তর বিনা দামে মাস দেড়েকের মধ্যে দেওয়া হয়। তবে কেউ যদি দ্রুত উত্তর চান তাহলে ৪৫০ ডলার (প্রায় ৩৬,০০০ টাকা) ফিস দিতে হবে।

    এটা ঠিক যে বিশ্বের বহু রেকর্ডই গিনেস বুকে পাওয়া যাবে এবং সেখানে সেটা না থাকলে গিনেস কর্তৃপক্ষের ডেটা বেইসে পাওয়া যাবে। বিভিন্ন কারণে গিনেস বুকে পুরনো রেকর্ড সরিয়ে ফেলা হয়। সেটা হতে দৈহিক বিপদ অথবা নৈতিক অথবা পরিবেশগত কারণে। একবার সবচাইতে বেশি ওজনের মাছের রেকর্ড প্রকাশিত হবার পর অনেকেই তাদের ফার্মে মাছকে বেশি খাইয়ে মোটা করার চেষ্টায় ব্রতী হন। ওয়াইন, বিয়ার, হুইস্কি জাতীয় অ্যালকোহলিক ডৃংক খাওয়ায় রেকর্ড প্রতিষ্ঠায় অনেকেই উৎসাহী হন। কেউ কেউ মোটর সাইকেল খাওয়া অথবা ব্লেড গলার মধ্যে ঢোকানোতে আগ্রহী হন। এসব এখন বন্ধ করা হয়েছে।

    আরেকটি বিষয়ে গিনেস বুক রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করে না। সেটি হচ্ছে সৌন্দর্য। গিনেস কর্তৃপক্ষ বলেন, সৌন্দর্যের পরিমাপ সম্ভব নয় – সেটা নির্ভর করে যিনি দেখছেন তার চোখের ওপর। সুতরাং বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নারী অথবা সুন্দর পুরুষটি কে সেটা গিনেস বুকে জানা যাবে না।

    গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এখন ইংরেজিসহ মোট ২৯টি ভাষায় প্রকাশিত হয়। সাধারণ এ-ফোর সাইজে এই বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা হয় ২৮০-র কম। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০১৪ বৃটিশ সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৭২ এবং দাম ২০ পাউন্ড (প্রায় ২,৫০০ টাকা)।

    বইটি নিজেই বিশ্ব রেকর্ড
    বইটির নিজের সম্পর্কেই তথ্যগুলো ইনটারেসটিং। যেমন :

    বিশ্বে কপিরাইট থাকা বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই প্রতি বছর বিক্রি হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। বইটির বর্তমানে সম্পাদক ক্রেইগ গ্লেনডে (twitter@craigglenday)। কপিরাইট মুক্ত সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বই বাইবেল।

    আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরি থেকে সবচেয়ে বেশি চুরি হওয়া বই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস।

    বৃটেন, আমেরিকা, কানাডা, ফ্রেঞ্চ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড, ডেনমার্ক, হল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, ইটালি, নরওয়ে, পর্টুগাল, রাশিয়া, স্পেন, ব্রাজিল ও সাউথ আমেরিকার অন্যান্য দেশের কপিগুলো ছাপা হয় স্পেনের বার্সেলোনাতে।

    উপরোক্ত সব সংস্করণ ছাপতে ৯৫ দিন লাগে। এর জন্য দরকার হয় ৪৮,৫০০ মিটার (১০,৬৬৮ গ্যালন) কালি যার সমপরিমাণ তেল দিয়ে চারটি ৭৪৭ জাম্বো জেটের ফিউয়েল ট্যাংক ভরা যায়।

    কভারের জন্য প্রয়োজনীয় সিলভার ফয়েল-এর দৈর্ঘ্য হয় ৪৭১ কিলোমিটার (২৯২ মাইল)। কভার বাইন্ডিংয়ের জন্য দরকার হয় ৬৭২.৭ টন কার্ডবোর্ড।

    বইয়ের কাগজের জন্য দরকার হয় ৩,৫০০ টন ১১০ gsm ফিনেস ২২০ পেপার যা আসে ফিনল্যান্ড ও জার্মানি থেকে।

    অন্যান্য সব সংস্করণ (জার্মানি, গৃস, ইসরেল, চায়না, জাপান, ক্রোয়েশিয়া, চেক রিপাবলিক, এস্টোনিয়া, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ল্যাটভিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং আরব দেশগুলোর জন্য) কপিগুলো ছাপা হয় একযোগে বিভিন্ন দেশে। বলা বাহুল্য, এদের জন্য যে কালি, ফয়েল, কার্ডবোর্ড ও কাগজ দরকার তার হিসাব আলাদা।

    মাত্র একটি বই প্রতি বছরে একবার প্রকাশের জন্য যে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে সেটাই আরেকটা রেকর্ড।

    গিনেস, গ্রীনিচ, গ্রীনিজ
    গিনেস রেকর্ড বিষয়ে যখন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা এবং রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা উৎসাহিত হওয়া শুরু করেন তখন তাদের অধিকাংশই জানতেন না গিনেস নামটির সঠিক বানান ও উচ্চারণ এবং এই রেকর্ড সংকলনের উৎপত্তি কিভাবে শুরু হলো। দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা হতো গ্রীনিচ বুক অফ রেকর্ডস। তাই নেতানেত্রীরা একে বলতেন গ্রীনিচ রেকর্ডস। এই ভুলটি তারা করেছিলেন কারণ তারা বিবিসির বাংলা খবরের সূচনাতেই শুনতেন, এখন গ্রীনিচ মান সময় বাক্যটি। তারই ফলে আয়ারল্যান্ডের গিনেস বাংলাদেশে হয়ে যায় গ্রীনিচ!

    এই ভুল নতুন মাত্রা পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কৃকেটার গর্ডন গ্রীনিজ বাংলাদেশ কৃকেট টিমের কোচ নিযুক্ত হবার পর। পত্রপত্রিকা এবং নেতানেত্রীরা বলা শুরু করেন গ্রীনিজ রেকর্ডস। অর্থাৎ, ভুল সংশোধন করতে গিয়ে আরেকটি ভুল তারা করতে থাকেন। এ বিষয়ে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ একাধিকবার লেখালেখির পর ক্রমে গিনেস নামটি বাংলাদেশে চালু হতে থাকে।

    মজার কথা এই যে, পশ্চিমের কোনো দেশে গিনেস শব্দটি উচ্চারণ করলে, মানুষ মনে করবে গিনেস বিয়ারের কথা বলা হচ্ছেÑ গিনেস রেকর্ডের কথা নয়। কারণ বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে উৎপাদিত এবং ১০০টির বেশি দেশে বিক্রি হওয়া গিনেস বিয়ারের জনপ্রিয়তা।

    বিয়ার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন লাগার (Lager), পিলসনার, স্টাউট, ইত্যাদি। বিয়ারে এলকোহলের পরিমাণ ২% থেকে ৮% পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত বিয়ারে এলকোহলের পরিমাণ হয় ৫%। বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া হাইনিকেন ৫% এবং ফস্টার্স-এ ৪.৯% এলকোহল থাকে।

    বিয়ার উৎপাদিত হয় ব্রুয়ারিতে। ১৭৫৯-এ আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে আর্থার গিনেস প্রতিষ্ঠা করেন গিনেস ব্রুয়ারি। গিনেস বিয়ার পরিচিত হয় স্টাউট (Stout) নামে এবং এর রং ও স্বাদ হয় অন্য বিয়ারের চাইতে ভিন্ন। দামও কিছুটা বেশি। গিনেসের রং গাঢ় চকোলেট বা প্রায় কালো। এটি ঘন এবং ফেনায়িত। বিভিন্ন ধরনের গিনেস স্টাউটে বিভিন্ন পরিমাণ এলকোহল থাকে এবং তার পরিমাণ হতে পারে সর্বোচ্চ ৭.৫% (গিনেস ফরেইন একস্ট্রা স্টাউট-এ)। তবে বিশ্ব জুড়ে যে গিনেস অরিজিনাল স্টাউট বিক্রি হয় সেখানে এলকোহলের পরিমাণ থাকে ৪.২% যেটা হাইনিকেন, কালর্সবাগ, ফস্টার্সের চাইতে কম।

    গিনেসের স্বাদ তিতা। এর স্বাদ কষ্ট করে আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু কেন গিনেসপায়ীরা কষ্ট করে গিনেসের স্বাদ আয়ত্ত করেন এবং তারপর বেশি দাম দিয়ে গিনেস খেতে অভ্যস্ত হন? এই প্রশ্নের উত্তরটা হচ্ছে অনেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, গিনেস স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

    স্বাস্থ্যের জন্য ভালো
    ১৯৫৭-তে লন্ডনে গিয়ে বড় বড় বিলবোর্ডে দেখতাম গিনেস ইজ গুড ফর ইউ (Guinness is good for you) স্লোগান সংবলিত বিজ্ঞাপন। ওইসব বিজ্ঞাপনে দেখা যেত, একজন গিনেসপায়ী পুরুষ বিশাল ভারের লোহার স্ল্যাব স্বচ্ছন্দে তুলে দাড়িয়ে আছে।

    অথবা গিনেসপায়ী পুরুষ দৌড়ে, সাতারে, নৌকা বাইচে প্রথম হচ্ছে। ইংরেজ লেখিকা ডরোথি এল. সেয়ার্স এই স্লোগানটির উদ্ভাবক ছিলেন।

    গিনেস যে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটা প্রমাণ করতে এক সময়ে গিনেস কর্তৃপক্ষ ডাক্তারদের কাছে গিনেসের বোতল (সেই সময়ে ক্যান ছিল না) পাঠিয়ে দিতেন তাদের পেশেন্টকে ফৃ দিতে।

    গিনেসের এই মার্কেটিং ট্যাকটিক্সের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় অন্যান্য বিয়ার উৎপাদনকারীরা। তখন গিনেস কর্তৃপক্ষ ওই বিজ্ঞাপনী স্লোগান বাদ দিতে বাধ্য হন।

    এই বিতর্ক সত্ত্বেও এটা স্বীকৃত সত্য যে, সব বিয়ারের মধ্যে গিনেসেই এমন সব কেমিকাল মিশ্রিত আছে যা কলেস্টেরল কম রাখতে এবং দেহে রক্ত চলাচল ভালো রাখতে সহায়ক।

    বাংলাদেশে গিনেস ম্যানিয়া
    গিনেস ব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠাতা আর্থার গিনেস, অথবা গিনেস বুক অফ রেকর্ডসের জন্মদাতা স্যার হিউ বিভার অথবা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বইটির বর্তমান মালিক রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট কখনো কল্পনাও করেননি যে, সুদূর বাংলাদেশে, যেখানের মানুষ কখনো গিনেস খায়নি, এমনকি গিনেসের নামও শোনেনি, তারা গিনেসে এত উৎসাহী হবে।

    গত কয়েক মাস যাবৎ বাংলাদেশে গিনেস বুকে নাম ওঠানোর ম্যানিয়া সৃষ্টি করা হয়েছে।

    প্রথমে এই কর্মটি করেন রবি মোবাইল ফোন কর্তৃপক্ষ। তারা বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশের একটি মানবপতাকা গঠনে অংশ নিতে আহ্বান জানান। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩-তে তারিখে ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে এই মানবপতাকাটি গঠিত হয়। তবে যেহেতু এটি ছিল মানবসহ এবং স্থলভূমিতে আবদ্ধ সেহেতু সাধারণ পতাকার মতো এটিকে আকাশে ওড়ানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাতে কী? গিনেস বুকে তো নাম উঠলো।

    এই আত্মপ্রসাদ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক দিন পরেই জানা গেল পাকিস্তান এই রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের চাইতে বড় মানবপতাকা ভূমিতে তৈরি হয়েছে।

    মানবপতাকার এই রেকর্ড সৃষ্টি এবং সেটি ভঙ্গের পর প্রচার উৎসাহী আওয়ামী লীগ সরকার স্থির করে এবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সর্বাধিক কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইবার রেকর্ড সৃষ্টি করতে হবে।

    এই প্ল্যান কার্যকর করতে রাজধানী জুড়ে বড় বড় বিলবোর্ড স্থাপিত হয়। মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠান হয়। মিডিয়া জুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান হয়। বাংলাদেশের মানুষকে দেশপ্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বীবিহীন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আহবান জানান হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে ২৬ মার্চে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হলে জনপ্রতি ১,০০০ টাকা দেওয়া হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, ১০০০ টাকা নয় মাত্র ৬০ টাকা দেওয়া হবে। তবে আসা-যাওয়া এবং দুপুরের খাওয়া ফৃ দেয়া হবে। এদের আনা নেওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশে আন্ত:জেলা রুটের কোচগুলো দুইদিন ধরে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়। এই গিনেস প্রকল্পে মোট কত টাকা সরকার খরচ করেছে আশা করি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অচিরেই জানা যাবে।

