• ?????: মুক্তমঞ্চ

    নতুন সিইসি নিয়েও সংশয়

    নতুন সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। দেশের সুশীলসমাজ ও বিশেষজ্ঞরাও মুখ খুলছেন। তারা বলেছেন, নতুন সিইসি আওয়ামী ঘরানার ঘনিষ্ঠ লোক। কথাটি মিলে যায় নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন সিইসির সাক্ষাৎকারে, যা প্রথম আলোতে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। সিইসি নূরুল হুদা বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা ছিল, আমি ছিলাম ফজলুল হক হলের ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। ১৯৭২ সালে পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হই।’ আমরা সবাই জানি, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সবাইকে অটোপ্রমোশনের একটি সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে সিইসির নামও ছিল। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৭৩ সালে তার চাকরি জীবন শুরু হয়। তার বক্তব্য ছিল- আমি এখন অতীত ভুলে যেতে চাই। আজ থেকে আমি নতুন মানুষ। বর্তমান দায়িত্ব নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে চাই। কিন্তু কথা থেকে যায়- যা নতুন সিইসি স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার বিনা কারণে আমাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। তখন মাত্র ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হয়। বিএনপি সূত্র বলেছে, জনতার মঞ্চের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে তার বিরুদ্ধে ওই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। নতুন সিইসি তা অস্বীকার করলেও সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম দাবি করেছেন, জনতার মঞ্চের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণেই বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। নূরুল হুদা এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। সেই আইনি যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হন, এ কথাও তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জনতার মঞ্চ যখন ঢাকায় চলছিল, তখন কুমিল্লার ডিসি ছিলাম। তখন কুমিল্লায় ডিসি অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নামানোর ঘটনা ঘটেছিল। কথাটি ঠিক। কিন্তু কাজটি কে বা কারা করেছে তা আমি জানি না। নূরুল হুদা বলেছেন, ২০০৮-২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পেয়েছি। আদালতের রায় ছিল ভূতাপেক্ষভাবে সব সুযোগ সুবিধা, পদমর্যাদাসহ আমাকে চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে।’ বিএনপির শাসনামলে, ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত চাকরিতে ফেরেননি। এ কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি চাকরিতে আবার যোগদান করেন। উল্লেখ্য, তিনি স্বাধীনতার ২৮ দিন আগে ১৮ নভেম্বর ১৯৭১ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপার পানপট্টিতে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার সব কিছুই যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, অর্থাৎ নভেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। যা হোক, নূরুল হুদার সাক্ষাৎকারের আলোকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়- তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। প্রথম কারণ, তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। দ্বিতীয় কারণ, জনতার মঞ্চ (১৯৯৫-১৯৯৬) যখন জাতীয় প্রেস ক্লাব সম্মুখস্থ সড়কে স্থাপন করে মখা আলমগীরের নেতৃত্বে চাকরিরত অবস্থায় সরকারি আমলাদের বিদ্রোহ ঘটে, কুমিল্লার ডিসি নূরুল হুদার অফিস থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। এটাও তিনি স্বীকার করেছেন। তৃতীয় কারণ তার চাকরিচ্যুতি ঘটে বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর। চতুর্থ কারণ নূরুল হুদা চাকরি ফিরে পান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। এরপর নানা পদে তিনি চাকরি করেছেন। তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এসব কারণে বলা যায়, তিনি কখনোই আওয়ামী মতাদর্শের বাইরের ব্যক্তি ছিলেন না। উপরন্তু বিএনপির প্রতি তার রাগ-বিরাগ ছিল, সেটাও তার সাক্ষাৎকারে প্রমাণ মেলে। শেষে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি অতীতকে ভুলে যেতে চাই। আজ আমি নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। সেই দায়িত্ব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে করতে চাই।’ সিইসিকে হতে হবে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু দেখা গেছে, তিনি ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সব সুযোগ-সুবিধা আওয়ামী লীগ সরকারের দুই টার্মে ক্ষমতায় আসার পর পেয়েছিলেন।
    এখন আমাদের প্রশ্ন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে যিনি জাতির অভিভাবকের আসনে বসে আছেন তিনি কি একজন সত্যিকার নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাননি, সার্চ কমিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নামগুলোর মধ্যে? ভবিষ্যতে নতুন সিইসি নূরুল হুদা যে রকীব কমিশনের মতো নির্বাচনী প্রহসনের পথ করে দেবেন না- তার কোনো নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন। আমরা চাই বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক একটি সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচন; যে নির্বাচন দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক মহল তখন বলবে, সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে নির্বাচন কমিশন। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০১৮-১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। আল্লাহ না করুন, যদি রকীব মার্কা নির্বাচন দিয়ে মানুষ খুন করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার কোনো মহড়া হয়, তাহলে এর দায়ভার আওয়ামী সরকার এড়াতে পারবে না। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সময়ে বাছাই কমিটির নিয়োগপ্রাপ্ত রকীবউদ্দিন কমিশন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে একটি কালো অধ্যায় বিদায়ী কমিশন জাতিকে উপহার দিয়েছে। এ ছাড়াও কয়েকজনের লাশ পড়েছে। স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা ক্রন্দন এখনো বাংলার আকাশ-বাতাসে মিশে আছে। আওয়ামী লীগ কৌশলী ভূমিকায় থেকে জোটের শরিক গণতান্ত্রিক পার্টি ও তরিকত ফেডারেশনের মাধ্যমে দেয়া পাঁচজনের নামই বাছাই করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখন ২০ দলীয় জোটের লক্ষ্য, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার। অনেকেই বলছেন, এ ক্ষেত্রেও ২০ দল অকৃতকার্য হবে। আওয়ামী লীগের চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতির সাথে বিএনপি কুলিয়ে উঠতে পারেনি। পারেনি ১৯৯৬ সালে, পারেনি ২০০৬ সালে, পারেনি ২০০৮-২০০৯ সালে এবং পারেনি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে। হেরে গেল চলতি মাসে সিইসি নিয়োগ প্রদানকালে। যুদ্ধ করতে হয় কৌশলী হয়ে, ডিফেন্সিভ বা অফেন্সিভ সব ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। একই কথা রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রমাণ করে দিয়েছেন। ডিজিটাল কারচুপি করে ইলেকটোরাল নির্বাচনে হিলারিকে পরাজিত করেছেন গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে।
    সুজন-এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, নতুন সিইসি প্রসঙ্গে, ‘আমার কাজ আমি করমু তোদের শুধু জিগাইয়া লমু।’ সেই আশঙ্কা সত্য হলো। প্রফেসর আসিফ নজরুল টিভি চ্যানেলে বলেছেন, একজন আওয়ামী লীগারকে সিইসি পদে আসীন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে। অনেকের মুখ থেকে শুনেছি, বিচারপতি কে এম হাসানকে আওয়ামী লীগ প্রতিহত করতে পেরেছে কোনো এক সময় বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অজুহাতে। আওয়ামী লীগ (২০০৬-২০০৭) যে কাজটি প্রতিহত করার যোগ্যতা দেখাতে পেরেছিল, সেটি পারেনি বিএনপি-বিরোধী দলে অবস্থান করে। ৫০ বছর পূর্তি ২০২১ সাল। এটা আওয়ামী লীগ জাঁকজমকপূর্ণভাবে করবে এ কথা ২০০৮-২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বলছে। সেই ছক ধরেই তারা এগোচ্ছে। অনেক ইস্যু আওয়ামী লীগ বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু একটি ইস্যুও কাজে লাগাতে পারেনি। জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এটা করতে পারেনি রাজনীতির কলা কৌশল না জানার কারণে।
    ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন এবং এটা তার বিখ্যাত উক্তিÑ ‘তুমি সমস্যার অধিনায়ক হও। সমস্যাকে পরাজিত করো এবং সফল হও।’ বিএনপির উচিত এই বাক্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। সবাই বলছে এবং পত্রপত্রিকা ও বিদেশী মিডিয়াও বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের অপর নাম হলো দলীয় শাসনব্যবস্থা। অথচ কাগজে কলমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম বহুদলীয় গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র পরমতসহিষ্ণুতা। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান, বলা হয়েছে সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে। ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা।
    সংবিধানে বলা আছে, সংসদকে কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারি দল ও বৃহত্তম বিরোধী দলের। নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সুশাসন এসব কি দেশে আছে। সব কিছুই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। জবাবদিহিতামূলক শাসনপদ্ধতিও দেশে নেই। জবাবদিহিতার সংসদও দেশে বিগত ৪৬ বছরে গড়ে ওঠেনি।
    তার পরও এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে বলে, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ, সুশাসনের দেশ। নিজের কাছেই লজ্জা হয়, যখন শুনি এসব অসার বচন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্ট (ঊওঠ)-এর নবম বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪।
    হাইব্রিড তথা শঙ্কর ধারার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ আজ। এসব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো- আজ এত প্রতীক্ষার পরও জাতি পেল প্রশ্নবিদ্ধ একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। আমরাও নিশ্চিত ছিলাম রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দনীয় কোনো ব্যক্তিকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন না। বাস্তবে সেটাই হয়েছে।
    লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও কলামিস্ট
    email : harunrashidas@gmail.com

    ৫ জানুয়ারি : গণতন্ত্রের রক্ষক না ভক্ষক?

    তৈমূর আলম খন্দকার : ৫ জানুয়ারি ২০১৪ বাংলাদেশের একটি দিবস যা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে ‘গণতন্ত্রের’ মাসী মা হিসেবে, কারো মতে এটা রাক্ষুসিনী যার কাজ ছলে বলে কৌশলে মায়াময়ী মা সেজে নিজ সন্তানকে ভক্ষণ করা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ ২০ দলীয় জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে না এ প্রত্যয় নিয়েই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। সে আন্দোলন সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করতে না পাড়লেও একটি শক্ত নাড়া দিয়েছিল এ মর্মে কোনো সন্দেহ ছিল না। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩ ‘রোড ফর ডেমোক্র্যাসি’ আন্দোলনটি পুলিশ ও র‌্যাবের নির্মম ও অগণতান্ত্রিক নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সে দিন ৯টি বালুর ট্রাক দিয়ে খালেদা জিয়াকে আটকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তিনি ঘর থেকে বেরুতে না পারেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বালু ট্রাকের মাধ্যমে পথ রোধ করে সরকার যে আচরণ প্রদর্শন করেছে তা-ও নাকি ‘গণতন্ত্রের’ জন্য। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র’ নামক অসার বস্তুটিকে বুটের নিচে রেখে একটি ফরমায়েসি গণতন্ত্রের সূচনা হলো। ভোট ও প্রার্থীবিহীন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন প্রার্থী এমপি এবং বাকিগুলোও তথাকথিত বিতর্কিত নির্বাচিত হতে জনগণের ভোট লাগেনি। অতঃপর সংরক্ষিত আসনে আরো ৪৫ জন নারীকে নির্বাচিত করে শুরু হয় অনির্বাচিত জাতীয় সংসদের পথচলা। সব কিছু জেনে বিশ্ববাসীও এ নির্বাচনকে বিতর্কিত নির্বাচন বললেও এর ধারা অব্যাহত রয়েছে।
    ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি লোক দেখানো নির্বাচনের পর বিরোধী দল আন্দোলন করেছে, মামলা-মোকদ্দমায় আসামি হয়েছে, গুম হয়েছে, ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে, সর্বোপরি বিরোধী দল আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, প্রহসনের নির্বাচন তারা মেনে নেয়নি। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সময় গড়িয়ে চলে এলো ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে সরকার গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করতে চাইলেও বিএনপি এটাকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করার উদ্যোগ নেয়। সে দিনও খালেদা জিয়াকে গুলশান অফিস থেকে বের হতে দেয়া হয়নি পুরনো কায়দায় সেই বালুর ট্রাক। বালুর ট্রাক সম্পর্কে সরকারি মুখপাত্র (মন্ত্রী) বলেছেন যে, ‘খালেদা জিয়া বাড়ি মেরামতের কাজের জন্য বালুর ট্রাক এনেছে।’ অন্য দিকে ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপাররা বলেছেন, ‘পুলিশ আমাদের কেন ধরে এনেছে তা আমরা জানি না।’ জনসভায় যোগ দেয়ার জন্য অফিস থেকে বের হতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন যা ৯৩ দিন অবদি চলে। অনেক ঘটনা অঘটনের মাধ্যমে ২০১৬ অতিক্রম করলেও ‘গণতন্ত্র’ আর আলোর মুখ দেখতে পায়নি। কারণ ২০১৫-১৬ দুটো বছরই ছিল স্থানীয় সরকার অর্থাৎ ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন। সে নির্বাচনও ছিল লোক দেখানো ও মানুষ হত্যার নির্বাচন। ১৪৫ জন নাগরিক ইউপি নির্বাচনে হত্যা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন যে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।’
    মূল কথায় আসা যাক। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার অবস্থান আগেও ছিল না, এখনো নেই, তবে কথা বলার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে বার বার, মানুষ সফল হয়েছে, কিন্তু সেই আগ্রাসন বার বারই গণমানুষের কণ্ঠকে রোধ করে দিয়েছে। ঘটনাচক্রে ‘হীরক রাজার’ দেশের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাজা যা বলবে সেটাই প্রজার জন্য আইন, এর ব্যতিক্রম আগেও ছিল না। বর্তমানেও নেই, তবে শব্দ চারণ ও কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশরা ‘খান বাহাদুর’ বা ‘রায় বাহাদুর’ টাইটেল দিয়ে যারা কথা বলতে পারত তাদের করায়ত্ত করত। পাকিস্তান আমলে করা হয়েছিল তগমায়ে কায়েদে আযম বা মিল্লাতে পাকিস্তান বা এ জাতীয় কোনো উপাধি দিয়ে। যারা অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করত তাদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য চালানো হতো স্টিমরোলার। সে অবস্থায় এখনো পরিবর্তন হয়নি।
    রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী? না তারা কি জনস্বার্থকে বিবেচনা করে কাজ করেন? দেশের চলমান প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড কি প্রমাণ করে?
    সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে :
    (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
    (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়।
    কিন্তু সত্যিই কি জনগণ রাষ্ট্রের বা ক্ষমতার মালিক? জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর কোনো প্রক্রিয়া (স্পেস) ক্ষমতাসীনরা কি খোলা রাখে? স্পেস রাখে না এ কারণে যে, জনগণের জন্য স্পেস রাখলেই তারা (ক্ষমতাসীনরা) নিজেরাই হাওয়া হয়ে যেতে পারে এ ভয়ে। দলীয় কারণের অভিযোগ আগেও ছিল, কিন্তু দলবাজি এত প্রকট আকার ধারণ করতে দেখা যায়নি। যোগ্যতা যাই থাকুক কোনো চাকরি, ব্যাংকিং সুবিধাসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে সাধারণ নাগরিকরা বঞ্চিত, যারা ক্ষমতাসীনদের সমর্থন করে না অথবা যাদের কোনো আত্মীয়স্বজন সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত।
    মোটা দাগে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা আভিধানিক অর্থে যাই হোক না কেন বাস্তবতার দৃশ্যপটে তা বদলে গেছে। ইংল্যান্ডে যত আদেশ-নিষেধ সরকারিভাবে যে ঘোষণাই আসুক না কেন তা হয় রানীর ব্যানারে। বাস্তবতা এই যে, আমাদের দেশেও গণতন্ত্রকে দুর্বল ও ধ্বংস বা বিতর্কিত করার জন্য যা করা হয় সবই গণতন্ত্রকে রক্ষার অজুহাতে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান শর্ত হলো জবাবদিহিতা। বর্তমান সরকার মনে করে, তারা জবাবদিহিতার অনেক ঊর্ধ্বে। কারণ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে।
    সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ক্যালেঙ্কারি ও অর্থ লোটপাট বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোষাগার থেকে ডিজিটাল চুরির মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে জবাবদিহিমূলক কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি বরং তথ্যবিভ্রাট সৃষ্টি করে সরকার জনমনে ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। সরকার ভারতের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করেছে যা সম্পর্কে জনগণ অবগত নয়; এমনকি বিনা ভোটে নির্বাচিত নিজের করায়ত্ত সংসদেও তা আলোচনা করা হয়নি। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সত্যই জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়ে থাকে তবে জনগণের সাথে এ বৈরিতা কেন? কেন জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলক ঘটাতে দেয়া হচ্ছে না? আইনের শাসন ও মানবতা পাশাপাশি নির্বিঘেœ চলতে না পারলে গণতন্ত্রের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে না। আইনের শাসনের পরিবর্তে দেশে যখন ব্যক্তির শাসন চলে তখন এ পরিবেশকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলা যায় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষমতাসীনদের মুখে মুখে থাকলে স্বাধীনমত প্রকাশের জন্য মিথ্যা মামলায় নিগৃত হয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আমার দেশ, টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত। একুশে টিভির মালিক পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। ‘লাইসেন্স আমি দিয়েছি এবং আমিই তা বন্ধ করতে পারি’ এ হুমকি দিয়েও মিডিয়ার প্রতি ভীতি সঞ্চার করা হয়েছে।
    সরকারি দল ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস এবং বিরোধী দল বিএনপি ও শরিক দল এ দিবসকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে উদযাপন করেছে। আগে থেকে সরকারি দলের মুখপাত্র ঘোষণা দিয়ে আসছে যে, বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না যা ইতঃপূর্বে সরকারি দল দিয়েছিল। বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে না দেয়া কি গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ? পুলিশ বা র‌্যাব দিয়ে মিথ্যা মামলায় নাজেহাল এবং হুমকি দিয়ে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করাই কি গণতন্ত্রের বিজয়? অনৈতিকভাবে নিজ স্বার্থ রক্ষাই যদি বিজয় হয় তবে এ বিজয় সম্পর্কে দেশবাসীর চেতনাবোধ কোনো কাজ করবে না, বরং বিবেক যদি সচেতন থাকে তবে অবশ্যই এ বিজয় জনগণের সমর্থন পেতে পারে না। বেনজির ভুট্টোর ভাষায় ‘বন্ধুক ও টিয়ারশেল দিয়ে মানুষকে দমন করা যায়, তাদের বরখাস্ত করা যায়, কিন্তু তাদের হৃদয়কে জয় করা যায় না। ধুসর মরুতে যেমন ফুলের গাছ জন্মায় না তেমনি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে এক নায়কতন্ত্র হওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলকে জনগণের মন জয় করেই টিকে থাকতে হয়। তারা শহীদের আত্মার প্রতি দায়বদ্ধ, যারা গণতন্ত্রের জন্য আত্মহুতি দিয়েছে’ (সূত্র ডটার অব টি ইস্ট পৃষ্ঠা-৩৫০)।
    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন-
    ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, আচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনাবিচারে বন্দী করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’ ওই বইটির প্রকাশক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি কি তার পিতার এ উপলব্ধি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হননি? নাকি ক্ষমতার লোভ বা স্বার্থের জন্য মানুষ যেভাবে পথ হারিয়ে ফেলে তিনি অনুরূপ হয়েছেন? গণতন্ত্র কি তার বোঝার ক্ষমতা তিনি রাখেন, তারপরও তিনি যদি বুঝেশুনে না বুঝে থাকেন তবে তার দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের বিজয় নামক পোশাক পরে উল্লাস করা ক্ষমতাসীনদের জন্য যথার্থ!

    রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে মায়ানমার ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম

    মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের মায়ানমার সরকারের গণহত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন ও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে দেশ থেকে বিতাড়িত করা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।

    মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গুলীতে ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত ও বহু লোক আহত হওয়ার নির্মম ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র’র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম I

    ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মায়ানমারে মুসলমানদেরকে হত্যা ও বহু লোককে আহত এবং শত শত ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে মুসলমানদের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল। মায়ানমার সরকারের পরিচালিত এ হত্যাকাণ্ড গণহত্যার শামিল।

    ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম, মুসলমানরা যখন বাঁচার জন্য ঘুরে দাড়াতে চেষ্টা করে তখন তাদের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করে না। কোথায় জাতিসংঘ ? কোথায় মানবাধিকার সংস্থা ? রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা কি তাদের বিবেককে তাড়িত করে না?

    তিনি বলেন, গত তিন যুগ আগে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছিল। তাদের আজ পর্যন্ত মায়ানমার সরকার দেশে ফিরিয়ে নেয়নি। সাম্প্রতিক মায়ানমার সেনাবাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪ শত রোহিঙ্গা মুসলমান গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

    তিনি আরো বলেন, এ মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে মায়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বিশ্ব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই।

    এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে এগিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র’র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম জাতিসংঘ ও আইসি এবং সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

    মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
    মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বাংলাদেশ যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সেসম্পর্কে বলেছে সংস্থাটি।
    এদিকে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে আজ আরো তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
    ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখান মানুষদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে সেখানকার সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছে।
    গত ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত চৌকিতে এক হামলার জের ধরে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই সেখান থেকে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের টেকনাফে ঢোকার চেষ্টা করে অনেকে। মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশের গ্রামগুলোতে ৯ই অক্টোবরের পর অন্তত ৬৯ জনকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে দেশটি সেনাবাহিনী। রাখাইন প্রদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করছে সেনাবাহিনী।

    বিবৃতিতে ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যুগ যুগ ধরে সে দেশের সরকার চরম জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাচাঁও বাচাঁও বলে আর্তচিৎকার করছে। মায়ানমারের বর্বর সরকার তাদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে। মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের আহাজারীতে পৃথিবীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। কোথায় আজ বিশ্ব মুসলমানদের সহযোগীতা ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও.আই.সি। নীরব কেন আজ মানবধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ?। গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এভাবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নিজ দেশে থাকতে না পেরে তারা বাঁচার আশায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র পথে নৌযানে পাড়ি জমাচ্ছে। নৌযান ডুবে তারা সাগরের পানিতে ভাসছে ও ডুবে মরছে। সাগরে ভাসতে ভাসতে শুধু রোহিঙ্গা মুসলমান মরছে না, মানবতারও মৃত্যু হচ্ছে। তাদের বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসা সকলের মানবিক দায়িত্ব।

    পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও কেন দেশে-দেশে মুসলমানরা আজ নির্যাতিত? মুসলমানগণ কি আমাদের কেউ নয়? বর্তমানে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে মায়ানমার সরকার। মুসলিম জনগণের ওপর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অমানবিক এবং অবৈধ, নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মুসলমান শুন্য করার খেলায় মেতে উঠেছে। নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এ নৃশংস বর্বরতার নিন্দা জানানোর ভাষা অভিধানে আজ পরাজিত! রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে গোটা বিশ্বের অমুসলিম শক্তি আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। আমরা এখনও নিশ্চুপ! রোহিঙ্গা মুসলমানদের কিই বা দোষ ছিল, যার কারণে তারা আজ নির্মম-জুলুম নির্যাতন ভোগ করতে হচ্ছে? কারণ একটাই ওরা যে মুসলমান। ধর্মীয় পার্থক্য ও বৈপরিত্যের কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সামরিক জান্তা, প্রশাসন ও বৌদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠিরা তাদের উপর সীমাহীন জুলুম চালাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠি। শত শত বছর ধরে তারা নির্যাতিত ও নিপিড়ীত হচ্ছে। নির্যাতনের চিত্রগুলো বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। মজলুম রোহিঙ্গাদের বিভৎস চেহারাগুলো দেখে কার চোঁখ না অশ্রুসিক্ত হবে? আপনার সামনে আপনার ভাই-বোন, মা-বাপ, ছেলে-মেয়েদের যদি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে, শরীরের উপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, চোঁখের সামনে তাজাদেহ দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তখন আপনার কেমন লাগবে? আহ! বার্মার মুসলমানদের সাথে তাই করা হচ্ছে! জাতিসঙ্ঘ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর নির্যাতনের শিকার জনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেছে। রোহিঙ্গা পরিচিতি? বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ওরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হযেছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে যে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওযা একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়েবলেন, আল্লহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।তবে,ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

    মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। সেও ছিল ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে। শত শত বছর ধরে তারা মিয়ানমারে বাস করে এলেও মিয়ানমার সরকার তাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বলা হয় এরা বহিরাগত। ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায় এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্ব প্রথম গড়ে উঠা মুসলিম বসতি ওয়ালা প্রদেশের মধ্যে বর্তমানের আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ ছিল উল্লেখ যোগ্য। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকানের স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। ২০০ বছরের বেশি সময় সেটা ছিল স্থায়ী। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ পর্যন্ত আরাকান রাজ্য এক কঠিন দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আর এই দূর্ভিক্ষই আরাকান থেকে মুসলিম প্রশাসকের পতন ঘটে। ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক শাসনকর্তা আরাকান রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন প্রদেশ করে, এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, এ রাজ্য বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোন সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। বড় আফসোস! আজও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার। বার্মা বা মিয়ানমার দেশটির রাখাইন রাজ্যে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে এবং তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি অভিবাসী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করছে মিয়ানমার সরকার। বর্তমানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শিবিরে আটক অবস্থায় রয়েছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তা তার অধিবাসী মুসলমানদের জন্য সে দেশকে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে পরিণত করেছে। তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে উপার্জিত সব সম্পদের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও। তাই তারা সমূহ বিপদের কথা জানার পরও মরিয়া হয়ে ছুটছে একটুখানি নিরাপদ ঠিকানার সন্ধানে।
    আরাকানের বর্তমান অবস্থা
    মিয়ানমারের পশ্চিমা প্রদেশ আরাকান (রাখাইন) আবার জ্বলছে। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পুরোনো রাজধানী ম্রাউক-উ-তে চলছে বৌদ্ধ রাখাইনদের মিছিল। মিছিল চলছে জীপগাড়ি, মোটরসাইকেল, রিক্সা, টুক-টুক কিংবা সাইকেলে চড়ে – কিন্তু সবচেয়ে বেশী লোক চলছে পায়ে হেঁটেই। তাদের সাথে আছে বর্শা, তরবারী, ধামা, বাঁশ, গুলতি, তীর-ধনুক এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পেট্রোল বোমাও। তাদের লক্ষ্য – নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐ মিছিলেই জনৈক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকে গলা-কাটার মতো ভয়াবহ ইশারা-ইঙ্গিত করতে দেখা যায় (যুক্তরাজ্যের দি ইকনমিস্ট; ৩-রা নভেম্বর, ২০১২)।
    দুঃখের বিষয় এই যে ম্রাউক-উ’ই একমাত্র শহর নয় যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পরিকল্পিত গণহত্যার মুখোমুখি। মিয়ানমারের ভেতর থেকে পাওয়া খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর মদদে রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ভাবে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে বের করে দেয়ার অভিপ্রায়ে গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। এই নির্মূলাভিযান এমনই ভয়াবহ ও নৃশংস যে, পরিকল্পিত হিংস্রতা লুকিয়ে রাখার স্বগত প্রবণতা থাকা বর্মী রাষ্ট্রপতিও শুক্রবার, ২৬-শে অক্টোবর, স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ৮টি মসজিদ সহ ২০০০ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে (সূত্র: বার্মিজ সরকারপন্থী পত্রিকা, the New Light of Myanmar)। এই সপ্তাহে তার মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইন প্রদেশে পুরো গ্রাম কিংবা আংশিক নগর পুড়ে ভস্মীভুত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।” বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আসল সংখ্যা ও বাস্তবতা আরো অনেক ভয়াবহ।

    আশংকা করা হচ্ছে যে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ৫০০০ রোহিঙ্গার বসতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে তোলা ছবিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর চিয়াউকফুর (Kyaukphyu) মুসলিম অধ্যুষিত অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ দেখা যায় (১, ২)। এই শহর থেকেই তেল ও গ্যাসের পাইপ-লাইন বার্মা থেকে চীনে যাবার কথা। সাম্প্রতিক এই গণহত্যার আগ্রাসনের সময় মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ও শহরাংশে তাদের আঁটকে রেখে আগুনের গোলা ছোঁড়া হয়। মৃত্যু আতংকে পালাতে চেষ্টা করা মুসলিমদের উপর রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসী ও সরকারের মধ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা চালায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিবিদ ও ভিক্ষুরা দিনে দিনে সেখানে গড়ে তুলছে বর্ণ ও ধর্মের ঘৃণার পরিবেশ, যাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরণের সহিংসতাকে অনুমোদন দেয়া যায়। অনেক রোহিঙ্গা তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে। কিন্তু হায়! সেখানেও রক্ষা নেই। গত সপ্তাহে শতাধিক রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অনেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে গেছেন বাংলাদেশে। ধরা পড়ে অনেককেই যেতে হচ্ছে সিত্তেওয়ের মানবতের জঘণ্য ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে জুন মাস থেকেই আঁটকে আছে আরো অনেক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী। ঐদিকে রাখাইন সন্ত্রাসীরা আবার ডজন ডজন রোহিঙ্গা মেয়েদের তুলে নিয়ে করছে ধর্ষণ – আর সেইসাথে চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের বিভীষিকা I
    এটা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেয়ারই তৎপরতা। ২৫-শে অক্টবরের এক ইস্তেহারে মিয়ানমারে অবস্থিত জাতিসংঘের কর্মকর্তা অশোক নিগম বলেন, “জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধংসযজ্ঞের ব্যাপারে শংকিত।” তিনি বলেন ক্ষতিগ্রস্ত সকল জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ প্রবেশাধিকার অপরিহার্য; এবং সে লক্ষ্যে তিনি সরকারের প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে দ্রুত ও শর্তহীনভাবে পৌঁছবার মানবিক আবেদন জানান।

    মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা জঘন্য অপরাধগুলো লুকিয়ে রাখতে চায়, সেজন্যে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও, সাহায্য সংস্থা এমনকি জাতিসংঘকেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতে প্রবেশাধিকার দেয়না – পাছে তারা বর্বরতার মাত্রা বুঝে ফেলে। আর যেহেতু রোহিঙ্গাদের সার্বিক নির্মূল রাষ্ট্রীয় নীতিরই অংশ, তাই মুসলিম ভুক্তভোগীদের জন্যে মিয়ানমারের সরকারী সংস্থাগুলো থেকে কোনো সাহায্যই পৌঁছেনা। আরো জঘন্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ও.আই.সি কিংবা ইসলামিক রিলিফ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও প্রাপক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। হিসেবে দেখা গেছে, পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর ১০ শতাংশেরও কম ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেছে। রাষ্ট্র-আয়োজিত অক্টোবরের রাখাইন সন্ত্রাসী ও ভিক্ষুদের প্রতিবাদ সভাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়; কেননা, সেই অযুহাত দেখিয়েই মিয়ানমার সরকার ও.আই.সি-সহ অন্যান্য মুসলিম সাহায্য সংস্থাকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ত্রাণ কার্যালয় খুলতে দেয়নি।

    মুসলিমদের ভয়াবহ হত্যার জন্যে একজন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকেও শাস্তি দেয়া হয়নি। থেইন সেইনের সরকার থেকে আমরা কেবল সহিংসতার হোতাদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ফাঁকা বুলি শুনেছি। কিন্তু এসব প্রতিজ্ঞা কখনো ন্যায়বিচারে পর্যবসিত হয়না, যেমনটা আমরা দেখেছি ৩-রা জুনে ১০ বর্মী মুসলিমদের বিনা বিচারে মেরে ফেলার ঘটনায়। এই যখন বাস্তবতা – তখন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের জান-মাল রক্ষার কথা না হয় বাদই দিলাম।
    বুঝতে কষ্ট হয়না যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে থেইন সেইনের সরকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছে; একদিকে যেমন উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি থেকে অপরাধগুলোকে আর লুকিয়ে রাখা যায়না তখন তারা সবাইকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়া শান্ত করে – আর অন্যদিকে যখন বহির্শক্তির চাপ কিছুটা কমে আসে, সাথে সাথেই বেড়ে যায় জঘন্য অপরাধগুলোর মাত্রা। তাই ৩-রা জুনে শুরু হওয়া সংঘবদ্ধ হত্যা ও নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট এক লক্ষ আভ্যন্তরীন শরণার্থীর সাথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসের ফলে আরো কয়েক অযুত বাস্তুহারা শরণার্থী যোগ দিলে সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটে অনেকখানি। এক সময়ের সমৃদ্ধ মুসলিম জনপদ এখন যেন বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়া অঞ্চল! কোনো রোহিঙ্গাকেই তাদের এলাকাতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি পূনর্গঠন করতে দেয়া হয়নি। নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ক্যাম্পে তাদের আঁটকে রাখা হয়েছে। ঐ বীভৎস ছাউনিগুলো থেকে বের হয়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করলে রাখাইন বৌদ্ধ নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হবার সমূহ ঝুঁকি থাকে। ঐ ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে যাতে তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

    নিরস্ত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা যেন রাখাইনদের জাতীয় চেতনাতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তরক্ষীরা (NASAKA) বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে আরাকান হচ্ছে রাখাইন রাজ্য – যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোনো স্থান নেই। রোহিঙ্গাদের বলা হয় তারা যেন আরাকান থেকে চলে যায়, না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে নির্মূল করার তালিকায় একে একে যুক্ত হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলো। পাঁচের বেশী লোকের সমাবেশ ঘটানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা ১৪৪ ধারা কেবল রোহিঙ্গাদের উপরই প্রয়োগ করা হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের আশীর্বাদ পওয়া রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট, মসজিদ, স্কুল কিংবা গ্রাম লুট হওয়া অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেও বাইরে যেতে পারেনা রোহিঙ্গারা।

    বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী রাখাইনরা সরকারের সহযোগিতা পায়। চিয়াউকফু শহরের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, বৌদ্ধ অগ্নি-নির্বাপক দল পানির বদলে আগুনের উপর জ্বালানী ছিটিয়েছে, যাতে ধ্বংসলীলা সম্পূর্ণ হয়! পিট প্যাটিসন নামের একজন স্থানীয় শিক্ষক, যিনি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জন্যেও কাজ করে থাকেন বলেন,
    দমকলের বাহিনীর লোকজন আগুনের উপর আদতে ঢেলেছে পেট্রোল – কিন্তু ভান দেখাচ্ছে যেন তারা পানি ছিটাচ্ছে! কর্তৃপক্ষ আসলেই একপেশে। আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারিনা।

    যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাতেগুলোতে মুসলিমরা একতরফা ভুক্তভোগী – থেইন সেইন সরকার একে রাখাইন রাজ্যের আন্তঃগোত্রীয় দাঙ্গা বলে চিত্রায়িত করতে সচেষ্ট। সাদামাটা অর্থে যা হচ্ছে তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইনদের দ্বারা হত্যা-সহ ভয় ভীতির উদ্রেক করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যমূলক সরকারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে এই কাজগুলোকেই বলে নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (ethnic cleansing)। রক্তপিপাসু এই সরকার কিংবা ঘরে ও বাইরে সরকারের কোনো সমর্থকই ছল-চাতুরী করে এমন ভয়াবহ অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।
    মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (Ethnic Cleansing)
    রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিনাশ আসলে পূর্ব-পরিকল্পিত বিষয় (text book case)। বিষয়টি বর্মী ও রাখাইন বৌদ্ধদের আশীর্বাদে রাখাইন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বর্মী সরকারের হাতে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিকল্পনার অংশ – যেখানে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সাধু-সন্ত ও জনতা-সহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সবাই রোহিঙ্গা সমস্যার শেষ সমাধান দেয়ার এই পরিকল্পনার উৎসুক অংশীদার।
    তাই থেইন সেইন সরকারের রোহিঙ্গা উৎখাতের পরিকল্পনাকে সমর্থন করা তরুন সাধু সঙ্ঘের (Young Monks Association) বিক্ষোভ সভাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেখে অবাক হতে হয়না। সবচাইতে বড় এমনই এক বিক্ষোভ সভাতে সভাপতিত্ব করতে দেখা গেছে উইরাথু (৫) নামের পরম-পূজনীয় এক বৌদ্ধ শিক্ষককে। সে হচ্ছে সেই অপরাধী যে ২০০৩ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার প্ররোচনা দেবার জন্যে জেলে গিয়েছে। তাই অবাক হবার কিছু নেই যে আং সান সু চি আজ প্রতারণামূলক অঙ্গীকার করছেন – যেখানে তার দল NLD আসলে রোহিঙ্গা নির্মূলের রাষ্ট্রীয় অভিযানের অন্যতম সমর্থক। ‘গণতন্ত্র’র প্রতীক বলে পরিচিত এমন অনেক নেতাই আজ ফ্যাসিবাদের চাইতে কতটা ভালো তার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন – সত্যি বলতে কি, তাদের কাজকর্ম আদতে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (KKK) সদস্যদের চেয়েও জঘন্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
    এই নির্মূল অভিযানের সবচাইতে ভয়ানক অংশ হচ্ছে রাখাইন বৌদ্ধরা, যাদের পূর্বপুরুষেরা একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরাকানে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য আরো শতাধিক বছর আগেই হিন্দু সাম্রাজ্য চন্দ্র’দের শাসনামলে অপেক্ষাকৃত শ্যামলা বর্ণের রোহিঙ্গাদের বংগ-ভারতীয় পূর্বপুরুষেরা আরাকানে ইতোমধ্যেই বসবাস শুরু করে দিয়েছে। চন্দ্র রাজাদের তৎকালীন বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
    রাখাইন জাতির সেই তিব্বতীয়-বর্মী বৌদ্ধ পূর্বপুরুষদের অনধিকার ও সহিংস প্রবেশের ফলে আরাকানে বসবাসকারী হিন্দু ও মুসলিমরা কালক্রমে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। কিন্তু ১৪৩০ সালে প্রায় ৫০,০০০ সদস্যের দু’টি সৈন্যদল পলায়নরত রাজা নারামেইখলা’কে যখন আরাকান রাজ্যে পুনঃঅধিষ্ঠিত করে তখন সেই সৈন্যদলের অনেককেই আরাকানে থেকে যেতে রাজা অনুরোধ করেন (৬); উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বর্মী আক্রমণ প্রতিহত করা। মুসলিম সেনাদলের অনেকেই নতুন রাজধানী ম্রোহাংগ (ম্রাউক-উ)-এ থেকে গেলে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের সংখ্যা আরাকানে কিছুটা বাড়ে।
    আরাকানের ম্রাউক-উ সাম্রাজ্য পার্শ্ববর্তী বাংলা/ভারত অঞ্চল থেকে অনেক আচার, কৃষ্টি গ্রহণ করে। তারা ইসলামী অভিলিখনে মুদ্রাও বাজারে ছাড়েন। তারা বাংলা সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতাও দেন। তারা মুসলিম নামও অধিগ্রহণ করেন, যে রীতি ষোড়শ শতাব্দীর প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত চলে। বৈচিত্র্যপূর্ণ নৃ ও জাতিগোষ্ঠীর সমাহারে সাজানো এই সাম্রাজ্যে মুসলিমরা প্রশাসন, আদালত ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিশেষ অবদান রাখে। ১৭৮৪ সালের বর্মী রাজা বোদোপায়ার অধিগ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরেই এই বিচিত্র ও অনন্য রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন।
    বোদোপায়া ছিলেন উগ্রপন্থী বৌদ্ধ, যিনি মুসলিম সম্পর্কিত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে চাইতেন। ধর্মীয় সৌহার্দপূর্ণ অঞ্চলে তিনি সংকীর্ণতাবাদী সাম্প্রদায়িকতার প্রচলন করেছিলেন। আরাকানের সৈকত জুড়ে থাকা মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে তিনি সেখনে প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ আশ্রম গড়ে তোলেন। আরাকান অধিগ্রহণের সময় তিনি কয়েক অযুত মুসলিমকে মারা ছাড়াও প্রায় ২০,০০০ মুসলিমকে বন্দী করে নিয়েছিলেন। তার নৃশংস রাজত্বকালে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পালিয়ে যায়। প্রায় ৪০-বছর বর্মী শাসনের পরে (১৯৮৪-১৮২৪) আরাকান ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। ইংরেজরা ৪-ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালের বার্মার স্বাধীনতা পর্যন্ত এই আরাকান অঞ্চল শাসন করে I

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বার্মা অধিগ্রহণের প্রাক্কালে বৌদ্ধ যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদী রাজকীয় জাপানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ভারতীয় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ী ও ব্যাবসাদির উপর হামলে পড়ে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও এই নির্মূলাভিযান থেকে রেহাই পায়নি। প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা ঐ বৌদ্ধ-জাপানী যৌথ অভিযানে প্রাণ হরান। রোহিঙ্গাদের তখন দক্ষিণ আরাকান থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই তখন ব্রিটিশ বাংলার প্রতিবেশী উত্তর আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে বাঁচেন, কেননা সেখানে তখনো রোহিঙ্গাদের নিগূঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। জীবন বাঁচাতে গিয়ে আরো প্রায় ৮০ হাজার তখন সীমান্ত পেরিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলায় বসবাস শুরু করে দেয়। সে সময় ২৯৪টি রোহিঙ্গা গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় (৮, ৯)।
    দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বার্মা স্বাধীন হবার পরেও রোহিঙ্গা-সহ অন্যান্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যা ও নৃশংসতা চলতেই থাকে। নৃতাত্ত্বিক বিনাশের লক্ষ্যে আমার জানা মতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিদেনপক্ষে দুই ডজন অভিযান চালানো হয়, সেগুলো হচ্ছে:
    ১. সামরিক অভিযান (৫ম বর্মী রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
    ২. বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স (BTF) এর অভিযান – ১৯৪৮-৫০
    ৩. সামরিক অভিযান (দ্বিতীয় জরুরী ছিন রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
    ৪. মাউ অভিযান – অক্টোবর ১৯৫২-৫৩
    ৫. মনে-থোন অভিযান – অক্টোবর ১৯৫৪
    ৬. সমন্বিত অভিবাসন ও সামরিক যৌথ অভিযান – জানুয়ারী ১৯৫৫
    ৭. ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিস (UMP) অভিযান – ১৯৫৫-৫৮
    ৮. ক্যাপ্টেন হটিন কিয়াও অভিযান – ১৯৫৯
    ৯. শোয়ে কি অভিযান – অক্টোবর ১৯৬৬
    ১০. কি গান অভিযান – অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৬৬
    ১১. ঙ্গাজিঙ্কা অভিযান – ১৯৬৭-৬৯
    ১২. মিয়াট মোন অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯-৭১
    ১৩. মেজর অং থান অভিযান – ১৯৭৩
    ১৪. সাবি অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪-৭৮
    ১৫. নাগা মিন (ড্রাগন রাজা) অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮-৭৯ (ফলাফল: ৩ লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus); মৃত্যু চল্লিশ হাজার)
    ১৬. সোয়ে হিন্থা অভিযান – অগাস্ট ১৯৭৮-৮০
    ১৭. গেলোন অভিযান – ১৯৭৯
    ১৮. ১৯৮৪’র তাউঙ্গকের গণহত্যা
    ১৯. মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – তাউঙ্গি (পশ্চিম বার্মা)। পিয়াই ও রেঙ্গুন সহ বার্মার অনেক অঞ্চলে এই দাঙ্গা ঘটে।
    ২০. পি থিয়া অভিযান – জুলাই ১৯৯১-৯২ (ফলাফল: দুই লক্ষ আটষট্টি হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus))
    ২১. না-সা-কা অভিযান – ১৯৯২ থেকে আজ পর্যন্ত
    ২২. মুসলিম বিরোধী সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা – মার্চ ১৯৯৭ (মান্দালয়)
    ২৩. সিটীওয়ে’তে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – ফেব্রুয়ারী ২০০১
    ২৪. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা – মে ২০০১
    ২৫. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা (বিশেষত পিয়াই/প্রোম, বাগো/পেগু শহরে) – ৯/১১ এর পরবর্তী থেকে অক্টোবর ২০০১
    ২৬. যৌথ নির্মূলাভিযান – জুন ২০১২ থেকে চলছে
    জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সকল মিয়ানমার সরকারই মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সার্বিক নৃতাত্ত্বিক বিনাশে খেলায় মত্ত। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করতঃ – তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরণের অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই মানা হচ্ছেনা। এখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:
    নাগরিকত্ব অস্বীকার
    সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ ও চলাচল
    নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত শিক্ষা
    সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কাজের অধিকার
    জবরদস্তিমূলক শ্রমনিয়োগ
    ভূমি অধিগ্রহণ
    জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদ
    ঘরবাড়ী, অফিস, স্কুল, মসজিদ ইত্যাদির ধ্বংস সাধন
    ধর্মীয় যন্ত্রণা দান
    জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ
    নিয়ন্ত্রিত বিয়ে
    প্রজননে বাধাপ্রদান ও জোরপূর্বক গর্ভনাশ
    স্বেচ্ছাচারী কর আরোপ ও বলপ্রয়োগে কর আদায়
    গবাদি পশু-সহ পরিবারের সদস্যদের জবরদস্তিমূলক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকরণ
    স্বৈরাচারী মনোভাবসূলভ গ্রেফতার, নিবর্তন ও আইন বহির্ভূতভাবে হত্যা
    রোহিঙ্গা মহিলা ও বয়ষ্কদের অবমাননা ও অমর্যাদা
    যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের প্রয়োগ
    রোহিঙ্গা সমৃদ্ধ লোকালয়ের প্রণালীবদ্ধ উচ্ছেদ
    অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কার্ড বাজেয়াপ্তকরণ
    আভ্যন্তরীণ শরনার্থী ও রাষ্ট্রহীনতা
    মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে মুসলিম ঐতিহ্য সমৃদ্ধ স্থান ও প্রতীকের ধ্বংস কিংবা পরিবর্তন

    ড. শুয়ে লু মং ওরফে শাহনেওয়াজ খান তার লেখা The Price of Silence: Muslim-Buddhist War of Bangladesh and Myanmar – a Social Darwinist’s Analysis বইতে জানাচ্ছেন যে আরাকান রাজ্যের চারটি জেলাতে রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের সংখ্যিক অনুপাত প্রায় সমানই ছিল – কিন্তু তেশরা জুন, ২০১২ থেকে শুরু হওয়া রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্মূলাভিযানের কল্যাণে সেসব মুসলিম জনবসতি এখন প্রায় জনশূণ্য।
    জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যপারে সঠিকই বলেছেন – রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচাইতে বড় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের গোত্র ও ধর্মের জন্যে তারা মিয়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা গণহত্যার বলি হচ্ছেন।