    আওয়ামী লীগ সরকার কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আবার প্রমাণ করে ইংরেজ চিন্তাবিদ ড. স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-১৭৮৪) ঠিকই বলেছিলেন। তার বিখ্যাত উক্তি Patriotism is the last refuge of a scoundrel (প্যাটৃয়টিজম ইজ দি লাস্ট রিফিউজ অফ এ স্কাউনড্রেল) বা শয়তানের নিরাপত্তার শেষ ভরসা হচ্ছে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করানো।

    বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এবং দেশপ্রেমিকরা বুঝতে পারেননি গিনেস বুকে নাম ওঠানোর “সাফল্য” “কৃতিত্ব” ইত্যাদি অলিম্পিক বা ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে সাফল্যের সাথে কোনোমতেই তুলনীয় নয় এবং সেখানে সাফল্যের মতো সম্মানিতও নয়। উল্লেখ করা যেতে পারে ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও কিউবা ও জ্যামাইকা অলিম্পিকে বহু সাফল্য অর্জন করেছে। ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও উরুগুয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়েছে এবং এবারও তারা ২০১৪-র চূড়ান্ত রাউন্ডে ব্রাজিলে খেলবে।

    প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতামূলক এসব ইভেন্টে বাংলাদেশ কোথায়? উত্তর: এসব ইভেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা হাতে কিছু স্পোর্টস কর্মকর্তার উপস্থিতিতে।

    গণপ্রচারণায় আসক্ত আওয়ামী লীগ
    প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন ‘বিজয়ী’ নির্লজ্জ আওয়ামী লীগ এখন শঙ্কিত চিত্তে অপেক্ষা করছে ২৬ মার্চে প্রতিষ্ঠিত গণসঙ্গীত গাইবার রেকর্ড পাকিস্তান অথবা অন্য কোনো দেশ অচিরেই ভাঙ্গবে কিনা।

    মানুষ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অগ্রণী দেশ। ১৯৪৭-এ এই ভূখন্ডের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার কোটি। ১৯৭১-এ ছিল সাড়ে সাত কোটি। এখন ২০১৪-তে ধারণা করা হয় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ষোল থেকে আঠার কোটির মধ্যে। সঠিক সংখ্যাটি যাই হোক না কেন, আওয়ামী লীগ সরকার তার আর্থিক ও প্রশাসনিক শক্তি এবং আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সবসময়ই চেষ্টা করে যাবে, বাংলাদেশের মানবশক্তিকে প্রচারণার কাজে লাগিয়ে গিনেস বুকে তাদের নাম ওঠাতে।

    বিশ্বের সপ্তম জনবহুল দেশ এখন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চাইতে বেশি জনবহুল ছয়টি দেশ, যথাক্রমে, চায়না, ইন্ডিয়া, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও পাকিস্তান। এদের মধ্যে পাকিস্তান বাদে আর কোনো দেশ জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে মনে হয় না।

    আওয়ামী লীগের এই মহান কর্মকাণ্ডে সহায়ক হবার জন্য দুই ধরনের গিনেস রেকর্ড প্রকল্প শুরু হতে পারে। এক. যেসব ক্ষেত্রে অলরেডি গিনেস রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সেসবের দাবি করে গিনেস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে আওয়ামী সরকার। এবং দুই. নতুন কিছু রেকর্ড প্রতিষ্ঠার জন্য এখন থেকেই কাজে নেমে যাওয়া, অর্থাৎ বিলবোর্ড প্রস্তুত করা এবং টাকা খরচ করা।

    যেসব ক্ষেত্রে গিনেস রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তাদের অন্তত দশটি নিচে উল্লেখ করা হলো :

    রানা প্লাজা দুর্ঘটনা: কোনো গার্মেন্টস ভবনে ধসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত।
    তাজরীন গার্মেন্টস: কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত।
    ডেসটিনি: কোনো পিরামিড ফাইনান্স ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বিনিয়োগকারী প্রতারিত।
    শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ: আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফাসির দণ্ডে দণ্ডিত করার লক্ষ্যে আইন বদলানো দাবিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনসমাবেশ এবং তার প্রেক্ষিতে প্রচলিত আইন বদলিয়ে ফাসির দণ্ড দিয়ে সেটা কার্যকর।
    শাপলা চত্বরে হেফাজতের মে ২০১৩ সম্মেলন : ধর্মপরায়ণ মানুষের প্রতিবাদ সম্মেলনে সর্বোচ্চ সংখ্যাকের সমাবেশ এবং সেখানে সরকারি বাহিনীর গুলিচালনার পর প্রধানমন্ত্রীর দাবি সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের “পাখি হয়ে ফুরুৎ করে আকাশে উড়ে যাওয়া”।

    সারা দেশ জুড়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক গণহুলিয়া জারি করা।

    ব্যাপকতম প্রশ্নপত্র ফাস হওয়া।

    সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা চুরি ও লুট হওয়া।

    ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচন : নির্বাচন ছাড়াই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়া এবং বাকি ১৪৭টি আসনে ৩% থেকে ৫% মানুষের ভোটে অংশগ্রহণে বিজয়ী হওয়া।

    এবার আপনি আপনার পছন্দ মতো আরো কিছু নাম এই লিস্টে যোগ করতে পারেন। যেমন, সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা ঝুলে থাকা, সর্বোচ্চ সংখ্যক সরকারি কর্মচারিদের ওএসডি হওয়া। ইত্যাদি।

    অন্তত পাচটি নিউ গিনেস প্রজেক্ট আওয়ামী সরকার শুরু করতে পারে। যেমন :

    ঢাকার বেড়িবাধের পাশে তুরাগ নদীকে ভূমিদস্যুদের কবলমুক্ত করার জন্য জনসমাবেশ করা।

    ঢাকার পাশে চার নদী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা এবং বালুকে দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে জনকর্মীদের সম্মিলিত করা।

    সারা দেশে শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ঢাকাস্থ ইউনিভার্সিটিগুলোর সর্বোচ্চ সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে মফস্বলে অন্ততপক্ষে ছয় মাস অবস্থান ও মফস্বলের স্কুলে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা।

    পরিচ্ছন্ন রাজধানী দিবস পালন উপলক্ষে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনকর্মীর সমাবেশ ঘটানো।

    তিস্তা এবং পদ্মাকে বাচানোর জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মিছিল করে ওই দুই নদীর তীরে যাওয়া।

    পারবে কি ইনডিয়া ব্র্যান্ড আওয়ামী সরকার এসব করতে?

    এসব যদি পারতো তাহলে গিনেস বুকে নাম উঠুক বা না উঠুক, বাংলাদেশের অবস্থার কিছু উন্নতি হতো।

    ১২ এপৃল ২০১৪

    (বানান রীতি লেখকের নিজস্ব )

    শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক, টিভি অ্যাঙকর, বিবিসির সাবেক কর্মী (১৯৫৭-১৯৯১), লন্ডনে বহুভাষাভিত্তিক স্পেকট্রাম রেডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১৯৮৭-১৯৯২)। fb.com/ShafikRehmanPresents

    একজন স্পষ্টবাদী সাংবাদিক এবিএম মূসা শফিক রেহমান

    30282_post-1পঞ্চাশের দশকে ফেব্রুয়ারির এক বিকেল।
    ঢাকা স্টেডিয়ামে পড়ন্ত রোদের আলো আর বসন্তের মৃদু বাতাসের মধ্যে উপস্থিত কয়েক হাজার দর্শক সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাদের প্রিয় দুটি ফুটবল কাবের প্লেয়ারদের মাঠে আসার জন্য। ওই দুটি দল ছিল ভিক্টোরিয়া কাব এবং ঢাকা ওয়ান্ডারার্স কাব। সেই সময়ে ওই দুটি দলের মুখোমুখি হবার দিনটি হতো এই দেশের ফুটবল লিগে সর্বাধিক প্রতীক্ষিত এবং বহুল আলোচিত। এখন যেমন আবাহনী ক্রীড়াচক্র বনাম মোহামেডান স্পোর্টিং কাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিনটি।
    সেদিন ভিক্টোরিয়া বনাম ওয়ান্ডারার্স ম্যাচের ফলাফলের ওপরে নির্ভর করছিল লিগ চ্যাম্পিয়নের শিরোপাটি।
    এমন দিনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত গুটি কয়েক দৈনিক পত্রিকার স্পোর্টস রিপোর্টাররা অবশ্যই স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকতেন। যেমন, দৈনিক সংবাদ-এর লাডু ভাই, দৈনিক আজাদের জাফরভাই, দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভারের আবুল বাশার মোহাম্মদ মূসা সংক্ষেপে এবিএম মূসা এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর আমি।
    আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্সের ছাত্র ছিলাম। বিকেল ও সন্ধ্যায় ছিলাম ইত্তেফাকের স্পোর্টস রিপোর্টার । মূসা ছিলেন আমার চাইতে প্রায় চার বছরের বড় এবং অবজার্ভারের ফুলটাইম রিপোর্টার।

    স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখলাম মূসা তখনো আসেন নি। অবাক হলাম। তিনি ছিলেন সময়নিষ্ঠ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ তরুণ সাংবাদিক।
    প্রতিদ্বন্দ্বী দুই কাবের জার্সি পরা প্লেয়াররা মাঠে নামলেন। গোলমুখে বল প্র্যাকটিস শুরু করলেন। দর্শকদের তালি ও হর্ষধ্বনি হলো।
    তবুও মূসার কোনো চিহ্ন নেই।
    অবাক হলাম।
    এ রকম তো আগে কখনো হয় নি?
    চিন্তিতও হলাম।
    কোনো দুর্ঘটনা?
    কিন্তু প্রাক-মোবাইল ফোন যুগে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব ছিল না।

    ম্যাচ শুরু হয়ে গেল।
    হাফটাইম হলো।
    ম্যাচ শেষ হয়ে গেল।
    তবুও মূসার কোনো খবর আমরা পেলাম না।

    এবিএম মূসা কেন সেদিন একটা ইম্পরট্যান্ট ফুটবল ম্যাচ কভার করতে আসেন নি, সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম পরদিন।

    কিন্তু সে কথা পরে বলব।
    সুদর্শন, লম্বা শ্যামলা, মাথায় ঘন চুলবিশিষ্ট এবং অনর্গল কথা বলতে পারদর্শী এবিএম মূসা সহজেই আকৃষ্ট করতেন খেলাধুলার ভুবন থেকে রাজনৈতিক ভুবনের মানুষজনকে। পরবর্তী কালে তিনি পাকিস্তান অবজার্ভারের নিউজ এডিটর রূপে উন্নীত হয়েছিলেন। বলা হতো তার নিউজ সেন্স ছিল সব নিউজ এডিটরের মধ্যে সেরা। পেইজ মেকআপ করার সময়ে তিনি ত্বরিতে বলে দিতেন কোন নিউজটা লিড হবে। কোনটা সেকেন্ড, কোনটা থার্ড লিড। কোন ফটো ব্যবহার করতে হবে। ইত্যাদি।

    ষাটের দশকে ঢাকায় পাকিস্তান অবজার্ভারের মূসার যখন ক্রমোন্নতি হচ্ছিল, আমি তখন লন্ডনে চার্টার্ড একাউন্টেন্সি পড়ছিলাম এবং বিবিসিতে পার্টটাইম কাজ করছিলাম। এই সময়ে তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ১৯৬৮-তে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এলেও মূসার সঙ্গে কমই দেখা হতো।
    বিবিসিতে কাজ করার সুবাদেই ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মূসার সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। আমি ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম জুন ১৯৭১-এ এবং আবার বিবিসিতে পার্টটাইম কাজ শুরু করি। এই সময়ে মূসা বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে নিয়মিত নিউজ ফাইল করতেন। তিনি লন্ডনে দি সানডে টাইমস পত্রিকারও করেসপনডেন্ট ছিলেন। মুসার এসব রিপোর্ট ছিল ফ্যাক্টস-নির্ভর এবং আবেগবর্জিত। তাই বিবিসি কর্তৃপক্ষের কাছে তার রিপোর্ট ছিল বিশ্বাসযোগ্য।
    মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এ আমি নতুন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসি ।
    মূসার সঙ্গে দেখা হলো পুরনো ডিআইটি ভবনে বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্পরেশন-এর অফিসে। পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পরেশন বা পিটিভির নাম বদলে হয়েছিল বিটিভি।
    তখন কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ সরকার কাকে নিয়োগ দেবে বিটিভি-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে। মূসা সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন আমি সেই পদে ইনটারেসটেড কি না। কারণ, ডিসেম্বর ১৯৭০-এ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বিটিভির দুই দিন টানা ইলেকশন প্রোগ্রামে আমি ছিলাম অন্যতম উপস্থাপক। যেহেতু চার্টার্ড একাউন্টেন্ট রূপে সংখ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া করা ছিল আমার পেশা, সেহেতু ইলেকশনে একটানা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা জুড়ে বিভিন্ন সংখ্যার সহজ প্রেজেন্টেশন ও ব্যাখ্যা দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। তাই অনেকেই ভাবছিলেন আমি হয়তো বিটিভিতে যোগ দেব। কিন্তু আমি প্রধান পেশা ছেড়ে মিডিয়াতে ফুলটাইম কাজে আগ্রহী ছিলাম না। তাই মূসাকে সেটাই বললাম।

    শুনে মূসা খুশি হলেন এবং জানালেন তিনি বিটিভির এমডি পদে কাজ করতে আগ্রহী।
    মূসাকে সেই পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান।
    কিন্তু কয়েক মাস পরেই মূসা হয়তো বোঝেন যে টেলিভিশন তার ক্ষেত্র নয়। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন রাজনীতি তার ক্ষেত্র। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী রূপে নোয়াখালী-১ আসন থেকে এমপি হন।
    নভেম্বর ১৯৭৫-এ আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায় ঘটলে মূসা রাজনীতি ছেড়ে দেন।
    জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ১৯৭৮-এ মূসা ব্যাংককে জাতিসংঘের পরিবেশ কার্যক্রমের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের (এসকাপ) আঞ্চলিক পরিচালক পদে যোগ দেন। যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের আনুকূল্যে মূসা হয়েছিলেন বিটিভির এমডি এবং জাতীয় সংসদের এমপি, তবুও জিয়াউর রহমান মূসার যোগ্যতাকে বিবেচনা করে তার ব্যাংকক যাত্রা সমর্থন করেছিলেন।
    এসকাপের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত মূসা বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের (পিআইবি) ডিরেক্টর জেনারেল পদে কাজ করেন এবং পরে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) -এর এমডি পদে কাজ করেন। বলা যায় এবিএম মূসা তিন সরকারপ্রধান, শেখ মুজিব, জিয়া এবং এরশাদের স্নেহধন্য হয়েছিলেন।

    তার বয়স হয়েছিল।
    সরকারি চাকরির বয়সসীমা পার হয়েছিল।
    তবুও তিনি মিডিয়াতে থাকতে চাইছিলেন। দৈনিক পত্রিকায় ‘আমার যত ভাবনা’ নামে একটি কলাম লেখা শুরু করেন। মজার ব্যাপার এই যে, টেলিভিশনেও তিনি আবার ফিরে আসতে চান। তাই একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল খোলার প্রাথমিক কাজগুলো শেষ করেন। ওয়ান-ইলেভেনের পর ক্রমেই বিভিন্ন প্রাইভেট চ্যানেলে এবিএম মূসা টক শোতে অংশ নিতে থাকেন।
    সামাজিকভাবে মূসা ছিলেন বন্ধুবৎসল। তিনি তার জন্মদিনে মোহাম্মদপুরে তার বাড়িতে, যার নাম ছিল “রিমঝিম”, সেখানে বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতেন। এমনই এক নিমন্ত্রণে তার বাড়িতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে এসেছিলেন নোয়াখালীর আওয়ামী নেতা জয়নাল হাজারী। সেখানে জয়নাল হাজারীর উপস্থিতিতে কিছু নিমন্ত্রিত ব্যক্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন মূসাকে। কিন্তু সুন্দর ও শালীনভাবে মূসা বিষয়টিকে হ্যান্ডল করেছিলেন। অতিথি রূপে (নিমন্ত্রিত না হলেও) জয়নাল হাজারীর সঙ্গে আন্তরিকতাসহ দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন।
    শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ, জিয়ার বিএনপি, এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে শুরু করে জয়নাল হাজারীর পার্টি পর্যন্ত – সবখানেই মূসা নিজস্ব মতামত বজায় রেখে মানিয়ে চলতে পারতেন। এটা ছিল তার পরমতসহিঞ্চুতার একটা বড় প্রমাণ।
    পরবর্তীকালে তিনি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গেও মানিয়ে চলতে পেরেছিলেন। এই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের প্রতি তার প্রাপ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। গত রমজানের সময়ে ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়া তার পাশে মূসাকে বসিয়েছিলেন এবং বহু বিষয়ে কথা বলেন।

    কিন্তু সবার সঙ্গে মূসা চলতে পারলেও শেখ হাসিনার সঙ্গে চলতে পারেন নি।
    দেশে কুশাসনের জন্য বিভিন্ন টক শোতে হাসিনা সরকারের তীব্র সমালোচনা করতে থাকেন মূসা।
    একপর্যায়ে টিভিতে মূসা দর্শকদের পরামর্শ দেন আওয়ামী লীগের যেসব মন্ত্রী-নেতা দুর্নীতিবাজ তাদের “তুই চোর” বলে ডাকতে।
    প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু এবিএম মূসাকে টেলিভিশন চ্যানেল খোলার লাইসেন্স তার সরকার দেয়নি সেহেতু মূসা সমালোচনামুখর হয়েছেন। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, একটা সরকারি টৃপে তাকে অন্তর্ভুক্ত না করায় মূসা নাখোশ হয়েছেন।
    মূসা এসব অভিযোগের উত্তর দেন নি।
    তিনি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পান নি।

    ২০১৩ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে মূসা-হাসিনা দ্বন্দ্ব চরমে পৌছায়। ওই সময়ে আওয়ামীবিরোধী আন্দোলন সারা দেশে তুঙ্গে উঠেছিল। মূসা টক শোতে বলেন, শেখ হাসিনা এখন শুধু ঢাকার প্রধানমন্ত্রী। ঢাকার বাইরে এমন গণ-আন্দোলন আমি একাত্তরেও দেখিনি।

    ইনডিয়ান কারসাজি ও সমর্থনে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-তে অধিকাংশ আসনে ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের “বিজয়”- কে গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মূসা মেনে নিতে পারেন নি।
    তাই ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪-র দুপুরে মূসা অসুস্থ আছেন জেনে যখন ল্যাবএইড হসপিটালে তার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাই, তিনি আমাকে দেখেই বলে ওঠেন, এটা কি হলো?

    তাকে তখন নার্সরা শেভ করিয়ে দিচ্ছিলেন।
    তার অসুস্থতা বিবেচনায় আমি কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় না গিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর এড়াতে চেয়েছিলাম।
    কিন্তু মূসা বারবার বর্তমান আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক ভূমিকা এবং দলের নেত্রীর স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড বিষয়ে উত্তেজিতভাবে বলতে থাকেন।

    আওয়ামী ঘরানার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে এবিএম মূসার সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল যে, তিনি শেখ মুজিব-অনুরাগী হয়েও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে পিছপা হননি। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ ব্র্যান্ড আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার ইনডিয়া ব্র্যান্ড আওয়ামী লীগ যে এক নয় সে কথা তিনি বুঝতেন। শেখ হাসিনার তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাটাকে তিনি অগ্রাহ্য করেছেন। মূসা সভ্য ও শালীন হওয়ায় শেখ হাসিনার বিভিন্ন অভিযোগের কোনো উত্তর দেন নি। তবে তিনি প্রায়ই টক শোতে বলতেন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা বিষয়ে তার কাছে অনেক তথ্য আছে। তিনি বলতেন, এখন সম্ভব না হলেও, হয়তো বা তার মৃত্যুর পর এসব প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

    তিনি ছিলেন জন্মগতভাবেই সাংবাদিক। তাই মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থেকেও সাংবাদিকসুলভ আচরণ করেছিলেন। তবে এর মধ্যেও তিনি ভুলে যান নি আমার স্ত্রীর কথা।
    তালেয়া কই? সে আসল না? প্রশ্ন করেছিলেন মূসা।
    তালেয়াই আমাকে লন্ডন থেকে ফোন করেছে তোমাকে দেখতে যাবার জন্য।
    লন্ডনে? লন্ডনে কেন সে?
    তার হাটুতে অপারেশন হয়েছে। উত্তর দিয়েছিলাম।
    আমার উত্তরে তিনি একটু থমকে গেলেন।
    তারপর আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
    আমি ভালো আছি। তোমার জন্মদিনে আবার দেখা হবে। গুড বাই।

    কিন্তু এবার মূসার জন্মদিনে দেখা হয়নি। আমার সঙ্গে ছিলেন দুই সহকর্মী সজীব ওনাসিস ও দিপু রহমান। অনেক খোজাখুজি করেও রিমঝিম পাচ্ছিলাম না। পরে জানলাম সেখানে নতুন সব ফ্যাট হয়েছে। আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। তখন তিনি ছিলেন খুবই অসুস্থ এবং ঘুমন্ত।

    এখন মূসা চলে গিয়েছেন চিরঘুমের দেশে।
    তার সঙ্গে আর দেখা হবে না।

    তবে মনে থাকবে কেন তিনি সেই ফুটবল ম্যাচে স্টেডিয়ামে আসেন নি।
    তরুণ মূসা যে নারীর প্রেমে পড়েছিলেন সেদিন তাকে গোপনে বিয়ে করেছিলেন তিনি।
    সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি!
    পারিবারিক অসম্মতির ঝুকি থাকা সত্ত্বেও ওই তরুণ বয়সে বিয়ে করায় তার সাহসের প্রশংসা আমি করেছিলাম এবং বলেছিলাম, এই দেশে ভালোবাসা দিন তো তোমারই প্রবর্তন করা উচিত ছিল।
    মূসা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি যে ভ্যালেন্টাইনস ডে, সেটা তো তখন আর আমি জানতাম না। ওই ভূমিকায় তোমাকেই মানিয়েছে ভালো।
    মূসা আর তার স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন ছিল সুখের এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার।
    স্বামী মূসা, প্রেমিক মূসা, সাংবাদিক মূসা, পলিটিশিয়ান মূসা, টক শোর বক্তা মূসা – এসব পরিচয়ের মধ্যে আমার কাছে সেই তরুণ প্রণয়ীর পরিচয়ই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে।

    fb.com/shafikrehmanpresents

    মালয়শিয়া এয়ারলাইন ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ এভিয়েশনের শিক্ষণীয়

    শফিক রেহমান
    ২৮ মার্চ ২০১৪, শুক্রবার, ১০:০২
    27096_shafik_rehmanসোমবার ১০ মার্চ ২০১৪-তে বিশ্ববাসী জানতে পারে শনিবার ৮ মার্চ মধ্য রাতে কুয়ালালামপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া মালয়শিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ (MH370) পরদিন নির্ধারিত সময়ে বেইজিংয়ে পৌছায়নি। বেইজিং এয়ারপোর্টে ফ্লাইট এরাইভাল নোটিশ বোর্ডে এমএইচ৩৭০-এর পাশে লেখা ওঠে, DELAYED (ডিলেইড বা বিলম্বিত)। কিন্তু ধীরে ধীরে জানা যায় প্লেনটি বিলম্বিত হয়নি, হয়েছিল VANISHED (ভ্যানিশড বা অদৃশ্য)।
    এরপর ১০ মার্চ থেকে ২৭ মার্চে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিশ্ববাসীর চোখ নিবদ্ধ থাকে পত্রিকার পাতায়, টিভির নিউজে এবং কমপিউটার স্কৃনে অনলাইন খবরে। গভীর কৌতূহলের সঙ্গে মানুষ অনুসরণ করেছে এমএইচ৩৭০ সম্পর্কিত প্রতিটি সংবাদ – মালয়শিয়ান এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের বিবৃতি, মালয়শিয়ান ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রীর বিবৃতি, মালয়শিয়ান প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি এবং ২৬টি দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় নিখোজ প্লেনটিকে খোজা। সবার মনেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল এই হাইটেকের যুগে সবার চোখ ফাকি দিয়ে কিভাবে এত বড় একটা প্লেন ভ্যানিশ করে গেল? কিভাবে আকাশে বিলীন হয়ে গেল?
    এমএইচ৩৭০ বিষয়ে আমি কৌতূহলী থেকেছি বিশেষ কয়েকটি কারণে।