    জাতিসংঘ-সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত অনুসারে রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অসহায় ও নির্যাতিত জাতি।
    রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য গণহত্যা ছাড়া আর কোনো শব্দ আছে বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রে গণহত্যা শব্দের ব্যবহারে কারো অবাক হবার কিছু নেই, কেননা মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে গণহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, “ইচ্ছাপ্রনোদিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো নৃ, জাতি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নির্মূল অভিযান [the deliberate and systematic destruction of a racial, political or cultural group]।” সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, হোক সার্বিক কিংবা আংশিক – নৃ, জাতি, ধর্ম কিংবা রাষ্ট্রিক গোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক নির্মূলাভিযান থাকলেই গণহত্যা’র সংজ্ঞা প্রাসঙ্গিকই থাকে। আর যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারেই আরাকানের রোহিঙ্গারা নৃ, জাতি ও ধার্মিক আঙ্গিকে সংখ্যাগুরু রাখাইন বৌদ্ধ বর্মীদের চাইতে পুরোপুরি আলাদা।
    ড. ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহ্যাগেন তার লেখা Worse than War বইতে পাঁচ ধরণের উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে –পরিবর্তন, নিবর্তন, বিতাড়ন, জন্মনিরোধ ও সর্বাংশে নির্মূল। এখানে পরিবর্তন বলতে বোঝানো হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি-সহ সকল মৌলিক পরিচিতিগুলোকে ধীরে ধীরে পাল্টে দেয়া। আগে আমি যেভাবে বললাম, যদিও আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস স্মরণাতীত কালেই পৌঁছে – তবুও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা নব্য বসতকারী গোষ্ঠী হিসেবে নতুন মিথ্যে পরিচিতি দেয়া হচ্ছে।
    নিবর্তন হচ্ছে সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে ঘৃণিত, অননুমোদিত ও ভয়ঙ্কর মানুষদের নিজেদের কব্জায় রেখে তাদের উপর সহিংস দমননীতি চালানো যাতে সেই ভয়ানক জনগোষ্ঠী আসল কিংবা কল্পিত কোনও রকমের ক্ষতিই আর করতে না পারে। নিবর্তন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জীবনের প্রাত্যহিক বৈশিষ্ট্য।
    বিতাড়ন কিংবা বিবাসন হচ্ছে তৃতীয় উচ্ছেদের উপায়। বিতাড়নের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে হয় দেশের সীমানার বাইরে কিংবা দেশের মধ্যেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বিতাড়নের আরেকটি উপায় অবশ্য হচ্ছে জনগোষ্ঠীকে স্বদলবলে ক্যাম্পের জীবন বেছে নিতে বাধ্য করা। আর নে উইনের আমল থেকেই মিয়ানমার সরকার এই দোষে দোষী।
    উচ্ছেদের চতুর্থ উপায় হচ্ছে জন্ম নিরোধ যা মিয়ানমার সরকার অন্যান্য উপায়গুলোর সাথে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও ব্যবহার করা হয় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, গর্ভপাত ও ধর্ষণ। হালে ঘটা নিবর্তনে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, শহর ও লোকালয় আক্রমণের সময় অনেক মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া বলতে গেলে নৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে।
    সর্বাংশে নির্মূল হচ্ছে উচ্ছেদের পঞ্চম উপায় যেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে মেরেই ফেলা হয়। সর্বাংশে নির্মূলের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে এমন কারণও দেয়া হয় যে উল্লেখ্য গোষ্ঠীর সামান্য উপস্থিতিই যেন অন্যদের জন্য ভয়ানক হুমকির ব্যপার। এই পদ্ধতিতে সাময়িক, খণ্ডকালীন কিংবা সম্ভাব্য সমাধানের বদলে দেয়া হয় “চিরস্থায়ী সমাধান।” বুঝতে কষ্ট হয়না যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কেন রাখাইন ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলার জন্যে বিষাক্ত তেল ও খাদ্যাদি বিক্রী করেছে। বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাখাইন সন্ত্রাসী, রক্তপিপাসু রাজনীতিবিদ ও সরকারের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে এটা পরিষ্কার যে সার্বিক মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গারা নির্মূলাভিযানের শিকার।

    কী ভিক্ষু কী বৌদ্ধ জনতা – রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বের করে দিতে প্রায় সকল শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ আজ সংকল্পবদ্ধ।
    উপরে দেয়া মিয়ানমার সরকারের অপরাধ তালিকা থেকে এটা পরিষ্কার যে রোহিঙ্গারা উল্লেখিত পাঁচ ধরণের উচ্ছেদেরই শিকার। এটা আদতে রোহিঙ্গা নির্মূলের একটি সার্বিক পরিকল্পনা।
    গণহত্যার জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এটা শুরু হয় মানুষের মন থেকে, আর এজন্যে দরকার ব্যপক প্রচারাভিযান যাতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ কাজগুলো করা যায়। এক্ষেত্রে অপরাধ কিংবা হত্যাকারীদের নিঃশঙ্ক তো হতেই হবে, বরং তার উপরে বিশ্রী অপরাধগুলো চালিয়ে যাবার জন্য হতে হবে স্ব-প্রণোদিত অন্ধ সমর্থক। অনেক ক্ষেত্রেই, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবহ তৈরীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয় অন্ধ বর্ণবাদী বুদ্ধিজীবীদের উপর, যারা আম-জনতাকে অসহিষ্ণুতার বিষাক্ত বড়ি বিক্রী করেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিদ্বেষী মানসিকতাসম্পন্ন হওয়া কঠিন। তবে, উৎসাহী ও উদ্যমী শব্দমালা দিয়ে একবার চালু করে দেয়া গেলে, উচ্ছেদকারী সরকারের অভিঘাতী সৈন্যদল ও সমাজের সাধারণ জনগণ সার্বাঙ্গীন উন্মাদনা নিয়ে দায়িত্ব পালনে দেহ প্রাণ সঁপে দেয়। তারা স্বপ্রনোদিত হয়েই তা করে। আর আজকে মিয়ানমারে, বিশেষত আরাকানে তা-ই আমরা দেখছি।
    গণহত্যা আর যেসব জায়গাতে ঘটেছে সেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে আজকের সবচেয়ে বড় অপরাধের হোতারা – অর্থাৎ, মিয়ানমার সরকার, স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সাধারণ জনতার মস্তক ধোলাইকল্পে রোহিঙ্গা-সহ অ-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অহর্নিশি বিকৃত ইতিহাস দিয়ে চালাচ্ছে প্রোপাগাণ্ডা ও প্রাতারণা – উদ্দেশ্য হচ্ছে মিয়ানমার ও আরাকানের মাটিকে ‘অন্য’ লোকদের থেকে দখলমুক্ত করে ‘পবিত্র’ করা। আয়ে চ্যান, (বিগত) আয়ে কিয়াও, খিন মং স ও অন্যান্য উৎকট স্বদেশপ্রেমী রাখাইন লেখকদের বিষাক্ত লেখাগুলোকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় – কেননা তাদের লেখার কল্যানেই আজ মুসলিম জনগোষ্ঠী – বিশেষত রোহিঙ্গাদেরকে, বানানো হয়েছে ‘বহিরাগত ভাইরাস,’ যা বৌদ্ধ স্বকীয়তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাই আজকাল মিডিয়ার বদৌলতে – ‘রাখাইন লোকজনদের পক্ষে আর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব নয়’ – এমনতরো শ্লোগান প্রায়শই শোনা যাচ্ছে। আর ব্যপক এই হত্যাযজ্ঞের একমাত্র বলি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী – এই সমস্ত একপেশে রিপোর্টে তা পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে। আদতে উল্টো রোহিঙ্গারাই কিন্তু বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে দিশেহারা।

    ব্যাপক হারে হত্যাযজ্ঞের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার নীতিমালায়। সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক গঠনই হচ্ছে সেই বিভাজনকারী রেখা – যেখান থেকে সাধারণত এসব উচ্ছেদ প্রকল্প শুরু হয়। অন্য জায়গাতে আমি যেভাবে বলেছি, মিয়ানমার সরকার নব্য মিয়ানমারবাদকে সমর্থন জানায় – যেখানে বর্ণবাদ ও গোঁড়ামি হচ্ছে আদর্শিক সূতিকা – যার উপর ভিত্তি করে সকল অ-বৌদ্ধ ও অ-মোঙ্গল জাতির নাগপাশ থেকে মিয়ানমারের মাটিকে পবিত্র করার শপথ আছে। নৃ-তাত্ত্বিক, জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির বৈচিত্র্য যেখানে মহান শক্তিতে পরিণত হতে পারতো, সেখানে এই বিষাক্ত ভাবাদর্শের কল্যাণে তাকেই দেখা হচ্ছে সবচাইতে বড় দুর্বলতা হিসেবে।
    ইহুদি হলোকস্টের অনেক আগে ১৯৩৫ সালে জার্মানীর নুরেমবার্গ শহরে ইহুদিদের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ করে ইহুদি-বিরোধী বর্ণবাদী ও বিদ্বেষপূর্ণ এক আইন জারী করা হয়। ইহুদিরা ভোটাধিকার সহ চাকুরি করার যোগ্যতা হারায়। পরবর্তী ৮ বছর ধরে রাইখ (reich) নাগরিকত্ব আইন বলবৎ রাখার জন্যে ১৩টি আনুষঙ্গিক অধ্যাদেশ জারী করা হয় – যেখানে পর্যায়ক্রমে জার্মানির ইহুদিদের গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়। এই আইন ভঙ্গকারীদের কঠিন কায়িক শ্রম, জেল কিংবা জরিমানা করা হতো। এই আইনের সুযোগ নিয়ে নাৎসি’রা ভুক্তভোগীদের সম্পত্তি ধ্বংস করতো। ইহুদি হলোকস্টের মতো ঘটনার সূত্রপাত যে নুরেমবার্গের সেই ইহুদি-বিদ্বেষী আইনে, তা বুঝতে কষ্ট হয়না। আর সম্প্রতি বিশেষত রোহিঙ্গা মুসলিম ও সার্বিক ভাবে সকল মুসলিমদের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদকারী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জারী করা ধর্মীয় ডিক্রি সার্বিক বার্মায় এবং বিশেষত আরাকানে এক সম্ভাব্য ভয়াবহ গণহত্যার আভাস দিচ্ছে।

    মিয়ানমারের বৌদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের গড়ে ওঠা নব্য মিয়ানমারবাদ, নব্য-নাতসীবাদের মতোই একটি সামগ্রিক ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারার নেতা ও অনুসারীরা রাষ্ট্র ও ধর্মের পার্থক্য মুছে ফেলে তাদের বর্ণ ও ফ্যাসীবাদী রাজনীতির সাথে থেরাভাদা বৌদ্ধ মতবাদকে একীভুত করে ফেলতে চায়। আর থেরাভাদা বৌদ্ধ মতবাদ নিজেদের ছাড়া অন্য সব ধর্মমতের প্রতি গোঁড়া, মৌলবাদী, বর্ণবাদী, হিংস্র ও অসহিষ্ণু। মুসলিম, খৃষ্টান, শিখ ও হিন্দুদের মতো ১৪০টি নৃ-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত মিয়ানমারের প্রায় ১৫ শতাংশের এই সংখ্যালঘুদের জন্যে এই মতবাদ একটা সর্বনাশা বিষাক্ত প্রণালী। এটা অসহিষ্ণুতা উৎপাদন করে আর হিংস্রতা প্রতিপালন করে। তদুপরি বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থনসহ সরকারীভাবে এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবে অনুমোদনও দেয়া হয়। বর্মী বর্ণবাদের এই জগাখিচুড়ি-মার্কা আত্মম্ভরী নীতি ও অসহিষ্ণু বৌদ্ধ মতবাদ সংখ্যালঘু সহ সামগ্রিক অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

    দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পশ্চিমা আকাঙ্ক্ষার জন্য রাখাইন ও মিয়ানমার সরকারের অপরাধগুলোকে এড়িয়ে চলা হয়। মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড তাই সম্প্রতি প্রতারণামূলক ভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর চলা বর্বরতার মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার অভাব বলে জানিয়েছেন।
    তবে এই নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে যদিও মিয়ানমার খনিজ সমৃদ্ধ একটি দেশ, এটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে দরিদ্র। কিন্তু দারিদ্রই এই গণহত্যার মূল কারণ – যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এমন মতামত আসলে ভাষিক ছদ্মাবরণে থেকে ঘাতক মিয়ানমার সরকারের অপরাধগুলোর ভয়াবহতাকে চেপে যাবার নামান্তর। বসনিয়া আর রুয়ান্ডার ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের অজুহাত শুনেছি। পৃথিবীতে অনেক দরিদ্র দেশই আছে – তাই বলে সেসব দেশে শক্তিশালী সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপর গণহত্যার প্রকল্প নেয়না। গণহত্যা ঘটাতে হলে চাই রাষ্ট্রিক পৃষ্ঠপোষকতা, যেখানে সমাজের প্রায় সকল স্তরের লোকই অংশগ্রহণ করে – আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সাথে তাই-ই হচ্ছে।
    অনেককাল ধরেই চীন, ভারত-সহ অন্যান্য এশীয় ও প্রশান্ত অঞ্চলের দেশগুলো মিয়ানমারের নির্দয় সামরিক সরকারের সাথে ব্যবসা করে আসছে। এখানে মানবাধিকার কখনো অগ্রাধিকার পায়নি। অনেকদিন ধরেই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো মিয়ানমারে ব্যবসা করতে পারেনি। তাদের অংশগ্রহণের জন্য মিয়ানমারের পরিচায়ক মুখের পরিবর্তন ছিল অপরিহার্য। এই বিকৃত পদ্ধতি শুরু হয় যোগ্যতাহীন সু চি’কে নোবেল পুরষ্কার দেয়ার মাধ্যমে – আর তার ধারাবাহিকতায় আসে সেনা সদস্যদের অসামরিক পোষাক পড়ে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে পরিচিতি দেয়ার নাটকের দৃশ্যায়নে। ওটা যেন ছিল বার্মার গ্লাসনস্ত মুহুর্ত – যখন বার্মার নাম পাল্টে মিয়ানমার রাখা হয়। এই দাবীর ধারাবাহিকতায় আসে ২০১০ সালের নির্বাচন ও এর পরের উপনির্বাচন, যেখানে সু চি’র NLD পার্টি সদ্যোমে অংশ নেয় – উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, মিয়ানমার ফ্যাসিবাদী সামরিক গোষ্ঠীশাসন থেকে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এরপরে আসে থেইন সেইনের অলিখিত দূত হিসেবে সু চি’র পশ্চিমা বিশ্ব সফর – যেখানে তিনি বার্মার সাথে বহির্বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্য পুনঃস্থাপনের অনুরোধ জানান। সম্পর্কে স্বাভাবিকীকরণের শেষ অঙ্কে আসে থেইন সেইনের জাতিসংঘে সফরের নাটক, যেখানে তিনি বান-কি-মুন সহ অন্যান্য পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাত করেন।

    এরপরে শুরু হয় অপরাধী বর্মী সরকারের উপর আরোপিত পুরোনো সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রতিযোগিতা – উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন বাজারে আগেভাগে ঢুকে নিজের ভাগের অংশ ঠিক রাখা। তারা মিয়ানমারে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেয়। এমন উদ্যোগের মহড়া দেখে থেইন সেইন সরকারের সাহস বেড়ে যায় আরো অনেকগুণ – আর তারা ভাবতে থাকে যে বিশ্ববাসীর কাছে দেয়া আগের প্রতিশ্রুতিগুলো মানতে তারা আর বাধ্য নয়। জাতিসংঘের সফরের অব্যবহিত পরেই, বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিক্ষোভের সাজানো নাটক করে বর্মী সরকারের কাছে মুসলিমদের জোরপূর্বক অন্যত্র স্থানান্তরিত করার আর্জি জানায়। সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলোতে তারা ঘোষণা দেয় যে মুসলিমদের সাথে কোনোরকমের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেউ রাখলে তাকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। আগে যেভাবে বলা হলো, এটা নাৎসি নীতিরই ছায়া। এটা হচ্ছে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা সহ সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার সার্বিক ব্যবস্থা। মিয়ানমারের এই বৌদ্ধ ফ্যাসিবাদ এমনই অনিষ্টকর যে, আরাকানের ভেতরে ও বাইরে বসবাসরত রাখাইন বৌদ্ধরা মিয়ানমারের অন্য সব বৌদ্ধদের আশীর্বাদে মিয়ানমারে, বিশেষত রাখাইন রাজ্যে একজন মুসলিমও অবশিষ্ট রাখতে চায়না।
    আগে আমি অন্যখানেও বলেছি যে, রোহিঙ্গাদের নির্মূল করা এখন একটা মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে পরিণত হয়েছে – যেখানে তথাকথিত গণতন্ত্রের প্রতীক আং সান সু চি সহ মিয়ানমারের অধিকাংশ বৌদ্ধরা কোন-না-কোন ভাবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী। অনেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও হন্তক রাখাইন বৌদ্ধ ও সরকারের গণহত্যার প্রকল্পের ব্যাপারে রহস্যজনক নিরবতা কিংবা মৌন সম্মতি তাদেরকে এই অপরাধের সহযোগী হিসেবেই চিত্রিত করেছে। রাখাইন বৌদ্ধরা এখন তাদের নিজস্ব ধাঁচের কৃস্টালনাক্সট খুঁজে পেয়েছে। তারা ১৯৩৮ সালের নাৎসি পার্টির ধারাবাহিক নির্যাতন, হত্যা ও লুণ্ঠনকে অনুকরণ করছে, যখন একের পর এক ইহুদি লোকালয় আক্রমণ করা হয়েছিল। এই হারে চলতে থাকলে নিজ মাতৃভুমি আরাকানেই মুসলিমদের কোনো চিহ্ন ভবষ্যতে অবশিষ্ট থাকবে না।
    তেসরা জুন থেকে ঘটা আক্রমণগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক আইনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রহীন হওয়া রোহিঙ্গাদের উপর মিথ্যাভাবে সকল অপরাধের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে ফ্যাসিবাদী রাখাইন রাজনীতিকরা অবশিষ্ট বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে উত্তেজিত করে ক্রম-অগ্রসরমান “বর্ণ বিশুদ্ধিকরণ” প্রকল্পের প্রতি বাকীদের সমর্থন ও অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে। আয়ে মং এর ফ্যাসিবাদী দল, RNDP ও অন্যান্য বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিক সহ লোভী ব্যবসায়িরা বিনা বিচারে রোহিঙ্গাদের মেরে, ঘরবাড়ী, মসজিদ পুড়িয়ে তাদের সম্পত্তি ও ব্যবসা লুট করছে। রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তও করা হচ্ছে। এই কাজে রাখাইন সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশও উৎসুক অংশীদার। ফলে রোহিঙ্গারা আজ হয় কন্সেন্ট্রেশন-ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ছাউনি কিংবা বস্তিতে বন্দী কিংবা তাদেরকে দেশের বাইরে নির্বাসিত। গণহত্যার প্রকল্প এগিয়ে চলছে পূর্ণ উদ্যমে যাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করে সমস্যাটির “শেষ সমাধান” দেয়া যায়।

    আমরা এখনো এই নির্মূলাভিযান থামাতে পারি, যদি পশ্চিমা সরকারগুলো এখনই ব্যবস্থা নেয়। তারা জাতিসংঘের মাধ্যমে থেইন সেইন সরকারকে চাপ দিতে পারে – যাতে করে এই জাতি-বিনাশী প্রকল্প থামানো যায় আর সেই সাথে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পূনর্বহাল করা যায়। পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে হবে যাতে রোহিঙ্গারা তাদের হারানো জান ও মালের জন্য ক্ষতিপূরণ পান ও কালাদান নদীর পশ্চিম পাশে যাতে তারা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্ভয়ে বসবাস করতে পারেন। সরকার যদি এমন বাস্তবমুখী পরিবর্তনকে বিরোধিতা করে তাহলে নিরাপত্তা পরিষদে অর্থনৈতিক অবরোধ সহ অপরাধী মিয়ানমার ও রাখাইন সরকারের নেতৃবৃন্দকে নুরেমবার্গের মতো বিচারসভায় নিয়ে যেতে হবে – যাতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তাদের বিচার করা যায়।
    দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, রোহিঙ্গা সমস্যার প্রতি পশ্চিমা শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি নাৎসি আমলের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়; তারা স্পষ্ট সত্য দেখতে কিংবা শুনতে নারাজ। সহজ কথায় এটা অনৈতিক ও অমার্জনীয়। তারা কেবল মিয়ানমার সরকারের ভাষ্যকেই পুনরাবৃত্তি করছে – যেন সংঘর্ষটা দ্বিপাক্ষিক, অর্থাৎ বড় দুটো গোষ্ঠী একে অপরকে আক্রমণ করছে। এটা অবজ্ঞাপূর্ণ মিথ্যা সাযুষ্যের প্রয়াস বৈ কিছু নয়। যখন কেবল রোহিঙ্গাদের শহরগুলোই জ্বলছে, যখন সকল শরণার্থীই রোহিঙ্গা, যখন প্রথিতযশা কর্মী থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ভিক্ষু, স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক ও ছাত্রদের আর্তনাদ নাৎসি আমলের স্মারক – তখন এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে রোহিঙ্গা সমস্যার “শেষ অঙ্ক” মঞ্চস্থ করার ভয়াবহ মহড়া চলছে। এই বীভৎস সত্য কেউই লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।

    রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন (আরাকান) রাজ্য যেন একটা বিশালাকায় কারাগার। রোহিঙ্গা ঘরবাড়ীগুলোতে এখন দেয়া হয়েছে লৌহবেষ্টনী আর তাদের পুড়ে যাওয়া দালান-কোঠা হয়েছে সামরিক চেকপয়েন্ট। রাজধানী সিত্তওয়ে (আকিয়াব) এর বাইরে প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা বাস করছে শরণার্থী শিবিরের অস্বস্তিকর পরিবেশে – যেখানে অপুষ্টি ও রোগব্যধি সুবিস্তৃত আর যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় রাখাইন লোকবল ত্রাণকর্মীদের অবাধ চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করছে। বহুকালের নিবর্তন ও ধীরলয়ে এগিয়ে যাওয়া গণহত্যার তৎপরতায় ইতোমধ্যেই অর্ধেক রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া গেছে। যারা এখনো দেশের মধ্যে জীবিত আছেন তারা জীবন্ত নরক থেকে পালাবার দিন গুনছেন। আমাদের প্রজন্ম কি পুরো একটা জাতিকে এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেবে?
    আর কতো রোহিঙ্গার মৃত্যু ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সাম্প্রতিক এই ভয়ানক বর্ণবাদী নৃশংশতা রোধে এগিয়ে আসবে? বর্ণবাদী প্রতিহিংসা, ধর্মীয় গোঁড়ামী, সন্ত্রাস ও নৃশংসতা এবং সেইসাথে ঔদ্ধত্য ও শক্তির নিষ্ঠুরতার ইঙ্গিতবাহী এই পরিকল্পিত, ক্ষতিকর ও বিধ্বংসী অপরাধকে আর কতদিন আমরা উপেক্ষা করে যাব?