    প্রথমত আমি প্লেনে ট্রাভেল বিষয়ে আগ্রহী ছোটবেলা থেকে। প্রথম উড়ন্ত প্লেন দেখি ১৯৪৪-৪৫-এ কলকাতায়, পার্ক সার্কাসে। তখন ঝাকে ঝাকে জাপানিজ ফাইটার প্লেন দুপুর এবং বিকালে আসত কলকাতায় খিদিরপুর ডকে বোমা ফেলতে। সূর্যের আলোতে ফর্মেশন ফ্লাইটে জাপানিজ প্লেনগুলো আকাশে চিকচিক করত।
    প্লেনে প্রথম ফ্লাই করি এর প্রায় ১০ বছর পরে। আগস্ট ১৯৪৭-এ ইনডিয়া পার্টিশনের পরে আমরা চলে আসি ঢাকায়, পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৫৪-তে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে কলকাতায় ফিরে গিয়েছিলাম মেমরি টৃপে। সেখান থেকে ইনডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ডাকোটা প্লেনে ঢাকায় ফিরে এসেছিলাম।
    এরপর আমার অগ্রজপ্রতিম পাইলট বন্ধু ওয়ারেস আলির কল্যাণে বেশ কয়েক ঘণ্টা ছোট প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা হয়। ওয়ারেস আলি ছিলেন ফ্লাইং ইন্সট্রাকটর। তার ছাত্র না থাকলে মাঝে মাঝে তিনি আমাকে প্লেনে নিতেন এবং আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা ফ্লাই করতাম। দিনে এবং সন্ধ্যায়। এসব প্লেন ছিল টাইগার মথ এবং চিপ মাংক। এ ধরনের ছোট প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা অন্য রকম এবং বলা যায় এক ধরনের নেশা সৃষ্টিকারী। ককপিট থেকে ইচ্ছা অনুযায়ী প্লেনে ওপরে-নিচে ওঠানামা, ইচ্ছা অনুযায়ী দিক পরিবর্তন করা, লো ফ্লাই করে মাটিতে নিজের বাড়ি এবং অন্যান্য পরিচিত ভবন লোকেট করা – এ সবই আনন্দ এবং উত্তেজনার একটা অদ্ভুত মিকশ্চার হৃদয়ে তৈরি করে। নিজেকে মনে হয় ডানা বিহীন পাখি।
    তাই সুদূর প্রাচীন কাল থেকে মানুষ চেষ্টা করেছে নিজের দেহের সঙ্গে ডানা লাগিয়ে অথবা ডানার বদলে যন্ত্রের সাহায্যে আকাশের উড়তে। পঞ্চদশ শতাব্দির ইটালিয়ান পেইন্টার, ভাস্কর, আর্কিটেক্ট ও ইনজিনিয়ার লিওনার্দো ডা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) লিখেছেন এরোনটিকক্স বিষয়ে। যুগে যুগে মানুষের বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টের পরিণতিতে এরোনটিক্সে স্বশিক্ষিত দুই আমেরিকান ভাই অরভিল রাইট (১৮৭১-১৯৪৮) এবং উইলবার রাইট (১৮৬৭-১৯১২) প্রথম প্লেনে আকাশে ওড়েন। স্থানটি ছিল কিটি হক। তারিখটি ছিল ১৭ ডিসেম্বর ১৯০৩। অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ১১১ বছর আগে।
    তারপর যাত্রীবাহী কমার্শিয়াল প্লেনের বহু উন্নতি হয়েছে। প্রপেলার প্লেন, যেমন ডাকোটা থেকে এসেছে জেট-প্রপ প্লেন, যেমন বৃস্টল ব্রাবাজন। জেট প্রপ থেকে এসেছে জেট এবং জাম্বো জেট, যেমন মালয়শিয়ার এমএইচ৩৭০ বোয়িং ৭৭৭-২০০। এসব প্লেন ক্রমেই আরো উচুতে এবং আরো স্পিডে উড়েছে। আরো যাত্রী নিয়েছে। যেমন, এয়ারবাস এ৩৮০ সর্বোচ্চ ৮৫৩ যাত্রী নিয়ে উড়তে পারে। এই প্লেনের দুটি তলাতে যাত্রীদের বসার এবং শোওয়ার (উন্নত শ্রেণীতে) ব্যবস্থা আছে। নিচের তলাগুলোতে থাকে ব্যাগেজ। প্রতিটি যাত্রীর জন্য আছে নিজস্ব টিভি। বলা যায়, এ ধরনের জাম্বো জেটগুলো ফ্লাইং হোটেল। এ৩৮০ ঢাকার রূপসী বাংলা হোটেলের (যেটা আগে শেরাটন এবং তারও আগে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ছিল) তিন গুণ বেশি গেস্ট/যাত্রীকে তাদের খাবার এবং মালপত্রসহ আকাশে ৮,৫০০ মাইল উড়িয়ে নিয়ে গন্তব্য স্থানে পৌছে দিতে পারে। ভেবে দেখুন, তিনটি রূপসী বাংলা হোটেল এক হয়ে আকাশে উড়ছে!
    আর এ জন্যই আমি প্রায়ই তরুণ প্রজন্মকে বলি, বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি বুঝতে হলে প্লেনে অবশ্যই চড়তে হবে। আমি নিজে এই বিশেষ অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওড়ার চেষ্টা করেছি। ১৯৫৭-তে বিওএসি-র (পরে যেটা বৃটিশ এয়ারওয়েজ হয়েছে) বৃস্টল ব্রাবাজন প্লেনে ফ্লাই করে ইওরোপে গিয়েছিলাম। সর্বশেষ এমিরেটস এয়ারলাইনসের এয়ারবাস এ৩৮০-তে ফ্লাই করে লন্ডন থেকে দুবাই গিয়েছি।
    প্লেনের প্রতি বিশেষ আগ্রহের কারণে আমার বেশ কয়েকজন পাইলট বন্ধুও হয়েছেন, যেমন, অতীতে পিআইএ-র তথা বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন মজহার (খোকা), ক্যাপ্টেন ইদরিস তালুকদার, ক্যাপ্টেন মাহমুদুল আমিন থেকে শুরু করে বর্তমানে নভোএয়ারের ক্যাপ্টেন রেজাউর রহমান। ক্যাপ্টেন রেজার উদ্যোগে ঢাকায় উত্তরাতে পাইলটদের একটি নিজস্ব কাব প্রতিষ্ঠায় অংশ নিতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেছিলাম।

    দ্বিতীয়ত, যদিও ১০ মার্চ ২০১৪ থেকে ২৬ মার্চ ২০১৪ পর্যন্ত আওয়ামী সরকার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিহীন একটি তথাকথিত বিশ্ব রেকর্ড গড়ার জন্য আড়াই লাখের কিছু বেশি মানুষকে (২৫৪,৬৮১) ঢাকায় সমবেত করতে ব্যস্ত ছিল এবং এমএইচ৩৭০ বিপর্যয়ের তাৎপর্য অনুধাবনে সম্ভবত অলস ছিল তখন প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় পৌনে এক কোটি।
    এদের অনেকেই স্বদেশে আসা-যাওয়া করেন। কেউ বা দুই-তিন বছরে একবার। কেউ বা বছরে তিন বা আরো বেশি বার। খুলনার জামিরা ইউনিয়নের বিএনপিপন্থী চেয়ারম্যান ড. মামুন রহমান লন্ডনে চার্টার্ড একাউন্টেসি পেশায় রত। তিনি প্রতি মাসে ঢাকায় আসেন। তিনি আসেন একা। অনেকেই আসেন সপরিবারে। রাজনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে এরা নিয়তই প্লেনে আসা-যাওয়া করছেন। এমএইচ৩৭০-এর যাত্রীদের মতো এরাও যেকোনো সময়ে বিপদে পড়তে পারেন। আফটার অল, মানবদেহ যেমন যেকোনো সময় অচল হতে পারে, ঠিক তেমনই মানব নির্মিত যন্ত্র যেকোনো সময়ে বিকল হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এরা বিপদে পড়লে সেটা সামলানোর জন্য বাংলাদেশের কার এবং কি দক্ষতা আছে? কেউ কি লক্ষ্য করেছেন মালয়শিয়া সরকার এবং মালয়শিয়া এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ বিশ্ব জুড়ে কত কঠিন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন এবং কত নম্র, ভদ্র ও শান্তভাবে সেসবের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
    ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রাভেলের কারণে বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দেশ নয়। বাংলাদেশ বিমানেরও একই মডেলের প্লেন বোয়িং৭৭৭ আছে। এই প্লেনে বাংলাদেশি এবং বিদেশিরা ট্রাভেল করছেন। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিভিন্ন দেশে এবং বোয়িং নির্মাতা আমেরিকাতেও বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হবে। এবং সেটা মার্জিত ভাষায় সুচিন্তিতভাবে করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লিসেন, লিসেন অথবা মুই, হনু, ছ্যাপ, মার্কা ভাষায় নয়। জবাবদিহি করতে হবে মালয়শিয়ান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের মতো শালীন ও নম্র ভাষায়। পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের উত্তেজনাপূর্ণ ভাষায় নয়, মালয়শিয়ান ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুসেইনের মতো সহানুভূতিপূর্ণ শান্ত ভাষায়। জবাবদিহি করতে হবে মালয়শিয়া এয়ারলাইনস গ্রুপের সিইও মোহাম্মদ জাওদাইয়ের মতো তথ্যপূর্ণ ভাষায়।
    এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বিমানের কোনো ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) অথবা সিইও হয়তো নেই। ২৩ মার্চ ২০১৪-তে বাংলাদেশ বিমানের এমডি কেভিন স্টিল পদত্যাগ করেছেন। এই বৃটিশ ছিলেন বাংলাদেশ বিমানের প্রথম বিদেশি এমডি। মাত্র এক বছর কাজ করার পর তিনি পদত্যাগ করলেন অথবা করতে বাধ্য হলেন। সাম্প্রতিক কালে যারা লন্ডন-ঢাকা-লন্ডন রুটে বিমানে ফ্লাই করেছেন তারা প্রায় সবাই বলেন কেভিন স্টিল ইনচার্জ হওয়ার পর বিমানের ফ্লাইট শেডিউল অনেকটা নিয়মিত হয়ে আসছিল এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত হচ্ছিল। ফলে বিমানের যাত্রী সংখ্যা বাড়ছিল এবং সম্ভবত বিমানের ক্ষতির পরিমাণ কমছিল। কিন্তু আওয়ামী সরকারের প্রাণকেন্দ্র দিল্লিতে বিমানের ফ্লাইট নিয়ে সরকারের সঙ্গে ভিন্ন মতের কারণে কেভিন স্টিল পদত্যাগ করেন বলে কিছু সূত্র দাবি করেছে। এই সূত্রগুলোর মতে, ঢাকা-দিল্লি-ঢাকা রুটে বিমানের ফ্লাইটে ক্ষতি হয়। তাই কেভিন স্টিল এই রুটে ফ্লাইট বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার এতে রাজি হয়নি। ফলে এক যোগ্য এমডিকে বাংলাদেশ বিমান হারিয়েছে। বিষয়টি অন্যদিকে নেয়ার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ বলেছে, স্বাস্থ্যগত কারণে কেভিন স্টিল পদত্যাগ করেছেন।

    তৃতীয়ত, এমএইচ৩৭০ নিখোজ হয়ে যাওয়ার পরে বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় রিপোর্টিং স্টাইল ও কনটেন্টস ছিল শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয়। বিবিসি ওয়ার্ল্ড তাদের নিউজ প্রোগ্রামে অন্যান্য সংবাদ খুব সংক্ষিপ্ত করে দিনের পর দিন বড়ভাবে কভার করেছে মালয়শিয়া এলারলাইনস সন্ধান প্রচেষ্টা, নিখোজ যাত্রীদের আত্মীয়স্বজনের প্রতিক্রিয়া এবং এভিয়েশন এক্সপার্টদের মতামত। বিবিসি কিছু নিউজ ব্রডকাস্টিংয়ে নিউজকাস্টারদের পেছনে (ব্যাকড্রপে) বড় বড় অক্ষরে মঙ্গল কামনা করেছে প্রে ফর এমএইচ৩৭০, Pray For MH370 লিখে।
    প্লেনটি নিখোজ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে বিবিসি। এটির বাংলা অনুবাদ নিচে প্রকাশিত হলো।
    আমেরিকার প্রভাবশালী ম্যাগাজিন টাইম কভারস্টোরি করেছে যার শিরোনাম, The mystery of flight 370 বা ফ্লাইট ৩৭০ রহস্য। এই কভারস্টোরির অনুবাদও নিচে প্রকাশিত হলো। টাইম তার কভারের ছবির জন্য বিখ্যাত। তার অনেক কভারই হয় চোখধাধানো। কিন্তু এবার তারা ফ্লাইট ৩৭০ রহস্য বোঝানোর জন্য এক ধরনের চোখের ধাধা দিয়ে কভার করেছে। কভারটি পুনঃমুদ্রিত হলো ছোট আকারে। নয়া দিগন্ত-র ছাপা যদি ভালো হয় তাহলে পাঠকরা লক্ষ্য করবেন খাড়াখাড়ি সরল রেখাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি বোয়িং৭৭৭।
    ১৯৫৪ থেকে আমি টাইম নিয়মিত পড়ছি। কিন্তু এত কেভার কভার দেখেছি বলে মনে পড়ে না। পাঠকরা ইন্টারনেটে গিয়ে কালারে কভারটি দেখলে বিষয়টি বুঝবেন।
    প্যারেড গ্রাউন্ডে লোক দেখানো দেশপ্রেমের অজুহাতে জিরো প্লাস জিরো প্লাস জিরো ইকোয়াল টু জিরো মানুষের গুরুত্বহীন সমাবেশ না ঘটিয়ে আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত মালয়শিয়া, বিবিসি, টাইমের মতো দক্ষ, যুক্তি ও তথ্যশালী লোকবল সৃষ্টি করা, যার ফলে সম্ভব হবে দুর্যোগ ও বিপর্যয়গুলো সমন্বিত ও সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করা।

    টাইম কভার
    দি মিস্টৃ অফ ফ্লাইট ৩৭০
    শুনলে মনে হবে এটা লস্ট (Lost) নামে মুভিটির একটি রিয়াল-লাইফ কাহিনী। ১৯৫৫-র লস্ট মুভিতে একটি ধনী পরিবারের শিশুকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল এক বুয়া। সেই বুয়া একটু অন্যদিকে তাকাতেই নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় সেই শিশুটি। তারপর চলতে থাকে শিশুকে খোজার জন্য পরিবার এবং পুলিশের আপ্রাণ চেষ্টা।
    ২৭২ টন ওজনের বোয়িং৭৭৭ এভিয়েশনের অতি নির্ভরযোগ্য প্লেন। কুয়ালা লামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে টেক অফ করল বেইজিংয়ের উদ্দেশে। ফ্লাইটের এক ঘণ্টা পুরো না হতেই প্লেনটি অদৃশ্য হয়ে গেল এয়ার ট্রাফিক রেডার স্কৃন থেকে। শুরু হয়ে গেল ২৬টি দেশের টেকনলজিকাল সাজ-সরঞ্জামের খোজার চেষ্টা। অংশ নিল বহু হাইটেক যুদ্ধ-জাহাজ, খুব সফিসটিকেটেভ সুপারসনিক জেট প্লেন, সব দিকে দৃষ্টিব্যাপী সব স্যাটেলাইট। দিনের পর দিন চলে গেল। কিন্তু এয়ারলাইনারের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। বিশ্ব জুড়ে গোয়েন্দা দাদারা বহু খুজলেন, ওপর-নিচে সব দিকে। কিন্তু তারা কিছুই পেলেন না।
    ৮ মার্চ ২০১৪-র মাঝ রাতের পর পরই মালয়শিয়া এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৩৭০-এর সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তখন প্লেনটির অবস্থান ছিল মালয়শিয়া এবং ভিয়েতনামের আকাশসীমার ঠিক মাঝখানে। বলা যেতে পারে নো ম্যানস স্কাই (No Man’s sky)-তে।
    অন্ধকার রাত থেকে আলোর প্রভাতের মধ্যের সময়টিতে সেই প্লেনের কি হয়েছিল সে বিষয়ে এরপর প্রতিদিন নতুন সব থিওরি আসতে থাকে। ওই প্লেনটিকে হাইজ্যাক করে কোনো দূরবর্তী ল্যানডিং স্টৃপে নামানো হয়েছে? যদি তাই হয় তাহলে যাত্রীরা কোথায়? অথবা প্লেনটির যন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়ার ফলে সমুদ্রে ক্র্যাশ করেছে? তাই যদি হয়, তাহলে ধ্বংসাবশেষ (ডেবৃ, Debris) কোথায়? সার্চ টিমগুলো এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে কাজে লেগে যায়। এমএইচ৩৭০ বিষয়ে তাদের সংগৃহীত সর্বশেষ তথ্যগুলো জানতে লক্ষ লক্ষ বিশ্ববাসী উদগ্রীব হয়ে থাকে। তারা ভাবতে থাকে এই ২০১৪-তে টেকনলজি এত অভাবগ্রস্ত কেন, যার ফলে ২৩৯ জন যাত্রী নিয়ে ২০৯টি (৬৪ মিটার) লম্বা একটি এয়ারলাইন আধুনিক এভিয়েশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় অদৃশ্য থাকতে পারে।
    আমাদের এই সবজান্তা যুগে এমএইচ৩৭০-এর অদ্ভুত কাহিনী খাপ খায় না। আমরা যখন জীবন যাপন করি তখন কোটি কোটি মানুষকে বিশ্বের ইনটেলিজেন্স এজেন্সিগুলো দেখতে পারে, শুনতে পারে। এমনকি আমরা যারা স্পাই নই তাদের কাছেও বহু রকমের ট্র্যাকিং টেকনলজি আছে। আইফোন হারিয়ে গেলে কিছু ওয়েবসাইটে গিয়ে কিবোর্ড টেপাটেপি করলে সেটা পেতে পারি, যেসব স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে তাদের ট্র্যাক করতে পারি, গুগল ম্যাপ দিয়ে বহু দূরের স্থানগুলো আবিষ্কার করতে পারি। তাহলে বিটস ও বাইটস-এর (Bits and Bytes) যে অতি জটিল ও বিস্ময়কর অবকাঠামো আমরা বানিয়েছি তা সত্ত্বেও আমরা কেন একটা জাম্বো জেটকে ট্র্যাক করতে পারলাম না?
    উত্তরগুলো উদ্বেগজনক। নাইন ইলেভেনে (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১)-এ নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার পরে বিশ্ব জুড়ে এয়ারপোর্টে যখনই আমরা প্লেনে উঠতে যাই তখন প্রতিবারই বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটি প্রটোকল আমাদের মানতে হয়। কিন্তু আকাশে ভাসমান অবস্থায় আমাদের ট্র্যাক করার জন্য টেকনলজিগুলো সাধারণ। এসব বেসিক টেকনলজিগুলো নিশ্ছিদ্র নয়। আমাদের সবচেয়ে আধুনিক এয়ারক্রাফটকেও অদৃশ্য করে দিতে পারে মানুষের হাত।
    এমএইচ৩৭০ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে, মালয়শিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এ বিষয়ে তার প্রথম সরকারি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটা ছিল ওই প্লেনে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত কাজের ফল।
    আকাশে ওড়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরে, রাত ১২:৪১ মিনিটে এয়ারক্রাফটের যোগাযোগ করার দুটি প্রধান যন্ত্র সুইচ অফ করে দেয়া হয়। এই দুটি যন্ত্র হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয় অটোমেটেড এয়ারক্রাফট কমিউনিকেশনস অ্যান্ড রিপোর্টিং সিস্টেম (সংক্ষেপে একার্স, ACARS) এবং ট্রান্সপনডার যা উড়ন্ত প্লেনের এক ধরনের বিশেষ সিগনাল মাটিতে অবস্থানকারী গ্রাউন্ড কনট্রোলকে পাঠায়। মালয়শিয়ান কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিবৃতিগুলো জানায়, রাত ১.১৯ মিনিটে প্লেনের কো-পাইলট ফরিক আবদুল হামিদ, এমএইচ৩৭০ থেকে এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলকে বলেন, ‘অল রাইট, গুড নাইট।’ এটাই ছিল এমএইচ৩৭০ থেকে জানা মতে শেষ কথা। (প্লেনের পাইলট জাহারি আহমদ শাহ (৫৩)-র আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা ছিল ৩৩ বছরের। এই সময়ের মধ্যে তিনি ১৮,০০০ ফ্লাইট আওয়ার্স উড়েছিলেন)।
    এরপর প্লেনটি তার পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট পথে থেকে সরে যায়। ফ্লাইট সিস্টেম যে জানে এমন কোনো ব্যক্তি ওই প্লেনের কমপিউটারে নতুন প্রোগ্রাম পাঞ্চ করেছিল। তাই এমএইচ৩৭০ উত্তরে চায়নার পথে না গিয়ে হঠাৎ পশ্চিমে মোড় নিয়ে এগোতে থাকে মালয়শিয়া উপদ্বীপের দিকে। তারপর প্লেনটি মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে যায়। বিশ্বের অতি ব্যস্ত শিপিং লেইনের অন্যতম মালাক্কা প্রণালি।
    কয়েক দিন পরে জানা যায়, ওই প্লেনের যাত্রাপথে ট্র্যাক করেছিল একট ধারাবাহিক ইলেকট্রনিক হ্যান্ডশেক। একটা মোবাইল ফোন, যেমন একটা অজানা ক্যারিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে ঠিক তেমনি এমএইচ৩৭০ থেকে এই হ্যান্ডশেক করা হয়েছিল একটি কমার্শিয়াল স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে। কিন্তু মালয়শিয়া এয়ারলাইনস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল না।
    এ ধরনের হ্যান্ডশেককে পিং (Ping) বলা হয়। সর্বশেষ স্যাটেলাইট পিংটি হয় ৮ মার্চ সকাল ৮.১১ মিনিটে। প্রাপ্ত তথ্য বলে, এই প্লেন জার্নির সম্ভবত শেষ স্থানটি হতে পারে মধ্য এশিয়া থেকে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে ৩০ লক্ষ বর্গ মাইল বিস্তৃত যেকোনো জায়গায়।
    কে নজর রাখছে আকাশে?
    যদি প্লেনটি উত্তর-পশ্চিমের দিকে মোড় নিত এবং মধ্য এশিয়ার দিকে এগিয়ে যেত তাহলে ইনডিয়া, পাকিস্তান ও চায়নার রেডার সিস্টেমে সেটা ধরা পড়ত। আফগানিস্তানে আমেরিকান ঘাটিগুলোর রেডারেও ধরা পড়ত। অথবা ধরা পড়ত না। সত্যটা হচ্ছে এই যে, আমাদের আকাশ লক্ষ্য করার জন্য অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার হয়েছে গত কয়েক যুগ ধরে একটু একটু করে। এর সঙ্গে আধুনিক কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি যুক্ত করার কোনো আইন হয়নি। প্লেনে এসব যন্ত্রপাতি ফিট করারও খুব ব্যয়সাপেক্ষ।
    রবার্ট বেনজন, যিনি ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (সংক্ষেপে এনটিএসবি, NTSB)-এ এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইন্সপেক্টর পদে ২৫ বছর কাজ করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসায়ে এক ধরনের কবর ফলক (Tombstone) মানসিকতা আছে। কোনো কিছু করার জন্য আগে দরকার মাটিতে রক্ত অথবা মরা মানুষ। যখন সব কিছুই ঠিক মতো চলে, তখন কোনো কিছু বেঠিক হবে এমন সম্ভাবনার ওপর টাকা খরচ করাটা খুবই দুষ্কর।
    তার এ কথায় যদি বিচলিত না হন, তাহলে এটা ভাবুন : কিছু রেডার সিস্টেম সুইচড অফ রাখা হয়। স্থানীয় কোনো টেনশন হলে তখন এই সিস্টেমের পাওয়ার অন করা হয়। সার্বক্ষণিকভাবে এয়ার-সারভেইলান্স সিস্টেম অন রাখতে অনেক খরচ হয়। তাই সরকারগুলো এই সিস্টেমের সুইচ সাধারণ অফ করে রাখে। এমএইচ৩৭০ যে এলাকায় নিখোজ হয়ে গিয়েছে সেখানের এয়ার সারভেইলান্স সিস্টেম এমনই ছিল।
    এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, যেমন ইনডিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে, বিষয়টিকে আরো জটিল করেছে। কোনো সরকার যদি মনে করে কোনো তথ্য বা ডেটা সামরিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তাহলে সেটা তারা অন্য সকারের সঙ্গে শেয়ার করবে না। অথবা ইমার্জেন্সির সময়ে ঢিলেমি করবে। ১৮ মার্চে থাইল্যান্ড জানায়, গ্রাউন্ড কনট্রোলের সঙ্গে এমএইচ৩৭০-এর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কিছু পরেই হয়তো তাদের একট মিলিটারি রেডার নিখোজ প্লেনটিকে লক্ষ্য করেছিল। এই খবরটির ফলে যদিও এমএইচ৩৭০ সন্ধান কাজের গতিপথ বদলায়নি, তবু থাইল্যান্ড যে ১০ দিন পরে তাৎপর্যপূর্ণ মিলিটারি ইনটেলিজেন্স শেয়ার করতে চেয়েছে, তাতে বোঝা যায় এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক সার্চ কাজকে সমন্বিত করা কত কঠিন।
    আন্তর্জাতিক সমুদ্রে সহযোগিতাও জোড়াতালি দিয়ে চলে। তীরে অবস্থিত রেডার ভূমি থেকে ২৫০ মাইলের (৪০০ কিমি) বেশি কার্যকর নয়। তার মানে একটি ফ্লাইটকে ট্র্যাক করতে বিভিন্ন গ্রাউন্ড স্টেশন বিভিন্ন সময়ে কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। এর ফলে একটা প্লেনের গতিপথ সম্পূর্ণভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
    ‘যে টেকনলজি ৭০ বছরের বেশি পুরনো সেটা পাহাড়ের মধ্যে কাজ করে না এবং পৃথিবীর গোল আকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বাকাতে পারে না। একটা এয়ারক্রাফট যখন একটি দুর্গম এলাকার ওপর দিয়ে অথবা সমুদ্রের ওপর দিয়ে যায়, তখন তাকে ট্র্যাক করার কোনো সিস্টেম আসলেই নেই।’ এ কথা বলেন আমেরিকার ডেটোনা বিচে এমবৃ রিডল এরোনটিকাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্টান্ট প্রফেসর ডেভিড আইসন।
    আরো আধুনিক টেকনলজি এখন পাওয়া যায়। কিন্তু এয়ারলাইন ইনডাস্টৃ সেটা নেয়নি। আমেরিকায় ফোর্ট ওয়ার্থে এভিয়েশন এক্সপার্ট এবং রিটায়ার্ড মেরিন পাইলট উইলিয়াম লরেন্স বলেন, ‘এখন আমাদের যে টেকনলজি আছে সেটা দিয়ে রিয়াল টাইম জিপিএস (GPS) ট্র্যাকিং সার্ভিস সম্ভব। এই ধরনের একটা সিস্টেম আছে। যার নাম অটোম্যাটিক ডিপেনডেন্ট সারভেইলান্স ব্রডকাস্ট (সংক্ষেপে এডিএস-বি, ADS-B)। কিন্তু কনটিনেন্টাল আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু স্থান এখনো রেডার এবং রেডিও-র ওপর নির্ভর করে। আমেরিকার ফেডারাল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ২০২০-এর মধ্যে এডিএস-বিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্ল্যান করেছে।’
    সর্বাধুনিক টেকনলজি প্লেনে যুক্ত করা এয়ারলাইনসগুলোর জন্য খুবই ব্যয় সাপেক্ষ। এমএইচ৩৭০ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে মালয়শিয়া এয়ারলাইনস অর্থ কষ্টে ছিল। একটা জেট প্লেন আর একটা আইফোন সমান নয়। একটা জেটের কর্মজীবন ৩০ থেকে ৪০ বছর। একটা প্রডাক্ট ডেভেলপ করতে সময় লাগে। রিসার্চ থেকে প্লেনে সেই প্রডাক্ট বসাতে এক যুগ সময় লাগতে পারে। কোনো এয়ারলাইনের সব প্লেনকে সর্বাধুনিক এভিওনিক্স (Avionics) দিয়ে আপগ্রেড করতে অনেক খরচ হয়। শুধু ভেবে দেখুন, একটা জেট প্লেনে ওয়াই-ফাই বসাতে খরচ হতে পারে ২৫০,০০০ ডলার।