    দুঃখের বিষয় এই যে আমরা অতীতের গণহত্যা থেকে কিছুই শিখিনি – না হিটলারের জার্মানী থেকে, না হালের বসনিয়া, কসভো কিংবা রুয়ান্ডা থেকে। ভাষিক কূটাবরণে আজো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর ঘটা অপরাধের মাত্রাকে খাটো করে দেখানোর অপচেষ্টা চলছে। অনেক সাংবাদিক ঘটনার বর্ণনা দেবার আগে “অভিযোগ আছে যে” (“alleged”) এর মতো পূর্বপদ ব্যবহার করছেন, যাতে আসলেই কী ঘটেছে সে সম্পর্কে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা যায়। অনেক স্থানীয় সাংবাদিক নিঃসন্দেহে পক্ষপাতদুষ্ট যারা সরকারী প্রচারণাকেই বিতরন করার দোষে দোষী।
    ১৯৪৬ সালে নুরেমবার্গ বিচারসভার মার্কিন প্রধান কৌসুলী রবার্ট জ্যাকসন আন্তর্জাতিক সামরিক বিচার-পরিষদের সামনে দেয়া সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন,
    বাস্তবতা এই যে ইতিহাসের দীর্ঘ পদচারণায় বর্তমান শতাব্দী প্রশংসিত অবস্থানে থাকবে না, যদিনা এর দ্বিতীয় ভাগ প্রথম ভাগের কালিমা মুছে ফেলে। বিংশ শতাব্দীর এই দুটি ঘটনা ইতিহাসের বইগুলোতে সবচাইতে রক্তাক্ত ঘটনা হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশ্বযুদ্ধ দুটোতে হতের সংখ্যা প্রাচীণ ও মধ্যযুগের সকল যুদ্ধে নিহতের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশী। ইতিহাসের কোনও অর্ধ-শতাব্দী কখনো এই মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখেনি। দেখেনি এমন নিষ্ঠুরতা, এমন অমানবতা, এমন পাইকারি হারে মানুষকে দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা, এমন মাত্রার সংখ্যালঘুর পূর্ণবিলয়। তর্কেমাদার সন্ত্রাসও নাৎসি বিভৎসতার কাছে ফ্যাকাশে লাগে। ভবিষ্যত প্রজন্ম এই দশকগুলোতে ঘটা অনন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণে রাখবে। আমরা যদি এই বর্বরতার পেছনের কারণগুলোকে দূরীভূত করে এর পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে এটা কোনো অতিরঞ্জিত ভবিষ্যত বাণী হবেনা যদি বলা হয় যে বিংশ শতাব্দী হয়ত সভ্যতারই পরিসমাপ্তি টানবে।
    মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা এই গণহত্যার মহড়া দেখে এটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে আমরা দুভাবে ব্যর্থ – প্রথমত “কারণ” গুলোকে দূরীভূত না করতে পারা, আর দ্বিতীয়ত, “বর্বর ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি” প্রতিরোধ না করতে পারা।

    দুঃখজনক সত্য

    ‘হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, শান্তি পুরষ্কার দেয়ার ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি বরাবরই সব উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯৯৪ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারের কথা স্মরণ করুন। সেবার রবিন, শিমন পেরেজ আর ইয়াসির আরাফাতকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার ভূষিত করা হয়েছিলো। তারা নাকি গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু গাজার একটি শিশুকে জিজ্ঞেস করে দেখুনতো, তারা কেমন আছে, উত্তরটা পাবেন।’
    মেহদি বলেন, ‘২০১৩ সালেই সিএনএনকে দেয়া স্বাক্ষাৎকারেও এই নেত্রী বলেছিলেন, আমি অাগাগোড়া একজন রাজনীতিক। ২০১৬ সালে ক্ষমতায় বসাই আমার মূল লক্ষ্য। তাইলে কি ক্ষমতায় বসার জন্যই রোহিঙ্গা ইস্যুটি দেখেও না দেখার ভান করছেন সুচি? এ নেত্রীই কিন্তু নোবেল জয়ের প্রায় ২১ বছর পর ২০১২ সালে যখন নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন, আমাদের আশা এমন একটি পৃথিবী গড়া যেখানে কোন নিষ্পেষণ থাকবে না, কোন ‘সংখ্যালঘু’ থাকবে না, গৃহহীন থাকবে না কেউই।’

    বাংলাদেশ মায়ানমারের প্রতিবেশি দেশ হিসেবে মানবিক কারণেই মায়ানমারের মজলুম মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের উপর কর্তব্য। ইসলাম মজলুমের পক্ষাবলম্বন করেছে। মজলুম যদি অমুসলিমও হয়, তবুও তাকে সাহায্য করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো। চাই সে জালিম হোক বা মজলুম। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! মজলুমের সাহায্যের বিষয়টি তো স্পষ্ট। কিন্তু জালেমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বলেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ। এটাই তার প্রতি তোমার সাহায্য’। (-বুখারি শরিফ ) মজলুম মুসলমানদের সাহায্য করা আল্লাহর নির্দেশ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহপাক কুরআনেুল কারীমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হলো, তোমরা কেন আল্লার রাস্তায় অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়াই করছ না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হয়ে ফরিয়াদ করে বলছে, হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালিম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোন বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাঠাও’। (-সুরা নিসা:৭৫-৭৬) এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। বিশ্বের কোথাও কোনো মুসলমান আক্রান্ত হলে তার সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা অপর মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। হজরত নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন ‘সব মুমিন একই ব্যক্তিসত্তার মতো। যখন তার চোখে যন্ত্রণা হয় তখন তার গোটা শরীরই তা অনুভব করে। যদি তার মাথাব্যথা হয় তাতে তার গোটা শরীরই বিচলিত হয়ে পড়ে। (-মিশকাত শরীফ) এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, মু’মিনরা পারস্পরিক ভালবাসা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক দেহের ন্যায়। দেহের কোনো অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে পুরো দেহ সে ব্যথা অনুভব করে। (-বুখারি) একজন মুমিন-মুসলমান আহত হলে তার খোঁজ-খবর ও সহযোগীতা করা অপর মুসলমানের অন্যতমও কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহপাক বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে। মুমিন মাত্রই একে অন্যের ভাই। এক মুমিন অপর মুমিনের মাঝে এমন ভালবাসা ও আন্তরিকতা থাকবে যে পরস্পর একটি দেহের মতো মনে হবে। দরুণ একজনের ক্ষতি আরেক জনকে ততটাই আহত করবে যতটা মাথা আঘাত পেলে তার সারা শরীর আহত হয়। বিপদ মুসিবতের সময় একে অন্যের প্রতি আন্তরিকভাবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। কোন ভাই অসুস্থ বা আহত হলে কিংবা কোন ক্ষতি বা বিপদের সম্মুখীন হলে তাহলে অপর ভাই তার সাহায্যে এগিয়ে আসা। কেউ কারো ইজ্জত হানী করতে চাইলে কেউ তাকে অন্যায়ভাবে পরাজিত করতে চাইলে তার আশু সমাধান বা তার পক্ষাবলম্বন করা মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব। মিল্লাতে মুসলিম একটি দেহের মত। দেহের কোন অঙ্গ জখম হলে যেমন শরীরে ব্যথা অনুভব হয়, তেমনি কোথায় কোন ঈমানদার ভাই আহত নিহত হলে বা বিপদ-মুসিবতে পড়লে যদি তার মনে যদি এর জন্য দরদ বা ব্যথা অনুভব না হয় তাহলে মনে করতে হবে দুর্বল ঈমান। আর যদি এমন কারো জন্য ব্যথা অনুভব হয় তাহলে বুঝতে হবে সে প্রকৃত ঈমানদার। শেষ কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গারাও মানুষ, তারা আমাদের ভাই। তাদের বাঁচাতে এবং তাদের মানবিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ে জাতিসংঘ এবং ও আই সি এবং মিয়ানমার সরকারকে দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    অখণ্ড ভারত? নাকি গাজওয়াতুল হিন্দ?

    বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দিনদিন উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়ে উঠছে। বিশ্ব-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যর পরে ভারতীয় উপমহাদেশ হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    বর্তমান বিশ্বে ইসরাইলের (আমেরিকা) জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের মিসাইল রেন্জের মধ্যে ইসরাইলের অবস্থান আছে। পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমানবিক ক্ষমতাশীল দেশ যারা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তেই ইসরাইল কে ধ্বংস করে দিতে পারে, এটা ইসরাইল ভালো করেই জানে। কৌশলগত কারণে তারা সেটা প্রকাশ করে না এবং সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য এরা কখনো বলে ইরান তাদের জন্য হুমকি আবার কখনো বলে আমেরিকা তাদের জন্য হুমকি।
    পাকিস্তানকে অনেক কৌশলে মোকাবেলা করা হচ্ছে।
    তাই আমার মনে হয়না এই মুহূর্তে এই ভাবে সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে।
    ইন্ডিয়া কখনো সাহস করবে না পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।
    ইন্ডিয়া চাইবে ইসরাইল অথবা অন্য কোন শক্তি ব্যবহার করে পাকিস্তানের পারমানবিক ক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে তারপর যেন সর্বাত্মক হামলা চালানো যায়।

    ভারতীয় উপমহাদেশঃ-

    ভারতীয় উপমহাদেশ এশিয়া তথা ইউরেশিয়া মহাদেশের একটি অঞ্চল, যা হিমালয়ের দক্ষিণে ভারতীয় টেকটনিক পাতের উপর অবস্থিত এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত প্রসারিত এক সুবিশাল ভূখণ্ডের উপর বিদ্যমান। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলি হল বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্রস্থল হবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া। এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিরও পরিবর্তন ঘটবে। বিশ্ব নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায়।
    স্বভাবতই সকল বিশ্বশক্তিই এই এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। এরজন্য তাদেরকে হয় ইন্ডিয়া অথবা চিনকে (পাকিস্তান) সমর্থন করতে হবে। এতদিন আমেরিকা বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তান কে নিভির পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখেছিলো কিন্তু পাকিস্তান তাদের ভণ্ডামি বুঝতে পেরে এখন চীনের সাথে যোগ দিয়েছে। রাশিয়াও মুরব্বিদের মত আচরণ করছে, সরাসরি কাউকে সমর্থন দিচ্ছে না।
    :
    পাক-ভারত যুদ্ধে হলে তা সমস্ত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পরবে। পাকিস্তান হয়তো চীন, তুর্কি, সৌদি, রাশিয়া থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। ইন্ডিয়া হয়তো ইসরাইল, আমেরিকা, জাপান, ইরান থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। আর বাংলাদেশ হয়তো চীন ছাড়া কারো কাছ থেকেই সহযোগিতা পাবে না। চীন থেকে সহযোগিতা পাওয়ার আশাও খুব কম কারণ বাংলাদেশ তিনদিক থেকেই ইন্ডিয়া পরিবেষ্টিত।
    ————————
    ★★★বাংলাদেশের ভূমিকাঃ-
    :
    বাংলাদেশ ভৌগলিক ও সামুদ্রিক কারণে ভারতের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণ চীনের কাছেও। পাক-ভারত যুদ্ধ হলে চীন ভারত উভয়ই চাইবে বাংলাদেশে গ্রাউন্ড ফোর্স পাঠাতে। কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশ যাদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে তারা অনেক সুবিধা পাবে। যদি ইন্ডিয়া বাংলা দখল করে তাহলে চীন চাইবে শিলিগুরি করিডর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে।
    ইন্ডিয়া তাই চীনকে (+বাংলাদেশ) ঠেকানোর জন্য আসামে গোপনে নিউক্লিয়ার ব্যাস তৈরি করছে এবং এই অঞ্চলে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বহর সহ সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে।
    ইন্ডিয়ানরা বলে থাকে যে তাদের শুধু বাংলাদেশ দরকার বাংলাদেশের জনগণকে নয়। কেউ যদি মনে করে তাদের সাথে আপোষ করে থাকবে তাহলে ভুল মনে করবে। কারণ তারা কাউকে ছাড়বে না, প্রথমে তারা ইসলামিস্টদের মারবে তারপর মোডারেটদের তারপর দালালদের। তারা সকল মুসলিমদের শেষ করে দিবে। তাই বাংলাদেশীদের উচিৎ হবে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গরে তোলা।
    —————
    ★★★অখণ্ড ভারতঃ-
    :
    অখণ্ড ভারত হচ্ছে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদশ, নেপাল, ভুটান ও শ্রিলংকা নিয়া একটি একক ও বৃহৎ রাষ্ট্র স্থাপনের মহাপরিকল্পনা।
    অখন্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করা হিন্দুস্থানীয়দের আদর্শিক স্বপ্ন, আর সেটা বাস্তবায়ন করতে তারা সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে আসছে।
    বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস), বজরং, শিব সেনা এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মতো মূলস্রোতের ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সমন্বয়ে একটি অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের দাবি উত্থাপন করছে।
    অখন্ড ভারতের ধারণা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত আবেগময় এবং তাদের অস্তিত্বের অংশ।
    —————
    ★★★গাজওয়াতুল হিন্দঃ-
    :
    গাজওয়াতুল হিন্দ হল রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণীত ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম ও মুশিরকদের মধ্যে ভবিতব্য চূড়ান্ত যুদ্ধ।
    “গাযওয়া” অর্থ যুদ্ধ, আর “হিন্দ” বলতে এই উপমহাদেশ তথা পাক-ভারত-বাংলাদেশসহ মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানকে বুঝায়। এবং বর্তমানে এই অঞ্চলের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আমাদেরকে সেই গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
    মুসলিমরা গাযওয়া ই হিন্দ নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করলেও ইহুদি মুসরিকরা কিন্তু বিস্তর গবেষণা করছে। গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কিত কিছু হাদিস নিচে দেওয়া হল, উল্লেখ্য যে হাদিসগুলোকে সহিহ(বিশুদ্ধ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
    ***
    হযরত সা্ওবান (রাঃ) এর হাদিস-
    নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আজাদকৃত গোলাম হযরত সা্ওবান (রাঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের দুটি দল এমন আছে, আল্লাহ যাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ করে দিয়েছেন। একটি হল তারা, যারা হিন্দুস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে, আরেক দল তারা যারা ঈসা ইবনে মারিয়ামের সঙ্গী হবে’। (সুনানে নাসায়ী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪২)
    ***
    আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত,
    তিনি বলেনঃ “আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে হিন্দুস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। কাজেই আমি যদি সেই যুদ্ধের নাগাল পেয়ে যাই, তাহলে আমি তাতে আমার জীবন ও সমস্ত সম্পদ ব্যয় করে ফেলব। যদি নিহত হই, তাহলে আমি শ্রেষ্ঠ শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হব। আর যদি ফিরে আসি, তাহলে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আবু হুরায়রা হয়ে যাব”। (সুনানে নাসায়ী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪২)
    ***
    হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত,
    হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হিন্দুস্তানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, “অবশ্যই আমাদের একটি দল হিন্দুস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ্ সেই দলের যোদ্ধাদের সফলতা দান করবেন, আর তারা রাজাদের শিকল/ বেড়ি দিয়ে টেনে আনবে । এবং আল্লাহ্ সেই যোদ্ধাদের ক্ষমা করে দিবেন (এই বরকতময় যুদ্ধের দরুন)। এবং সে মুসলিমেরা ফিরে আসবে তারা ঈসা ইবনে মারিয়াম (আঃ) কে শাম দেশে (বর্তমান সিরিয়ায়) পাবে”।
    হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “আমি যদি সেই গাযওয়া পেতাম, তাহলে আমার সকল নতুন ও পুরাতন সামগ্রী বিক্রি করে দিতাম এবং এতে অংশগ্রহণ করতাম । যখন আল্লাহ্ আমাদের সফলতা দান করতেন এবং আমরা ফিরতাম, তখন আমি একজন মুক্ত আবু হুরায়রা হতাম; যে কিনা সিরিয়ায় হযরত ঈসা (আঃ) কে পাবার গর্ব নিয়ে ফিরত । ও মুহাম্মাদ (সাঃ)! সেটা আমার গভীর ইচ্ছা যে আমি ঈসা (আঃ) এর এত নিকটবর্তী হতে পারতাম, আমি তাকে বলতে পারতাম যে আমি মুহাম্মাদ (সাঃ) এর একজন সাহাবী”।
    বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ ‘খুব কঠিন, খুব কঠিন’। (আল ফিতান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪০৯) – [মুসনাদে আহমাদ, আস সুনান আল মুজতাবা ,আস সুনান আল কুবরা, আল মজাম আল অস্ত, আল জাম্য আল কাবীর]
    *—-*
    রাসুলুল্লাহ(সঃ) এর কথা অনুযায়ী খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্তান) থেকে কালিমাখচিত কালোপতাকাধারীদের উত্থান এবং তাদের কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া, পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ভারতের কাশ্মীর সীমান্তে ৭ লক্ষ সেনা মোতায়েন, পাক-ভারত-বাংলাদেশের হকপন্থী ইসলামী দলগুলোর আলোচনায় উঠে আসা, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং মুসলিমদের নির্যাতন নিয়ে ভারতের ভেতরে মুসলিমদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ, সেভেন সিস্টারস তথা ভারতের ৭ টি অঙ্গরাজ্যের স্বাধীনতার দাবি নিঃসন্দেহে গাজওয়াতুল হিন্দ এর ইঙ্গিত বহন করে।
    এই সময় হইত পাক-ভারত-বাংলাদেশের মুসলিম নামধারী মুনাফিকরা আলাদা হয়ে যাবে। তারা হয়তো কাফিরদের পক্ষে যোগ দিবে অথবা পালিয়ে বেড়াবে। এবং এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হবে এবং তারা বায়তুল মুকাদ্দাস (বর্তমান ফিলিস্তিন) এ গিয়ে ঈসা (আঃ) এর সাথে মিলিত হবে এবং খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করবে।
    :
    আল্লাহ-সুবহান ওয়া তা’লা বলেন, হে নবী, আপনি মুসলমানগণকে উৎসাহিত করুন জেহাদের জন্য। তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়পদ ব্যক্তি থাকে, তবে জয়ী হবে দু’শর মোকাবেলায়। আর যদি তোমাদের মধ্যে থাকে একশ লোক, তবে জয়ী হবে হাজার কাফেরের উপর থেকে তার কারণ ওরা জ্ঞানহীন। (Al- Anfaal: 65)
    :
    আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (Al-Baqara: 190)
    :
    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করছে আল্লাহ্ তাদের ওয়াদা করছেন যে, তিনি নিশ্চয়ই তাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের যারা ছিল এদের পূর্ববর্তী, আর অবশ্যই তিনি তাদের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের ধর্ম যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন, আর নিশ্চয়ই তাদের ভয়-ভীতির পরে তাদের জন্যে বদলে আনবেন নিরাপত্তা। তারা আমারই এবাদত করবে, আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করবে না। আর যে কেউ এর পরে অকৃতজ্ঞতা দেখাবে — তাহলে তারা নিজেরাই হচ্ছে সীমা-লংঘনকারী। (An-Noor: 55)