    সেখানে একটা অফ সুইচ কেন?
    কেউ সুইচ অফ না করা পর্যন্ত আধুনিক জিপিএস সিস্টেমগুলো কাজ করে। যেমন ব্যাটারি চার্জ সেভ করার জন্য আমরা অনেকেই স্মার্টফোন অফ করে রাখি। প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এমএইচ৩৭০ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে আপনি জানতেন না একটা এয়ারলাইনারের প্রায় সব কমিউনিকেশন সিস্টেম বন্ধ রাখা যায়। ‘একজন পাইলট যে শুধু প্লেনের ট্রান্সপনডার সুইচ অফ করতে পারেন তাই নয়, তিনি ফ্লাইট রেকর্ডার (যেটি ব্ল্যাক বক্স নামে পরিচিত)-ও অচল করে দিতে পারেন। প্লেন আকাশে ওড়ার সময় কি হচ্ছে তা রেকর্ড করে ব্ল্যাক বক্স।’ এ কথা বলেন ব্ল্যাক বক্স বিষয়ে রিটায়ার্ড এনটিএসবি এক্সপার্ট জিম ক্যাশ। তিনি আরো বলেন, ‘ব্ল্যাক বক্স ঠিক মতো কাজ করলেও, যদি সেটা না পাওয়া যায় তাহলে কোনো লাভ হয় না। এমএইচ৩৭০-এর ব্ল্যাক বক্স সার্চ লাইট বিকিরণ করবে ৩০ দিন। তবে পানির নিচে এর অবস্থান হতে হবে ২ মাইলের (৩.৫ কিমি) কম। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ দিকে গড় গভীরতা ২ মাইলের বেশি। দক্ষিণ-পশ্চিমের এয়ারকরিডর বরাবর ফ্লাই করেছিল এমএইচ৩৭০। তারপর হয়তো ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে ক্র্যাশ করেছিল। সে ক্ষেত্রে তার ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা হবে খুবই কঠিন চ্যালেঞ্জ।’
    প্রশ্ন হচ্ছে, প্লেনের অবস্থান নির্ণয়কারী এমন যন্ত্র কেন প্লেনে থাকে যেটা বন্ধ করে দেয়া যায়? একটা উত্তর হলো : ইচ্ছাকৃতভাবে এই সিস্টেম ধ্বংস করা খুবই বিরল এবং তাই হয়তো এটা বদলানোর বিষয়ে কেউ ভাবেনি। তা ছাড়া ট্রান্সপনডারে আগে থেকেই অফ সুইচের ব্যবস্থা ছিল যেন সেটা এয়ারপোর্টের রেডারে কোনো বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। এয়ারপোর্টের নতুন রেডার সিস্টেম প্লেনের আলো বিকিরণে কনফিউজড হয় না। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বড় কমার্শিয়াল এয়ারলাইনে এখনো অটোমেটেড ট্রান্সপনডার লাগানো হয়নি, যেটা প্লেন আকাশে ওড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে দেয়।
    এমএইচ৩৭০-এর ককপিটে মানুষের হস্তক্ষেপ হয়েছিল এমনটা ধারণার পর বিশ্ব জুড়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় কে বা কারা এটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছিল এবং কিভাবে তারা প্লেনটিকে রেডারের নিচ দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ওই প্লেনের ক্যাপ্টেন অথবা কো-পাইলট কি সুইসাইডাল ছিলেন? অথবা উগ্রপন্থী ফ্যানাটিক? অথবা ওই প্লেনের কোনো প্যাসেঞ্জার যার এভিয়েশন বিষয়ে এক্সপার্টিজ ছিল। সে কি জোর করে ককপিটে ঢুকে গিয়েছিল? এটা মনে হচ্ছে প্লেনটা উত্তর করিডর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে যায়নি। উত্তর করিডরে বহু দেশের মিলিটারি রেডার আছে। বরং প্লেনটি দক্ষিন করিডর দিয়ে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ দিকে গিয়েছিল যেন তাকে কেউ লক্ষ্য না করতে পারে। আরেকটি থিওরিতে বলা হয় হয়তো প্লেনটি অপর একটি প্লেনের খুব পিছু পিছু গিয়েছিল, যার কারণে রেডারে বোঝা সম্ভব হয়নি।
    এমএইচ৩৭০ মহাসাগরে ক্র্যাশ করেছে এমন সম্ভাবনায় অনেকে মনে পড়ে যায় এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭-এর কথা। ২০০৯-এ রিও ডি জ্যানেরো থেকে প্যারিসের যাত্রাপথে ওই প্লেনটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ দুটি ঘটনার মধ্যে বড় কিছু তফাত আছে। মন্দ আবহাওয়া, পাইলটদের ভুলভ্রান্তি এবং এয়ারস্পিড পড়তে ভুল করা – সম্মিলিতভাবে এই তিনটি কারণে ফ্লাইট ৪৪৭ দক্ষিণ আটলান্টিকে ডুবে গিয়েছিল। ফলে প্লেনের ২২৮ যাত্রী নিহত হয়েছিল। ওই প্লেনের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করতে দুই বছর সময় লাগে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছিল এ কারণে যে ব্ল্যাক বক্স ১৩,০০০ ফিট (৩,৯৬০ মিটার) পানির নিচে ছিল এবং তদন্তকারীরা জানতেন যে ঠিক কোথায় খুজতে হবে। বেনজন বলেন, ‘এয়ার ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিনা বিলম্বে ভাসমান ধ্বংসাবশেষ দেখা গিয়েছিল। ওতেই বোঝা যায় মহাসাগরের কোন জায়াগায় সার্চ করতে হবে।’
    এমএইচ৩৭০ রহস্য বিশ্ব জুড়ে এয়ারপোর্টগুলোর সিকিউরিটি ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নাইন ইলেভেনের (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১) পরে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি ট্রান্সপারেন্ট ব্যাগে প্রসাধনী সামগ্রী প্যাক করতে এবং সিকিউরিটি গেইটের নিচে দাড়িয়ে কেউ কিছু বলার আগে দুই হাত তুলে দাড়াতে। কিন্তু তার পরও এমএইচ৩৭০-এ দুজন যাত্রী চোরাই পাসপোর্টে ফ্লাই করছিল। প্লেনটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর পরই খবরটি প্রকাশিত হয়। সবার চোখ তখন পড়ে ওই দুই যাত্রীর প্রতি। পরে জানা যায়, তারা ছিল তরুণ ইরানি। তারা ইওরোপে যেতে চাচ্ছিল অবৈধ ইমিগ্রান্ট রূপে নতুন জীবন শুরু করার জন্য। তারা টেররিস্ট ছিল না। কিন্তু তারা যে এত সহজে সব ইমিগ্রেশন চেক এড়িয়ে প্লেনে চড়তে পেরেছিল সেটা উদ্বেগের বিষয়। ইন্টারপোল একটি ডেটাবেইসে প্রায় চার কোটি চুরি হওয়া অথবা হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্টের লিস্ট রেখেছে। এমএইচ৩৭০-এ যে দুটি চোরাই পাসপোর্ট ব্যবহার করা হয়েছিল তার বিবরণও সেই ডেটাবেইসে আছে। কিন্তু বিশ্বের ২০টির কম দেশ এই ডেটাবেইসে রেজিস্টৃ করিয়েছে। মালয়শিয়ানরা যে ইন্টারপোলের এই তথ্য সম্ভার কাজে লাগায়নি সেটা স্পষ্ট হয়েছে।

    মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়
    বিভিন্ন নিরাপত্তা, সিস্টেম ও টেকনলজি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা বাস্তবায়িত হবে ভবিষ্যতে। এমএইচ৩৭০-এ যারা নিখোজ হয়ে গিয়েছেন তাদের পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা এতে কমবে না। এদের অধিকাংশ, ১৫৩ জন, ছিলেন চায়নিজ। বেইজিংয়ের একটি হোটেলে এদের এনে রাখা হয়েছিল। তারা মনে করেন মালয়শিয়া এয়ারলাইনসের স্টাফরা তথ্য গোপন রেখেছেন। ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ আত্মীয়রা ওই স্টাফদের প্রতি মিনারাল ওয়াটার বটল ছুড়ে মারেন।
    ই-র দুলাভাই চেন জিয়ানশি (৫৮) ওই প্লেনের যাত্রী ছিলেন। ই বলেন, আত্মীয় পরিবারদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে। তারা প্রতিটি পরিবারের গলায় যেন একটা ফাসির দড়ি পরিয়ে রেখেছে আর প্রতিদিন আস্তে আস্তে টানছে। গলায় ফাসটা আরো টাইট হচ্ছে।
    যাত্রীদের অনেকেই ছিলেন চায়নার নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এবং বিদেশ ভ্রমণে এয়ার ট্রাভেল ছিল তাদের জন্য একটি নতুন আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। এদের আত্মীয়দের অনেকেই এখনো চায়নায় চাষবাস ও কারখানার সাথে সম্পৃক্ত। আনস্মার্ট পোশাকে এরা হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ান। তাদের দেখে ক্লান্ত মনে হয়। মালয়শিয়া এয়ারলাইনস ওই গ্র্যান্ড বলরুমকে তাদের কমান্ড সেন্টার করেছে। কিন্তু এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমান্ড করার মতো খুব কম তথ্য তাদের কাছে ছিল। আত্মীয়রা গ্রামীণ হন অথবা শহুরে হন, তারা কেউই বুঝতে পারছিলেন না এমএইচ৩৭০ কেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। (টাইম ম্যাগাজিন ডেটলাইন ৩১ মার্চ ২০১৪ যদিও এটি ঢাকায় প্রচারিত হয় ২৫ মার্চ ২০১৪-তে)
    সর্বশেষ সংবাদ
    ২৬ মার্চে জানা যায় ফ্রান্সের একট স্যাটেলাইট থেকে গৃহীত ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে প্রায় ১২০টি ভাসমান বস্তুর ফটো তদন্তকারী দলকে দেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট লেখার সময়ে ২৭ মার্চে জানা গেছে থাইল্যান্ডের থাই স্পেস এজেন্সি দক্ষিণ ভারত মহাসগরের প্রায় একই স্থানে ২০০ থেকে ৩০০ ভাসমান বস্তুর ফটো তুলে তদন্তকারী দলকে পাঠিয়েছে। কিন্তু মহাসাগরের ওই এলাকায় আবহাওয়া খুব খারাপ থাকায় উদ্ধারকারীরা সেখানে যেতে পারেননি। পাচটি জাহাজ এবং বহু প্লেন উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছে। ইতিমধ্যে ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারকারীদের একটি বিশেষ টিম আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়াতে এসে পৌছেছে।

    ১০ টি প্রশ্নের উত্তর
    ১. প্লেনটি কেন বাম দিকে ঘুরল
    ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ যাচ্ছিল উত্তর-পূর্ব দিকে। মিলিটারি রেডার লগে দেখা যায় অপ্রত্যাশিতভাবে এটি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে যায়। এর আগেই প্লেনের ট্রান্সপনডার সুইচ অফ করা হয়েছিল এবং প্লেন থেকে সর্বশেষ একার্স (ACARS) ডেটালিংক ট্রান্সমিশন পাঠানো হয়েছিল।
    ব্রুনাই ইউনিভার্সিটির ফ্লাইট সেফটি ল্যাব-এর ড. গাই গ্র্যাটন বলেন, এ ধরনের ঘুরে যাওয়া খুব কমই ঘটে। এর প্রধান কারণ হতে পারে প্লেনে কোনো রকম সিরিয়াস সমস্যা দেখা দিলে পাইলট ভিন্ন গন্তব্যস্থলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যেন প্লেনটাকে দ্রুত মাটিতে নামানো সম্ভব হয়।
    ক্র্যানফিল্ড ইউনিভার্সিটি (ইউকে)-র ফ্লাইট ডেটা মনিটরিং এক্সপার্ট ডেভিড ব্যারি বলেন, প্লেনের খুব কাছাকাছি অন্য আরেকটি প্লেন এসে পড়লে অথবা হঠাৎ ডিকমপ্রেশন হলে পাইলট এভাবে প্লেনের গতিপথ বদলাতে পারেন।
    তবে পাইলটের অথবা অন্য কোনো অনাহূত ব্যক্তির কুইচ্ছার ফলেও এমনটি ঘটতে পারে।
    কিন্তু ব্ল্যাক বক্স বা ফ্লাইট রেকর্ডার না পাওয়া পর্যন্ত জানা যাবে না ওই সময়ে ককপিটে কি ঘটেছিল।
    ২. পাইলট কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন?
    মিডিয়াতে কেউ কেউ বলেছেন এমএইচ৩৭০-এর নিখোজ হওয়ার কারণ হতে পারে পাইলটের সুইসাইড।
    সেটা হলে এই প্রথম হবে না। ধারণা করা হয়, ১৯৯৭-এ সিল্ক এয়ার ফ্লাইট ১৮৫ এবং ১৯৯৯-এ ইজিপ্ট এয়ার ফ্লাইট ৯৯০ দুটিই ক্র্যাশ করেছিল পাইলটের ইচ্ছায়। তবে এই মতের বিরুদ্ধে অন্য মতামতও এসেছে। এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক বলছে, ১৯৭৬ থেকে আটটি প্লেন ক্র্যাশ করেছে পাইলটের সুইসাইডের জন্য।
    এমএইচ৩৭০-এর ক্যাপ্টেন জাহারি আহমদ শাহ এবং তার কো-পাইলট ফরিক আবদুল হামিদ-এর বাড়ি সার্চের পর যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে অনুরূপ কোনো কারণ খুজে পাওয়া যায়নি। তবে জল্পনা-কল্পনা হয়েছে ক্যাপ্টেন জাহারি শাহ-র সঙ্গে তার স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি হয়তো বা মানসিকভাবে আপসেট ছিলেন। কিন্তু এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত তার মানসিক অবস্থা বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ক্যাপ্টেন শাহ-র বাড়িতে পুলিশ একটা ফ্লাইট সিমুলেটর (একটি যন্ত্র যেটার মাধ্যমে ঘরে বসে কৃত্রিমভাবে প্লেন চালানো প্র্যাকটিস করা যায়) পেয়েছে। পুলিশ ওই যন্ত্রটি পরীক্ষা করে দেখছে।
    ব্যারি বলেছেন, প্লেনের কিছু সিসটেম যে ইচ্ছা করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল তাতে সুইসাইড থিওরিটা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। কিন্তু অন্য যেকোনো থিওরির মতোই পাইলট সুইসাইডও আরেকটা থিওরি।
    গ্র্যাটন তার সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, সুইসাইড থিওরি প্রমাণ করা অথবা বাতিল করার মতো কোনো আলামত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
    ৩. প্লেনটা কি হাইজ্যাক হয়েছিল?
    নাইন ইলেভেনে (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১) নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর হাইজ্যাকাররা যেন ককপিটের কনট্রোল না নিতে পারে সে জন্য ফ্লাইট ডেক দরজা খুব মজবুত করে বানানো হয়। ফ্লাইট ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিনের সেফটি এডিটর ডেভিড লিয়ারমাউন্ট বলেন, ওই দরজাগুলো এখন বুলেট প্রুফ তো বটেই – এমনকি কুঠার দিয়েও ভাঙা যাবে না।
    হোয়াই প্লেনস ক্র্যাশ (কেন প্লেন ক্র্যাশ করে) বইয়ের লেখিকা এবং লাইট এয়ারক্রাফট পাইলট সিলভিয়া রিনলি একমত হয়ে বলেন, ককপিটের দরজা ভেঙে ঢুকলেও পাইলট সময় পাবেন বিপদ সংকেত পাঠাতে।
    তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পাইলট বলেন, তালা খুলে ফ্লাইট ডেকে ঢোকা সম্ভব।
    কিন্তু দরজা যতই শক্ত হোক না কেন এক সময়ে সেটা খুলতেই হয়। যেমন, পাইলট টয়লেটে যেতে চাইতে পারেন অথবা ক্যাবিনে কি হচ্ছে সেটা দেখতে যেতে পারেন। ঠিক সেই সময়ে হাইজ্যাকাররা দ্রুত ককপিটে ঢুকে যেতে পারে। ফেব্রুয়ারি ২০১৪-তে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে পাইলটের টয়লেট যাওয়ার জন্য দরজা খোলার অপেক্ষায় ছিল হ্যাইজ্যাকাররা। তারা প্লেনটিকে হাইজ্যাক করে সুইজারল্যান্ডে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। এই সম্ভাবনা কমানোর জন্য ইসরেলের এয়ারলাইন এল আল (EL AL)-এ ডাবল দরজার ব্যবস্থা হয়েছে। গ্র্যাটন বলেছেন, যখন দরজা খোলা হবে তখন একজন ক্যাবিন ক্রু যেন সেখানে গার্ড দেন সেই নিয়ম আছে।
    তা-ও যদি হাইজ্যাকাররা দ্রুত ককপিটে ঢুকে পড়ে তাহলে অন্তত একজন পাইলট বিপদ সংকেত পাঠাতে পারবেন।
    কোনো পাইলট হয়তো বা কোনো যাত্রীকে ককপিটে বসার অনুমতি দিতে পারেন। জানা গেছে, গত মাসে এমএইচ৩৭০-এর কো-পাইলট, এর আগের একটি ফ্লাইটে এক টিনএজারকে ককপিটে ফটো তোলার পারমিশন দিয়েছিলেন।
    প্লেন নির্মাতা বোয়িং কম্পানি বলেছে, তদন্ত চলাকালে কোনো মন্তব্য করা উচিত হবে না।
    ৪. কোনো দুর্ঘটনা কি কারণ হতে পারে?
    প্লেনের কমিউনিকেশন সিসটেম ও ট্রান্সপনডার ইচ্ছাকৃতভাবে অচল করে দেয়া হয়েছিল এই থিওরির ওপর ভিত্তি করে তদন্ত চলছে। মালয়শিয়া কর্মকর্তারা সেটাই বলেছেন।
    তবে রিগলি মনে করেন, পরপর কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে প্লেনটির গতিপথ বদলে গিয়ে দুর্ঘটনাও হতে পারে। তিনি হেলিওস এয়ারওয়েজ ফ্লাইট ৫২২-র দৃষ্টান্ত টেনে বলেন, ২০০৫-এ গৃসের একটি পাহাড়ে এই প্লেনটি ক্র্যাশ করেছিল। তার আগে কোনো কারণে ক্যাবিন প্রেশার কমে গিয়েছিল এবং অক্সিজেনের অভাবে প্লেনের ক্রুরা অজ্ঞান হয়ে যান। প্লেন তখন অটো পাইলটে চলতে থাকে এবং পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লাগায়। যদি ওই প্লেনটা পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা না লাগাত তাহলে তেল ফুরিয়ে না পর্যন্ত উড়তেই থাকত। আমি বলছি না যে এমএইচ৩৭০-এ তেমন কিছু ঘটেছে। তবে এটাও একটা সম্ভাবনা।
    পাইলটরা বলেছেন, ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে প্রথম যেসব করতে হয় তার মধ্যে রয়েছে এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলে বিপদ সংকেত পাঠান। তবে কোনো দুর্ঘটনায় যদি একই সময়ে সব কমিউনিকেশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এমন বিপদ ঘটতেও পারে।
    ৫. ট্রান্সপনডার সিগনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে কোনো একশন নেয়া হয়নি কেন?
    প্লেনের ট্রান্সপনডার মাটিতে অবস্থিত রেডার বা গ্রাউন্ড কনট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ওড়ে। এমএইচ৩৭০-এর ট্রান্সপনডার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সাউথ চায়না সাগরের ওপর মালয়শিয়ার আকাশসীমা পেরনোর পর পরই এবং ভিয়েতনাম আকাশসীমা ঢোকার আগ মুহূর্তে ট্রান্সপনডার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
    ব্যারি বলেন, ইওরোপে এভাবে একটা প্লেন অদৃশ্য হয়ে গেলে এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলর কেউ এটা লক্ষ্য করতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বিপদ বার্তা দিতেন। গ্র্যাটন একমত হয়ে বলেন, এক আকাশসীমা থেকে আরেক আকাশসীমায় উড়ন্ত প্লেনকে হ্যান্ডওভার করা বা ঝুকিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটি খুবই স্মার্ট। প্লেন তাদের সীমানার মধ্যে থাকার সময়ে গ্রাউন্ড কনট্রোলাররা সার্বক্ষণিক সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। তারা নিশ্চিত করেন অন্য কোনো প্লেন যেন খুব কাছে এসে না পড়ে।
    তবে বৃটিশ এয়ারওয়েজের বোয়িং৭৭৭ প্লেনের সাবেক পাইলট স্টিভ বাজডিগান বলেন, ভিয়েৎনামিজ আকাশসীমায় ঢোকার আগে প্লেনের ভিএইচএফ ট্রান্সমিশন ১০ মিনিটের জন্য অকার্যকর থাকতে পারে।
    লিয়ারমাউন্ট বলেন, এটা সম্ভব যে মাটিতে কেউ লক্ষ্য করেননি প্লেনটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। মালয়শিয়ান এয়ার ট্রাফিক কনট্রোল হয়ত এমএইচ১৭০-কে ভিয়েতনামিজ এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলকে বুঝিয়ে দেয়ার পরে বিষয়টি ভুলে গিয়েছিল। ভিয়েতনামিজ গ্রাউন্ড কনট্রোলের সঙ্গে প্লেনটি যে যোগাযোগ স্থাপন করেনি সেটা বুঝতেই পাচ মিনিট লেগে যেতে পারে। তাই কেউ এলার্ম বাটন টেপেনি।
    ৬. মিলিটারি স্যাটেলাইট দিয়ে মিসিং প্লেন ট্র্যাক করা সহজ নয় কেন?
    পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের ১,৫০০ মাইল (২,৫০০ কি.মি) দক্ষিণ পশ্চিমে সমুদ্রে ভাসমান কিছু পদার্থের ভিত্তিতে সন্ধান কাজ চলছে। এই বস্তুগুলোর ছবি সরবাহ করেছে কমার্শিয়াল স্যাটেলাইট কম্পানিগুলো।
    জিওস্পেশিয়াল ইনসাইট-এর চিফ টেকনলজি অফিসার ড্যান শ্নার বলেন, এ ধরনের ফটো তোলার ক্ষমতা জানা মতে ২০টি স্যাটেলাইটের আছে। এদের মধ্যে সম্ভবত ১০টি স্যাটেলাইট রোজই নিয়মমাফিক ফটো তোলে। ফটোগুলো তারা মাটিতে বিম করে পাঠায়। গ্রাউন্ড রিসার্চ তখন এসব ফটো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে। এতে সময় লাগে।
    মিলিটারি এবং সরকারি স্যাটেলাইটও আছে। কিন্তু এমএইচ৩৭০-এর খোজে এদের সামনে দেখা যায়নি। তাই কেউ কেউ বলেন, সার্চের প্রথম দিকেই হয়তো প্লেনের দুর্ভাগ্যের বিষয়টি জানা গিয়েছিল – কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হয়নি।
    ফ্লাইট ২৩২ : ‘এ স্টোরি অফ ডিজাস্টার অ্যান্ড সারভাইভাল’ বইটির লেখক লরেন্স গনজালেস বলেন, ‘কিছু দেশের নিশ্চয়ই খুবই আধুনিক ও উন্নত ও শক্তিশালী সারভেইলাস সিসটেম আছে। কিন্তু সেটা তারা বলছে না। তারা যদি একটা দ্রুত ধাবমান ছোট মিসাইলকে লক্ষ্য রাখতে পারে তাহলে সেই তুলনায় ধীর গতিতে উড়ন্ত এক বিরাট জাম্বো জেটকে দেখতে পেল না – সেটা হয় কি করে? সুতরাং কোনো শক্তিশালী দেশ বা গোষ্ঠি জানে প্লেনটা কোথায়। কিন্তু সে বিষয়ে তারা বলতে চায় না। হয়তো এর সঙ্গে তাদের নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত। স্যাটেলাইট টেকনলজি এখন এত উন্নত যে, মহাকাশ থেকেও মাটিতে একটা গলফ বলের ওপরে লেবেলটাও পড়া সম্ভব।’
    কিন্তু গ্ল্যাটন বলেছেন, মিলিটারি স্যাটেলাইট নিয়োজিত হয় মিসাইলের ওপর নজর রাখতে। তারা কমার্শিয়াল এয়ারলাইনের ওপর নজর রেখে ডেটাবেইস বড় করতে চায় না। এমএইচ৩৭০-এর তুলনায় মিসাইলের স্পিড চার অথবা পাচ গুণ বেশি এবং সেটা ৩০ থেকে ৫০ মাইল ওপরে চলে। কমার্শিয়াল এয়ারলাইন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
    ৭. তেল ফুরিয়ে যাওয়ার পর প্লেনটা কি গ্লাইড করে সমুদ্রে নেমেছিল? নাকি সরাসরি ডুবে গিয়েছিল?
    এমএইচ৩৭০-এর শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল সেটা নির্ভর করছে সেটার কনট্রোলে তখনো পাইলট ছিলেন কিনা তার ওপরে।
    গ্র্যাটন বলেছেন, প্লেন আন্ডার কনট্রোলে থাকলে, তাকে গ্লাইড করে সমুদ্রে নামানো সম্ভব ছিল। নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে একটা এয়ারবাস নামাতে বাধ্য হয়েছিলেন পাইলট। ওই প্লেনের দুটি ইঞ্জিনই বিকল হয়ে গিয়েছিল। ফলে তেল ফুরিয়ে গেলে যে সমস্যা হতে পারে ওই এয়ারবাসের সেই একই সমস্যা হয়েছিল।
    ব্যারি একমত হয়ে বলেন, তেল ফুরিয়ে গেলে এই সাইজের একটা প্লেন গ্লাইড করে ৫০ মাইল যেতে পারে। তারপর সেটা সমুদ্রে পড়বে। কিন্তু ককপিটের কনট্রোলে যদি কোনো পাইলট না থাকেন তাহলে প্লেন ধপাস করে পড়ে যেতে পারে।
    ৮. যাত্রীরা কি জেনেছিলেন প্লেনে সমস্যা হয়েছে?
    প্লেনের ক্যাবিনে কোনো বড় রকমের সমস্যা দেখা না গেলে যাত্রীরা জানবেন না ককপিটে কি হচ্ছে। বিশেষত যদি প্লেনের মধ্যে কোনো মারামারি না হয়। পপুলার মেকানিক্স ম্যাগাজিনের সিনিয়র এডিটর জো পাপালারডো বলেন, প্লেন যখন তার নির্ধারিত গতিপথের বাইরে চলে যায় তখন সাধারণত যাত্রীরা সেটা জানেন না অথবা বোঝেন না। এমএইচ৩৭০-এর যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই হয়তো রাত একটায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তবে সচেতন কোনো যাত্রী ভোরে উঠে হয়তো বুঝতে পারেন সূর্যের অবস্থানটি প্রত্যাশিত স্থানে নয়।
    মালয়শিয়ান কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্লেন ৪৫,০০০ ফিট উচুতে উঠে গিয়েছিল। তারপর ২৩,০০০ ফিট নিচে নেমে এসে গতিপথ বদলেছিল। সে ক্ষেত্রে কিছু যাত্রী হয়তো উচ্চতা কমে আসাটা শারীরিকভাবে টের পেয়েছিলেন।
    আরেকটা থিওরি হচ্ছে প্লেনকে ইচ্ছা করে ওপরে ওঠানো হয়েছিল হাইপোক্সিয়া (Hypoxia) ঘটানোর জন্য। অর্থাৎ, অক্সিজেনের অভাব সৃষ্টির জন্য। সেটা হয়ে থাকলে যাত্রীরা হয়তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন – এমনকি মরেও গিয়েছিলেন।
    রিগলি বলেন, আকাশে বেশি উচুতে ওঠার সময়ে ক্যাবিনে ডিকমপ্রেশন হলে, অক্সিজেন মাস্ক তাদের সামনে ঝুলে পড়ার কথা। তাহলে তখন তারা বুঝতে পেরেছিলেন কোনো কারণে অক্সিজেন কমে গেছে। তবে এটাও হতে পারে যে সমুদ্রে আছড়ে পড়ার আগ পর্যন্ত তারা কিছুই বুঝতে পারেননি।
    ৯. যাত্রীরা কেন তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি?
    প্লেনে সমস্যা হয়েছে এমনটা বোঝার পরেও কোনো যাত্রীই কেন তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি? তারা তো আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিপদের কথা জানাতে পারতেন। নাইন-ইলেভেনে আমেরিকায় ইউনাটেড এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ৯৩ হাইজ্যাক হওয়ার পর কিছু যাত্রী তাদের মোবাইলে গ্রাউন্ডে স্বজনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
    কিন্তু এমএইচ৩৭০ প্রায় সাত মাইল উচ্চতায় উড়ছিল। তার গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ মাইল সেখান থেকে কোনো মোবাইল ফোনে যোগাযোগ সম্ভব ছিল না। মাটিতে কোনো সিগনাল পাওয়া সম্ভব ছিল না।
    ১০. স্যাটেলাইটে সার্বক্ষণিকভাবে সব ডেটা পৌছে দেয়ার যন্ত্র কেন প্লেনে ফিট করা হয় না?
    বর্তমান যুগে একটা স্মার্টফোন (আইফোন অথবা স্যামসাং গ্যালাক্সি) হারিয়ে গেলে খুজে পাওয়া সম্ভব। সেই তুলনায় একটা অতিকায় জাম্বো জেট প্লেন দু-একটি সিসটেম সুইচ অফ করে এত সহজে কিভাবে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে?
    ব্যারি বলেছেন, এখন প্লেনের অবস্থানগত ফটো বিভিন্ন সময়ে নেয়া হয়। অনেকটা স্ন্যাপশট ফটো তোলার মতো। কিন্তু ভিডিও ফটোগ্রাফির মতো চলমান ফটো তোলাও সম্ভব। সার্বক্ষণিক ভিডিও ফটোও তোলা সম্ভব। বোয়িং৭৭৭ সার্ভিসে প্রথম এসেছিল নব্বই দশকের শুরুতে। ওই প্লেনের টেকনলজি সেই যুগের।
    তবে গ্র্যাটন বলেছেন, একার্স (ACARS) সুইচ অফ না করা হলে এমএইচ৩৭০-কে ট্র্যাক করা যেত। এ ঘটনার পর এভিয়েশন ইনডেস্টৃকে বুঝতে হবে প্রতিটি প্লেনে এমন সিস্টেম বসাতে হবে, যেটা ম্যানুয়ালি সুইচ অফ করা সম্ভব নয়।
    প্রতিটি প্লেনে এমন সিস্টেম থাকতে হবে, যা দিয়ে স্যাটেলাইট থেকে সার্বক্ষণিকভাবে প্লেন দেখা যাবে – এমনকি ককপিটের কথাও শোনা যাবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আড়ি পেতে শোনার অভিযোগ উঠতে পারে। প্রশ্ন তখন হবে, কোনটা বড় ঝুকি? প্লেন নিখোজ হয়ে যাওয়া? নাকি ইলেকট্রনিকস আড়ি পেতে শোনা?
    ২৭ মার্চ ২০১৪