    রাজনীতির অঙ্কটা পাল্টে যাচ্ছে

    মাসুদ মজুমদার>নানা কারণে রাজনীতির গতানুগতিক ধারা ও অঙ্কটা পাল্টে যাচ্ছে। ‘গণতন্ত্র কম, উন্নয়ন বেশি’র নেতিবাচক উপসর্গগুলো এখন স্পষ্ট। হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি স্বদেশের সীমা অতিক্রম করে অল্প-বিস্তর বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী কমিউনিটির ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে। এটি অন্য যেকোনো জাতির সাথে তুলনা করলে বেশি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সচেতনতা প্রদর্শন করেন। জেলাভিত্তিক অসংখ্য সমিতি রয়েছে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক শহরে। হালে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি শহরেও দেশজ দলান্ধ রাজনৈতিক চর্চা ও সমিতি করার প্রবণতা বেড়েছে। সাধারণত ভাষা, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সব দেশে সঙ্ঘবদ্ধ থাকার মধ্যে নিজেদের কল্যাণ বিবেচনা করে। বাস্তবেও তাই। এটি শুধু ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধরে রাখার জন্য নয়, কমিউনিটির ভেতর বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই ঐক্য গড়ে ওঠে নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখার ভাবনা থেকেও। একটা মাত্রা পর্যন্ত এটি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে জরুরিও বটে। বাংলাদেশীরা দেশের দলান্ধ রাজনীতি ফেরি করতে গিয়ে সম্ভবত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। আমাদের সমস্যাটা অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হওয়ার কারণে। অন্যান্য জাতি দেশের বাইরে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। স্বজাতির প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশীরা প্রতিনিধিত্ব করে দেশের কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলকে। আমাদের পুরো জাতি কার্যত এই মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে শুধু বিভাজিত নয়, এতটা বিভক্ত যে, প্রবাসে যিনি যে অবস্থানেই থাকুন তিনি হয় সরকার সমর্থক, নয়তো বিরোধী দল সমর্থক। কেউ বিএনপিপন্থী, কেউ আওয়ামী লীগপন্থী, কেউ জামায়াতপন্থী, কেউ বা অন্য কোনো দলের সমর্থক। সমর্থন পর্যন্ত থাকলে এটি কোনো সমস্যার কারণ হতো না। এ সমর্থন এখন দলবাজির চূূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গেছে। বিদেশীদের হাসানোর মতো কাণ্ডকীর্তি ঘটানো হচ্ছে। লজ্জায় খাবি খাচ্ছেন অনেক প্রবাসী। আমাদের দুর্ভাগ্য, যারা সরকার পরিচালনায় থাকেন তারাও দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী না হয়ে দলের ব্যানারে থাকতে বেশি পছন্দ করেন। নিজেরাই বুঝিয়ে দেন, তারা দেশের সব মানুষের প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী নন, দলের প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী। বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে- যারা ঢাকায় থাকি তারা গ্রামে গিয়ে দেখি আমাদের নিজ নিজ গ্রামে ঢাকাকেন্দ্রিক সব দলের শাখা-প্রশাখা রয়েছে। রাজধানীতে যে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ও দলবাজি দেখি তারই প্রতিধ্বনি শুনি গ্রামেও। এখন এটি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব প্রান্ত ছুঁয়েছে। ঈদ লাগোয়া সময়টিতে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ককেন্দ্রিক দেশজ রাজনীতির উত্তাপ ও চাঞ্চল্য অতীত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর কারণ, রাজনৈতিক মেরুকরণের মাধ্যমে প্রবাসীরা দলবাজির চূড়ান্ত স্তরে রয়েছেন। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটনেত্রী শেখ হাসিনা নিউ ইয়র্ক সফরে ছিলেন। লন্ডনে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কার্যত বিরোধী দলেরই নেতা। এ সুযোগে স্ব স্ব দলের ও জোটের পক্ষে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগটা কোনো প্রবাসী হাতছাড়া করতে চাননি। এক নেত্রীর যাত্রাভঙ্গের জন্য অন্য জোটের ও দলের কর্মী-সমর্থকেরা এতটা মরিয়া হয়ে উঠলেন- যা দেখা যায়, হজম করা যায় না। দুই নেত্রী সংবর্ধনা পেয়েছেন। আবার প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ প্রতিরোধও মোকাবেলা করেছেন। কোনো মন্ত্রী হয়েছেন অবরুদ্ধ, কেউ প্রতিবাদ প্রতিরোধের মুখোমুখিও হয়েছেন। কেউ কেউ ফুলের মালার পরিবর্তে পেয়েছেন ঘৃণার মালা। সমাবেশের স্থান পরিবর্তনের মতো লুকোচুরি সাধারণ ঘটনা। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই রুট পাল্টিয়েছেন। এটি এখন বাড়াবাড়ির প্রান্ত অতিক্রম করেছে। কার্যত বিরোধীদলীয় নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ঈদকেন্দ্রিক বিদেশ সফর নানা গুজবের জন্ম দিয়েছে। কাকতালীয়ভাবে দু’নেত্রী এবারই একসাথে দেশের বাইরে পৃথক পৃথক দেশে ঈদ পালন করলেন। এ ছাড়া দুই দলেরই শীর্ষ ক’জন নেতাও প্রবাসে ছিলেন। সরকার দেশের রাজনীতিতে যে খরা ও বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করেছে, তার মোকাবেলায় প্রবাসের অনুকূল পরিবেশে বিরোধীদলীয় নেতারা স্বচ্ছন্দে মতবিনিময়ের সুযোগ নেবেন তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখি না। দলবাজির নোংরা খেলা ছাড়া আর যা-ই ঘটুক সব কিছু ইতিবাচক। তাতে লোকচক্ষুর আড়ালে দুই জোটের মধ্যে সৌজন্য বৈঠক হতেও পারে, না-ও হতে পারে। এ নিয়ে অতি উৎসাহ-অনুৎসাহ দেখানোর কিছু নেই। আবার তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় রাজনীতির বরফ গলানোর উদ্যোগ নিলেও আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হবে না। এটা তো মানতেই হবে আমরা রাজনৈতিক খই ফুটাই, কিন্তু ষোলো আনা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাদের রাজনীতিতে নাক ঢোকায় ভারত। মাথা গলায় যুক্তরাষ্ট্র। আরো কিছু আন্তর্জাতিক ফোরাম, দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের সাথে লেপ্টে আছে। আমাদের রাজনীতি নিয়ে চীনের বক্তব্য রয়েছে। রাশিয়ার ভূমিকাও ক্ষুদ্র নয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবও ফেলনা নয়। তাই ষোলো কোটি মানুষের দেশটা নিয়ে একক বাণিজ্য করার ও একরৈখিক হয়ে দীর্ঘ দিন মসনদে থাকার ও রাখার কোনো সুযোগ নেই। পক্ষপুষ্ট রাজনীতির জন্য এ ধরনের অদৃশ্য শক্তির জুয়া খেলা কখনো সুখকর হয় না। সরকার রাজনৈতিক সমর্থন ও জনগণের ভোটের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ চালাচ্ছে না। সরকার পরিচালনায় লেজেগোবরে অবস্থা ও বৈধতার সঙ্কট তাদের তাড়িয়ে ফিরছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই সত্যটি মানে ও জানে। কয়টা ডিগ্রি, দু-চারটা পুরস্কার ও পদক গ্রহণ যোগ্যতার সূচক নয়। তাই সম্মানজনক যেকোনো একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য সরকারের বাহ্যিক অবস্থান যতটা অস্বচ্ছ হোক, ভেতরের তাগিদ অনেক বেশি। অবৈধতার হুল সহ্য করে পুলিশি রাষ্ট্র পরিচালনার ঝুঁকি মারাত্মক। এটা প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি বোঝেন। তাই তিনি বলেনও বেশি। মৃত্যুকে তিনি পরোয়া করেন না। জনসেবা তার ব্রত। বাবার মতো প্রাণ দিয়েও দেশের জন্য কিছু করবেন। তিনি ৪১ সালের মিশন বাস্তবায়ন করবেন- জনগণের সেবক, ক্ষমতালিপ্সু নন ইত্যাদি। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে ও বৈধতার বিষয়টি আড়াল করতে চাইলেও আড়াল থাকে না। দেশ যে ভালো চলছে না, সরকারের গ্রন্থিগুলো যে শিথিল হয়ে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়ে চলেছে, চার পাশে মোসাহেব ও চেনা মুখের ভিড় বাড়লেও ক্ষমতার দাবা খেলায় তিনি যে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, তার আক্রমণভাগে খেলার ধরনই সেটা প্রমাণ করে। বিরোধী দল ও মত বধ করার জন্য ক্ষমতার বলয় থেকে এত দিন যেসব বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করা হয়েছে- সেগুলো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছে। জঙ্গিবাদের জিগির- অস্ট্রেলিয়া আমলে নিয়েছে। যুক্তরাজ্য সতর্ক হয়েছে, কূটনীতিকপাড়ায় ইতালীয় নাগরিক হত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে ব্যঙ্গই করল। এটা ঠিক, সরকার অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা ও নিষ্ঠুরতার সাথে বিরোধী জোটের বার্গেনিং ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। বিএনপি-জামায়াতকে অনেকটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। রাজনীতিকে মাঠ থেকে অন্দরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তার ভক্তরা এর নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতি কম, উন্নয়ন বেশি’। বাকশালকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের দর্শন বলে যারা তাকে ডুবিয়েছেন- সেই চাটার দল এখন শেখ হাসিনার চার পাশে। গণতন্ত্র বধ করে যারা দেশ চালানোর দায় নিয়েছেন তারা সবাই খেসারত দিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও এই নজির কম নেই। দমন-পীড়ন, জেল-জুলুম ও হামলা-মামলার কারণে বিরোধী দল ও জোটের বার্গেনিং সক্ষমতা কমেছে। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, এই মুহূর্তে বিরোধী দলের কোনো বার্গেনিং ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। অগণতান্ত্রিক আচরণ ও জবরদস্তির শাসনের কারণে শুধু বিরোধী দল ক্ষতিগ্রস্ত নয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, সরকার ও সরকারি দল। কারণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক সমর্থন কমেনি। ক্ষেত্রবিশেষে জনসমর্থন বেড়েছে। মাথাগুনে জরিপ করার দরকার নেই। আমেরিকার কোনো সংস্থার জরিপ ভাড়া নেয়ারও প্রয়োজন নেই। জনগণের পাল্স বোঝার জন্য চোখ-কান খোলা রাখাই যথেষ্ট। জনগণ মনে করে, বিরোধী দল সক্ষমতা হারালেও যিনি কোনো দিন ক্ষমতা হারান না তিনি সব দেখছেন। দূরদর্শী ও বিচক্ষণ হলে এখন শেখ হাসিনা নিজের জন্য নিজেই সম্মানজনক সমাধানের ফর্মুলা বা সিদ্ধান্ত আরোপ করতে পারেন। কারণ রাজনীতির প্রতিপক্ষ রাজনীতি হলে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়া ছাড়া মারাত্মক কোনো ঝুঁকি থাকে না। জনগণের সমর্থন রাজনীতিরই কোনো পক্ষ উপভোগ করে। অন্যথায় বিগড়ে থাকা জনমত এতটাই পরিবর্তনকামী হয়ে ওঠে, যেকোনো অগণতান্ত্রিক পরিবর্তনকেও স্বাগত জানাতে কার্পণ্য করে না। লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্কে কোনো সমঝোতামূলক রাজনৈতিক সন্ধি হলো কিংবা না-ই হলো- বিভক্ত জাতিকে হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে মুক্তি দিতে হবে। নেতৃত্ব সেই পথে না হাঁটলে ক্ষমতা নিজ বৈশিষ্ট্যে এবার পার্শ্ব পরিবর্তন করবে। তাতে রাজনীতির অঙ্কটা পাল্টে যাবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার গ্লানি এখন অসহনীয় হয়ে পড়েছে। কূটনীতিকপাড়ায় অস্থিরতার চেয়েও বড় সূচক হচ্ছে- ইউরোপের অনেক দেশ এখন বাংলাদেশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক দেশ ভিসা ইস্যুর কেন্দ্র বানিয়েছে দিল্লিকে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য এটা কতটা অসম্মানজনক ও লজ্জার তা বোঝার বোধটুকুও উন্নয়নের ডুগডুগিবাজরা ভুলে থাকতে চাচ্ছে। কূটনীতিকপাড়ায় ইতালীয় নাগরিক হত্যা, উত্তরবঙ্গে জাপানি খুন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের ব্যাপারে রিজার্ভেশন, মন্ত্রীদের পরস্পর স্ববিরোধী বক্তব্য, জঙ্গি নিয়ে দু’ধরনের বক্তব্য উপস্থাপনের প্রেক্ষাপটে জাতির মনোজগতে নতুন করে চিত্ত চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। তার মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার আরেকটি ঘটনা ঘটল। ইউজিসির কর্মকর্তা হত্যার দায় বর্তাল র‌্যাবের ওপর। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এমপি গুলি ছুড়ে আহত করল স্কুলছাত্রকে। কালিহাতীর ঘটনার রেশ না কাটতেই প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ গ্রহণের রাজনীতি আবার ছড়িয়ে পড়ল। খুন হলেন পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান, পাবনায় খুন হলেন পুলিশ কর্তকর্তা। একই জেলায় যাজক হত্যার মতো ঘটনাও ঘটতে যাচ্ছিল। প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে এটা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। প্রতিহিংসার রাজনীতির আরো বিস্তৃতি ঘটালে সরকারকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। তাতেও রাজনীতির ধরন-ধারণ পাল্টে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। masud2151@gmail.com

    অখণ্ড ভারত? নাকি গাজওয়াতুল হিন্দ?

    বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দিনদিন উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়ে উঠছে। বিশ্ব-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যর পরে ভারতীয় উপমহাদেশ হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    বর্তমান বিশ্বে ইসরাইলের (আমেরিকা) জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের মিসাইল রেন্জের মধ্যে ইসরাইলের অবস্থান আছে। পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমানবিক ক্ষমতাশীল দেশ যারা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তেই ইসরাইল কে ধ্বংস করে দিতে পারে, এটা ইসরাইল ভালো করেই জানে। কৌশলগত কারণে তারা সেটা প্রকাশ করে না এবং সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য এরা কখনো বলে ইরান তাদের জন্য হুমকি আবার কখনো বলে আমেরিকা তাদের জন্য হুমকি।
    পাকিস্তানকে অনেক কৌশলে মোকাবেলা করা হচ্ছে।
    তাই আমার মনে হয়না এই মুহূর্তে এই ভাবে সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে।
    ইন্ডিয়া কখনো সাহস করবে না পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।
    ইন্ডিয়া চাইবে ইসরাইল অথবা অন্য কোন শক্তি ব্যবহার করে পাকিস্তানের পারমানবিক ক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে তারপর যেন সর্বাত্মক হামলা চালানো যায়।

    ভারতীয় উপমহাদেশঃ-

    ভারতীয় উপমহাদেশ এশিয়া তথা ইউরেশিয়া মহাদেশের একটি অঞ্চল, যা হিমালয়ের দক্ষিণে ভারতীয় টেকটনিক পাতের উপর অবস্থিত এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত প্রসারিত এক সুবিশাল ভূখণ্ডের উপর বিদ্যমান। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলি হল বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্রস্থল হবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া। এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিরও পরিবর্তন ঘটবে। বিশ্ব নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায়।
    স্বভাবতই সকল বিশ্বশক্তিই এই এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। এরজন্য তাদেরকে হয় ইন্ডিয়া অথবা চিনকে (পাকিস্তান) সমর্থন করতে হবে। এতদিন আমেরিকা বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তান কে নিভির পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখেছিলো কিন্তু পাকিস্তান তাদের ভণ্ডামি বুঝতে পেরে এখন চীনের সাথে যোগ দিয়েছে। রাশিয়াও মুরব্বিদের মত আচরণ করছে, সরাসরি কাউকে সমর্থন দিচ্ছে না।
    :
    পাক-ভারত যুদ্ধে হলে তা সমস্ত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পরবে। পাকিস্তান হয়তো চীন, তুর্কি, সৌদি, রাশিয়া থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। ইন্ডিয়া হয়তো ইসরাইল, আমেরিকা, জাপান, ইরান থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। আর বাংলাদেশ হয়তো চীন ছাড়া কারো কাছ থেকেই সহযোগিতা পাবে না। চীন থেকে সহযোগিতা পাওয়ার আশাও খুব কম কারণ বাংলাদেশ তিনদিক থেকেই ইন্ডিয়া পরিবেষ্টিত।
    ————————
    ★★★বাংলাদেশের ভূমিকাঃ-
    :
    বাংলাদেশ ভৌগলিক ও সামুদ্রিক কারণে ভারতের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণ চীনের কাছেও। পাক-ভারত যুদ্ধ হলে চীন ভারত উভয়ই চাইবে বাংলাদেশে গ্রাউন্ড ফোর্স পাঠাতে। কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশ যাদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে তারা অনেক সুবিধা পাবে। যদি ইন্ডিয়া বাংলা দখল করে তাহলে চীন চাইবে শিলিগুরি করিডর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে।
    ইন্ডিয়া তাই চীনকে (+বাংলাদেশ) ঠেকানোর জন্য আসামে গোপনে নিউক্লিয়ার ব্যাস তৈরি করছে এবং এই অঞ্চলে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বহর সহ সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে।
    ইন্ডিয়ানরা বলে থাকে যে তাদের শুধু বাংলাদেশ দরকার বাংলাদেশের জনগণকে নয়। কেউ যদি মনে করে তাদের সাথে আপোষ করে থাকবে তাহলে ভুল মনে করবে। কারণ তারা কাউকে ছাড়বে না, প্রথমে তারা ইসলামিস্টদের মারবে তারপর মোডারেটদের তারপর দালালদের। তারা সকল মুসলিমদের শেষ করে দিবে। তাই বাংলাদেশীদের উচিৎ হবে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গরে তোলা।
    —————
    ★★★অখণ্ড ভারতঃ-
    :
    অখণ্ড ভারত হচ্ছে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদশ, নেপাল, ভুটান ও শ্রিলংকা নিয়া একটি একক ও বৃহৎ রাষ্ট্র স্থাপনের মহাপরিকল্পনা।
    অখন্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করা হিন্দুস্থানীয়দের আদর্শিক স্বপ্ন, আর সেটা বাস্তবায়ন করতে তারা সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে আসছে।
    বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস), বজরং, শিব সেনা এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মতো মূলস্রোতের ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সমন্বয়ে একটি অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের দাবি উত্থাপন করছে।
    অখন্ড ভারতের ধারণা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত আবেগময় এবং তাদের অস্তিত্বের অংশ।
    —————
    ★★★গাজওয়াতুল হিন্দঃ-
    :
    গাজওয়াতুল হিন্দ হল রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণীত ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম ও মুশিরকদের মধ্যে ভবিতব্য চূড়ান্ত যুদ্ধ।
    “গাযওয়া” অর্থ যুদ্ধ, আর “হিন্দ” বলতে এই উপমহাদেশ তথা পাক-ভারত-বাংলাদেশসহ মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানকে বুঝায়। এবং বর্তমানে এই অঞ্চলের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আমাদেরকে সেই গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
    মুসলিমরা গাযওয়া ই হিন্দ নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করলেও ইহুদি মুসরিকরা কিন্তু বিস্তর গবেষণা করছে। গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কিত কিছু হাদিস নিচে দেওয়া হল, উল্লেখ্য যে হাদিসগুলোকে সহিহ(বিশুদ্ধ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
    ***
    হযরত সা্ওবান (রাঃ) এর হাদিস-
    নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আজাদকৃত গোলাম হযরত সা্ওবান (রাঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের দুটি দল এমন আছে, আল্লাহ যাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ করে দিয়েছেন। একটি হল তারা, যারা হিন্দুস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে, আরেক দল তারা যারা ঈসা ইবনে মারিয়ামের সঙ্গী হবে’। (সুনানে নাসায়ী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪২)
    ***
    আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত,
    তিনি বলেনঃ “আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে হিন্দুস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। কাজেই আমি যদি সেই যুদ্ধের নাগাল পেয়ে যাই, তাহলে আমি তাতে আমার জীবন ও সমস্ত সম্পদ ব্যয় করে ফেলব। যদি নিহত হই, তাহলে আমি শ্রেষ্ঠ শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হব। আর যদি ফিরে আসি, তাহলে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আবু হুরায়রা হয়ে যাব”। (সুনানে নাসায়ী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪২)
    ***
    হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত,
    হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হিন্দুস্তানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, “অবশ্যই আমাদের একটি দল হিন্দুস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ্ সেই দলের যোদ্ধাদের সফলতা দান করবেন, আর তারা রাজাদের শিকল/ বেড়ি দিয়ে টেনে আনবে । এবং আল্লাহ্ সেই যোদ্ধাদের ক্ষমা করে দিবেন (এই বরকতময় যুদ্ধের দরুন)। এবং সে মুসলিমেরা ফিরে আসবে তারা ঈসা ইবনে মারিয়াম (আঃ) কে শাম দেশে (বর্তমান সিরিয়ায়) পাবে”।
    হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “আমি যদি সেই গাযওয়া পেতাম, তাহলে আমার সকল নতুন ও পুরাতন সামগ্রী বিক্রি করে দিতাম এবং এতে অংশগ্রহণ করতাম । যখন আল্লাহ্ আমাদের সফলতা দান করতেন এবং আমরা ফিরতাম, তখন আমি একজন মুক্ত আবু হুরায়রা হতাম; যে কিনা সিরিয়ায় হযরত ঈসা (আঃ) কে পাবার গর্ব নিয়ে ফিরত । ও মুহাম্মাদ (সাঃ)! সেটা আমার গভীর ইচ্ছা যে আমি ঈসা (আঃ) এর এত নিকটবর্তী হতে পারতাম, আমি তাকে বলতে পারতাম যে আমি মুহাম্মাদ (সাঃ) এর একজন সাহাবী”।
    বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ ‘খুব কঠিন, খুব কঠিন’। (আল ফিতান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪০৯) – [মুসনাদে আহমাদ, আস সুনান আল মুজতাবা ,আস সুনান আল কুবরা, আল মজাম আল অস্ত, আল জাম্য আল কাবীর]
    *—-*
    রাসুলুল্লাহ(সঃ) এর কথা অনুযায়ী খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্তান) থেকে কালিমাখচিত কালোপতাকাধারীদের উত্থান এবং তাদের কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া, পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ভারতের কাশ্মীর সীমান্তে ৭ লক্ষ সেনা মোতায়েন, পাক-ভারত-বাংলাদেশের হকপন্থী ইসলামী দলগুলোর আলোচনায় উঠে আসা, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং মুসলিমদের নির্যাতন নিয়ে ভারতের ভেতরে মুসলিমদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ, সেভেন সিস্টারস তথা ভারতের ৭ টি অঙ্গরাজ্যের স্বাধীনতার দাবি নিঃসন্দেহে গাজওয়াতুল হিন্দ এর ইঙ্গিত বহন করে।
    এই সময় হইত পাক-ভারত-বাংলাদেশের মুসলিম নামধারী মুনাফিকরা আলাদা হয়ে যাবে। তারা হয়তো কাফিরদের পক্ষে যোগ দিবে অথবা পালিয়ে বেড়াবে। এবং এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হবে এবং তারা বায়তুল মুকাদ্দাস (বর্তমান ফিলিস্তিন) এ গিয়ে ঈসা (আঃ) এর সাথে মিলিত হবে এবং খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করবে।
    :
    আল্লাহ-সুবহান ওয়া তা’লা বলেন, হে নবী, আপনি মুসলমানগণকে উৎসাহিত করুন জেহাদের জন্য। তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়পদ ব্যক্তি থাকে, তবে জয়ী হবে দু’শর মোকাবেলায়। আর যদি তোমাদের মধ্যে থাকে একশ লোক, তবে জয়ী হবে হাজার কাফেরের উপর থেকে তার কারণ ওরা জ্ঞানহীন। (Al- Anfaal: 65)
    :
    আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (Al-Baqara: 190)
    :
    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করছে আল্লাহ্ তাদের ওয়াদা করছেন যে, তিনি নিশ্চয়ই তাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের যারা ছিল এদের পূর্ববর্তী, আর অবশ্যই তিনি তাদের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের ধর্ম যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন, আর নিশ্চয়ই তাদের ভয়-ভীতির পরে তাদের জন্যে বদলে আনবেন নিরাপত্তা। তারা আমারই এবাদত করবে, আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করবে না। আর যে কেউ এর পরে অকৃতজ্ঞতা দেখাবে — তাহলে তারা নিজেরাই হচ্ছে সীমা-লংঘনকারী। (An-Noor: 55)

    রাষ্ট্রীয় বাহিনী ক্রসফায়ারেই পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছে : আনু মুহাম্মদ

    তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড ঘটাতেই বেশি পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছে। যদি এসব বাহিনী তাদের দক্ষতা অর্জনে বিভিন্ন দেশে বহু টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, বিদেশ ট্যুর করেছে। কিন্তু একজন নিরীহ মানুষকে পিঠমোড়া দিয়ে বন্ধ একটি ঘরে রেখে মেরে ফেলার মধ্যে কী ধরণের দক্ষতা আছে তা আসলে বোধগম্য নয়। এজন্য তো আলাদা প্রশিক্ষণেও দরকার নেই।

    আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে বাম মোর্চার কনভেনশনে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন।

    অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরো বলেন, দেশে অত্যন্ত নিরাপদ এলাকা বলে পরিচিত গুলশান। সেখানেই যে নির্মম ঘটনা ঘটে গেল, তাতে প্রশ্নই জাগে এর আগে যে হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কারা? তিনি বলেন, ঐ গ্রেফতারকৃত ঐ ১৫হাজার লোক এখন কই। কিভাবে আছেন তারা? তিনি বলেন, যখনই দেশে বড় ধরণের কিছু ঘটে তখনই বিভিন্ন ধরণের দেশ বিরোধী চুক্তি সম্পাদিত হয়। তিনি বলেন, গুলশানের ঘটনার পর পর জাতি যখন প্রতিবাদ মিছিল করছে তখনই ভারতের সাথে রামপাল চুক্তি হয়ে যায়। দেশের স্বার্থ রক্ষার নাম করে চুক্তি হয় আমেরিকার সাথে ।

    কনভেনশনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা এবং রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিবর্গ। কনভেনশনে সভাপতিত্ব করবেন বাম মোর্চার সমন্বয়ক কমরেড শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী।

    জাতীয় সমস্যা ও সমাধান

    পত্রিকায় দেখলাম ডা. জাফরুললাহ বিএনপির ব্যপারে বলেছেন, হাঁটুভাংগা স্হায়ী কমিটি দিয়ে কোন কাজ হবেনা। এছাড়াও ম্যাডামকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন । ডা. জাফরুললাহ বর্তমান বাংলাদেশের কথা বলার আকালের মধ্যে একজন অন্যতম সাহসী সৈনিক। এছাড়াও অত্যন্ত স্পষ্টবাদী ও দেশ দরদী বলেই সম্ভবত: বিএনপিকে ও ম্যাড।ম খালেদা জিয়াকে কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
    গতকাল অন্য খবরে দেখতে পেলাম ড. কামাল হোসেনও গুম খুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বলেছেন এর বিরুদ্ধে সবাইকে এক হতে হবে। ঐক্য ঐক্য ঐক্য ৩ বার বলেছেন।
    আমি একজন সাধারন নাগরিক হয়েও ম্যাডামকে একই কথা বলে আসতেছি। আমি আবারও বলতেছি, ম্যাডামকেই এই ঐক্যের উদ্যোগ নিতে হবে। নিজেকে বাঁচাতে হবে, দেশকে ও জাতিকে বাঁচাতে হবে। ম্যাডাম, আপনার হারাবার কিছুই নাই। এই শেষ বয়সে জেলের কষ্টের চাইতে, স্লোপয়জনে মৃত্যুর মোকাবিলা করার চাইতে সংগ্রাম করাই উচিত মনে করি। তাতেই জাতির কাছে আপনি চীর স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
    ম্যাডাম, সামনে মহা প্রলয় আসতেছে অতএব এখনি ঐক্যের উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে এক করে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ড. কামাল হোসেনের কথা ঐক্য ঐক্য ঐক্য বললেই হবেনা। দোহাই খোদার কেন্দ্রীয় কোন হাঁটুভাংগা ষড়যন্ত্রকারীর উপর ছেড়ে না দিয়ে এই কাজ সরাসরি আপনাকেই করতে হবে। তাহলেই সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
    আপনার ব্যক্তিগত, দল ও দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে মাঠে নামতেই হবে। ইনশায়াললাহ জয় হবেই।
    জালিমের দিন অনেক আগেই পুরিয়ে গেছে শুধু ঐক্যবদ্ধ ভাবে ধাক্কার অপেক্ষায় আছে। ইতি
    ড. এম এ আজীজ, লন্ডন Email: callaziz786@yahoo.co.uk
    United Kingdom

    আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসার থাবায় জিয়া ও বি,এন,পি’র রাজনীতি ক্ষত-বিক্ষত

    জাহিদ হাসান রিয়াদ, সউদী আরব৷ আওয়ামী লীগ দাবী করে তারা দেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দল৷ গনতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অর্থাত্‍ যে দেশে সত্যিকার অর্থে গনতন্ত্র আছে সেখানে শক্তিশালী বিরোধী দল ( সংসদে ও রাজপথে ) অবশ্যই থাকতে হবে৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ গনতন্ত্রের এই মূল নীতি, বৈশিষ্ট্য বা আদর্শে কখনও বিশ্বাসী ছিলনা এবং এখনও নাই৷ স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৫ সময়কালীন শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চেতনা গনতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে একদলীয় অভিনব বাকশাল তথা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিল৷ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারী ক্ষমতায় থেকেই গায়ের জোরে নিজ দলীয় সরকারের অধীনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, একতরফা ও ভোটার বিহীন এক অদ্ভূত নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের প্রায় ৩০০ আসনেই “জয়ী” হয়ে এখন নিরংকুশ সংখ্যাগড়িষ্ঠতার জোরে দলীয় তথা স্বীয় স্বার্থে সংসদে যা ইচ্ছা তাই অনুমোদন বা পাশ করিয়ে নিচ্ছে৷ ১৯৭২-৭৫ এর মন-মানষিকতাকে ধারন করে আওয়ামী লীগ আবারও দেশে বিরোধীদল বিহীন একদলীয় ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷ বি,এন,পিই হলো দেশে এখন আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনৈতিক তথা ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বি শক্তি, এরশাদের জাতীয় পার্টিকেত আওয়ামী লীগ এখন তাদের গৃহপালিত পোষা বিরোধীদল হিসেবে কব্জা করে নিয়েছে৷ সুতরাং বি,এন,পিকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চীরতরে নি:শেষ করে দিতে পারলে আওয়ামী লীগের আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বি বা প্রতিপক্ষ থাকবেনা৷ এই অগনতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে মাথায় রেখে আওয়ামী লীগ এখন বি,এন,পি’র বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিহিংসামূলক আক্রমন শুরু করেছে ৷
    আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকরা সবসময়েই সমালোচনা বা কটাক্ক করে বলে যে বি,এন,পি’র জন্ম হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে৷ সময়ের প্রয়োজনে বা ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায় বি,এন,পি’র জন্ম ক্যান্টনমেন্ট নয়-সামরিক ব্যক্তিত্ব জিয়ার হাত দিয়ে হয়ে থাকলেও একথা আজ অনস্বীকার্য যে বি,এন,পি’র বয়স এখন ৩৮ বছর হয়ে গেছে, বি,এন,পি এখন একটা গনমানুষের সমর্থনপুষ্ট গনতান্ত্রিক দলে পরিনত হয়েছে, দেশে এখন বি,এন,পি’র ৩৫-৪০ শতাংশ নির্দিষ্ট ভোটার রয়েছে৷ ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী গনআন্দোলনের পর তথাকথিত প্রাচীন ও বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ ১৯৯১ এর নির্বাচনে বি,এন,পি’র কাছেই পরাজিত হয়েছিল, জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েই বি,এন,পি তখন ক্ষমতায় গিয়েছিল – “ক্যান্টনমেন্টে” জন্ম হয়েছিল বলে এই দাপটে বা তৃতীয় কোন শক্তির উপর নির্ভর করে নয়৷ ১৯৯৬ সালে বি,এন,পি সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেনা বলে আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামের সাথে যুগপদ ( একসাথে) আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী আদায় করে এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, বি,এন,পিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে৷ এরপর ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে বি,এন,পি আবারও জয়লাভ করে৷ আওয়ামী লীগ তখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয়৷ ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে বি,এন,পি পুনরায় ক্ষমতায় আসার উদ্দেশ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার কারণে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তত্‍কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় বসে, তাদের অধীনে ২০০৯ সালে অুনষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, জেনারেল মইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরের মেয়াদকালে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন ভোগ করে বিপর্যস্ত অবস্থায় নির্বাচন করে কম আসনে জয়লাভ করেও বি,এন,পি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবেই থাকে ৷
    তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬-২০০৯ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ ও বি,এন,পিই পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে, তাই দেশের মানুষের ধারনা এবং আওয়ামী লীগের আশংকা এই ধারাবাহিকতায় (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ) ২০১৪ সালের নির্বাচনে হয়ত বি,এন,পিই আবার ক্ষমতায় আসতে পারে৷ আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্রের রাজনীতি৷ বি,এন,পি যাতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবার নির্বাচিত হয়ে আসতে না পারে সেজন্য ক্ষমতায় থেকেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জন্য আওয়ামী লীগ হাই কোর্টকে প্রভাবিত করে ( যা সবার কাছে পরিস্কার ) সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার রায় বাগিয়ে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার আইণ সংসদে পাশ করিয়ে নেয়৷ এর বিরুদ্ধে বি,এন,পি জোট ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন বর্জন করে এবং অতীতের মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে ও আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য দেশব্যাপী মারাত্মক ও হিংসাত্মক আন্দোলন চালিয়ে যায়, ফলে জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়৷ অপরদিকে বি,এন,পি জোটের আন্দোলন দমানোর এবং সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল সশস্ত্র শক্তি, দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার, অনুগত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন দিয়ে গায়ের জোরে যেভাবেই হউক ৫ই জানুয়ারী নির্বাচন করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে, এতেও প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জসহ সারা দেশে শত শত মানুষ নিহত হয় ৷ যে কারণে ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন ভোটারহীন, প্রার্থীহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একটা প্রহসনের নির্বচনে পরিনত হয়৷ সাধারন জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে হবে – ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে সংবিধানের এই শর্ত পূরন না হওয়া সত্তেও আওয়ামী লীগ আজ ৩ বছর পর্যন্ত গায়ের জোরে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বসে আছে৷ নির্বাচনের আগে আন্দোলন করে বি,এন,পি জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী আদায় করতে এবং এখনও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচু্যত করার জন্য কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারায় আওয়ামী লীগের লোকজন বি,এন,পিকে ঠাট্টা করে বা কটাক্ক করে বলে “বি,এন,পি’র আন্দোলন করার ক্ষমতা বা মুরদ নাই, আন্দোলন করতে হলে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে হবে”, ইত্যাদি৷ বরং ২০১৪ সালের নির্বাচনোত্তর ও ২০১৫ সালের জানুয়ারীর আন্দোলনের কারণে জালাও-পোড়াও এর জন্য আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী জোট বিশেষ করে বি,এন,পি’র শীর্ষ নেতাসহ হাজার হাজার স্থানীয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করেছে, বিগত ২ বছর যাবত বি,এন,পি’র নেতা-কর্মীরা মামলায় হাজিরা দিতে দিতে ও জামিন না হওয়া পর্যন্ত জেলে থাকতে থাকতে অসুস্থ ও দিশেহারা হয়ে গেছে, স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মামলার ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে৷ বি,এন,পিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার এখন মামলাকেই মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী বি,এন,পিও সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন করেছিল, আওয়ামী লীগ তখন বি,এন,পি সরকারের অধীনে ( মাগুড়া উপ-নির্বাচনের অযুহাতে ) ঐ নির্বাচনে অংশ নেয় নাই, বরং বি,এন,পিকে ক্ষমতাচু্যত করা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী আদায়ের জন্য জামায়াতে ইসলামকে সাথে নিয়ে রাজপথে তুমুল আন্দোলন শুরু করেছিল, তখনই বাংলাদেশে প্রথম বাসে গান-পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল৷ বি,এন,পি তখন রাষ্ট্রীয় সকল সশস্ত্র শক্তি ও দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারকে ব্যবহার করে গায়ের জোরে যেভাবেই হউক ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেনি এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধেও গনহারে মামলা দেয় নাই৷ বরং সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিল পাশ করে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল৷ আর যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মত বি,এন,পি সে সময় ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করত তবে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কি ভয়ানক ও সন্ত্রাসী রূপ তা দেশবাসীকে প্রত্যক্ষ ও সহ্য করতে হত ( কারণ আওয়ামী লীগইতো বলে বি,এন,পি’র আন্দোলন করার ক্ষমতা বা মুরদ নাই, আন্দোলন করতে হলে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে হবে )৷ তাছাড়া ভবিষ্যতে যদি কোন সময় বি,এন,পি ক্ষমতায় থাকে আওয়ামী লীগ কি তখন বি,এন,পি’র দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে ? যদি তখন আওয়ামী লীগ বি,এন,পি’র অধীনে নির্বাচন করতে না চায় তখনও দেশের মানুষ দেখতে ও বুঝতে পারবে আওয়ামী লীগ ও এর আন্দোলনের কি ভয়ানক ও বিধ্বংশী রূপ৷ তবে বি,এন,পি যাতে আর কোনদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরিবর্তে কথিত গনতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ বিভিন্ন মামলা, হামলা ও অপকৌশলে বি,এন,পি’র অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে – যাতে বাংলাদেশে তাদের আর ক্ষমতার প্রতিপক্ষ না থাকে৷ বি,এন,পিকে দেশের মানুষের কাছে অজনপ্রিয় ও অপাংক্তেও করে তোলার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাসহ দলের সকল নেতা-নেত্রী ও আওয়ামী ঘরানার কথিত সুশিল সমপ্রদায়ের লোকজন এখন বি, এন,পি’র প্রতিষ্ঠাতা মরহুম জিয়াউর রহমানকে শেখ মুজিবের খুনি, খুনিদের পৃষ্ঠপোষক, মুজিব হত্যার বিচার না করার ইনমেনিটি বিল পাশ, মুক্তিযোদ্ধা নয় – পাকিস্তানের চর, রাজাকারদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের নায়ক, ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করে দিন-রাত অব্যাহতভাবে প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু আওয়ামী লীগের এই উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ও মিথ্যা প্রচারনা ইতিহাস ও সত্যকে কখনও মুছে ফেলতে পারবেনা৷ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থনে সশস্ত্রবাহিনীর একদল তরুন সেনা অফিসার, জেনারেল জিয়া ঐ ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বর্তমান আওয়ামী গোষ্টির মিথ্যা প্রচারনা ছাড়া তার কোন প্রমান নাই, জিয়া ছিলেন তখন উপ-সেনাপ্রধান, তার উপরে সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ৷ একদল সেনা অফিসার উপ-সেনাপ্রধানের সমর্থন বা সহযোগিতায় এমন একটা ঝুকিপূর্ন ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছে সেনাপ্রধান তা জানতে পারবেনা-এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ? তাছাড়া জেনারেল শফিউল্লাহ বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতা হয়েও কখনও বলেননি জিয়া ১৫ই আগষ্টের ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন৷ প্রমান হিসেবে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বলা হয় অভূ্যত্থানকারী সেনা অফিসারদের মধ্যে ২ জন কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ তাদের সাক্ষাত্‍কারে বলেছে তারা একবার জিয়ার কাছে গিয়ে এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল, জিয়া নাকি বলেছিল সে একজন সিনিয়ার অফিসার, সে এসবের মধ্যে জড়াতে চায়না, তাদেরকে নাকি বলেছিল তোমরা করতে চাইলে তোমরা এগিয়ে যাও৷ এমন কথপোকথনের কি কোন সাক্ষী আছে ? তাছাড়া কর্নেল ফারুক ও রশিদ জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় এমন কথা কোথাও বলে নাই৷ তদুপরি কর্নেল ফারুক ও রশিদসহ যারা শেখ মুজিব হত্যার সাথে জড়িত ছিল ১৫ই আগষ্ট থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর শৃংখলা বহির্ভূত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কারণে জেনারেল জিয়া তাদের উপর ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তাদেরকে শৃংখলায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন৷ তখন থেকেই তারা জিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে থাকে৷ ১৫ই আগষ্ট থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত সরকার প্রধান ছিল আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এ সময় জেনারেল জিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনা বা নীতি-নির্দ্ধারনী কর্মকান্ডে কোন ভূমিকাই ছিলনা৷ অবিশ্বাস্য হলেও চরম সত্য এই যে, শেখ মুজিবের ১৯৭৩ সালের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ২৩৪ জনই ছিল খন্দকার মোশতাক সরকারের সংসদ সদস্য, তারা কেউ পদত্যাগ করেনি, তারাই মোশতাক সরকারের সংসদে বসে ১৩ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব হত্যার বিচার করা যাবেনা বলে বিল পাশ করে৷ উল্লেখ্য, ১৯৭২-৭৫ সময়ে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ১৫ই আগষ্টের ঘটনাটিকে একটা রাজনৈতিক-সামরিক বিপ্লব বা অভূ্যত্থান বলা যায়, যার মাধ্যমে ক্ষমতা বা সরকার পরিবর্তন হয়েছিল, এটা শুধু ১৫ই আগষ্ট রাতের অন্ধকারে নেহায়েত একটা খুনের ঘটনা ছিলনা যে যারা ক্ষমতা দখল করেছিল তারা দেশের অন্যান্য খুনের ঘটনার মত শেখ মুজিবকে খুন করার অপরাধে খুনিদের বিচার করবে৷ যারা অভূ্যত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে তারা কি নিজেরা নিজেদের বিচার করে বা ভবিষ্যতে বিচার করার পথ খোলা রাখে ? যে কারণে তারা সংসদে বসে ১৩ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব হত্যার বিচার করা যাবেনা বলে বিল পাশ করেছিল৷ তখন জেনারেল জিয়ার এ ব্যাপারে কোন ভূমিকাই ছিলনা৷ পরবর্তিতে ৭ই নভেম্বরের পর জিয়া বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের পর বাস্তবতার প্রয়োজনে ক্ষমতায় এসে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আওয়ামী লীগের এম,পিদের সংসদে পাশ করা সেই বিলকেই ইনডেমনিটি আকারে সংবিধানে সংযুক্ত করে৷ জিয়া ও তার দল বি,এন,পি তখন মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিল, এরপর দীর্ঘ নয় বছর পর্যন্ত জেনারেল এরশাদ রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় ছিল, সেও এই ইনডেমনিটি সংবিধানে বহাল রাখে, আওয়ামী লীগ তখন কেন এরশাদকে বাধ্য করতে পারেনি এটা বাতিল করতে ? বরং শেখ হাসিনা এখন এরশাদকে কোলে বসিয়ে তার বিশেষ দূত বানিয়ে রেখেছে এবং তার দল জাতীয় পার্টিকে সংসদে গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবে সাজিয়ে রেখে হাসিনা-মার্কা সংসদীয় গনতন্ত্রের চর্চা করছে৷ যত দোষ জিয়ার, কারণ জিয়ার দল বি,এন,পিই এখন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ৷ জিয়াকে যত নীচে নামানো যাবে বি,এন,পি’র তত ক্ষতি হবে, এই হলো আওয়ামী লীগের হিসাব-নিকাশ৷
    ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশরর্ফ ৩রা নভেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রন নিয়ে জিয়াকে বন্দি করে সে নিজেই সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়, তখন তাকে দেশের মানুষ ভেবেছিল সে আওয়ামী লীগের সমর্থক হতে পারে, ঢাকায় ৪ঠা নভেম্বর ৩রা নভেম্বরের সমর্থনে একটা মিছিল বের হয়েছিল, কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ঐ মিছিলেও আজকের মুজিব-প্রেমীদের বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ কোন নেতাকে অংশ নিতে দেখা যায়নি৷ গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো তখন খালেদ মোশারর্ফ সেনাপ্রধান জিয়াকে বন্দি করল কিন্তু শেখ মুজিব হত্যার সাথে জড়িত সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নাই, বরং সে তাদেরকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, কেন সে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় নাই বা নিতে পারে নাই এবং কেন সে তাদেরকে নিরাপদে দেশ ত্যাগে সহায়তা করেছিল এ ব্যাপারে আওয়ামী মহলের কোন উচ্চ-বাচ্য নাই৷ তারা শুধু অভিযোগ করে জিয়া তাদেরকে পুনর্বাসিত করেছিল, অথচ বর্তমান আওয়ামী লীগের ভাষায় খুনিদের দেশ ত্যাগে সহায়তা করে সবচেয়ে প্রধান ও সর্বপ্রথম পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল খালেদ মোশারর্ফ – জেনারেল জিয়া নয়৷ ৭ই নভেম্বরের পর কর্নেল ফারুক-রশিদরা বহুবার দশে ফিরতে চেয়েছিল, কিন্তু আবারও দেশে ফিরে তারা সেনাবাহিনীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে বলে জিয়া তাদেরকে দেশে ফিরতে দেয় নাই, কর্নেল ফারুক একবার গোপনে দেশে ফিরে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে খুটি গেড়ে বসেছিল, জিয়া তাকে ধরে এনে ৫ বছরের জেল দিয়েছিল, এরপর বি,এন,পি তার জেল খাটা শেষ হলে জেল গেট থেকে ধরে সোজা বিমানবন্দরে নিয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়৷ যে কারণে কর্নেল ফারুক-রশিদরা জিয়ার উপর ক্ষুব্ধ এবং মুজিব হত্যায় জিয়াকে পরোক্ষভাবে দায়ী করতে চেয়েছিল৷ নিরাপদে দেশ ত্যাগ করে অধিকাংশ সেনা অফিসার লিবিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিল, বাকী কয়েকজন যাতে দেশে ফেরত আসতে না পারে সেজন্য বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনকার বাস্তবতায় এটাই ছিল স্বাভাবিক, কারণ তারা ছিল আওয়ামী লীগেরই সক্রিয় সমর্থনপুষ্ট সেনা অফিসার যারা ১৫ই আগষ্টের ঘটনা ঘটিয়েছিল ৷ এজন্য যদি জেনারেল জিয়াকে পৃষ্ঠপোষক বা আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা বলা হয় তবে শেখ হাসিনা তথা বর্তমান অনির্বাচিত আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ট সহচর জেনারেল এরশাদ ছিল তাদের আরো বড় পৃষ্ঠপোষক৷ এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে ১৫ই আগষ্টের ঘটনার নায়করা এরশাদের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশী পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে, যে কয়জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে সেনাবাহিনী থেকে প্রেশনে নিয়োগ দেখানো হয়েছিল এরশাদ সরকার তাদেরকে পদোন্নতিও দিয়েছে৷ শুধু তাই নয় কর্নেল ফারুক ও রশিদসহ নির্বাসিত ও বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ১৫ই আগষ্টের সেনা কর্মকর্তারা এরশাদের উদারতা ও সহযোগিতায় বাংলাদেশে এসে ফ্রিডম পার্টি নামে রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিল, এমনকি কর্নেল ফারুক একবার এরশাদের সাথে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, ১৯৮৬ সালে এরশাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি অংশগ্রহন করে এবং সংসদে একটা আসনও পেয়েছিল, কিন্তু সেই এরশাদ এখন আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার অগনতান্ত্রিক ও অনির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান সহযোগী৷ অথচ যত দোষ জেনারেল জিয়ার, কারণ জিয়ার বি,এন,পি’র কাছেই আওয়ামী লীগের ক্ষমতা হারানোর একমাত্র আশংকা৷ আর জেনারেল জিয়াকে যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ ১৫ই আগষ্টের সেনা কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করে তবে এমন পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার দায়তো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও উত্থাপন করা যায়৷ ১/১১ এর নায়ক জেনারেল মইন ও জেনারেল মাসুদ রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ১৩টা দূর্নীতির মামলা দিয়েছিল, তার দলের অনেক শীর্ষ নেতাকে দূর্নীতির দায়ে জেলে ভরে তাদেরকে শারীরিকভাবে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে টেনে হেচরে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাকে দীর্ঘদিন বিশেষ কারাগার বানিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে তখন নাকি খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে হত্যা করার সড়যন্ত্রও করা হয়েছিল-এ অভিযোগ আওয়ামী লীগেরই শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের৷ কিন্তু ১/১১ এর নায়কদের সমর্থিত ও কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৯ এর জানুয়ারীর নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় বসে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ১/১১ এর মূল নায়ক জেনারেল মইন ও জেনারেল মাসুদের কোন বিচার করাতো দূরে থাক তাদেরেকে সম্মানের সাথে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ দিয়েছিল এবং জেনারেল মাসুদকে অষ্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেশনে নিয়োগ দিয়েছিল, এমনকি তার দূতাবাসে চাকুরীর মেয়াদ ২ বার বৃদ্ধিও করা হয়েছিল৷ এটা কি ১/১১ এর আওয়ামী লীগের ভাষায় অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সেনা নায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় নয় ? এর জবাবে আওয়ামী মহল হয়ত বলবে ১৫ই আগষ্টের ঘটনার সাথে ১/১১ এর ঘটনার কোন তুলনা হয়না, কারণ ১৫ই আগষ্টের ঘটনা ছিল জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা৷ ৪১ বছর পর আজকের ভোল-পল্টানো আওয়ামী লীগের কাছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের ঘটনা যদি কেবল একটা খুনের ঘটনা বলেই মনে করা হয় তবে ১৯৭২-৭৫ সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১৫ই আগষ্টের ঘটনাকেও তখন একটা সফল সামরিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব হিসেবেই মনে করা হয়েছিল, যার সাথে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া তত্‍কালীন আওয়ামী লীগের প্রায় সকল শীর্ষ নেতারাই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল, শেখ মুজিবকে হত্যার পর তখন কাউকে প্রকাশ্যে চোখের জল ফেলতেও দেখা যায়নি, আজকের মুজিব-প্রেমীরা কোথাও একটা গায়েবানা জানাজাও পড়ায়নি, ১৫ আগষ্টের সকালে ঢাকার রাজপথে সেনাসদস্যদের বহনকারী ট্যাংক ও সাজোয়া যানের উপর ( অতি সমপ্রতি ঘটে যাওয়া তুরস্কের সেনা অভূ্যত্থানের মত ) তখনকার আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ইট-পাটকেল, জুতা-সেন্ডেল নিক্ষেপ করতে দেখা যায়নি, বরং স্বতস্ফূর্ত জনতা ট্যাংকের নলে ও ১৫ই আগষ্টের নায়কদের গলায় মালা পড়িয়ে দিয়েছে৷ সুতরাং ১৫ই আগষ্টের ও ১/১১ এর নায়কদের একইভাবে তুলনা করা যায়৷ ১৫ই আগষ্টের নায়করা খালেদ মোশারর্ফ, জিয়া ও এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল আর ১/১১ এর নায়করা শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ৷
    শেখ হাসিনা ও তার দল এখন প্রকাশ্যে ও সরাসরি জিয়াকে শেখ মুজিবের খুনি বলে অভিহিত করে, যদি জিয়া শেখ পরিবারের এমন শত্রু হত তবে শেখ হাসিনাকে জিয়া তার জীবদ্দশায় দেশে প্রবেশ করতে দিতনা, বরং ১৯৭৯ সালে জিয়াই শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আসতে দিয়ে ভাঙ্গনের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করতে আওয়ামী লীগের হাল ধরার সুযোগ করে দিয়েছিল৷ ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করে আওয়ামী লীগেরও অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়া হয়েছিল, জিয়াই বাকশাল বিলুপ্ত করায় আওয়ামী লীগ আবারও পুন:জন্ম লাভ করতে পেরেছিল এবং আজকের আওয়ামী লীগ নেতারা আওয়ামী লীগের ৬৫তম জন্মেত্‍সব পালন করতে এবং গর্ব করে বলতে পারছে আওয়ামী লীগই দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও শেখ মুজিবের হাতে-গড়া দল ( যে দলকে শেখ মুজিবই কবর দিয়েছিলেন ১৯৭৫ সালে ) ৷