    facebook.com/ shafik rehman presents
    13959362011

    কাল থেকে কম্পিউটার সিটির মেলা

    বিশ্বকাপের খেলা-প্রযুক্তির মেলা’ স্লোগানে কাল বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় কম্পিউটার বাজার বিসিএস কম্পিউটার সিটির বার্ষিক মেলা। ‘সিটিআইটি ২০১৪’ নামের এ মেলা চলবে আগামী ৮ মার্চ পর্যন্ত। বরাবরের মতো এবারও মেলায় বিভিন্ন পণ্যের ওপর বিশেষ মূল্য ছাড়, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাধুনিক পণ্যের প্রদর্শনী থাকছে।
    ঢাকার আগারগাঁও বিসিএস কম্পিউটার সিটিতে গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ মেলার বিস্তারিত জানানো হয়। মেলা সম্পর্কে বলেন মেলার আহ্বায়ক এ এন এম কামরুজ্জামান। এ সময় বিসিএস কম্পিউটার সিটির সভাপতি মজিবুর রহমানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
    সম্মেলনে জানানো হয়, বিসিএস কম্পিউটার সিটির নিচতলায় সজ্জিত মঞ্চে প্রতিদিন তারকাদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান থাকবে। এ ছাড়া চিত্রাঙ্কন, গেমিং, ডিজিটাল আলোকচিত্র, বিতর্ক ও কুইজ প্রতিযোগিতা থাকছে মেলায়। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও পরিচালিত হবে মেলার সময়টায়।
    কম্পিউটার সিটির প্রায় ১৬০টি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক প্রযুক্তিপণ্য মূল্য ছাড়ে বিক্রি করা হবে। মেলায় থাকছে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠান, কম্পিউটারবিষয়ক আয়োজন ও বিনা মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ। এ ছাড়া গুণীজন সংবর্ধনাও দেওয়া হবে মেলায়।
    সিটিআইটি মেলার প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। প্রতিবারের মতো এবারও মেলায় শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এ ছাড়াও প্রতিবন্ধীরা বিনা মূল্যে মেলা দেখতে পারবেন। প্রবেশ টিকিটের ওপর র‌্যাফল ড্রও থাকছে।