    বি,এন,পি’র প্রতিষ্ঠাতা বলে আওয়ামী লীগাররা এখন জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা নয়, পাকিস্তানের দালাল বা চর বলে গালি দেয়৷ কিন্তু সারা বিশ্ব ও দেশবাসী জানে জিয়া ছিল ১৯৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বীর, যেজন্য মরহুম শেখ মুজিব জীবিত সৈনিক হিসেবে জিয়াকেই বীর উত্তম খেতাব বা উপাধী দিয়েছিলেন৷ ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিব যখন স্বেচ্ছায় পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলেন তখন গোটা বাংগালী জাতি পাকিস্তানী সৈন্যদের বুলেট ও বুটের আঘাতে আর্তনাদ করছিল, সাড়ে সাত কোটি বাংগালী তখন দিক-নির্দেশনাহীন এক অন্ধকার ও অনিশ্চয়তায় পতিত হয়, তখন আওয়ামী লীগের কোন শীর্ষ নেতার কোন সাড়া-শব্দ বা অস্তিত্বও খুজে পাওয়া যায়নি, এহেন অবস্থায় চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭শে মার্চ মেজর জিয়ার বলিষ্ঠ কন্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান শুনে মুক্তিকামী বাংগালী জাতি সাহসে বুক বেঁধে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ও সংগঠিত হতে শুরু করে৷ স্বধীনতা যুদ্ধে জিয়ার ঐ ঘোষণাকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে ঐতিহাসিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অবদান হিসেবে আখ্যায়িত ও উল্লেখ করা হয়৷ “জিয়ার ঘোষণাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের তূর্যধ্বনি, এই ঘোষণা শুনে আকষ্মিক হামলায় হতভম্ব জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল৷ সেদিনের সেই রুখে দাড়ানো থেকেই বাংলাদেশের অভূ্যদয় ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর৷” ভারতের বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক রিপোর্টে এ কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৪০তম বিজয় দিবসকে সামনে রেখে পত্রিকাটি ১১ই ডিসেম্বর সংখ্যায় এমন মন্তব্যপূর্ন রিপোর্ট করেছিল৷ আজকের আওয়ামী গোষ্টি স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়ার ভূমিকাকে খাটো তথা বি,এন,পিকে অজনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কত মনগড়া ও কাল্পনিক তথ্যই না প্রচার করে যাচ্ছে৷ তারা জিয়াকে আর ১০ জন সেক্টর কমান্ডারের মত একজন সেক্টর কমান্ডারের বেশী কিছু নয় বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভরে কথা বলে৷ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও রংপুরেও বেতার কেন্দ্র ছিল, আর কোন সেক্টর কমান্ডার বা কোন আওয়ামী লীগ নেতা অন্য কোন বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা বা মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানাতে পারলনা কেন ? সেক্টর কমান্ডার জিয়াই তা পেরেছিল কারণ সে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে চট্টগ্রাম শহরকে ১৭ দিন পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রনে রেখেছিল বলেই তার পক্ষে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, পাকিস্তানী সৈন্যরা ২৫ মার্চের পর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রটাকে বাংগালীদের জন্য উম্মুক্ত করে দেয় নাই৷ জিয়ার ভূমিকাকে খাটো তথা বি,এন,পিকে হেয় করার জন্য এই চরম সত্যটাকে আজ আওয়ামী মহল অস্বীকার করে জিয়া ও শেখ মুজিবের মৃতু্যর পর কত কল্পকাহিনীই না প্রচার করে যাচ্ছে ৷
    আওয়ামী মহল থেকে জিয়াকে অভিযুক্ত করা হয় সে বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল এবং পুনর্বাসিত ও রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিল, একথা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে একথাও সত্য যে স্বাধীনতার পর পর শেখ মুজিবুর রহমানই মরহুম শাহ আজিজুর রহমান ও সবুর খানকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বাংলাদেশে রাজনীতি করা থেকে নিষিদ্ধ করেন নাই৷ বৃটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা বৃটিশের পক্ষে রাজনীতি করেছিল ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তাদের অনেকেইে পরবর্তিতে ভারতের রাজনীতিতে পুনর্বহাল ও কেউ কেউ মন্ত্রীও হয়েছিল৷ কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংগালী যারা পাকিস্তানী সৈন্যদের গনহত্যা, ধর্ষণ, লুট-পাট ও অগি্নসংযোগে সহায়তা করেছিল তাদের অপরাধ মানবতাবিরোধী এবং অমার্জনীয়৷ এমন চার ধরনের অপরাধে জড়িত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বাকী সবাইকে শেখ মুজিব ক্ষমা করে দিয়েছিলেন ৷ কিন্তু শেখ মুজিব তার জীবদ্দশায় সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে উল্লেখিত অপরাধীদের মাত্র ১জন ছাড়া ( চিকন আলী ) কারো বিচারই শেষ না করে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন৷ স্বাধীনতার পর পর এদের অপরাধের সকল সাক্ষী ও আলামত ছিল তরতাজা এবং এদের দ্বারা অত্যাচারিত ও ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই জীবিত ছিল, তখন বিচার করা ছিল অনেক সহজ ও স্বচ্ছ৷ স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই এদের বিচার শেষ করা যেত, তখন শেখ মুজিব সরকারের উপর কোন আন্তর্জাতিক চাপও ছিলনা ৷ কিন্তু সাড়ে তিন বছর যাবত তাদের বিচার শেষ করা এমনকি বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহতও রাখা হয়নি৷ বিচার ঝুলিয়ে রাখার কারণে তখন সাধারন মানুষ এটাও মনে করেছিল শেখ মুজিব হয়ত শেষ পর্যন্ত তাদেরকেও ক্ষমা করে দিবেন৷ এখন বি,এন,পিকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী মহল থেকে অভিযোগ করা হয় জেনারেল জিয়া ‘৭৫ এর পর ক্ষমতায় এসে তাদেরকে বিচার না করে মুক্ত করে দিয়েছিল, এজন্য যদি জিয়াকে অভিযুক্ত করা হয় তবে এর চেয়েও মারাত্মক অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা যায় শেখ মুজিবুর রহমানকে৷ যে পাকিস্তানী এক লাখ সৈন্য গনহত্যা, ধর্ষণ, লুট-পাট ও অগি্নসংযোগের ঘটনা সরাসরি সংঘঠিত করেছিল তাদেরকে স্বাধীন বাংলার মাটিতে বন্দি করার পরেও বিচার না করে কেন পাকিস্তানে ফেরত দেওয়া হল ? এজন্য তখন কোন আন্তর্জাতিক চাপও ছিলনা, তখনকার পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতসহ বলতে গেলে পূর্ব ইউরোপের সকল দেশেরই সমর্থন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ তথা শেখ মুজিবের প্রতি৷ এখন নব্য আওয়ামী রাজাকাররা কত খোড়া যুক্তিই না দেখাচ্ছে৷ এক লাখ সৈন্যকে জিম্মি হিসেবে বাংলার মাটিতে আটকে রেখে পাকিস্তানের কাছ থেকে শেখ মুজিবকে জীবিত ফেরত আনা ( যদিও ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেখ মুজিবের অবস্থান ও অবস্থা অজানা ছিল ), আটকে-পড়া বাংগালীদের পাকিস্তান থেকে ফেরত আনা, অবাংগালীদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো এবং পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের ( বাংলাদেশের ) আর্থিক পাওনা ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরন সবই আদায় করা যেত৷ এমনকি ঐ এক লাখের মধ্যে শেষ পর্যন্ত যে ১৯৫ জনকে সুনির্দিষ্ট অভিয়োগে চিহ্নিত ও অভিযুক্ত করা হয়েছিল তাদেরকেও শেখ মুজিবুর রহমানের মহানুভবতার আলোকে ১৯৭৪ সালের তৃপক্ষীয় শিমলা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের কাছে ফেরত দেওয়া হয়৷ এখন আওয়ামী মহলের পক্ষ থেকে জাতিকে ( নতুন প্রজন্মকে ) এসবের কত মনগড়া ও খোড়া যুক্তিই না দেওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে শিমলা চুক্তির শর্ত ছিল পাকিস্তান দেশে ফেরত নিয়ে তাদের বিচার করবে, কি হাস্যকর ও অগ্রহনযোগ্য শর্ত, যে পাকিস্তান তার ঐসব হায়েনা সৈন্যদের দিয়ে বাংগালীদের উপর ইতিহাসের নজীরবিহীন অত্যাচার চালিয়েছে সেই পাকিস্তান তাদের বিচার করবে ! যে অপরাধের জন্য জেনারেল জিয়াকে অভিযুক্ত বা আক্রমন করা হচ্ছে এর চেয়ে আরো বড় অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবের কোন দোষ নাই, অর্থাত্‍ একজনের বেলায় অপরাধ অন্যজনের বেলায় কৌশল বা তখনকার বাস্তবতায় কোন উপায় না থাকা৷ এই যুক্তি জেনারেল জিয়ার বেলায় প্রযোজ্য নয় কেন ? দক্ষিন আফ্রিকার নেলসন মেন্ডেলা বা ভিয়েতনামের হু চি মিন আন্দোলন ও যুদ্ধে সফল হওয়ার পরও দেশকে পূনর্গঠনের জন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার মহান উদ্দেশ্যে যেমন জাতিগত বিভেদ পরিহার করেছিলেন, জেনারেল জিয়াও হয়ত সেই মহান উদ্দেশ্য ও চিন্তা-চেতনাকে ধারন করেছিলেন৷ ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব যদি নিহত না হতেন এবং পরবর্তি সময়ে আটকে রাখা বাংগালী যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধীদের পাকিস্তানী সৈন্যদের মত মহানুভবতা দেখিয়ে মাফ করে দিতেন তবে আজকের আওয়ামী মহল নিশ্চয়ই তার পক্ষেই ঢোল বাজাতো৷ আওয়ামী লীগ এখন যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধী আপরাধের দায়ে বাংগালীদের বিচার করছে ও ফাঁসি দিচ্ছে, এতে বিশ্ববাসীর কাছে এটাই প্রমানিত বা জানানো হচ্ছে যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যরা নয় বাংগালীরাই যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল ৷
    আওয়ামী মহল থেকে অভিযোগ করা হয় জেনারেল জিয়া ‘৭৫ এর পর জামায়াতে ইসলামসহ অন্যদেরকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার পথ উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ধর্ম ( ইসলাম ) ভিত্তিক রাজনৈতিক দল তথা রাজনীতি থাকাটাই স্বাভাবিক ( যেমন কথিত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ভারতে এখন চরম উগ্রবাদী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আছে – যাদের সাথে সখ্যতা/সমঝোতা করে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ), জিয়া তাদেরকে স্বাভাবিক রাজনীতির ধারায় রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তাই জামায়াতে ইসলাম বিগত ৪১ বছর যাবত বাংলাদেশে রাজনীতির মূল স্রোতে থেকে রাজনীতি করে যাচ্ছে, নির্বাচনে অংশগ্রহন করছে, সংসদেও আসন নিয়ে বসতে পেরেছে, তাদের সাথে বি,এন,পি’র আগে আওয়ামী লীগেরই সখ্যতা ছিল৷ পরবর্তিতে ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ করে আওয়ামী লীগ বি,এন,পি-জামায়াত জোটকে দূর্বল করার জন্য ৪০ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতাদের বিচার করে জামায়াতকে নিশ্চিন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে, যদি ২০০১ এর নির্বাচনেও জামায়াত ১৯৯৬ এর মত আওয়ামী লীগের সাথে থাকত তবে আওয়ামী লীগ আদৌ মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতাদের বিচার করত কিনা তা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহ করা যেতে পারে৷ এমনও সন্দেহ করা হয় ভবিষ্যতে যাতে কখনও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বচনী জোটের প্রয়োজনে জামায়াতকে সাথে নেওয়ার কৌশল নিতে হয় সেজন্য এত অপবাদ ও অপরাধে অভিযুক্ত করার পরও আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছেনা, বরং তাদেরকে শুধু বি,এন,পি জোট থেকে বের করে আনতে চাচ্ছে৷ উল্লেখ্য, জিয়ার মৃতু্যর ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে বি,এন,পি আবার ক্ষমতায় আসে, এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ এবং ২০০১ সালে আবার বি,এন,পি, তারপর ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে৷ এই সময়ের মধ্যে জামায়াত ছাড়া ধর্মভিত্তিক আর কোন দলকে আওয়ামী লীগ বা বি,এন,পি পৃষ্ঠপোষকতা বা রাজনীতি করার সুযোগ দেয়নি, তাহলে আজকের বাংলাদেশে এত ডজনে ডজনে ধর্ম ( ইসলাম ) ভিত্তিক উগ্র ও জংগী রাজনৈতিক দল ও গোপন সংগঠনের জন্ম হলো কার পৃষ্ঠপোষকতায় ? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বলে ধর্ম তথা ইসলামকে পুঁজি করে এখানে স্বাভাবিকভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠন গড়ে উঠত ও উঠছে, এজন্য ‘৭৫ পরবর্তি সময় তথা জিয়াকে দায়ী করা আওয়ামী মহলের কেবলই রাজনৈতিক কৌশল৷ দেশে এখন যে ধর্মীয় জংগী গোষ্টির উত্থান ও তত্‍পরতা চলছে তার জন্যও শেখ হাসিনা ও তার দল শুধু জামায়াত-শিবির না বলে ঢালাওভাবে বি,এন,পি-জামায়াত এজন্য দায়ী বলে প্রচার ও অভিযোগ করে যাচ্ছে৷ অথচ শেখ হাসিনার বিগত ৭ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ও জংগী গোষ্টিতে পরিনত হয়েছে, তাদের ৭ বছরের খুন-খারাবী, ধর্ষণ, চাঁদা-বাজি তথা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অন্য যে কোন ধর্মীয় জংগী গোষ্টির তত্‍পরতাকে হার মানিয়েছে, উগ্র ধর্মীয় জংগীরাতো মাঝেমধ্যে টার্গেট কিলিং করে, কিন্তু ছাত্রলীগ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশে প্রায় প্রতিদিন তাদের সন্ত্রাসী ও জঘন্য কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, যেজন্য এ প্রতিষ্ঠানকে এখন চাপাতি লীগ নাম দেওয়া হয়েছে ৷
    উল্লেখ্য, জিয়া যখন বিভিন্ন দল, গোষ্টি ও সমপ্রদায়ের লোকদের নিয়ে বি,এন,পি গঠন করেছিল তখন বি,এন,পিতে জামায়াত ইসলামের কাউকে স্থান দেননি৷ আরো উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব মিত্র দেশ ভারতকে অসন্তুষ্ট করেও ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অুনষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, যে জুলফিকার আলী ভূট্টোর কারণে নির্বাচনে জয়ী হয়েও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসনভার হাতে পান নাই বরং পেয়েছিলেন অত্যাচার আর নির্যাতন এবং বাংগালীদের উপর ইতিহাসের জঘন্যতম গনহত্যা সেই ভূট্টোর সাথে সেখানে সহাস্যে করমর্দন ও কোলাকোলি করেছিলেন, যদি ‘৭৫ এর পর এমন সম্মেলনে জেনারেল জিয়া পাকিস্তান যেতেন তবে আওয়ামী গোষ্টি চিত্‍কার করে বলতে থাকত জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় যে পাকিস্তানের চর ছিল এটাই তার প্রমান ৷
    বি,এন,পিকে কাবু করার জন্য আওয়ামী লীগ আরো বলে থাকে জিয়াই প্রথম স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী এবং রাজাকার আব্দুল আলীমকে মন্ত্রী বানিয়েছিল এবং তার দল বি,এন,পি যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা দিয়েছিল, এটা যেমন সত্য এই দোষে আওয়ামী লীগও ধোয়া তুলশী পাতা নয়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসভায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মাওলানা নূর মোহাম্মদ ছিল রাজাকার, তাছাড়া আওয়ামী লীগের বর্তমান মন্ত্রীসভার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারর্ফ হোসেনও রাজাকার ছিল বলে অভিযোগ আছে, আর বি,এন,পি’র আগেই রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা দিয়েছিল বর্তমান আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সহচর এরশাদ, সে যখন ক্ষমতায় ছিল ধর্মমন্ত্রী বানিয়েছিল দৈনিক ইনকিলাবের মাওলানা মান্নানকে – স্বাধীনতার পর রাজাকার উল্লেখ করে পত্রিকায় ছবি দিয়ে যাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল৷ অথচ যত দোষ জিয়া আর বি,এন,পি’র, কারণ এসব বলে ও প্রচার করে বি,এন,পিকে অজনপ্রিয় করা৷
    শেখ হাসিনার সরকার এখন বি,এন,পি নেত্রী খালেদা জিয়াকেও বিভিন্ন মামলার জালে অক্টোপাশের মত জড়িয়ে ফেলেছে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী দেশের একটা বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের যিনি বিগত ৩০ বছর যাবত সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তাকে ১০টার বেশী মামলায় আসামী করে অসুস্থ শরীরে এই বৃদ্ধ বয়সেও প্রতিমাসে আদালতে হাজিরা দেওয়ার যন্ত্রনায় নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে, অথচ ১/১১ এর জেনারেল মইনের কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও ১৩টা মামলা দিয়েছিল, কিন্তু ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার সকল মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নিয়েছে, খালেদা জিয়া ও অন্যান্য বি,এন,পি নেতাদের মামলা প্রত্যাহারতো করেইনি বরং আরো নতুন নতুন মামলা দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে৷ বি,এন,পি এখন মামলাবাজ আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক শিকারে পরিনত হয়েছে৷ আওয়ামী লীগ সরকারে এসে ২০০৪ সালের ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় বি,এন,পি’র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্‍ফর জামান বাবর ও আব্দুস সালাম পিন্টুকেও আসামীর তালিকায় অন্তভর্ূক্ত করেছে, মামলার প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রকাশ্যে বলে থাকে এ ঘটনা তারেক রহমানেই ঘটিয়েছে, তাহলে আর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কিভাবে ? যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন যদি এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে তার জন্য সে সরকারই দায়ী এটা কোন যুক্তি হতে পারেনা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা, বিচার করা, ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য আগাম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এসবের জন্য ক্ষমতাসীন সরকারকে অবশ্যই দায়বদ্ধ হতে হবে, কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার তথা তার দলের লোকেরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত এমন অভিযোগ করা মোটেই প্রত্যাশিত ও যৌক্তিক নয়৷ আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই বি,এন,পি’র বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, নিন্ম আদালতের এক রায়ে তারেক রহমানকে খালাস দিলেও উচ্চ আদালতে সরকারের ইচ্ছায় তাকে ৭ বছরের জেল দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ গত ৭ বছরে পুরো বিচারাঙ্গনকে দলীয়করন এমনভাবে করেছে এখন আর দেশে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার পাওয়ার কোন আশা নাই, বাংলাদেশের বিচারপতিরাওতো জাতে বাংগালী, যেদিকে মেঘ সেদিকেই ছাতা ধরে ( বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া )৷ ১৯৮২ সাল থেকে ৯ বছর এরশাদ ক্ষমতায় ছিল, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বি,এন,পি সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন কোন সাহসী বিচারপতি বা উচ্চ আদালতের বেঞ্চকে জিয়া ও এরশাদের শাসনকালকে অবৈধ ঘোষণা করতে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের পরিপন্থি বলে রায় দিতে দেখা যায়নি, যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল বা থাকে তখনই “সাহসী ও জ্ঞানী” বিচারপতিরা এ ধরনের রায় দেন, আর আওয়ামী লীগ একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিরোধী দলকে ঘায়েল করার কাজে ব্যবহার করে৷ ক্ষমতায় যারা থাকে তারাই যদি অঘটনের জন্য দায়ী হয় তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে উদীচী ও রমনা বটমূলে যে বোমা হামলা হয়েছিল তার জন্যও নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগই দায়ী, ২১ আগষ্টের ঘটনার জন্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে বি,এন,পি নেতাদের যেভাবে জড়ানো ও অভিযুক্ত করা হচ্ছে ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী পিলখানায় যে পৈশাচিক ( ২১শে আগষ্টের চেয়েও নৃশংস ও জঘন্য ) ও নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটেছিল বি,এন,পি ক্ষমতায় আসলে যদি এজন্য আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীদের দায়ী করে মামলায় আসামী করা হয় তবে নিশ্চয়ই আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবেনা৷ আওয়ামী লীগ এখন ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের যে পথ তৈরী করে দিয়ে যাচ্ছে বি,এন,পিও যদি ভবিষ্যতে সে পথেই হাটে তবে তা অবশ্যই যথার্থই হবে৷ উল্লেখ্য, পিলখানার ঘটনায় বরং আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক মামলার জালে পড়ে বি,এন,পি নেতা নাসিরউদ্দীন পিন্টুকে বিনা বিচারে জেলখানাতেই মৃতু্যবরন করতে হয়েছে৷
    অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আওয়ামী লীগ এখন বিভিন্ন মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বি,এন,পি’র সিনিয়ার নেতাদের সাজা দিয়ে বি,এন,পিকে নেতৃত্ব শূন্য এবং তাদেরকে নির্বাচন করার অযোগ্য করে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে৷ অথচ শেখ হাসিনা প্রায়ই মূখে বলে সে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করেনা বা বিশ্বাস করেনা৷ কিন্তু দেশবাসী ২০০৯ সাল থেকে প্রত্যক্ষ করছে শেখ হাসিনা ও তার দল বি,এন,পি’র প্রতি কত রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ন৷ ক্ষমতায় এসেইে ৩০ বছর ধরে স্থায়ী জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম থেকে জিয়ার নাম সরিয়ে ফেলে দেয়, ৪০ বছর যাবত জিয়া পরিবার ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে থাকত, এই জায়গাটা জিয়ায় ক্ষমতায় থাকতে বা বি,এন,পি’র আমলে বরাদ্দ নেওয়া হয় নাই, জিয়া মারা যাওয়ার পর শেখ হাসিনার “ঘনিষ্ঠ বন্ধু” জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন জিয়া পরিবারকে এই জায়গাটা বরাদ্দ দিয়েছিল, কিন্তু শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করে নয় মনে হয় সতীন মনে করে বেগম জিয়াকে আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে ( আদালতকে ব্যবহার করে) ৪০ বছরের বাসস্থান থেকে টেনে হেচরে উচ্ছেদ করেছে৷ একজন নারী ও প্রধানমন্ত্রী আর একজন নারী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একটা বৃহত্‍ দলের নেত্রীর প্রতি এহেন আচরন তখনই করতে পারে যখন সে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আগুণে জ্বলতে থাকে৷ অনুগত ও দলীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী আদালত তথা বিচারকদের রায়ের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা ও তার দল এখন জিয়ার স্বাধীনতা দিবস পদক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমনকি শেরে বাংলানগর থেকে জিয়ার কবর সরানোর পরিকল্পনাও করছে, প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মনমানষিকতা ও বৈশিষ্ট্য ধারন করে বলেই শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ এখন জিয়া ও বি,এন,পি’র প্রতি এমন আচরন করে যাচ্ছে৷ নব্য আওয়ামী লীগের মতে জিয়া যদি মুক্তিযোদ্ধা নয়-পাকিস্তানের চর হয়ে থাকে তবে জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাব দেওয়ার অপরাধে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানেরও মরনোত্তর বিচার করা করা হয়না কেন ? আওয়ামী মার্কা বিচারকদের কাছ থেকে এ ব্যাপরে এখন এমন রায়ও আসা উচিত৷ শেখ হাসিনা দেশে ও বিদেশে যেখানেই যে কোন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা বা ভাষণ দেওয়ার সময় জিয়া, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিষেদগার ( কোন কোন সময় অশালীন ও শিষ্টাচার বহিভর্ূত শব্দ ও ভাষা প্রয়োগ করে ) না করলে যেন তার বক্তৃতা বা বক্তব্য যেন অসম্পূর্নই থেকে যায়, যেন তার তৃপ্তিই হয়না৷ ১৫ই আগষ্ট খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন ও কেক কাটেন বলে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের গায়ে আগুন ধরে যায়, যদি ঐদিন তার সত্যিই জন্মদিন হয়েও থাকে শেখ মুজিবুর রহমান ঐদিনে নিহত হয়েছিলেন বলে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ ১৫ই আগষ্টকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে, কাজেই তাদের পিতা ও নেতার মৃতু্য দিবসে বিরোধী দলের একজন নেতা যদি কেক কেটে তার জন্মদিন পালন করার মধ্য দিয়ে আনন্দ-র্স্ফূতি করে তবে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের গায়েত আগুন লাগবেই৷ কিন্তু বি,এন,পি তথা জিয়া, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে কটুক্তি ও খাটো করে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতা/নেত্রীরা যেভাবে অনবরত গালাগালি করেতে থাকে এবং শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে জিয়া পরিবারকে যেভাবে হয়রানী ও নির্যাতনের মধ্যে ফেলেছে তখন বি,এন,পি প্রতিশোধ হিসেবে ১৫ই আগষ্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করবেনা কেন ? তাছাড়া বি,এন,পি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসার ঐতিহাসিক দিন ৭ই নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে এবং সেদিন সরকারী ছুটি ঘোষণা করে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ৭ই নভেম্বরকে জিয় কতর্ৃক মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং ৭ই নভেম্বরের সরকারী ছুটি বাতিল করে ১৫ই আগষ্ট শোক দিবস হিসেবে সরকারী ছুটি ঘোষণা করে৷ এই প্রতিহিংসামূলক আচরনের জন্যই বি,এন,পি ১৫ই আগষ্ট কেক কেটে খালেদা জিয়ার জন্মদিন উদযাপন করে৷
    শেখ হাসিনা, তার দল ও সমর্থক গোষ্টি অব্যাহতভাবে প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সর্বত্রই উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, দেশের মানুষ অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশী সুখে , শান্তিতে ও নিরাপদে আছে৷ যদি তাই সত্য হয় তবে বিরোধী দল তথা বি,এন,পিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরিবর্তে মামলা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি ও দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের দিয়ে হামলা করে চরম প্রতিহিংসার পথ কেন বেছে নেওয়া হয়েছে ? কথিত এত উন্নয়ন ও ভালো কাজের জন্য দেশের জনগন নিশ্চয়ই চাইবে আওয়ামী লীগই যাতে ক্ষমতায় থাকে, তাহলে ক্ষমতা ছেড়ে ( এখনই হউক বা ২০১৯ সালেই হউক ) বি,এন,পিসহ সকল দল যাতে অংশগ্রহন করতে পারে একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে জনপ্রিয়তা যাচাই করতে ভয় বা বাধা কোথায় ? জিয়া ও বি,এন,পি’র বিরুদ্ধে এখন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী মহল থেকে যে অভিযোগ ও সমালোচনা করা হচ্ছে জনগনের রায়েই তা নির্দ্ধারিত হয়ে যাবে৷ কোন কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র বা প্রতিহিংসা দিয়ে নয় রাজনৈতিকভাবে এবং গনরায়ের মাধ্যমেই তার ফয়সালা হয়ে যাবে৷ এই সত্‍ সাহস কি বঙ্গবন্ধু কন্যার আছে ? যিনি মূখে বলেন ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রীত্ব তার কাছে বড় বিষয় নয়, দেশ ও জনগনের স্বার্থে তিনি যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন, যদি এমন মনোভাব সতিই পোষণ করেন তবে কি একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে জনপ্রিয়তা যাচাই করার জন্য নির্বাচনকালীন মাত্র তিন মাসের জন্য গদির স্বার্থ ত্যাগ করে ক্ষমতা থেকে সরে থেকে নির্বাচন দিয়ে জাতির কাছে মূখে নয় প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু কন্যার পরিচয় দেওয়ার সত্‍ সাহস দেখিয়ে নজীর স্থাপন করে যেতে পারবেন ?

    ২০ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক রাজনীতি

    সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক:

    ন্যাপ আয়োজিত স্মরণসভা
    বাংলাদেশ ন্যাপ নামক একটি সুপরিচিত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ২০ দলীয় জোটের অংশীদার। বাংলাদেশ ন্যাপের বর্তমান চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গনি। জনাব জেবেলের বাবা হচ্ছেন শফিকুল গনি স্বপন; জেবেলের দাদা হচ্ছেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া। যাদু মিয়া ছিলেন মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং ন্যাপের প্রধান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্যাবিনেটে সিনিয়র মিনিস্টার হয়েছিলেন। শফিকুল গনি স্বপন শহীদ জিয়ার অধীনে এবং পরবর্তীকালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে মন্ত্রী ছিলেন। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ২১ আগস্ট একটি আলোচনা সভা ছিল। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। বিনীতভাবে কয়েকটি কথা তুলে ধরেছিলাম, যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচের দু-একটি অনুচ্ছেদে আছে।

    শহীদ জিয়ার ঐতিহ্য
    শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান; দেশের প্রয়োজনে ও রাজনীতির প্রয়োজনে ডেকে ডেকে বেছে বেছে ব্যক্তিদের কাছে টেনে নিয়েছিলেন। কাউকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কাউকে দিয়ে রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে দিয়ে তিনি রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। দেশের রাজনীতিতে একটি ক্রান্তিকাল চলছে। এই ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়াকেও এরূপভাবে বিচক্ষণ পদক্ষেপ নিতে হবে বলে অনুভব করি। কিছু ব্যক্তিকে কাছে টেনে নিতে হবে, কিছু ব্যক্তি থেকে গভীরতর রাজনৈতিক সেবা আদায় করতে হবে, কিছু ব্যক্তির সাহস থেকে রাজপথকে সমৃদ্ধ করতে হবে। রাজনীতিতে যেমন একটি ক্রান্তিকাল চলছে, তেমনি বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের রাজনীতিতেও চলছে ক্রান্তিকাল। বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল সম্বন্ধে কম-বেশি সবাই অবহিত আছেন; কিন্তু বিএনপি ও ২০ দলের ক্রান্তিকাল সম্পর্কে হয়তো বা গভীরভাবে চিন্তা করা হয়নি। সে জন্য দু’টি কথা।

    ক্রান্তিকাল : রাজনীতি, জোট এবং বিএনপি
    ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক পর সংবাদ সম্মেলনে দেশনেত্রী বেগম জিয়া বলেছিলেন, দল পুনর্গঠনের পর আবার আন্দোলন শুরু হবে। একই বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ঢাকা মহানগরের বিদ্যমান বিএনপি কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছিলেন। ২০১৪ সালের শেষ দিন পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছিল। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখ থেকে প্রায় তিন মাস অবরোধ চলে। এ সময়টা অবশ্যই সঙ্কটময় ছিল। অবরোধপরবর্তী চার-পাঁচ মাস সরকারের দমননীতি ছিল চরম পর্যায়ে। অতএব পুনর্গঠন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই স্থগিত রাখতে হয়েছে। ২০১৫ সাল শেষ হওয়ার দু-তিন মাস আগে তৃণমূল পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল; কিছু জেলা কমিটি বা উপজেলা কমিটি বাতিল করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এরূপ জেলা-উপজেলা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়েছিল দলের কাউন্সিলের অপেক্ষায়। সেই কাউন্সিল গত ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এর আনুমানিক ১৮ বা ১৯ সপ্তাহ পর দলের কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো ঘোষিত হয়েছে। মহানগরগুলো পুনর্গঠন এখনো বাকি। তাহলে আমরা বলতেই পারি, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময়টি ক্রান্তিকাল। কারণ, কে দায়িত্বে আছে আর কে দায়িত্বে নেই এটা সময়টাতে শতভাগ সুনিশ্চিত থাকে না।

    সৈনিক জীবন থেকে উদাহরণ
    সৈনিক ছিলাম; সে জন্যই সৈনিক জীবন থেকে অনেক উদাহরণ আপনাদের সামনে মাঝে মধ্যেই উপস্থাপন করি। রাতের পর দিন আগমনের সময় অথবা দিনের শেষে রাত আগমনের সময়, বলা চলে ক্রান্তিকাল। ফজরের নামাজের এক ঘণ্টা আগে থেকে ফজরের নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়টিকে সামরিক পরিভাষায় ‘ডন’ বলি। মাগরিবের নামাজের আধা ঘণ্টা আগে থেকে মাগরিবের নামাজের আধা ঘণ্টা পর পর্যন্ত সময়টিকে সামরিক পরিভাষায় ‘ডাস্ক’ বলি। ডন অথবা ডাস্ক সময়কালে মানুষের বা সৈনিকদের দৃষ্টিশক্তি পূর্ণ সক্ষম থাকে না। আলো এবং আঁধার এই দুয়ের মধ্যে চোখের দৃষ্টিশক্তিকে অ্যাডজাস্ট করতে হয়। ডন বা সকালবেলায় মানুষের বা সৈনিকের শরীর ক্লান্ত থাকে; কারণ সারা রাত সে কিছু-না-কিছু করেছে। ডন বা সকালবেলায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার সময় মানুষ বা সৈনিকের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত কাজ। এ কারণে কোনো-না-কোনো লোক বা সৈনিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে হয়। বিকেলবেলা তথা সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে যুদ্ধের মাঠে সৈনিকেরা তাদের রাতের খাবার সেরে নেয়ার কথা। আবার সন্ধ্যার পরপরই কোনো কোনো সৈনিক প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে দূরে অন্য দায়িত্ব পালনে যাবেন। অতএব সন্ধ্যার আগে আগে সময়টায় বা সান্ধ্যকালীন সময়টায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ঘটে থাকে। এ জন্যই ডন বা ডাস্ক সময়ে শত্রুপক্ষ আক্রমণ চালাতে চেষ্টা করে। যদি করে, তাহলে সেই আক্রমণ মোকাবেলা করা যেন সহজ হয়, সে জন্যই যুদ্ধের ময়দানে ওই সময়টাই প্রতিরক্ষায় যারা থাকে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকে; ওই সতর্ক অবস্থাকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ‘স্ট্যান্ড টু’। রাজনীতিতেও ডন ও ডাস্ক থাকতে পারে। রাজনীতির পরিভাষায় সেটিকে আমরা ‘ক্রান্তিকাল’ বলতে পারি।

    ক্রান্তিকাল : আরেকটু আলোচনা
    এ জন্যই বললাম, বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তেমনি বিএনপিও পুনর্গঠন কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিএনপি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করলে ২০ দলীয় জোটও ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে অবশ্যই। কারণ, ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক, প্রধান শক্তি ও কেন্দ্রীয় শক্তি হচ্ছে বিএনপি। এ জোট ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলার আরো দু’টি ‘প্রান্তিক’ কারণ আছে। প্রথমটি, সরকারের পক্ষ থেকে বহু দিন ধরে বটেই, বেগম জিয়া কর্তৃক জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানোর পর থেকে মিডিয়ার মাধ্যমে আরো অনেকেই বিএনপির ওপর চাপ দিচ্ছেন বা জোটের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে। দ্বিতীয় প্রান্তিক কারণ হলো, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সাইড-ইফেক্ট। ১৩ জুলাই ২০ দলীয় জোটের মিটিংয়ে বেগম জিয়া কর্তৃক ইতঃপূর্বে সঞ্চারিত জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকে পূর্ণাঙ্গ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেয়া হয়; সাফল্য কামনা করা হয়; কিন্তু এই আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে ২০ দলীয় জোটের কোনো কোনো শরিক এ প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে মিডিয়া মারফত দ্বিমত পোষণ বা শর্তারোপ করেছেন। অতএব কিছুটা হলেও জোটের ভেতরে একটুখানি টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

    স্মরণসভায় আমার বক্তব্য
    ২১ আগস্ট সাগর-রুনি হলে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতেই একাধিক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর উদাহরণ দিলাম। যেমন একটি হলো রামপালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রসঙ্গে ২০ দলীয় জোটের অবস্থান ও বক্তব্য কী? আরেকটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা তথা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিন্যাস। মির্জা আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি বলেছি, বিএনপির পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া যেমন চলবে, তেমনি জোটকে শক্তিশালীকরণ প্রক্রিয়াও চলতে হবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। আমার বক্তব্য রাখার পরে শফিউল আলম প্রধান এবং তারপর বক্তব্য রাখেন মোস্তফা জামাল হায়দার; অতঃপর সভাপতির বক্তব্য রাখেন জেবেল রহমান গনি।

    প্রধান অতিথির গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যগুলো
    প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত বা ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলেন। অন্যতম ছিল, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে দল বা জোটের অন্যান্য কাজের সাথে সাথে। গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই, জনাব আলমগীর তার বক্তব্যের শুরুতেই ২১ আগস্ট ২০০৪ তারিখের ঘটনার প্রসঙ্গ আনেন। তিনি হতাহতদের কথা স্মরণ করে শোক প্রকাশ করেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘কলঙ্কজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমার মন্তব্য, তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক ও মানবিক মন্তব্য করেছেন। সেই সুবাদেই ২১ আগস্ট ২০০৪ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত দু’টি কথা উল্লেখ করছি। এরপর অন্য আলোচনায় যাবো।

    ২১ আগস্ট : ১২ বছর আগের ইবরাহিম
    ২১ আগস্ট ২০০৪ বিকেলবেলা ঢাকা মহানগরের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ তথা গুলিস্তানে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা একটি ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তার ভাষণটি শেষ হওয়া মাত্রই সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। ওটা একটি জনবহুল সমাবেশ ছিল। সভাস্থলটি পূর্ব দিক ও পশ্চিম দিক উন্মুক্ত, কিন্তু উত্তর দিক ও দক্ষিণ দিকে উঁচু উঁচু দালান দিয়ে আবদ্ধ। ওই আমলে রাজনীতি করতাম না। টেলিভিশনে যেতাম, টকশোতে অংশগ্রহণ করতাম অথবা সংবাদ চলাকালে নিরাপত্তাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মন্তব্য দেয়ার জন্য টেলিভিশনে যেতাম। ২২ আগস্ট ২০০৪ দিনের বেলা সুপরিচিত সাংবাদিক (এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ রিপোর্টার) মুন্নি সাহা আমার অফিসে আমার কাছে আসেন এবং এই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করার অনুরোধ করেন। বলেছিলাম, যেহেতু ঘটনা কোথায় হয়েছে, কিভাবে হয়েছে, কোন পরিবেশে হয়েছে সে সম্পর্কে পরিপক্ব ধারণা নেই; অতএব আমি মন্তব্য দিতে অপারগ। ওই পরিপ্রেক্ষিতেই, মুন্নি সাহা আমাকে দাওয়াত দিয়ে টেলিভিশন ক্যামেরাসহ ঘটনাস্থলে নিয়ে যান। তার প্রশ্ন ছিল, নিরাপত্তার দৃষ্টিতে আপনি বিস্ফোরণের ঘটনাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? উত্তর দিয়েছিলাম, গ্রেনেডগুলো যেভাবে যে জায়গায় বিস্ফোরিত হয়েছে, সেই জায়গাগুলোতে কারো বেঁচে থাকাই অস্বাভাবিক। অর্থাৎ গ্রেনেডগুলো নিক্ষেপের তথা বিস্ফোরণ ঘটানোর একমাত্র উদ্দেশ্য, লক্ষ্যবস্তুতে বা টার্গেটে উপস্থিত মানুষকে হতাহত করা। সেখানে কোন অবস্থান থেকে গ্রেনেডগুলো ছুড়ে মারা হয়ে থাকতে পারে এবং গ্রেনেডগুলো ছুড়ে মারার পর ব্যক্তিরা কোন দিক দিয়ে প্রস্থান করতে পারে ইত্যাদিও প্রাসঙ্গিকভাবে এক-দুই বাক্যে উচ্চারণ করেছিলাম বলে আমার মনে পড়ে। ২২ আগস্ট ২০০৪ তারিখের এটিএন বাংলার সন্ধ্যা বা রাতের খবর সন্ধান করে পেলে এ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হতে পারতাম। ওই ২২ তারিখে আমি যখন দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম, তখন পূর্ব দিক ও পশ্চিম দিক থেকে রাস্তাটিতে মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয়া ছিল। পুলিশের লোক পাহারায় ছিল। শত শত জুতা-স্যান্ডেল এবং কিছু কিছু পোশাকের অংশ বিক্ষিপ্তভাবে রাস্তায় পড়েছিল; রক্তের দাগ রাস্তা থেকে তখনো শুকায়নি। ২১ আগস্ট ২০১৬ আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। তাই বলে কি আমার মূল্যায়ন বদলাবে? আমার উত্তর হলো, মূল্যায়ন বদলাবে না। আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে মূল্যায়নে এবং শোক প্রকাশে সহমত পোষণ করি।

    জোটের বৈঠক প্রসঙ্গে মিডিয়া যোগাযোগ
    ২১ আগস্ট ২০১৬ দিনের বেলার আলোচনা সভা (যেটার কথা ওপরে বললাম) এবং মাথার মধ্যে বিদ্যমান চিন্তাগুলো নিয়েই সন্ধ্যার পরে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গেলাম। সেখানে পৌনে ৮টার দিকে সভা শুরু হলো। অনেক বিষয় আলোচনায় এসেছে। যতবারই ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়, ততবারই মিটিং শেষ হওয়ার আগে আগে একটি অনুরোধ টেবিলে উপস্থাপিত হয়। অনুরোধটি হলো, আপনারা কেউ মেহেরবানি করে মিডিয়ার সাথে বৈঠকের আলোচ্য সূচি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলবেন না। কারণ হলো, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে মিডিয়াকে জানালে ক্ষতিকারক পার্থক্য হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো, জোটের সমন্বয়ক তথা বিএনপি মহাসচিব মিডিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিফিং করে থাকেন। এক-দেড় বছর আগে মহাসচিবের ব্রিফিংটি মিটিংয়ের পরপরই গুলশান কার্যালয়ে হতো; যাতে টেলিভিশনে রাত ১০টা বা ১১টা বা মধ্যরাতের সংবাদে সেটা উপস্থাপন করা যায়। কিছু দিন ধরে ব্রিফিংটি রাতে হচ্ছে না, পরের দিনের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়; কিন্তু দেশবাসী ও মিডিয়া সংবাদের জন্য অপেক্ষা করে। ২০ দলীয় জোটের মিটিং হচ্ছে, এখান থেকে কী সিদ্ধান্ত হলো, জাতীয় জীবনের সাথে এর সম্পর্ক কী, এ বিষয়ে জনগণ জানতে চায়। ২০ দলীয় জোটে কী হচ্ছে বা না হচ্ছে, এটা জানতে চাওয়ার মানে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ জোট গুরুত্বপূর্ণ। জোট যদি কিছু জানাতে না চায়, তাহলে মানুষ সংবাদ থেকে বঞ্চিত হয়। জোটের মিটিং শেষ হয় রাত পৌনে ১১টা বা ১১টার দিকে। বড় বড় বা বিখ্যাত সংবাদপত্রগুলোর প্রথম সংস্করণ বা মফস্বল সংস্করণ ছাপা হয়ে যায় রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে। কারণ এগুলো ঢাকার বাইরে ও দূরবর্তী অঞ্চলে যাবে। তারপরে দ্বিতীয় ও কোনো কোনো সময়ে তৃতীয় সংস্করণ ছাপা হতে থাকে। পত্রিকাগুলো যদি ২০ দলীয় জোটের কোনো সংবাদ না দেয়, তাহলে পাঠকেরা মনে করবেন, পত্রিকা ২০ দলীয় জোটকে বয়কট করছে। অথবা মনে করবে, জোটের বা জোটের সংবাদের কোনো গুরুত্ব নেই; তাই ছাপানো হয়নি। পত্রিকাগুলো পরের দিনের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের জন্য অপেক্ষা করা অবাস্তব। কারণ ততক্ষণে জোটের মিটিংয়ের খবরটি বাসি হয়ে যায়। অনলাইন পত্রিকাগুলো আরো বেশি তৎপর। তারা চায় যত দ্রুত সম্ভব সংবাদ আপলোড করতে। যদি আনুষ্ঠানিকভাবে মিডিয়াকে কিছু বলা না হয়, তাহলে মিডিয়া অবশ্যই চেষ্টা করবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বা গোপনীয়ভাবে জানতে। এই অনানুষ্ঠানিক বা গোপনীয় প্রক্রিয়ায় জানার চেষ্টায় অন্যতম পদক্ষেপ হলো, মিটিংয়ে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতাদের ফোন করা। ফোন করে জেনে নেয়া কী আলাপ হলো, কী সিদ্ধান্ত হলো। ২১ আগস্ট ২০১৬ তারিখে মিটিংয়ের আগে আমি স্বাভাবিক নিয়মে মোবাইল ফোন অফ করে মোবাইলটি সুরক্ষিত স্থানে দিয়েছিলাম। মিটিংয়ের পর ফোন অন করতে ভুলে যাই, কারণ আমার জন্য দু-একজন লোক অপেক্ষা করছিল। তাদের গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক কথা ছিল। সাধারণত এমন হয় না। অতএব, প্রায় দুই ঘণ্টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। মধ্যরাতের পরে অনলাইনে দেখতে পেলাম এবং সোমবার ২২ তারিখ সকালবেলা পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম, ২০ দলীয় জোটের মিটিংয়ে আলোচনার সংবাদ। কোনো পত্রিকায় একটু বড়, কোনো পত্রিকায় একটু ছোট। অতএব, এই কলামের মাধ্যমে দু-একটি বিষয় জানানোর সুযোগ নিলাম।
    ২১ আগস্ট ২০১৬ : জোটের বৈঠক
    সভায় ২০ দলীয় জোটের সংহতি বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার কত দূর অগ্রগতি হলো বা হলো না; প্রক্রিয়ায় কী কী সীমাবদ্ধতা আছে প্রভৃতি এবং পুরো প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য ‘আউটকাম’ (ফলাফল) কী হতে পারে, সেগুলো নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে। কিছু কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের অবস্থান বা মতামত কী এবং সেগুলো জনসমক্ষে উপস্থাপন করা বা প্রকাশ করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়Ñ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে সঙ্কট, জঙ্গি দমন প্রক্রিয়ার সুবাদে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক কিছু কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ ইত্যাদি। সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যের মধ্যে আলোচিত হয়েছে যে, ২০ দলীয় জোটটি আন্দোলনের জোট। অতএব, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রসঙ্গটি, আবহাওয়া ও দেশের পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম জিয়া শিগগিরই কোনো একটি তারিখে পবিত্র হজ পালনের নিমিত্তে দেশের বাইরে যাবেন; অতএব, তাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। সর্বশেষে আলোচিত হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রত্যেকেই শান্তিপূর্ণভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কিছু-না-কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এসব আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান উপকৃত হয়েছেন, কল্যাণ পার্টি উপকৃত হয়েছে। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে মানুষের পাশে থাকতে। সেই চেষ্টা আরো বৃদ্ধি করবে।

    লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
    www.generalibrahim.com